মামলা জট কমাতে মেডিয়েশনকে আরও শক্তিশালী করতে হবে: চিফ লিগ্যাল এইড অফিসার
বদিউজ্জামান: মামলা জট কমানো এবং সাধারণ মানুষের দ্রুত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে লিগ্যাল এইডের কার্যক্রম ও মেডিয়েশন (মধ্যস্থতা) আরও শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন সাতক্ষীরার চিফ লিগ্যাল এইড অফিসার এবং যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ মো. মুস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেছেন, আপস-মীমাংসার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তি হলে উভয় পক্ষই জয়ী হয়, দুই পরিবারের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয় এবং আদালতের মামলা জটও কমে। লিগ্যাল এইড সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এ কার্যক্রমকে আরও এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) সকালে সাতক্ষীরা সদর উপজেলার এল্লারচর সংলগ্ন চিংড়ি চাষ প্রদর্শনী খামারের সম্মেলন কক্ষে ‘ব্রেকিং দ্য সাইলেন্স’-এর বাস্তবায়নে এবং টিডিএইচ নেদারল্যান্ডস-এর কারিগরি সহযোগিতায় পরিচালিত ‘স্পিক আপ!’ প্রকল্পের আওতায় আয়োজিত মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
চিফ লিগ্যাল এইড অফিসার বলেন, বাংলাদেশের সংবিধান ও রাষ্ট্র জনগণের মৌলিক অধিকারের বিষয়ে সোচ্চার। কেউ যাতে আইনের দৃষ্টিতে সমতা ও ন্যায্যতার অধিকার থেকে বঞ্চিত না হন, সে বিষয়ে সবাইকে লক্ষ্য রাখতে হবে। সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করতে লিগ্যাল এইড একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে প্রতিবছর গড়ে প্রায় পাঁচ লাখ মামলা দায়ের হয় এবং নিষ্পত্তি হয় প্রায় তিন লাখ। ফলে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক মামলা অনিষ্পন্ন থেকে যায়। এ মামলা জট থেকে উত্তরণের অন্যতম পথ হিসেবে সরকার অউজ বা বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির মাধ্যমে আপস-মীমাংসার উদ্যোগ নিয়েছে।
মো. মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, মেডিয়েশনের মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তি হলে আদালতে মামলা-মোকদ্দমায় জড়ানোর সুযোগ কমে যায়। একই সঙ্গে দুই পক্ষের পরিবারের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসের তুলনায় ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে আদালতে মামলা দায়ের ৬০ শতাংশ কমেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। মধ্যস্থতার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির ফলে এ পরিবর্তন সম্ভব হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিচার বিভাগের জন্য এটি একটি স্বস্তির বিষয়।
তিনি আরও বলেন, আপস-মীমাংসার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তি হলে কোনো পক্ষকে পরাজিত হতে হয় না; বরং দুই পক্ষই জয়ী হয়। উভয় পরিবারের মধ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার সুযোগ সৃষ্টি হয়। প্রাচীনকাল থেকেই আমাদের সমাজে সালিশ ব্যবস্থার প্রচলন ছিল। সেই ঐতিহ্যবাহী ব্যবস্থাকে আধুনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয় মেডিয়েশন পদ্ধতিতে সাজানো হয়েছে। এ ইতিবাচক উদ্যোগকে সবাইকে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে নিতে হবে।
লিগ্যাল এইড কার্যক্রমের প্রসারে জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, যত বেশি মানুষ লিগ্যাল এইড সম্পর্কে সচেতন হবে, সাধারণ মানুষ তত বেশি উপকৃত হবে। লিগ্যাল এইডের কার্যক্রমকে এগিয়ে নিতে সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে কাজ করতে হবে। আমরা সবাই লিগ্যাল এইডের একজন ‘সৈনিক’ হিসেবে কাজ করব-এ প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি।
সাতক্ষীরায় লিগ্যাল এইডের কার্যক্রম আরও গতিশীল করার কথা উল্লেখ করে চিফ লিগ্যাল এইড অফিসার বলেন, সরকারের দেওয়া লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যেতে চাই আমরা। এজন্য মেডিয়েশন কার্যক্রমকে আরও অনেক বেশি এগিয়ে নিতে হবে। জনগণের দোরগোড়ায় আইনগত সহায়তার সেবা পৌঁছে দিতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
সভায় মুখ্য আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের খুলনা বিভাগের যুগ্ম সচিব ও পরিচালক মো. হাসাইন শওকত। তিনি বলেন, মানুষকে যথাযথ সম্মান দিতে হবে। কাউকে সম্মান দিতে না পারলে তার কাছ থেকে ভালো কিছু আশা করা যায় না।
তিনি ডিভাইসের সঠিক ব্যবহারের ওপর গুরুত্বারোপ করে সাতক্ষীরায় সাইবার সুরক্ষা ট্রাইব্যুনাল গঠনের দাবি জানান। শিশু-কিশোরদের অনলাইনে যৌন হয়রানি ও অনলাইন নিরাপত্তাহীনতার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখার আহ্বান জানান তিনি। লিগ্যাল এইড অফিসে শিশুদের জন্য পৃথক ‘চাইল্ড সেল’ চালুর বিষয়টিও বিবেচনা করার প্রস্তাব দেন।
সভাপতির বক্তব্যে ব্রেকিং দ্য সাইলেন্সের উপপরিচালক ড. তারেকুজ্জামান বলেন, শিশু ও যুবকদের অধিকার সুরক্ষা, নিরাপদ অনলাইন পরিবেশ, স্বাধীন মতপ্রকাশ এবং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে তাদের অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
সভায় উন্মুক্ত আলোচনায় অংশ নেন সাংবাদিক আব্দুল বারী, স্বদেশের নির্বাহী পরিচালক মাধব চন্দ্র দত্ত, প্যানেল আইনজীবী খায়রুল বদিউজ্জামান, অ্যাডভোকেট শামিমুর রেজা শামীম, অ্যাডভোকেট এস,এম বিপ্লব হোসেন, জেলা লিগ্যাল এইড কমিটির পর্যবেক্ষক সদস্য সাকিবুর রহমান বাবলা, সাংবাদিক আখতারুজ্জামান বাচ্চু, টিআইবির রেবেকা সুলতানা, নাজমুল হুদা ও সাইবার ক্রাইম এলার্ট টিমের মাহাবুবুল হক।
বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন সিনিয়র সাংবাদিক মনিরুল ইসলাম মিনি, মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপপরিচালক নাজমুন্নাহার, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের পিপি শেখ আলমগীর আশরাফ এবং সিনিয়র আইনজীবী মোস্তফা আসাদুজ্জামান দিলু।
সভায় ‘স্পিক আপ!’ প্রকল্পের বিভিন্ন দিক তুলে ধরার পাশাপাশি লিগ্যাল এইডের কার্যক্রম, নির্যাতন ও শোষণের শিকার ব্যক্তিদের আইনগত সুরক্ষা, ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণ এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধির বিষয়ে আলোচনা করা হয়।
আলোচনা শেষে কুইজ প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। এতে বিজয়ী হিসেবে এডভোকেট ইয়াসমিন সুলতানা সুমি ও সাকিবুর রহমান বাবলা পুরস্কার লাভ করেন এবং সান্তনা পুরস্কার দেয়া হয় অ্যাডভোকেট বিউটি আক্তার এর কন্যা জাফরিন আক্তারকে।
সমগ্র অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন, ব্রেকিং দ্য সাইলেন্স এর ডিস্ট্রিক্ট ইনচার্জ মোঃ শরিফুল ইসলাম।









