শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৫ আশ্বিন ১৪৩৩
শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৫ আশ্বিন ১৪৩৩

ফিরে আসুক সাতক্ষীরার গুড়পুকুর মেলা

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৪:১৯ অপরাহ্ণ
ফিরে আসুক সাতক্ষীরার গুড়পুকুর মেলা

0-0x0-0-0#

সচ্চিদানন্দ দে সদয়

একটি মেলা কেবল দোকানপাটের সমাবেশ নয়। একটি মেলা একটি জনপদের স্মৃতি, সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও মানুষের মিলনের জায়গা। তাই কোনো ঐতিহ্যবাহী মেলা হারিয়ে যাওয়া মানে শুধু একটি আয়োজন বন্ধ হয়ে যাওয়া নয়; এর সঙ্গে হারিয়ে যায় মানুষের বহু বছরের স্মৃতি, স্থানীয় কারুশিল্পের বাজার এবং সামাজিক যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিসর। সাতক্ষীরার গুড়পুকুর মেলাও তেমনই এক ঐতিহ্যের নাম। শরৎ এলেই একসময় সাতক্ষীরার মানুষের মনে গুড়পুকুর মেলাকে ঘিরে তৈরি হতো আলাদা আনন্দ। শিশু-কিশোরদের মধ্যে থাকত মেলায় যাওয়ার আনন্দ।

 

পরিবারের বড়রা ব্যস্ত থাকতেন কেনাকাটা ও আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা করার আয়োজনে। দূরদূরান্তের মানুষও মেলায় আসতেন। মাঠজুড়ে বসত নানা ধরনের দোকান। মাটির খেলনা, বাঁশ-বেতের সামগ্রী, কাঠের তৈরি জিনিস, মিষ্টি, খাবার ও স্থানীয় কারিগরদের তৈরি পণ্য মেলার অন্যতম আকর্ষণ ছিল। প্রবীণ সাতক্ষীরাবাসীর স্মৃতিতে সেই মেলা এখনো জীবন্ত। তাঁদের কাছে গুড়পুকুর মেলা শুধু একটি উৎসব নয়Ñএটি শৈশব ও তারুণ্যের স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি নাম। কারও কাছে মেলার স্মৃতি নাগরদোলার, কারও কাছে মাটির খেলনার, কারও কাছে বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরে বেড়ানোর। আবার কারও কাছে মেলা মানেই পরিবারের সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে আনন্দ করার একটি দিন। কিন্তু সময় বদলেছে। মানুষের জীবনযাত্রা বদলেছে।

 

বিনোদনের ধরন বদলেছে। মোবাইল ফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, টেলিভিশন, অনলাইন কেনাকাটা ও আধুনিক বিপণি ব্যবস্থার বিস্তারে ঐতিহ্যবাহী মেলার গুরুত্ব অনেক জায়গায় কমেছে। স্থানীয় কারিগরদের তৈরি পণ্যের জায়গা নিয়েছে কারখানায় তৈরি পণ্য। ফলে গুড়পুকুরের মতো ঐতিহ্যবাহী মেলার ধারা বাহিকতাও নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। প্রশ্ন হলো, পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কি এই ঐতিহ্যকে নতুনভাবে বাঁচিয়ে তোলা যায় না? অবশ্যই যায়।

 

তবে সে জন্য প্রয়োজন শুধু মেলা আয়োজন নয়, মেলাটিকে নতুন করে ভাবা। গুড়পুকুর মেলার ঐতিহ্যকে সংরক্ষণ করতে হলে প্রথমেই এর ইতিহাস নথিবদ্ধ করা প্রয়োজন। মেলার উৎপত্তি, সময়ের সঙ্গে এর পরিবর্তন, পুরোনো আয়োজন, ব্যবসায়ী ও কারিগরদের অংশগ্রহণ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং মানুষের স্মৃতিকে লিখিত ও আলোকচিত্র আকারে সংরক্ষণ করা যেতে পারে। প্রবীণ সাতক্ষীরা বাসীদের সাক্ষাৎকার নিয়ে তৈরি করা যেতে পারে একটি ‘গুড়পুকুর মেলা আর্কাইভ’।

 

এতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম জানতে পারবে, এই মেলা কীভাবে একটি জনপদের সামাজিক জীবনের অংশ হয়ে উঠেছিল। মেলার সঙ্গে স্থানীয় লোকসংস্কৃতির সম্পর্কও নতুন করে তৈরি করা দরকার। বাউল গান, জারি-সারি, কবিগান, লোকনৃত্য, পুতুলনাচ, যাত্রা কিংবা হারিয়ে যেতে বসা গ্রামীণ খেলাধুলার আয়োজন করা যেতে পারে। শিশুদের জন্য চিত্রাঙ্কন, গল্প বলা ও ঐতিহ্যভিত্তিক প্রতিযোগিতা থাকতে পারে।

 

স্থানীয় লেখক-কবি ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের অংশগ্রহণে সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজনও করা সম্ভব। এর পাশাপাশি স্থানীয় কারিগর ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য মেলাকে একটি বড় বাজারে পরিণত করা যেতে পারে। সাতক্ষীরার নিজস্ব পণ্য, হস্তশিল্প, কৃষিপণ্য ও খাবারের জন্য আলাদা স্টল রাখা হলে মেলার অর্থনৈতিক গুরুত্ব বাড়বে। এতে স্থানীয় মানুষের আয়ও বাড়তে পারে।বিশেষ করে বাঁশ-বেত, মাটি, কাঠ কিংবা কাপড়ের কাজের সঙ্গে যুক্ত কারিগরদের জন্য মেলা গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করতে পারে।

 

আধুনিক বাজারব্যবস্থায় যাঁরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন, তাঁদের পণ্য প্রদর্শন ও বিক্রির জন্য মেলা একটি কার্যকর প্ল্যাটফর্ম হতে পারে। গুড়পুকুর মেলার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সামাজিক সম্প্রীতি। একটি ঐতিহ্যবাহী মেলার সৌন্দর্য হলো সেখানে নানা বয়স, পেশা ও সামাজিক পরিচয়ের মানুষ একই জায়গায় এসে মিলিত হন। বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজে মেলা বহুদিন ধরেই মানুষের যোগাযোগ ও পারস্পরিক সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। সাতক্ষীরার মতো বৈচিত্র্যময় একটি জেলার জন্য এই সামাজিক যোগাযোগের গুরুত্ব কম নয়। তবে মেলা আয়োজনের ক্ষেত্রে আবেগের পাশাপাশি ব্যবস্থাপনার বিষয়টিও গুরুত্ব দিতে হবে। নিরাপত্তা, যানজট নিয়ন্ত্রণ, অগ্নিনিরাপত্তা, পর্যাপ্ত আলো, বিশুদ্ধ পানি, অস্থায়ী চিকিৎসাকেন্দ্র, নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য সুস্পষ্ট পরিকল্পনা প্রয়োজন। মেলা শেষে যাতে পুরো এলাকা ময়লা-আবর্জনায় ভরে না যায়, সে বিষয়েও আয়োজকদের দায়িত্বশীল হতে হবে।

 

আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণÑমেলার আয়োজনে স্বচ্ছতা। দোকান বরাদ্দ, ইজারা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও অর্থ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা থাকলে মানুষের আস্থা বাড়বে। স্থানীয় ব্যবসায়ী, সাংস্কৃতিক সংগঠন, নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমকে পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত করা যেতে পারে। এখানে প্রশাসনের পাশাপাশি সাতক্ষীরার নাগরিকদেরও দায়িত্ব আছে। একটি ঐতিহ্যকে শুধু সরকারের ওপর নির্ভর করে বাঁচিয়ে রাখা যায় না। সমাজের মানুষকে এগিয়ে আসতে হয়। যাঁরা এই মেলার স্মৃতি বহন করেন, তাঁদেরও নতুন প্রজন্মের কাছে সেই ইতিহাস তুলে ধরতে হবে।

 

কারণ আজকের শিশুরাই আগামী দিনের সাতক্ষীরা। তারা যদি নিজের এলাকার ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে না জানে, তাহলে কয়েক দশক পরে গুড়পুকুর মেলা হয়তো কেবল পুরোনো মানুষের মুখে শোনা একটি গল্প হয়ে থাকবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, উন্নয়ন ও ঐতিহ্য পরস্পরের বিরোধী নয়। একটি আধুনিক শহরেও ঐতিহ্যবাহী মেলা থাকতে পারে। বরং আধুনিক প্রযুক্তিকে ব্যবহার করেই মেলার প্রচার বাড়ানো যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মেলার ইতিহাস, স্থানীয় কারিগর ও সাংস্কৃতিক আয়োজন তুলে ধরা যেতে পারে। অনলাইনে স্থানীয় পণ্যের প্রচার করা যেতে পারে। তরুণ প্রজন্মকে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে যুক্ত করা যেতে পারে। সাতক্ষীরার পরিচয় শুধু তার ভৌগোলিক অবস্থান বা প্রশাসনিক সীমানায় সীমাবদ্ধ নয়। এই জেলার পরিচয়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে তার নদী, কৃষি, সুন্দরবনের প্রান্তিক জীবন, লোকসংস্কৃতি, উৎসব, মেলা ও মানুষের সংগ্রাম। তাই গুড়পুকুর মেলাকে বাঁচিয়ে রাখা মানে সাতক্ষীরার একটি সাংস্কৃতিক পরিচয়কে বাঁচিয়ে রাখা।

 

আমরা অতীতকে হুবহু ফিরিয়ে আনতে পারব না। সময়ের সঙ্গে অনেক কিছুই বদলাবে। কিন্তু ঐতিহ্যের মূল চেতনাকে ধরে রাখা সম্ভব। পুরোনো মেলার স্মৃতির সঙ্গে নতুন প্রজন্মের প্রত্যাশাকে যুক্ত করেই তৈরি হতে পারে নতুন গুড়পুকুর মেলা। সাতক্ষীরার সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এখন প্রয়োজন সেই নতুন উদ্যোগ। প্রশাসন, নাগরিক সমাজ, সাংস্কৃতিক সংগঠন, ব্যবসায়ী ও স্থানীয় মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় প্রতিবছর একটি পরিকল্পিত, নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন ও ঐতিহ্যনির্ভর গুড়পুকুর মেলা আয়োজন করা যেতে পারে। মেলার মাঠে আবার মানুষের ভিড় হোক। স্থানীয় কারিগরের হাতে তৈরি পণ্য আবার মানুষের ঘরে ফিরুক।

 

লোকগানের সুরে মুখরিত হোক সন্ধ্যা। শিশুরা আবিষ্কার করুক তাদের এলাকার নিজস্ব সংস্কৃতিকে। প্রবীণরা ফিরে পান তাঁদের ফেলে আসা দিনের স্মৃতি। গুড়পুকুর মেলা শুধু অতীতের স্মৃতি হয়ে থাকুকÑএটা সাতক্ষীরাবাসী নিশ্চয়ই চান না।তাই সময় এসেছে নতুন করে বলারÑফিরে আসুক সাতক্ষীরার গুড়পুকুর মেলা। ফিরে আসুক মানুষের মিলন, লোকঐতিহ্যের প্রাণ এবং একটি জনপদের হারিয়ে যাওয়া আনন্দ।

লেখক: সংবাদকর্মী

Ads small one

পুলিশের অভিযানে আশাশুনিতে ৭ ও দেবহাটায় ১ জন গ্রেপ্তার, মোবাইল কোর্টে ১ জনের জেলা জরিমানা

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৫:৫৩ অপরাহ্ণ
পুলিশের অভিযানে আশাশুনিতে ৭ ও দেবহাটায় ১ জন গ্রেপ্তার, মোবাইল কোর্টে ১ জনের জেলা জরিমানা

বিএম আলাউদ্দীন/কে এম রেজাউল করিম: আশাশুনিতে পুলিশের নিয়মিত বিশেষ অভিযানে ওয়ারেন্টভুক্ত ৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এদের মধ্যে ভ্রাম্যমান আদালতের মাধ্যমে একজনকে ২ মাসের কারাদন্ড ও ১০১ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এছাড়া দেবহাটায় আটক করা হয়েছে সিআর পরোয়ানাভুক্ত এক আসামিকে।

আশাশুনি থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোঃ জাহাঙ্গীর আরিফ জানান, থানা পুলিশের বিশেষ অভিযানে মাদক ও আদালতের পরোয়ানাভুক্ত ৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। শুক্রবার দিবাগত গভীর রাতে পৃথক অভিযানে উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়।

গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন, আশাশুনি উপজেলার রাজাপুর গ্রামের মোঃ আব্দুর খালেক শেখের ছেলে মোঃ সাইফুল ইসলাম, মোঃ ইসাহাক সরদারের ছেলে মোঃ রুহুল কুদ্দুস, মোঃ ফজোর আলী মোড়লের ছেলে মোঃ রবিউল ইসলাম, মোঃ মুনছুর গাজীর ছেলে মোঃ আব্দুর রহমান, মোঃ রহমাত কারিকরের ছেলে মোঃ আসাদুল কারিকর এবং সুরমান সরদারের ছেলে মোঃ লিয়াকত আলী সরদার।
অপরদিকে পুলিশের অভিযানে মাদকসহ গ্রেপ্তারকৃত একজনকে ভ্রাম্যমান আদালতের মাধ্যমে ২ মাসের বিনাশ্রম কারাদন্ড ও ১০১ টাকা অর্থদন্ড প্রদান করা হয়েছে। দন্ডপ্রাপ্তের নাম রুহুল আমিন (৩০)। সে আশাশুনি সদরের পূর্বপাড়া গ্রামের আবুল বাশারের ছেলে। শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) দুপুরে আশাশুনিতে পরিচালিত ভ্রাম্যমাণ আদালতে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮-এর ৩৬(৫) ধারায় তাকে দোষী সাব্যস্ত করে এ দন্ডাদেশ দেওয়া হয়। ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন আশাশুনি উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট শ্যামানন্দ কুন্ডু। আশাশুনি থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) জাহাঙ্গীর আরিফের নেতৃত্বে এসআই লক্ষণ, এএসআই অমিত হাসান সহ সঙ্গীয় ফোর্সের সহায়তায় তাকে গ্রেপ্তার করে ভ্রাম্যমাণ আদালতে হাজির করা হয়।

গ্রেপ্তারকৃত আসামিদের শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) দুপুরে সাতক্ষীরা জেল হাজতে প্রেরণ করা হয়েছে।

এদিকে দেবহাটায় পুলিশের বিশেষ অভিযানে সিআর পরোয়ানাভুক্ত এক পলাতক আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) রাত আনুমানিক দেড়টার দিকে দেবহাটা থানাধীন কোড়া এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তার মো. হাবিবুর রহমান উপজেলার কোড়া গ্রামের মো. হান্নান আলীর ছেলে।

দেবহাটা থানা সূত্রে জানা যায়, থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) এইচএম শাহিন হোসেনের নেতৃত্বে এএসআই মো. ইব্রাহিম খলিল ও এএসআই রহমত আলী সঙ্গীয় ফোর্স নিয়ে অভিযান পরিচালনা করেন। এ সময় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশ জানায়, গ্রেপ্তারের পর তাকে শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) আদালতে প্রেরণ করা হয়েছে।

 

মামলা জট কমাতে মেডিয়েশনকে আরও শক্তিশালী করতে হবে: চিফ লিগ্যাল এইড অফিসার

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৫:১৪ অপরাহ্ণ
মামলা জট কমাতে মেডিয়েশনকে আরও শক্তিশালী করতে হবে: চিফ লিগ্যাল এইড অফিসার

বদিউজ্জামান: মামলা জট কমানো এবং সাধারণ মানুষের দ্রুত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে লিগ্যাল এইডের কার্যক্রম ও মেডিয়েশন (মধ্যস্থতা) আরও শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন সাতক্ষীরার চিফ লিগ্যাল এইড অফিসার এবং যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ মো. মুস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেছেন, আপস-মীমাংসার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তি হলে উভয় পক্ষই জয়ী হয়, দুই পরিবারের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয় এবং আদালতের মামলা জটও কমে। লিগ্যাল এইড সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এ কার্যক্রমকে আরও এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) সকালে সাতক্ষীরা সদর উপজেলার এল্লারচর সংলগ্ন চিংড়ি চাষ প্রদর্শনী খামারের সম্মেলন কক্ষে ‘ব্রেকিং দ্য সাইলেন্স’-এর বাস্তবায়নে এবং টিডিএইচ নেদারল্যান্ডস-এর কারিগরি সহযোগিতায় পরিচালিত ‘স্পিক আপ!’ প্রকল্পের আওতায় আয়োজিত মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

চিফ লিগ্যাল এইড অফিসার বলেন, বাংলাদেশের সংবিধান ও রাষ্ট্র জনগণের মৌলিক অধিকারের বিষয়ে সোচ্চার। কেউ যাতে আইনের দৃষ্টিতে সমতা ও ন্যায্যতার অধিকার থেকে বঞ্চিত না হন, সে বিষয়ে সবাইকে লক্ষ্য রাখতে হবে। সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করতে লিগ্যাল এইড একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।

তিনি বলেন, বাংলাদেশে প্রতিবছর গড়ে প্রায় পাঁচ লাখ মামলা দায়ের হয় এবং নিষ্পত্তি হয় প্রায় তিন লাখ। ফলে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক মামলা অনিষ্পন্ন থেকে যায়। এ মামলা জট থেকে উত্তরণের অন্যতম পথ হিসেবে সরকার অউজ বা বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির মাধ্যমে আপস-মীমাংসার উদ্যোগ নিয়েছে।

মো. মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, মেডিয়েশনের মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তি হলে আদালতে মামলা-মোকদ্দমায় জড়ানোর সুযোগ কমে যায়। একই সঙ্গে দুই পক্ষের পরিবারের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসের তুলনায় ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে আদালতে মামলা দায়ের ৬০ শতাংশ কমেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। মধ্যস্থতার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির ফলে এ পরিবর্তন সম্ভব হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিচার বিভাগের জন্য এটি একটি স্বস্তির বিষয়।

তিনি আরও বলেন, আপস-মীমাংসার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তি হলে কোনো পক্ষকে পরাজিত হতে হয় না; বরং দুই পক্ষই জয়ী হয়। উভয় পরিবারের মধ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার সুযোগ সৃষ্টি হয়। প্রাচীনকাল থেকেই আমাদের সমাজে সালিশ ব্যবস্থার প্রচলন ছিল। সেই ঐতিহ্যবাহী ব্যবস্থাকে আধুনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয় মেডিয়েশন পদ্ধতিতে সাজানো হয়েছে। এ ইতিবাচক উদ্যোগকে সবাইকে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে নিতে হবে।

লিগ্যাল এইড কার্যক্রমের প্রসারে জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, যত বেশি মানুষ লিগ্যাল এইড সম্পর্কে সচেতন হবে, সাধারণ মানুষ তত বেশি উপকৃত হবে। লিগ্যাল এইডের কার্যক্রমকে এগিয়ে নিতে সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে কাজ করতে হবে। আমরা সবাই লিগ্যাল এইডের একজন ‘সৈনিক’ হিসেবে কাজ করব-এ প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি।

সাতক্ষীরায় লিগ্যাল এইডের কার্যক্রম আরও গতিশীল করার কথা উল্লেখ করে চিফ লিগ্যাল এইড অফিসার বলেন, সরকারের দেওয়া লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যেতে চাই আমরা। এজন্য মেডিয়েশন কার্যক্রমকে আরও অনেক বেশি এগিয়ে নিতে হবে। জনগণের দোরগোড়ায় আইনগত সহায়তার সেবা পৌঁছে দিতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।

সভায় মুখ্য আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের খুলনা বিভাগের যুগ্ম সচিব ও পরিচালক মো. হাসাইন শওকত। তিনি বলেন, মানুষকে যথাযথ সম্মান দিতে হবে। কাউকে সম্মান দিতে না পারলে তার কাছ থেকে ভালো কিছু আশা করা যায় না।

তিনি ডিভাইসের সঠিক ব্যবহারের ওপর গুরুত্বারোপ করে সাতক্ষীরায় সাইবার সুরক্ষা ট্রাইব্যুনাল গঠনের দাবি জানান। শিশু-কিশোরদের অনলাইনে যৌন হয়রানি ও অনলাইন নিরাপত্তাহীনতার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখার আহ্বান জানান তিনি। লিগ্যাল এইড অফিসে শিশুদের জন্য পৃথক ‘চাইল্ড সেল’ চালুর বিষয়টিও বিবেচনা করার প্রস্তাব দেন।

সভাপতির বক্তব্যে ব্রেকিং দ্য সাইলেন্সের উপপরিচালক ড. তারেকুজ্জামান বলেন, শিশু ও যুবকদের অধিকার সুরক্ষা, নিরাপদ অনলাইন পরিবেশ, স্বাধীন মতপ্রকাশ এবং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে তাদের অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

সভায় উন্মুক্ত আলোচনায় অংশ নেন সাংবাদিক আব্দুল বারী, স্বদেশের নির্বাহী পরিচালক মাধব চন্দ্র দত্ত, প্যানেল আইনজীবী খায়রুল বদিউজ্জামান, অ্যাডভোকেট শামিমুর রেজা শামীম, অ্যাডভোকেট এস,এম বিপ্লব হোসেন, জেলা লিগ্যাল এইড কমিটির পর্যবেক্ষক সদস্য সাকিবুর রহমান বাবলা, সাংবাদিক আখতারুজ্জামান বাচ্চু, টিআইবির রেবেকা সুলতানা, নাজমুল হুদা ও সাইবার ক্রাইম এলার্ট টিমের মাহাবুবুল হক।

বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন সিনিয়র সাংবাদিক মনিরুল ইসলাম মিনি, মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপপরিচালক নাজমুন্নাহার, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের পিপি শেখ আলমগীর আশরাফ এবং সিনিয়র আইনজীবী মোস্তফা আসাদুজ্জামান দিলু।

সভায় ‘স্পিক আপ!’ প্রকল্পের বিভিন্ন দিক তুলে ধরার পাশাপাশি লিগ্যাল এইডের কার্যক্রম, নির্যাতন ও শোষণের শিকার ব্যক্তিদের আইনগত সুরক্ষা, ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণ এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধির বিষয়ে আলোচনা করা হয়।

আলোচনা শেষে কুইজ প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। এতে বিজয়ী হিসেবে এডভোকেট ইয়াসমিন সুলতানা সুমি ও সাকিবুর রহমান বাবলা পুরস্কার লাভ করেন এবং সান্তনা পুরস্কার দেয়া হয় অ্যাডভোকেট বিউটি আক্তার এর কন্যা জাফরিন আক্তারকে।

সমগ্র অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন, ব্রেকিং দ্য সাইলেন্স এর ডিস্ট্রিক্ট ইনচার্জ মোঃ শরিফুল ইসলাম।

সাতক্ষীরা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রম দ্রুত চালুর দাবি

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৫:০৫ অপরাহ্ণ
সাতক্ষীরা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রম দ্রুত চালুর দাবি

সংবাদদাতা: সাতক্ষীরা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ণাঙ্গ একাডেমিক কার্যক্রম দ্রুত চালু, উপাচার্য (ভিসি) নিয়োগ, প্রয়োজনীয় শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ, লাইন কার্যক্রম চালুসহ জেলার দীর্ঘদিনের বিভিন্ন যৌক্তিক দাবি বাস্তবায়নের দাবীতে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) সকাল ১০টায় সাতক্ষীরা সাংবাদিক ক্লাব, সাতক্ষীরা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় বাস্তবায়ন আন্দোলন পরিষদ, সুন্দরবন বিশ্ববিদ্যালয় সাতক্ষীরা জেলা বাস্তবায়ন কমিটি, ‘সময়ের দাবিতে সাতক্ষীরা সিটি কর্পোরেশন’ এবং সমৃদ্ধ সাতক্ষীরা জেলা বাস্তবায়ন পরিষদ যৌথভাবে এ সভার আয়োজন করে।

সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে অ্যাডভোকেট আব্দুল মজিদ বলেন, সাতক্ষীরা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ণাঙ্গ একাডেমিক কার্যক্রম দ্রুত চালু করতে হবে। এজন্য দ্রুত ভিসি নিয়োগের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগ এবং একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। সাতক্ষীরার মানুষের যৌক্তিক দাবিগুলো বাস্তবায়নে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
সভায় প্রধান বক্তার বক্তব্য দেন ঝাউডাঙ্গা ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার সাবেক অধ্যক্ষ মাওলানা আব্দুল বারী।

সাতক্ষীরা সাংবাদিক ক্লাবের সভাপতি এস এম মহিদার রহমানের সভাপতিত্বে সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের পিপি শেখ আলমগীর আশরাফ, সাতক্ষীরা জজকোর্টের অতিরিক্ত পিপি অ্যাডভোকেট আকবর আলী, অতিরিক্ত পিপি অ্যাডভোকেট এবিএম সেলিম, সাতক্ষীরা সাংবাদিক ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মীর আবু বকর, কুমিরা মহিলা কলেজের সহকারী অধ্যাপক নূর মোহাম্মাদ পাড়, সমাজসেবক শেখ মোহাম্মাদ জাহাঙ্গীর হাশেমী, প্রভাষক এস এম রজব আলী ও আব্দুস সামাদ। সভা সঞ্চালনা করেন অ্যাডভোকেট আব্দুল্লাহ আল হাবিব।

বক্তারা বলেন, সাতক্ষীরা দেশের একটি সম্ভাবনাময় সীমান্তবর্তী জেলা হলেও দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা, যোগাযোগ, নগরায়ণ ও অর্থনৈতিক উন্নয়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাঙ্খিত অগ্রগতি থেকে পিছিয়ে রয়েছে। জেলার উন্নয়নে দীর্ঘদিনের দাবিগুলো বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।

তারা সাতক্ষীরা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্রুত একাডেমিক কার্যক্রম চালু, প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামো ও প্রশাসনিক কার্যক্রম পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর দাবি জানান। একই সঙ্গে সাতক্ষীরায় সুন্দরবন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, রেল যোগাযোগ বাস্তবায়ন এবং সাতক্ষীরাকে সিটি কর্পোরেশনে উন্নীত করার দাবিও তুলে ধরেন।

বক্তারা আরও বলেন, সাতক্ষিয়ায় রেল যোগাযোগ চালু হলে ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষিপণ্য পরিবহন, পর্যটন ও মানুষের যাতায়াতে নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি হবে। পাশাপাশি উচ্চশিক্ষার সুযোগ বাড়লে সাতক্ষীরার শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি বৃহত্তর দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের শিক্ষার্থীরাও উপকৃত হবেন। অনুষ্ঠানের শুরুতে কোরআন তেলাওয়াত করেন হাফেজ মাওলানা আবুল হোসেন।

সভায় সাংবাদিক মো. ফিরোজ হোসেন, মো. শাহজাহান আলী মিটন, শেখ কামরুল ইসলাম, জি এম সোহরাব হোসেন, এস এম রবিউল ইসলাম, মোস্তাফিজুর রহমান, মো. জাকিরুল ইসলাম, হাবিবুল্লাহ বাহার, এম এম রবিউল ইসলাম, মো. শফিকুল ইসলাম, মো. মাসুদুজ্জামান, জাহাঙ্গীর হোসেন, মিহিরুজ্জামান, হাফিজুর রহমান, আতিয়ার রহমান, গোলাম মোস্তফা, এনামুল হক সিকদার, আসাদুজ্জামান খান, মো. মনিরুল ইসলাম, লাল্টু হোসেন, মো. দেলোয়ার হোসেন, আতিকুজ্জামান ও মো. হাফিজসহ সাংবাদিক, আইনজীবী, শিক্ষক, সামাজিক ও নাগরিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

 

সভা থেকে সাতক্ষীরাবাসীর দীর্ঘদিনের দাবিগুলো বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়। একই সঙ্গে এসব দাবি বাস্তবায়নে ভবিষ্যতে আরও ঐক্যবদ্ধ কর্মসূচি গ্রহণের প্রত্যয় ব্যক্ত করেন আয়োজক ও অংশগ্রহণকারীরা।