পলাশ কর্মকার, কপিলমুনি (পাইকগাছা): জমির মালিকানা আছে, প্রয়োজনীয় কাগজপত্রও প্রস্তুত। কিন্তু নামজারি কিংবা জমাভাগের কাজ শেষ করতে অপেক্ষার যেন শেষ নেই। কেউ পৈতৃক সম্পত্তি নিজের নামে রেকর্ড করতে চান, কেউ জমি কেনার পর নামজারি করতে গিয়ে পড়েছেন অনিশ্চয়তায়। আবার কারও প্রয়োজন জমির সীমানা নির্ধারণ, কারও জরুরি শুনানি। এসব সেবা পেতে খুলনার পাইকগাছা উপজেলা ভূমি অফিসে এসে বাড়তি ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ মানুষ। কারণ, দীর্ঘদিন ধরে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসিল্যান্ডের পদটি শূন্য রয়েছে।
গুরুত্বপূর্ণ এ পদে কর্মকর্তা না থাকায় অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)। এতে উপজেলা প্রশাসনের নিয়মিত কাজের পাশাপাশি ভূমি প্রশাসনের দায়িত্বও সামলাতে হচ্ছে তাঁকে। ফলে ভূমিসেবার স্বাভাবিক কার্যক্রম ও সেবাপ্রত্যাশীদের ভোগান্তি নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
ভূমি অফিসের সেবা মানুষের সম্পত্তির অধিকার ও দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। নামজারির আবেদন নিষ্পত্তিতে বিলম্ব হলে জমির মালিকানা হালনাগাদ আটকে যায়। এর প্রভাব পড়ে জমি কেনাবেচা, ব্যাংকঋণ গ্রহণ ও উত্তরাধিকারসূত্রে সম্পত্তি হস্তান্তরসহ বিভিন্ন কাজে। একইভাবে জমাভাগ, আপত্তির শুনানি ও ভূমিসংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তিতে বিলম্ব হলে দীর্ঘায়িত হয় মানুষের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সম্পত্তিসংক্রান্ত জটিলতা।
জানা গেছে, এসিল্যান্ডের পদ শূন্য থাকায় এসব কার্যক্রমের অতিরিক্ত দায়িত্ব পড়েছে ইউএনওর ওপর। ফলে উপজেলা প্রশাসনের সার্বিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ভূমি অফিসের প্রশাসনিক কার্যক্রমও সমন্বয় করতে হচ্ছে তাঁকে।
নামজারি ও জমাভাগের আবেদন নিষ্পত্তি, শুনানি গ্রহণ, ভূমি উন্নয়ন কর আদায় তদারকি, সরকারি খাসজমি সংরক্ষণ, অবৈধ দখল প্রতিরোধ এবং ভূমিসংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণে এসিল্যান্ডের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এ পদে কর্মকর্তা না থাকলে এসব কার্যক্রমে সমন্বয় ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাড়তি চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
পাইকগাছা সদরের বাসিন্দা আবির মল্লিক বলেন, পাইকগাছার মতো উপকূলীয় উপজেলায় সরকারি খাসজমি, জলাশয়, কৃষিজমি ও বিভিন্ন সম্পত্তির দখল নিয়ে বিরোধের অভিযোগ রয়েছে। এসব বিষয়ে নিয়মিত তদারকি ও দ্রুত প্রশাসনিক পদক্ষেপ জরুরি। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার পদ শূন্য থাকলে মাঠপর্যায়ে নজরদারি ও অভিযোগ যাচাইয়ে সমস্যা তৈরি হতে পারে।
সদরের আরেক বাসিন্দা সমীর রাহা বলেন, ভূমিসংক্রান্ত মামলার শুনানি, আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়নে প্রশাসনিক সহযোগিতা, সরকারি সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণ এবং ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তাই এসিল্যান্ডের অনুপস্থিতি শুধু একটি পদ শূন্য থাকার বিষয় নয়, এর প্রভাব পুরো ভূমি প্রশাসনের কার্যক্রমে পড়তে পারে।
সেবাগ্রহীতা হাফিজুর রহমান জানান, জমির নামজারি ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের কাজ নিয়ে তাঁকে ভূমি অফিসে আসতে হচ্ছে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট পদে কর্মকর্তা না থাকায় কাজের অগ্রগতি নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন। সময়মতো কাজ শেষ না হলে জমিসংক্রান্ত পরবর্তী কার্যক্রমেও সমস্যায় পড়তে হবে।
আরেক সেবাগ্রহীতা বলেন, প্রত্যন্ত এলাকা থেকে ভূমি অফিসে আসতে যাতায়াত খরচ ও সময় দুটোই ব্যয় হয়। একদিনে কাজ শেষ না হলে আবার আসতে হয়। এতে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাড়ে। দ্রুত নতুন এসিল্যান্ড পদায়ন করে ভূমিসেবার স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার দাবি জানান তিনি।
উপজেলা ভূমি অফিস সূত্রে জানা গেছে, সাবেক সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. ফজলে রাব্বী ২০২৫ সালের ১৩ অক্টোবর পাইকগাছায় যোগদান করেন। প্রায় এক বছর দায়িত্ব পালনের পর ২০২৬ সালের অক্টোবরে তাঁকে খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলায় বদলি করা হয়। ১ অক্টোবর বদলির আদেশের পর ৫ অক্টোবর বিকেল সাড়ে ৪টায় তিনি বটিয়াঘাটা উপজেলা ভূমি অফিসে যোগদান করেন।
নতুন সহকারী কমিশনার (ভূমি) পদায়নের বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ওয়াসিউজ্জামান চৌধুরী জানান, নতুন ব্যাচের ভূমিসংক্রান্ত প্রশিক্ষণ শেষ না হওয়া পর্যন্ত নতুন কর্মকর্তা পদায়ন সম্ভব হবে বলে মনে হচ্ছে না।
অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কোনো সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘২৪ ঘণ্টায় তো চাপ থাকে।’ উপজেলা প্রশাসনের সার্বিক দায়িত্বের পাশাপাশি ভূমি প্রশাসনের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে তাঁকে। তবে দায়িত্বের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে সেবাপ্রত্যাশীদের প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করতে প্রশাসন সচেষ্ট রয়েছে বলে জানান তিনি।
গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশাসনিক পদ শূন্য থাকলে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে বাড়তি চাপ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। তবে সেই চাপের প্রভাব যেন সাধারণ মানুষের সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে না পড়ে, তা নিশ্চিত করা জরুরি। বিশেষ করে নামজারি, জমাভাগ, শুনানি ও ভূমিসংক্রান্ত জরুরি আবেদন নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা এড়াতে কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন। দ্রুত নতুন কর্মকর্তা পদায়নের পাশাপাশি অন্তর্বর্তী সময়ে ভূমিসেবার স্বাভাবিক গতি বজায় রাখার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।