সচ্চিদানন্দ দে সদয়
বজ্রপাত সাতক্ষীরার মানুষের কাছে নতুন কোনো দুর্যোগ নয়। বর্ষার কালো মেঘ, বিদ্যুতের ঝলকানি আর হঠাৎ বিকট শব্দÑএর সঙ্গে উপকূলের মানুষ পরিচিত। কিন্তু পরিচিত এই প্রাকৃতিক ঘটনাই প্রতিবছর কেড়ে নিচ্ছে মানুষের প্রাণ। বিশেষ করে আশাশুনি, শ্যামনগর ও কালিগঞ্জে কৃষি, মৎস্যঘের, নদী ও জলাভূমিনির্ভর জীবিকার কারণে বজ্রপাতের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। এই তিন উপজেলার বাস্তবতা বুঝতে হলে মানুষের কর্মক্ষেত্রের দিকে তাকাতে হবে। এখানে হাজার হাজার মানুষ প্রতিদিন মাঠে, ঘেরের পাড়ে কিংবা নদীতে কাজ করেন।
২০২১ সালের সরকারি ক্ষয়ক্ষতির হিসাবে আশাশুনি, শ্যামনগর ও কালিগঞ্জে প্রায় ১৯ হাজার ৪৫৯টি মৎস্যঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, যার মোট আয়তন ছিল প্রায় ১২ হাজার ৬৫ হেক্টর। এটি বজ্রপাতের পরিসংখ্যান নয়; তবে কত বিপুলসংখ্যক মানুষ উন্মুক্ত জলাভূমি ও ঘেরকেন্দ্রিক কর্মক্ষেত্রে যুক্ত, তার একটি ধারণা দেয়। আশাশুনির আনুলিয়া, প্রতাপনগর, শ্রীউলা, খাজরা, বড়দল ও বুধহাটাসহ বিভিন্ন এলাকায় মৎস্যচাষ ও কৃষির বিস্তার রয়েছে। ঘেরের শ্রমিক কিংবা মালিককে দিনের বিভিন্ন সময়ে খোলা জায়গায় থাকতে হয়।
বজ্রপাত শুরু হলে অনেক ক্ষেত্রেই দ্রুত নিরাপদ পাকা ভবনে পৌঁছানোর সুযোগ থাকে না। ঘেরের মাঝখানে থাকা টিনের ঘর বা অস্থায়ী স্থাপনাকে নিরাপদ আশ্রয় মনে করার প্রবণতাও ঝুঁকি বাড়াতে পারে। ফলে বজ্রপাতের মৌসুমে ঘেরভিত্তিক কর্মীদের জন্য আলাদা নিরাপত্তা নির্দেশনা প্রয়োজন। শ্যামনগরের গাবুরা, পদ্মপুকুর, বুড়িগোয়ালিনী, রমজাননগর, মুন্সিগঞ্জ ও ঈশ্বরীপুরের মানুষের জীবনের সঙ্গে নদী, খাল, ঘের ও সুন্দরবন ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। জেলেদের ক্ষেত্রে ঝুঁকিটা আরও বেশি। নদীর মাঝখানে বজ্রপাত শুরু হলে কয়েক মিনিটের মধ্যে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকে না।
২০২৬ সালের জুনে শ্যামনগরের মালঞ্চ নদীতে মাছ ধরার সময় বজ্রপাতে একজন জেলে নিহত ও আরেকজন আহত হওয়ার ঘটনা সেই বাস্তবতাই সামনে আনে। একই বছর মৎস্যঘেরে কাজ করতে গিয়ে এবং ধানক্ষেতে কাজ করার সময়ও বজ্রপাতে মৃত্যুর খবর এসেছে। অর্থাৎ এখানে আক্রান্ত হচ্ছেন শুধু কৃষক নন-জেলে, ঘেরশ্রমিক ও সাধারণ মানুষও। কালিগঞ্জের বিস্তীর্ণ কৃষিজমি, নদী-খাল ও মৎস্যঘের বহু মানুষের জীবিকার সঙ্গে যুক্ত। ফলে বর্ষাকালে মাঠ ও জলাভূমিতে কর্মরত মানুষের বজ্রপাতের ঝুঁকি থাকে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক হলো, বজ্রপাত কখনো একটি পরিবারের একাধিক সদস্যকেও একসঙ্গে কেড়ে নেয়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কালিগঞ্জে একই পরিবারের তিনজনসহ একাধিক মানুষের বজ্রপাতে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। এ ধরনের ঘটনা শুধু একটি পরিবারের শোক নয়; স্থানীয় সমাজ ও অর্থনীতির ওপরও বড় আঘাত। সাতক্ষীরায় বজ্রপাত নিয়ে আলোচনা হলেও আশাশুনি, শ্যামনগর ও কালিগঞ্জে গত পাঁচ বা দশ বছরে ঠিক কতজন মারা গেছেন, কতজন আহত হয়েছেন এবং কোন ইউনিয়ন সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ-তার সমন্বিত প্রকাশ্য তথ্য খুবই প্রয়োজন। প্রতিটি ঘটনার তথ্য সংরক্ষণ করা হলে সহজেই জানা যাবে-কোন এলাকায় মৃত্যুর হার বেশি, কৃষক না জেলে কারা বেশি আক্রান্ত, কোন মাসে ঝুঁকি বাড়ে এবং ঘটনাগুলো প্রধানত মাঠ, ঘের না নদীতে ঘটে।
বজ্রপাতের সময় গাছের নিচে না দাঁড়ানো, খোলা মাঠ ও জলাশয় থেকে সরে যাওয়া-এসব সচেতনতা অবশ্যই জরুরি। কিন্তু মাঠের কৃষক বা ঘেরের শ্রমিক যদি কাছাকাছি নিরাপদ ভবনই না পান, তাহলে শুধু সচেতনতার বার্তা কতটা কার্যকর হবে? তাই বড় কৃষিজমি ও ঘের এলাকায় নিরাপদ আশ্রয়স্থল চিহ্নিত করা দরকার। ইউনিয়ন পরিষদ, স্কুল, কমিউনিটি ক্লিনিক ও অন্যান্য পাকা ভবনকে প্রয়োজনে আশ্রয়স্থল হিসেবে নির্ধারণ করা যেতে পারে।
নদীতে থাকা জেলেদের জন্য মোবাইলভিত্তিক দ্রুত আবহাওয়া সতর্কবার্তাও কার্যকর হতে পারে। একই সঙ্গে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে বজ্রপাতে আহতদের জরুরি চিকিৎসার প্রস্তুতি রাখা প্রয়োজন। উপকূলের মানুষকে বলা সহজÑবজ্রপাতের সময় বাইরে যাবেন না। কিন্তু কৃষক, জেলে বা ঘেরশ্রমিকের পক্ষে সব সময় কাজ বন্ধ রাখা সম্ভব নয়। তাঁদের জীবিকা প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল। তাই সমাধানও হতে হবে বাস্তবভিত্তিক। কাজ বন্ধ নয়, ঝুঁকি কমানোÑএই নীতিতে স্থানীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে।
আশাশুনি-শ্যামনগর-কালিগঞ্জে ইউনিয়নভিত্তিক বজ্রপাতের তথ্যভান্ডার, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিতকরণ, নিরাপদ আশ্রয়, আগাম সতর্কবার্তা ও স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকদের প্রশিক্ষণ-এই পাঁচটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া যেতে পারে। বজ্রপাত থামানো মানুষের হাতে নেই। কিন্তু মৃত্যুর সংখ্যা কমানোর সুযোগ আছে। সেই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে মৃত্যুর পর শোক প্রকাশের চেয়ে মৃত্যুর আগে প্রস্তুতি জরুরি। সাতক্ষীরার কৃষক মাঠে যাবেন, ঘেরশ্রমিক ঘেরে যাবেন, জেলে নদীতে নামবেনÑএটাই তাঁদের জীবন। রাষ্ট্র ও স্থানীয় প্রশাসনের দায়িত্ব হলো সেই জীবনকে যতটা সম্ভব নিরাপদ করা। বজ্রপাত প্রকৃতির ঘটনা; কিন্তু বজ্রপাতে মৃত্যু কতটা হবে, তার একটি অংশ নির্ভর করে আমাদের প্রস্তুতির ওপর।
লেখক: সংবাদকর্মী