সম্পাদকীয়/প্রসঙ্গ: বৈশাখী স্পন্দন ও আমাদের অঙ্গীকার
মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরাÑঅগ্নিস্নানে শুচি হয়ে আজ বাঙালি বরণ করে নিচ্ছে নতুন একটি বছরকে। আজ পহেলা বৈশাখ, বঙ্গাব্দ ১৪৩৩। সাতক্ষীরার সীমান্তঘেঁষা জনপদে আজ যে নবসূর্যের উদয় হয়েছে, তা কেবল একটি নতুন পঞ্জিকার সূচনা নয়, বরং এটি দুর্যোগ ও লড়াইয়ের সাথে ঘর করা এক সাহসী জনপদের নতুন করে জেগে ওঠার নাম। কপোতাক্ষ, বেতনা আর মরিচ্চাপের পলিমাখা ঘ্রাণে আজ মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে হাজার বছরের ঐতিহ্য আর আগামীর স্বপ্ন।
সাতক্ষীরার জন্য পহেলা বৈশাখ সবসময়ই ভিন্ন তাৎপর্য বহন করে। সুন্দরবনের কোলঘেঁষা এই জনপদ প্রতিনিয়ত লড়ছে নোনা জল আর প্রাকৃতিক দুর্যোগের সাথে। কিন্তু বৈশাখের এই দিনটিতে সাতক্ষীরাবাসী প্রমাণ করে দেয়Ñসংস্কৃতিই তাদের টিকে থাকার সবচেয়ে বড় শক্তি। জেলা প্রশাসনের কালেক্টরেট পার্ক থেকে শুরু হওয়া মঙ্গল শোভাযাত্রা কিংবা শহীদ আব্দুর রাজ্জাক পার্কের মেলা—সবই জানান দিচ্ছে যে, এ জনপদ তার শিকড়কে ভোলেনি। মাটির সরা চিত্র আর লোকজ পুতুলের অবয়বে যে শৈল্পিক সাতক্ষীরাকে আমরা আজ রাজপথে দেখলাম, তা আমাদের অসাম্প্রদায়িক চেতনারই এক শক্তিশালী প্রতিফলন।
নতুন বছর যেমন আনন্দের বার্তা নিয়ে আসে, তেমনি এটি ফেলে আসা বছরের হিসাব মেলাবারও সময়। সাতক্ষীরার মানুষ আজ দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা নিরসন, নদী খনন এবং সুন্দরবন রক্ষার দাবি জানাচ্ছে। সম্পাদকীয় স্তম্ভে আমরা জোর দিয়ে বলতে চাই—সাংস্কৃতিক জাগরণের পাশাপাশি টেকসই উন্নয়নই হতে পারে এই জেলার মানুষের প্রকৃত বৈশাখী উপহার। কৃষকের গোলা ভরা সোনালী ধানের স্বপ্ন এবং বেতনা-মরিচ্চাপের পুরনো নাব্য ফিরে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষাই হোক আমাদের এই বছরের মূল লক্ষ্য।
এবারের বৈশাখে সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসনের কিছু উদ্যোগ বিশেষভাবে প্রশংসার দাবি রাখে। হাসপাতাল, কারাগার ও এতিমখানায় উন্নতমানের খাবার পরিবেশনের মাধ্যমে উৎসবকে কেবল সামর্থ্যবানদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সর্বজনীন করা হয়েছে। বৈশাখের মূল দর্শনই হলো এইÑসাম্য ও সম্প্রীতি। ধর্মের বিভেদ ভুলে সব শ্রেণি-পেশার মানুষের এই যে মহামিলন, এটিই আমাদের রক্ষাকবচ।
১৪৩৩ বঙ্গাব্দ আমাদের সামনে নতুন সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে উপস্থিত হয়েছে। প্রযুক্তির জোয়ারে গা ভাসিয়ে দিলেও আমরা যেন আমাদের লোকজ ক্রীড়াÑলাঠি খেলা কিংবা ঘুড়ি উৎসবের মতো ঐতিহ্যগুলোকে হারিয়ে না ফেলি। শিশু ও তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ‘হ্যাপী নিউ ইয়ার’ এর চেয়ে ‘শুভ নববর্ষ’ এর প্রতি যে বাড়তি আগ্রহ সাতক্ষীরায় পরিলক্ষিত হয়েছে, তা আশাব্যঞ্জক।
পরিশেষে, নববর্ষের এই দিনে আমাদের প্রত্যাশাÑসাতক্ষীরার আকাশ থেকে মুছে যাক সব অন্ধকারের ছায়া। প্রগতির আলোয় উদ্ভাসিত হোক প্রতিটি জনপদ। সাতক্ষীরার মানুষের শ্রম আর মেধার সমন্বয়ে গড়ে উঠুক এক সমৃদ্ধ বাংলাদেশ। শুভ নববর্ষ ১৪৩৩!











