বর্ষাতেই আনন্দ, সেই বর্ষাতেই কাঁদন
আখলাকুর রহমান
কবি সাহিত্যিকদের খাতার পাতায় বর্ষা মানেই এক পরম স্নিগ্ধতা, এক মায়াবী রোমান্টিকতা। রবীন্দ্রনাথ যাকে বলেছিলেন ‘নবযৌবনের দূত’, জীবনানন্দ যার রূপ খুঁজেছিলেন ধানসিঁড়িটির তীরে অন্ধকারে জোনাকির আলোয়, সেই বর্ষা আজও বাঙালির মনে এক চিরন্তন আবেগের নাম। আষাঢ়ের কালো মেঘ যখন আকাশজুড়ে ডানা মেলে, তখন রিমঝিম বৃষ্টির শব্দে অনেকেরই বুক চিনচিন করে ওঠে। বহু বিনিদ্র রজনীতে বৃষ্টির এই একটানা সুর মনকে উদাসী করে তোলে, আবার অনেকের ক্লান্তি দূর করে চোখে এনে দেয় শান্তির ঘুম। পবিত্র কুরআনেও বৃষ্টিকে আল্লাহর রহমত ও সুসংবাদ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, যা মনে করিয়ে দেয় প্রতিটি বৃষ্টিবিন্দুই আসলে এক অনন্ত করুণার প্রতিচ্ছবি। কিন্তু এই নাগরিক বা সাহিত্যিক বিলাসের আড়ালে বর্ষার আদি ও আসল রূপটি আজ রূপকথার মতো হারাতে বসেছে। আমাদের শৈশবের সেই চেনা বর্ষা আর আজকের বর্ষার মধ্যে আকাশ পাতাল তফাত। আগে বর্ষা শুরু হতে না হতেই চারদিক কদম ফুলে ফুলে ছেয়ে যেত। ছোট ছোট বাচ্চারা কদম ফুল হাতে নিয়ে মেতে উঠত উল্লাসে। কিন্তু আজ সেই কদম গাছ আর কদম ফুল যেন আমাদের চারপাশ থেকে হারিয়েই গিয়েছে।
আজকের নতুন প্রজন্মের বাচ্চারা শুধু গল্পের বইয়ে কিংবা কবিতার লাইনে পড়ে, ‘হাতি নাচে ঘোড়া নাচে কদমতলায় কে’। বাস্তবে তারা কদম ফুল চেনেও না, দেখেনি কোনোদিন। পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, নগরায়ণ ও জলাভূমি ভরাটের কারণে দেশের অনেক অঞ্চল থেকেই কদম, বকুল, হিজলসহ বেশ কিছু ঐতিহ্যবাহী বৃক্ষ ক্রমেই বিলুপ্তির পথে। কদম ফুলের ছোঁয়া ছাড়া বর্ষা যে কতটা রূপহীন ও বিবর্ণ হতে পারে, তা ভাবলে আমাদের প্রজন্মের জন্য এক বুক আফসোস ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না।
আমাদের ছোটবেলার বর্ষার দিনগুলোর কথা মনে পড়লে আজও বুকের ভেতরটা হু হু করে ওঠে। মেঘের ডাক শুনলেই মনের ভেতর কেমন যেন এক চঞ্চলতা জেগে উঠত। বাবা মায়ের চোখ ফাঁকি দিয়ে, ঘরের কোণ থেকে ফুটবলটা বগলদাবো করে নিয়ে এক ছুটে চলে যেতাম খোলা মাঠের দিকে। কাদা আর পানিতে একাকার হয়ে সারা দুপুর বৃষ্টিতে ভিজতাম, গোল দিতাম আর উল্লাসে ফেটে পড়তাম। খেলায় মত্ত হয়ে কত দিন যে পরনের হাফপ্যান্ট ছিঁড়েছে, কাদায় পিছলে গিয়ে পায়ের নিচে দুই এক জায়গায় কেটেকুটে রক্তারক্তি হয়েছে, তার কোনো ইয়ত্তা নেই। খেলা শেষে যখন বিষণ্ণ ও অপরাধী মুখে বাড়ি ফিরতাম, তখন মায়ের হাতের গরম তাড়া আর বকুনি ছিল একদম ফ্রি বোনাস। সেই কড়া বকুনির ভেতরেও যে কী অকৃত্রিম স্নেহ আর ভালোবাসা লুকিয়ে থাকত, তা কি আজ সহজে ভুলে যাওয়া যায়? শৈশবের সেই কর্দমাক্ত মাঠ, বৃষ্টির পানিতে ফুটবল নিয়ে দাপাদাপি আর মায়ের সেই চিরাচরিত বকুনি আজ যেন কেবলই স্মৃতির অ্যালবামে বন্দি এক সোনালী অতীত।
কিন্তু জীবনের নির্মম বাস্তবতা হলো, বর্ষা সবার জন্য এই সুখের ও নস্টালজিয়ার বার্তা নিয়ে আসে না। আমাদের কাছে যা আনন্দের বৃষ্টি, অন্য কারো কাছে তাই আবার কান্নার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সকাল হলেই যখন আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামে, তখন মধ্যবিত্তের মনে শুরু হয় অফিস যাওয়ার তাড়া আর ভিজে যাওয়ার দুশ্চিন্তা। কিন্তু সমাজের সেই সব খেটে খাওয়া দিনমজুর ও গরিব মানুষের কথা কি আমরা কেউ কখনো গভীরভাবে ভেবে দেখেছি? এই অবিরাম বৃষ্টির কারণে রিকশাচালক, ভ্যানচালক কিংবা দিনমজুরদের দৈনিক কাজটা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। বর্ষার দিনে কাজে বের হতে না পারলে দিন শেষে অনেকের ঘরেই রাতের উনুন জ্বলে না, সন্তানদের মুখে দুমুঠো অন্ন তুলে দেওয়া সম্ভব হয় না। এক ফোঁটা বৃষ্টির আনন্দ যখন কারো ঘরের চুলো নেভানোর কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তখন বর্ষার চেয়ে নিষ্ঠুর আর কিছুই হতে পারে না। তবে এই বর্ষাই আবার আমাদের জন্য মানবতা প্রদর্শনের এক চমৎকার সুযোগ এনে দেয়।
হাদিসে বর্ণিত আছে, যে ব্যক্তি মানুষের প্রতি দয়া করে না, আল্লাহও তার প্রতি দয়া করেন না। আমরা যদি একটু সচেতন হই, তবে আমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী ক্ষুধার্ত প্রতিবেশীর ঘরে চাল ডাল পৌঁছে দিয়ে তাদের একটু হলেও সহযোগিতা করতে পারি। এই মানবিক হাত বাড়িয়ে দেওয়াটাই হতে পারে বর্ষার সবচেয়ে সুন্দর রূপ। প্রতিবেশীর দুঃখে পাশে দাঁড়ানোই তো প্রকৃত মানবিকতা, আর এই বর্ষাকালই সেই মানবিকতা যাচাইয়ের এক নীরব পরীক্ষাক্ষেত্র।
আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে চিন্তা করলে, আষাঢ় ও শ্রাবণের এই দিনগুলোতে সাতক্ষীরার মানুষের মনে এক চরম আতঙ্ক আর ভয়ের সৃষ্টি হয়। মেঘের গর্জন শুনলেই আমাদের মনে সবার আগে কু ডাক দিয়ে ওঠে, ঐতিহাসিক প্রাণসায়ের খাল কি এবার ঠিকমতো শহরের পানি টেনে নিতে পারবে? এক সময় প্রাণসায়ের খাল ছিল সাতক্ষীরার প্রাণকেন্দ্র। এই খাল দিয়েই ব্যবসায়ীরা নৌকায় পণ্য আনা নেওয়া করতেন, আর এই খালের নামানুসারেই অনেকে মনে করেন শহরের নামকরণ হয়েছিল। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে অপরিকল্পিত দখল আর পলি জমে যাওয়ার কারণে এই খালটি আজ নামমাত্র জোয়ারভাটায় রূপ নিয়েছে, হারিয়েছে তার চেনা নাব্যতা। বিগত কয়েকদিনের টানা বৃষ্টিতেই সাতক্ষীরার বহু রাস্তাঘাট ও নিচু এলাকা যেভাবে পানির নিচে তলিয়ে গিয়েছে, তা আমাদের চোখ খুলে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
অতীতের মতো এবারও যদি আমাদের এই বর্ষার পানির কাছে মাথা নত করতে হয়, তবে সাতক্ষীরার মানুষের দুর্ভোগের কোনো সীমা থাকবে না। আশপাশের জেলাগুলোতে ইতিমধ্যেই আকস্মিক বন্যা ও জলাবদ্ধতায় মানুষের চরম ভোগান্তি শুরু হয়ে গিয়েছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের এই বন্যার চিত্র দেখে আমাদের বুক কেঁপে ওঠে। কবি ফররুখ আহমদের ভাষায় বলা যায়, ‘সংগ্রাম, সংগ্রাম, সংগ্রাম চাই’, প্রকৃতির এই রুদ্ররূপের বিরুদ্ধে আজ আমাদেরও প্রয়োজন সেই সম্মিলিত সংগ্রামের মানসিকতা। তাই সাতক্ষীরাকে এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা করতে হলে এখনই প্রাণসায়ের খাল পুনখনন ও অবৈধ দখলমুক্ত করার জন্য প্রশাসন ও সচেতন নাগরিক সমাজকে একযোগে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় এগিয়ে আসতে হবে। নইলে আমাদের প্রিয় শহর প্রতি বছরের এই একই দুর্ভোগের বৃত্তেই আটকে থাকবে, আর আষাঢ়ের রহমতের বৃষ্টি পরিণত হবে অভিশাপে।
আজকের এই লেখা শুধু আক্ষেপ প্রকাশের জন্য নয়, বরং একটি আন্তরিক আহ্বান। আমরা প্রত্যেকেই যদি নিজ নিজ অবস্থান থেকে একটু সচেতন হই, প্রতিবেশীর কষ্টে পাশে দাঁড়াই, আর প্রাণসায়ের খালসহ শহরের জলনিষ্কাশন ব্যবস্থা রক্ষায় প্রশাসনের পাশাপাশি নিজেরাও সোচ্চার হই, তবেই এই বর্ষা আবার তার হারানো সৌন্দর্য ফিরে পাবে। আসুন, আমরা সবাই মিলে অঙ্গীকার করি, আগামী বর্ষায় সাতক্ষীরার মানুষকে যেন আর পানিবন্দি জীবনের এই একই দুর্ভোগ সহ্য করতে না হয়। প্রকৃতির এই রহমতকে অভিশাপে পরিণত হতে দেওয়া চলবে না, বরং একে আবার আনন্দের বার্তাবাহী হিসেবেই ফিরিয়ে আনতে হবে আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায়।









