আন্তর্জাতিক হাঙর সচেতনতা দিবস: সমুদ্রের অতন্দ্র প্রহরীর সুরক্ষায় আমাদের দায়বদ্ধতা
সাকিবুর রহমান বাবলা
প্রতি বছর ১৪ জুলাই বিশ্বজুড়ে পালিত হয় ‘আন্তর্জাতিক হাঙর সচেতনতা দিবস’। পপ কালচার ও হলিউড সিনেমার নাটকীয় চিত্রায়নের ফলে হাঙর আমাদের জনমানসে কেবলই ‘রক্তপিপাসু দানব’ হিসেবে পরিচিত। কিন্তু বাস্তবের হাঙর কোনো রাক্ষস নয়; বরং সমুদ্রের বিশাল ক্যানভাসে ভারসাম্য রক্ষাকারী এক অপরিহার্য ও প্রাগৈতিহাসিক প্রহরী। আজকের দিনে আমাদের দায়িত্ব এই মহিমান্বিত প্রাণীটির প্রতি আরোপিত ভ্রান্ত ধারণা ঝেড়ে ফেলে তার বাস্তুতান্ত্রিক গুরুত্ব অনুধাবন করা।
হাঙর সম্পর্কে প্রচলিত ভ্রান্ত ধারণা দূর করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন মার্কিন মৎস্যবিজ্ঞানী ড. ইউজেনি ক্লার্ক, যিনি ‘দ্য শার্ক লেডি’ নামে পরিচিত। তিনি তাঁর জীবদ্দশায় হাঙরের বুদ্ধিমত্তা ও আচরণ নিয়ে গবেষণা করে প্রমাণ করেছিলেন যে এরা মানুষের শত্রু নয়। ডিসকভারি চ্যানেলের জনপ্রিয় টেলিভিশন ইভেন্ট ‘শার্ক উইক’ ১৯৮৮ সাল থেকে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়, যা পরবর্তীতে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের ‘শার্ক ফেস্ট’-এর সাফল্যের পথ প্রশস্ত করে।
জীববিজ্ঞানের ভাষায় হাঙরকে বলা হয় ‘কী-স্টোন স্পিসিস’ বা বাস্তুতন্ত্রের ভিত্তিপ্রস্তর। সমুদ্রের খাদ্য শৃঙ্খলের শীর্ষে অবস্থানকারী এই এপেক্স প্রিডেটর ‘ট্রফিক ক্যাসকেড’ প্রক্রিয়ায় পুরো সামুদ্রিক পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ করে। হাঙর কেবল শক্তিশালী শিকারীই নয়, তারা সমুদ্রের ‘পুলিশ’ হিসেবেও কাজ করে। এরা সাধারণত অসুস্থ, দুর্বল ও বয়োবৃদ্ধ মাছ শিকার করে, যা সুস্থ মাছের জিনগত ধারাকে শক্তিশালী রাখে এবং সামুদ্রিক মহামারীর ঝুঁকি কমায়। বিস্ময়কর হলেও সত্য, হাঙরের উপস্থিতি প্রবাল প্রাচীর ও সামুদ্রিক ঘাসের বিছানাকে রক্ষা করে, যা জলবায়ু পরিবর্তন রোধে কার্বন শোষণে বড় ভূমিকা রাখে। হাঙর যদি আজ সমুদ্র থেকে হারিয়ে যায়, তবে খাদ্য শৃঙ্খলের ভারসাম্য বিনষ্ট হয়ে পুরো সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে।
ইসলাম প্রাণিজগত ও প্রাকৃতিক সম্পদের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণের শিক্ষা দেয়। অকারণে প্রাণী হত্যা নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। মানুষ যদি অহেতুক প্রাণীহত্যার সংস্কৃতি চালু করে, তা হবে প্রাকৃতিক পরিবেশ বিপর্যয়ের বড় কারণ। এ জন্য রাসুল (সা.) কোনো প্রাণী অযথা মেরে ফেলা থেকে বিরত থাকতে নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘কেউ যদি চড়ঁই পাখি বা তার চেয়ে ছোট কোনো প্রাণীকেও অকারণে হত্যা করে, কেয়ামতের দিন তাকে জবাবদিহি করতে হবে।’ (মিরকাত: ২৬৫৮)। এছাড়া বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে, বয়স্ক বা বড় হাঙরের মাংসে বায়োঅ্যাকুমুলেশনের মাধ্যমে পারদ বা মার্কারি সঞ্চিত থাকে, যা মানবস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। সুতরাং, ধর্মীয় বৈধতার পাশাপাশি স্বাস্থ্যগত সতর্কতা বজায় রাখাও আমাদের দায়িত্বের অংশ।
১৯৭০ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী হাঙর ও শাপলাপাতা মাছের সংখ্যা প্রায় ৭১% হ্রাস পেয়েছে। এর পেছনে মূল দায়ী আমাদের নিষ্ঠুর কর্মকা-—‘শার্ক ফিনিং’। স্যুপ তৈরির উদ্দেশ্যে জীবন্ত হাঙরের পাখনা কেটে নিয়ে বাকি অংশ সমুদ্রে ফেলে দেওয়ার মতো অমানবিক প্রথা আজ এই প্রাণীকে বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দিয়েছে। ড. ইউজেনি ক্লার্ক বা ‘দ্য শার্ক লেডি’-এর মতো গবেষকদের মতে, হাঙর মানুষের আক্রমণকারী নয়, বরং কৌতূহলী ও শান্ত স্বভাবের প্রাণী। লোহিত সাগরের শার্ম এল শেখ বা বিশ্বের বিভিন্ন ডাইভিং পয়েন্টগুলোতে ডুবুরিদের সাথে তাদের সহাবস্থানই এর প্রমাণ।
আন্তর্জাতিক এই দিবস আমাদের সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে নতুন এক অঙ্গীকারের ডাক দেয়। মনে রাখতে হবে, হাঙর সংরক্ষণের অর্থ কেবল একটি প্রজাতি বাঁচানো নয়, বরং সমুদ্রের বিশাল ঐশ্বর্য রক্ষা করা। ভ্রান্ত ধারণা বর্জন করে হাঙর সম্পর্কে পপ কালচারের কাল্পনিক আতঙ্ক দূর করে বৈজ্ঞানিক তথ্য জানা। হাঙরের পাখনা, তেল বা চামড়া দিয়ে তৈরি বিলাসবহুল পণ্য কেনা ও বিক্রি বন্ধ করা। টেকসই মৎস্য আহরণে সমুদ্রের দূষণ কমানো এবং হাঙ্গর শিকার নিষিদ্ধ বা সীমিত করার আইনি কঠোরতা বজায় রাখা। নাগরিক বিজ্ঞান কার্যক্রমে অংশগ্রহণের মাধ্যমে হাঙরের বিচরণ ও সংরক্ষণ-সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহে সহায়তা করা।
আধুনিকতা মানে কেবল ভোগ নয়, বরং প্রকৃতির বৈচিত্র্যকে পরম মমতায় আগলে রাখা। যে প্রাণীটি প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে পৃথিবীর ইতিহাসকে ধারণ করে আছে, তাকে বিলুপ্ত হতে দেওয়া হবে আমাদের সভ্যতার এক চরম ব্যর্থতা। আসুন, এই সচেতনতা দিবসে আমরা প্রতিজ্ঞা করি—সমুদ্রের এই অতন্দ্র প্রহরীকে আমরা কেবল সুরক্ষা দেব না, বরং মানুষের প্রতি তাদের প্রতি যে অহেতুক ভয়ের প্রাচীর গড়ে উঠেছে, তা ভেঙে পারস্পরিক সহাবস্থানের সংস্কৃতি গড়ে তুলব। বৈচিত্র্যময় এই পৃথিবীতে হাঙরের টিকে থাকাই আমাদের সমুদ্রের স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা।









