ফিরে আসুক সাতক্ষীরার গুড়পুকুর মেলা
0-0x0-0-0#
সচ্চিদানন্দ দে সদয়
একটি মেলা কেবল দোকানপাটের সমাবেশ নয়। একটি মেলা একটি জনপদের স্মৃতি, সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও মানুষের মিলনের জায়গা। তাই কোনো ঐতিহ্যবাহী মেলা হারিয়ে যাওয়া মানে শুধু একটি আয়োজন বন্ধ হয়ে যাওয়া নয়; এর সঙ্গে হারিয়ে যায় মানুষের বহু বছরের স্মৃতি, স্থানীয় কারুশিল্পের বাজার এবং সামাজিক যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিসর। সাতক্ষীরার গুড়পুকুর মেলাও তেমনই এক ঐতিহ্যের নাম। শরৎ এলেই একসময় সাতক্ষীরার মানুষের মনে গুড়পুকুর মেলাকে ঘিরে তৈরি হতো আলাদা আনন্দ। শিশু-কিশোরদের মধ্যে থাকত মেলায় যাওয়ার আনন্দ।
পরিবারের বড়রা ব্যস্ত থাকতেন কেনাকাটা ও আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা করার আয়োজনে। দূরদূরান্তের মানুষও মেলায় আসতেন। মাঠজুড়ে বসত নানা ধরনের দোকান। মাটির খেলনা, বাঁশ-বেতের সামগ্রী, কাঠের তৈরি জিনিস, মিষ্টি, খাবার ও স্থানীয় কারিগরদের তৈরি পণ্য মেলার অন্যতম আকর্ষণ ছিল। প্রবীণ সাতক্ষীরাবাসীর স্মৃতিতে সেই মেলা এখনো জীবন্ত। তাঁদের কাছে গুড়পুকুর মেলা শুধু একটি উৎসব নয়Ñএটি শৈশব ও তারুণ্যের স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি নাম। কারও কাছে মেলার স্মৃতি নাগরদোলার, কারও কাছে মাটির খেলনার, কারও কাছে বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরে বেড়ানোর। আবার কারও কাছে মেলা মানেই পরিবারের সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে আনন্দ করার একটি দিন। কিন্তু সময় বদলেছে। মানুষের জীবনযাত্রা বদলেছে।
বিনোদনের ধরন বদলেছে। মোবাইল ফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, টেলিভিশন, অনলাইন কেনাকাটা ও আধুনিক বিপণি ব্যবস্থার বিস্তারে ঐতিহ্যবাহী মেলার গুরুত্ব অনেক জায়গায় কমেছে। স্থানীয় কারিগরদের তৈরি পণ্যের জায়গা নিয়েছে কারখানায় তৈরি পণ্য। ফলে গুড়পুকুরের মতো ঐতিহ্যবাহী মেলার ধারা বাহিকতাও নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। প্রশ্ন হলো, পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কি এই ঐতিহ্যকে নতুনভাবে বাঁচিয়ে তোলা যায় না? অবশ্যই যায়।
তবে সে জন্য প্রয়োজন শুধু মেলা আয়োজন নয়, মেলাটিকে নতুন করে ভাবা। গুড়পুকুর মেলার ঐতিহ্যকে সংরক্ষণ করতে হলে প্রথমেই এর ইতিহাস নথিবদ্ধ করা প্রয়োজন। মেলার উৎপত্তি, সময়ের সঙ্গে এর পরিবর্তন, পুরোনো আয়োজন, ব্যবসায়ী ও কারিগরদের অংশগ্রহণ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং মানুষের স্মৃতিকে লিখিত ও আলোকচিত্র আকারে সংরক্ষণ করা যেতে পারে। প্রবীণ সাতক্ষীরা বাসীদের সাক্ষাৎকার নিয়ে তৈরি করা যেতে পারে একটি ‘গুড়পুকুর মেলা আর্কাইভ’।
এতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম জানতে পারবে, এই মেলা কীভাবে একটি জনপদের সামাজিক জীবনের অংশ হয়ে উঠেছিল। মেলার সঙ্গে স্থানীয় লোকসংস্কৃতির সম্পর্কও নতুন করে তৈরি করা দরকার। বাউল গান, জারি-সারি, কবিগান, লোকনৃত্য, পুতুলনাচ, যাত্রা কিংবা হারিয়ে যেতে বসা গ্রামীণ খেলাধুলার আয়োজন করা যেতে পারে। শিশুদের জন্য চিত্রাঙ্কন, গল্প বলা ও ঐতিহ্যভিত্তিক প্রতিযোগিতা থাকতে পারে।
স্থানীয় লেখক-কবি ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের অংশগ্রহণে সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজনও করা সম্ভব। এর পাশাপাশি স্থানীয় কারিগর ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য মেলাকে একটি বড় বাজারে পরিণত করা যেতে পারে। সাতক্ষীরার নিজস্ব পণ্য, হস্তশিল্প, কৃষিপণ্য ও খাবারের জন্য আলাদা স্টল রাখা হলে মেলার অর্থনৈতিক গুরুত্ব বাড়বে। এতে স্থানীয় মানুষের আয়ও বাড়তে পারে।বিশেষ করে বাঁশ-বেত, মাটি, কাঠ কিংবা কাপড়ের কাজের সঙ্গে যুক্ত কারিগরদের জন্য মেলা গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করতে পারে।
আধুনিক বাজারব্যবস্থায় যাঁরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন, তাঁদের পণ্য প্রদর্শন ও বিক্রির জন্য মেলা একটি কার্যকর প্ল্যাটফর্ম হতে পারে। গুড়পুকুর মেলার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সামাজিক সম্প্রীতি। একটি ঐতিহ্যবাহী মেলার সৌন্দর্য হলো সেখানে নানা বয়স, পেশা ও সামাজিক পরিচয়ের মানুষ একই জায়গায় এসে মিলিত হন। বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজে মেলা বহুদিন ধরেই মানুষের যোগাযোগ ও পারস্পরিক সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। সাতক্ষীরার মতো বৈচিত্র্যময় একটি জেলার জন্য এই সামাজিক যোগাযোগের গুরুত্ব কম নয়। তবে মেলা আয়োজনের ক্ষেত্রে আবেগের পাশাপাশি ব্যবস্থাপনার বিষয়টিও গুরুত্ব দিতে হবে। নিরাপত্তা, যানজট নিয়ন্ত্রণ, অগ্নিনিরাপত্তা, পর্যাপ্ত আলো, বিশুদ্ধ পানি, অস্থায়ী চিকিৎসাকেন্দ্র, নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য সুস্পষ্ট পরিকল্পনা প্রয়োজন। মেলা শেষে যাতে পুরো এলাকা ময়লা-আবর্জনায় ভরে না যায়, সে বিষয়েও আয়োজকদের দায়িত্বশীল হতে হবে।
আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণÑমেলার আয়োজনে স্বচ্ছতা। দোকান বরাদ্দ, ইজারা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও অর্থ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা থাকলে মানুষের আস্থা বাড়বে। স্থানীয় ব্যবসায়ী, সাংস্কৃতিক সংগঠন, নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমকে পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত করা যেতে পারে। এখানে প্রশাসনের পাশাপাশি সাতক্ষীরার নাগরিকদেরও দায়িত্ব আছে। একটি ঐতিহ্যকে শুধু সরকারের ওপর নির্ভর করে বাঁচিয়ে রাখা যায় না। সমাজের মানুষকে এগিয়ে আসতে হয়। যাঁরা এই মেলার স্মৃতি বহন করেন, তাঁদেরও নতুন প্রজন্মের কাছে সেই ইতিহাস তুলে ধরতে হবে।
কারণ আজকের শিশুরাই আগামী দিনের সাতক্ষীরা। তারা যদি নিজের এলাকার ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে না জানে, তাহলে কয়েক দশক পরে গুড়পুকুর মেলা হয়তো কেবল পুরোনো মানুষের মুখে শোনা একটি গল্প হয়ে থাকবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, উন্নয়ন ও ঐতিহ্য পরস্পরের বিরোধী নয়। একটি আধুনিক শহরেও ঐতিহ্যবাহী মেলা থাকতে পারে। বরং আধুনিক প্রযুক্তিকে ব্যবহার করেই মেলার প্রচার বাড়ানো যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মেলার ইতিহাস, স্থানীয় কারিগর ও সাংস্কৃতিক আয়োজন তুলে ধরা যেতে পারে। অনলাইনে স্থানীয় পণ্যের প্রচার করা যেতে পারে। তরুণ প্রজন্মকে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে যুক্ত করা যেতে পারে। সাতক্ষীরার পরিচয় শুধু তার ভৌগোলিক অবস্থান বা প্রশাসনিক সীমানায় সীমাবদ্ধ নয়। এই জেলার পরিচয়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে তার নদী, কৃষি, সুন্দরবনের প্রান্তিক জীবন, লোকসংস্কৃতি, উৎসব, মেলা ও মানুষের সংগ্রাম। তাই গুড়পুকুর মেলাকে বাঁচিয়ে রাখা মানে সাতক্ষীরার একটি সাংস্কৃতিক পরিচয়কে বাঁচিয়ে রাখা।
আমরা অতীতকে হুবহু ফিরিয়ে আনতে পারব না। সময়ের সঙ্গে অনেক কিছুই বদলাবে। কিন্তু ঐতিহ্যের মূল চেতনাকে ধরে রাখা সম্ভব। পুরোনো মেলার স্মৃতির সঙ্গে নতুন প্রজন্মের প্রত্যাশাকে যুক্ত করেই তৈরি হতে পারে নতুন গুড়পুকুর মেলা। সাতক্ষীরার সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এখন প্রয়োজন সেই নতুন উদ্যোগ। প্রশাসন, নাগরিক সমাজ, সাংস্কৃতিক সংগঠন, ব্যবসায়ী ও স্থানীয় মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় প্রতিবছর একটি পরিকল্পিত, নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন ও ঐতিহ্যনির্ভর গুড়পুকুর মেলা আয়োজন করা যেতে পারে। মেলার মাঠে আবার মানুষের ভিড় হোক। স্থানীয় কারিগরের হাতে তৈরি পণ্য আবার মানুষের ঘরে ফিরুক।
লোকগানের সুরে মুখরিত হোক সন্ধ্যা। শিশুরা আবিষ্কার করুক তাদের এলাকার নিজস্ব সংস্কৃতিকে। প্রবীণরা ফিরে পান তাঁদের ফেলে আসা দিনের স্মৃতি। গুড়পুকুর মেলা শুধু অতীতের স্মৃতি হয়ে থাকুকÑএটা সাতক্ষীরাবাসী নিশ্চয়ই চান না।তাই সময় এসেছে নতুন করে বলারÑফিরে আসুক সাতক্ষীরার গুড়পুকুর মেলা। ফিরে আসুক মানুষের মিলন, লোকঐতিহ্যের প্রাণ এবং একটি জনপদের হারিয়ে যাওয়া আনন্দ।
লেখক: সংবাদকর্মী









