সাকিবুর রহমান বাবলা
একটি পরিচ্ছন্ন রাস্তা, ময়লামুক্ত নদীর পাড়, প্লাস্টিকবিহীন সমুদ্রসৈকত কিংবা আবর্জনামুক্ত শহরÑএসব শুধু সৌন্দর্যের বিষয় নয়; মানুষের স্বাস্থ্য, পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুরক্ষার সঙ্গে এর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। পরিচ্ছন্নতার এ বার্তা বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে দিতে প্রতি বছর ২০ সেপ্টেম্বর পালিত হয় বিশ্ব পরিচ্ছন্নতা দিবস।
২০২৬ সালের বিশ্ব পরিচ্ছন্নতা দিবসের প্রতিপাদ্যÑ“পরিচ্ছন্ন প্লেট থেকে পরিচ্ছন্ন নগর”। এবারের কর্মসূচিতে পরিচ্ছন্নতা অভিযানের পাশাপাশি খাদ্য অপচয় রোধ, জৈব বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, চক্রাকার অর্থনীতি ও টেকসই নগর ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ চীনের ঝেজিয়াং প্রদেশের শাওশিং শহরে দিবসটির বৈশ্বিক আয়োজন অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
বিশ্ব পরিচ্ছন্নতা দিবসের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ নাগরিক আন্দোলনের ইতিহাস। ২০০৮ সালে এস্তোনিয়ায় মাত্র পাঁচ ঘণ্টার একটি পরিচ্ছন্নতা অভিযানে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ অংশ নেন। পুরো দেশকে এক দিনে পরিচ্ছন্ন করার সেই উদ্যোগ পরবর্তী সময়ে বিশ্বব্যাপী পরিচ্ছন্নতা আন্দোলনে অনুপ্রেরণা জোগায়। মানুষ নিজ উদ্যোগে জনপরিসর পরিষ্কারের পাশাপাশি বর্জ্য কমানো, পুনঃব্যবহার ও পুনঃচক্রায়নের বিষয়ে সচেতন হতে শুরু করে।
এই ব্যাপক নাগরিক অংশগ্রহণের ধারাবাহিকতায় ২০২৩ সালের ৮ ডিসেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭৮তম অধিবেশনে গৃহীত রেজুলেশন ৭৮/১২২-এর মাধ্যমে প্রতি বছর ২০ সেপ্টেম্বরকে বিশ্ব পরিচ্ছন্নতা দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। জাতিসংঘ মানব বসতি কর্মসূচি দিবসটি উদযাপনে সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করে।
হ্রাস, পুনঃব্যবহার ও পুনঃচক্রায়নÑএই ৩আর নীতি পরিচ্ছন্ন ও টেকসই জীবনযাপনের অন্যতম ভিত্তি। এবারের “পরিচ্ছন্ন প্লেট থেকে পরিচ্ছন্ন নগর” প্রতিপাদ্য খাবারের প্লেট থেকে শহরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার একটি প্রত্যক্ষ যোগসূত্র তুলে ধরে।
জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচির ‘ফুড ওয়েস্ট ইনডেক্স রিপোর্ট ২০২৪’ অনুযায়ী, ২০২২ সালে বিশ্বে প্রায় ১০৫ কোটি টন খাদ্য অপচয় হয়েছে। এর প্রায় ৬০ শতাংশ পরিবার, ২৮ শতাংশ খাদ্য পরিবেশন খাত এবং ১২ শতাংশ খুচরা বিক্রয় পর্যায়ে অপচয় হয়েছে। বিশ্বে বিপুল পরিমাণ খাদ্য প্রতিদিন অপচয় হলেও একই সময়ে কোটি কোটি মানুষ খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। খাদ্য অপচয় পরিবেশের ওপরও বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করে এবং এর সঙ্গে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন ও অর্থনৈতিক ক্ষতি জড়িত।
পরিচ্ছন্নতা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বিভিন্ন দেশের নিজস্ব ও অনুকরণীয় পদ্ধতি রয়েছে। জাপানে বিদ্যালয় থেকেই শিক্ষার্থীদের পরিচ্ছন্নতার কাজে যুক্ত করার মাধ্যমে সামাজিক দায়িত্ববোধ গড়ে তোলা হয়। দক্ষিণ কোরিয়ায় খাদ্যবর্জ্য পৃথকভাবে সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনার ব্যবস্থা রয়েছে। সিঙ্গাপুরে পরিচ্ছন্নতা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমে আইন, নাগরিক সচেতনতা ও পরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনার সমন্বয় দেখা যায়।
বাংলাদেশের শহর ও পর্যটনকেন্দ্রে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এখনও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে প্লাস্টিক বর্জ্য, একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক, অপরিকল্পিত বর্জ্য ফেলা এবং পর্যাপ্ত বর্জ্য পৃথকীকরণের অভাব পরিবেশের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
বাংলাদেশ ন্যাশনাল থ্রি-আর স্ট্র্যাটেজি ফর ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট-এর মাধ্যমে বর্জ্য হ্রাস, পুনঃব্যবহার ও পুনঃচক্রায়নের নীতি গ্রহণ করেছে। পাশাপাশি প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় উৎপাদক ও আমদানিকারকদের দায়িত্বশীল করার লক্ষ্যে এক্সটেন্ডেড প্রডিউসার রেসপনসিবিলিটি (ইপিআর)-ভিত্তিক নীতিগত উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব উদ্যোগ কার্যকর করতে সরকারি প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সরকার, ব্যবসায়ী, নাগরিক সমাজ এবং সাধারণ মানুষের সমন্বিত অংশগ্রহণ প্রয়োজন।
বিশ্ব পরিচ্ছন্নতা দিবস শুধু এক দিনের পরিচ্ছন্নতা অভিযান নয়; এটি প্রতিদিনের অভ্যাস পরিবর্তনের একটি আহ্বান। প্রয়োজন অনুযায়ী খাবার প্রস্তুত করা, বাজারে পুনঃব্যবহারযোগ্য ব্যাগ নেওয়া, প্লাস্টিকের বোতল ও অন্যান্য বর্জ্য যেখানে-সেখানে না ফেলা এবং জৈব বর্জ্য থেকে কম্পোস্ট তৈরির মতো ছোট ছোট অভ্যাস বড় পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে।
একটি পরিচ্ছন্ন প্লেট থেকে শুরু হতে পারে পরিচ্ছন্ন রান্নাঘর, পরিচ্ছন্ন বাড়ি, পরিচ্ছন্ন পাড়া এবং পরিশেষে একটি পরিচ্ছন্ন নগর। আসুন, বর্জ্য ফেলার আগে এর পরিণতি নিয়ে ভাবি এবং পরিচ্ছন্নতাকে শুধু একটি দিবসের কর্মসূচি নয়, বরং দৈনন্দিন জীবনের অংশ করে তুলি।