দস্যুমুক্ত সুন্দরবনই হোক জাতীয় অঙ্গীকার
মো. মামুন হাসান
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছিলেন নদীর মাঝিদের কথা, যাঁদের জীবন নদীর মতোই অনিশ্চিত, অথচ নদীকে ছাড়া যাঁদের জীবন অচল। সুন্দরবনের জেলে ও মৌয়ালদের দিকে তাকালে সেই পদ্মাপারের মাঝিদের ছবিই চোখে ভাসে। পার্থক্য এটুকুই, এখানে নদীর ঢেউয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অস্ত্রধারী দস্যুদের ছায়া। বাংলাদেশের দক্ষিণ প্রান্তে বিস্তৃত এই বনভূমি আমাদের জাতীয় পরিচয়ের সবুজ ঢাল, জীববৈচিত্র্যের অমূল্য ভাণ্ডার এবং লক্ষাধিক মানুষের জীবিকার ঠিকানা।
ইউনেস্কো একে বিশ্ব ঐতিহ্যের মর্যাদা দিয়েছে, রামসার তালিকাতেও পেয়েছে স্বীকৃতি। অথচ এই বনের গভীরে বছরের পর বছর ধরে যে ভয়ের সংস্কৃতি বাসা বেঁধেছে, তা প্রকৃতির এই বিস্ময়কে করেছে ম্লান এবং মানুষের জীবনকে করেছে অনিশ্চিত। একজন শিক্ষক হিসেবে আমার দৃঢ় বিশ্বাস, দস্যুমুক্ত সুন্দরবন কোনো দূরের স্বপ্ন নয়; এটি আমাদের সম্মিলিত অস্তিত্বের পূর্বশর্ত।
সুন্দরবনের সৌন্দর্য কবিদের চিরকাল আকৃষ্ট করেছে। জীবনানন্দ দাশ যে রূপসী বাংলার ছবি এঁকেছিলেন, নদী, মাঠ আর ভাটফুলের গন্ধে ভরা সেই বাংলার সবচেয়ে বন্য ও রহস্যময় রূপটি ধরা দেয় এই বনেই। সেই সৌন্দর্য যদি ভয়ের পর্দায় ঢাকা পড়ে, তবে ক্ষতি কেবল অর্থনীতির নয়, আমাদের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারেরও। বনবিবি ও দক্ষিণ রায়ের লোককথা আমাদের শেখায়, বিপদে পড়লে মানুষ এই বনে বনদেবীর কাছে আশ্রয় খুঁজেছে। এসব লোকবিশ্বাসের মধ্য দিয়ে মানুষ ও প্রকৃতির সম্পর্কের যে চিত্র ফুটে ওঠে, তা আমাদের বিনয় ও বিশ্বাসের শিক্ষা দেয়। অথচ আজ সেই বিশ্বাসের জায়গায় স্থান করে নিয়েছে আতঙ্ক। দস্যুরা যেন লোককথার সেই বাঘের চেয়েও ভয়ংকর রূপে হাজির হয়েছে। কারণ, বাঘের আচরণে অন্তত প্রকৃতির নিয়ম কাজ করে; দস্যুদের কাছে আছে কেবল লোভ।
যাঁরা এই বনের ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকেন, তাঁদের কথা ভাবুন। জেলের জাল কেবল মাছ ধরে না, একটি পরিবারের চুলাও জ্বালিয়ে রাখে। মৌয়ালের কাঁধের চাক কেবল মধু আনে না, জোগায় সন্তানের বই-খাতার খরচ। বাঘের থাবা আর কুমিরের আক্রমণ তাঁদের নিত্যদিনের ঝুঁকি। এর সঙ্গে যখন যুক্ত হয় অপহরণ, মুক্তিপণ ও চাঁদাবাজি, তখন জীবিকা অর্জন পরিণত হয় জীবন বাজি রাখার খেলায়। মুক্তিপণের টাকা জোগাড় করতে ভিটেমাটি বিক্রি করা পরিবারগুলো আবার ঋণের জালে জড়িয়ে একই বনে ফিরতে বাধ্য হয় এবং পুনরায় একই ভয়ের মুখোমুখি হয়। এভাবে দস্যুতা হয়ে ওঠে দারিদ্র্যকে পুনরুৎপাদনকারী এক নিষ্ঠুর চক্র।
পর্যটনবিজ্ঞানের আলোকে দেখলে সংকটের গভীরতা আরও স্পষ্ট হয়। মনোবিজ্ঞানী আব্রাহাম মাসলোর চাহিদার স্তরবিন্যাস তত্ত্ব আমাদের শেখায়, খাদ্য ও আশ্রয়ের মতো মৌলিক চাহিদা পূরণের পাশাপাশি মানুষের কাছে নিরাপত্তাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিরাপত্তার ভিত্তি দুর্বল হলে সৌন্দর্য উপভোগ কিংবা আত্মোপলব্ধির উচ্চতর স্তরে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে। কোনো ভ্রমণকারী এমন গন্তব্যে অবকাশ যাপন করতে চান না, যেখানে নিজের জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। রিচার্ড বাটলারের পর্যটন গন্তব্যের জীবনচক্র তত্ত্ব অনুযায়ী, প্রতিটি গন্তব্য আবিষ্কার, উন্নয়ন ও সংহতিসহ বিভিন্ন ধাপ অতিক্রম করে। যথাযথ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কোনো গন্তব্য নবজীবন পেতে পারে, আবার অব্যবস্থাপনার কারণে ক্ষয়ের পথেও এগিয়ে যেতে পারে। নিরাপত্তাহীনতা সেই ক্ষয়কে ত্বরান্বিত করে। বিশ্ব পর্যটন মানচিত্রে সুন্দরবনের যে সম্ভাবনাময় অবস্থান তৈরি হওয়ার কথা ছিল, দস্যুভীতি তাকে বারবার পিছিয়ে দিয়েছে।
পর্যটন গবেষণায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কোনো গন্তব্যের ভাবমূর্তি বাস্তব পরিস্থিতির চেয়েও দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। একটি অপহরণের খবর হাজারটি ইতিবাচক প্রচারণার সুফল মুহূর্তেই ম্লান করে দিতে পারে। এর প্রভাব পড়ে পর্যটন গাইড, নৌযানচালক, রিসোর্টকর্মী, হস্তশিল্পী ও স্থানীয় খাদ্য ব্যবসায়ীদের ওপর। জন ডক্সির বিরক্তি সূচক তত্ত্ব আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, স্থানীয় মানুষের আস্থা ও সহযোগিতা ছাড়া পর্যটনের টেকসই বিকাশ সম্ভব নয়। অন্যদিকে, সম্প্রদায়ভিত্তিক পর্যটনের দর্শন বলে, পর্যটনের সুফল যখন বনসংলগ্ন মানুষের ঘরে পৌঁছায়, তখন তাঁরাই হয়ে ওঠেন বনের সবচেয়ে বিশ্বস্ত প্রহরী। দস্যুতা এই আস্থার বন্ধন ভেঙে দেয়। টেকসই পর্যটনের তিনটি স্তম্ভ—অর্থনীতি, সমাজ ও পরিবেশ—সব কটিতেই একযোগে আঘাত হানে দস্যুতা। অর্থনীতিতে স্থবিরতা, সমাজে ভয় ও বিভাজন এবং পরিবেশে অবৈধ শিকার ও বনসম্পদ লুটের প্রবণতা বাড়ে।
এবার আসা যাক রাষ্ট্রের দায়িত্বের প্রসঙ্গে। টমাস হবস ও জন লকের সামাজিক চুক্তি তত্ত্বের মূল কথা হলো, নাগরিকেরা নিরাপত্তা ও অধিকার রক্ষার প্রত্যাশায় রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব মেনে নেন। যে জেলে বা মৌয়াল রাষ্ট্রের অনুমতিপত্র নিয়ে বনে প্রবেশ করেন, তিনিও এই সামাজিক চুক্তির অংশীদার। তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা তাই কোনো দয়া নয়; বরং রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব। অ্যালবার্ট ভেন ডাইসির আইনের শাসনের ধারণা অনুযায়ী, আইনের চোখে সবাই সমান এবং কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নয়। অস্ত্রের জোরে বনকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করা দস্যু বাহিনী এই নীতির প্রকাশ্য লঙ্ঘন করে।
আমাদের সংবিধানও এ বিষয়ে নীরব নয়। সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদে আইনের আশ্রয়লাভ ও আইনানুযায়ী আচরণ পাওয়ার অধিকার এবং ৩২ অনুচ্ছেদে জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার সুরক্ষা নিশ্চিত করা হয়েছে। ১৮ক অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রকে পরিবেশ, বন, জীববৈচিত্র্য ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণসংক্রান্ত আইনেও বনসম্পদ ও বন্যপ্রাণী রক্ষার বিধান রয়েছে। এসব সাংবিধানিক অঙ্গীকার যদি কেবল গ্রন্থের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তা নিষ্প্রাণ অক্ষরমালায় পরিণত হবে। সুন্দরবনের গভীরে এসব অঙ্গীকারের বাস্তব প্রতিফলন ঘটাতে হবে নিয়মিত টহল, কার্যকর নজরদারি ও ন্যায়বিচারের মাধ্যমে।
অপরাধ দমনের তত্ত্বও আমাদের পথ দেখায়। সিজার বেকারিয়ার মতে, শাস্তির কার্যকারিতা কেবল কঠোরতার ওপর নির্ভর করে না; বরং শাস্তি নিশ্চিত ও দ্রুত হওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। কোহেন ও ফেলসনের রুটিন কার্যকলাপ তত্ত্ব অনুযায়ী, অপরাধ সংঘটিত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে যখন অপরাধপ্রবণ ব্যক্তি, উপযুক্ত লক্ষ্যবস্তু এবং কার্যকর অভিভাবকত্বের অনুপস্থিতি একই সঙ্গে উপস্থিত থাকে। সুন্দরবনের বিস্তীর্ণ জলপথে কার্যকর নজরদারির ঘাটতি পূরণ করাই এখানে বড় চ্যালেঞ্জ। এ জন্য প্রয়োজন নিয়মিত যৌথ টহল, আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থা, জেলেদের জন্য জরুরি সংকেত পাঠানোর প্রযুক্তি এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা।
তবু আমি বিশ্বাস করি, কেবল অস্ত্রের জোরে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। সমাজবিজ্ঞানী রবার্ট মার্টনের চাপ তত্ত্ব অনুযায়ী, সমাজ যখন মানুষের সামনে সাফল্যের লক্ষ্য তুলে ধরে, অথচ সেই লক্ষ্যে পৌঁছানোর বৈধ সুযোগ সীমিত রাখে, তখন কেউ কেউ অপরাধের পথে পা বাড়াতে পারে। উপকূলের অনেক তরুণ দারিদ্র্য, নদীভাঙন ও কর্মহীনতার চাপে অপরাধে জড়িয়ে পড়তে পারে। তাই আত্মসমর্পণকারী দস্যুদের পুনর্বাসন, বিকল্প কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়নের প্রশিক্ষণ জরুরি। অপরাধ দমন ও অপরাধীদের পুনর্বাসন—এই দুটি উদ্যোগ সমান্তরালে কার্যকর হলেই দস্যুতা নির্মূলের লক্ষ্য বাস্তব রূপ পেতে পারে। দারিদ্র্যের শিকড় অক্ষত রেখে কেবল ডালপালা ছেঁটে কোনো সমস্যার স্থায়ী সমাধান করা যায় না।
আমি আমার শিক্ষার্থীদের প্রতিদিন শেখাই, আতিথেয়তা মানে কেবল অতিথিকে আপ্যায়ন করা নয়, তাঁকে নিরাপদ বোধ করানোও। যে গন্তব্য পর্যটককে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে পারে না, সে আতিথেয়তার গর্ব করতে পারে না। সুন্দরবনসংলগ্ন অঞ্চলের তরুণেরা আজ পর্যটনশিক্ষায় নিজেদের দক্ষ করে তুলছেন। কেউ হতে চান প্রকৃতিবিষয়ক গাইড, কেউ ইকো-রিসোর্টের ব্যবস্থাপক, আবার কেউ স্থানীয় উদ্যোক্তা। তাঁদের চোখে যে স্বপ্ন, তা বাঁচিয়ে রাখার দায় আমাদের সবার।
সুন্দরবন আমাদের ঘূর্ণিঝড়ের বিরুদ্ধে প্রাকৃতিক ঢাল, কার্বনের ভাণ্ডার এবং জীবিকার আশ্রয়। এই বনকে দস্যুভীতি থেকে মুক্ত করা মানে কেবল একটি আইনশৃঙ্খলাজনিত সমস্যার সমাধান নয়। এর অর্থ জেলের চোখে ভরসা ফিরিয়ে দেওয়া, মৌয়ালের মনে সাহস জোগানো এবং পর্যটকের মনে বিশ্বাস গড়ে তোলা। রাষ্ট্র, প্রশাসন, স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও পর্যটন খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা হাতে হাত রাখলে সেই দিন আর দূরে থাকবে না, যেদিন সুন্দরবনের নদীতে নৌকার পালে লাগবে নির্ভয়ের হাওয়া, আর মাঝির কণ্ঠে আবার ফিরবে ভাটিয়ালির সুর।
দস্যুমুক্ত সুন্দরবনই হোক আমাদের সম্মিলিত অঙ্গীকার।
মো. মামুন হাসান, শিক্ষক ও পর্যটন উন্নয়ন গবেষক









