সম্পাদকীয়/ প্রসঙ্গ: মৃত্যুফাঁদে নার্সিং কলেজ!
সাতক্ষীরা সরকারি নার্সিং ও মিডওয়াইফারি কলেজের বর্তমান চিত্র সংবাদপত্রের পাতা ছাড়িয়ে যেন কোনো এক ভৌতিক গল্পের প্রেক্ষাপট হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিম থেকে বেরিয়ে আসা মরিচা ধরা রড, ছাদ চুইয়ে পড়া বৃষ্টির পানি আর পড়ার টেবিলে খসে পড়া পলেস্তারাÑসব মিলিয়ে প্রায় ৪০০ শিক্ষার্থীর জীবন এখানে আক্ষরিক অর্থেই এক ‘মৃত্যুফাঁদে’র মধ্যে বন্দি। কিন্তু সবচেয়ে বেদনাদায়ক ও বিচিত্র বিষয় হলো, শিক্ষার্থীদের জীবনের নিরাপত্তা দেওয়ার বদলে কলেজ কর্তৃপক্ষ তাদের কাছ থেকে ‘দায়মুক্তি’ স্বাক্ষর গ্রহণ করেছে। অর্থাৎ, ভবন ধসে শিক্ষার্থী মারা গেলে বা আহত হলে কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। একটি স্বাধীন ও সভ্য দেশে উচ্চশিক্ষার প্রাঙ্গণে এমন প্রশাসনিক অমানবিকতা ও দায়িত্বজ্ঞানহীনতা অকল্পনীয়।
গণপূর্ত অধিদপ্তর গত ৩০ মার্চ ভবনটিকে ‘অতিঝুঁকিপূর্ণ’ ও ‘সংস্কার অযোগ্য’ বলে ঘোষণা করেছে। বিশেষজ্ঞ দলও নতুন ভবন নির্মাণের সুপারিশ দিয়েছেন। যখন একটি সরকারি সংস্থা ভবনটিকে বসবাসের অযোগ্য বলছে, তখন সেখানে শিক্ষার্থীদের অবস্থান করতে বাধ্য করা কি ফৌজদারি অপরাধের শামিল নয়? বিকল্প আবাসন ব্যবস্থা না থাকায় অনেক শিক্ষার্থী মেসে উঠে বাড়তি আর্থিক চাপে পড়েছেন, আবার নারী শিক্ষার্থীরা পড়েছেন নিরাপত্তা সংকটে। আর যারা বাধ্য হয়ে হোস্টেলে থাকছেন, তারা প্রতি মুহূর্ত কাটাচ্ছেন মরণাতঙ্কে।
কর্তৃপক্ষের দাবি, তারা সিভিল সার্জন, জেলা প্রশাসক ও গণপূর্তকে লিখিতভাবে জানিয়েছেন। প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা বলছেন বিষয়টি ‘প্রক্রিয়াধীন’ বা ‘বাজেট সাপেক্ষে’। প্রশ্ন হলো, একটি বড় ধরনের দুর্ঘটনার পর কি তবে আমাদের টনক নড়বে? অতীতে আমরা দেখেছি, ভবন ধসে বা ছাদ খসে প্রাণহানি হওয়ার পর তদন্ত কমিটি গঠন ও তড়িঘড়ি করে বরাদ্দ দেওয়ার তোড়জোড় চলে। কিন্তু সাতক্ষীরা সরকারি নার্সিং কলেজের ক্ষেত্রে সেই লাশের মিছিলের অপেক্ষা কেন করা হচ্ছে?
শিক্ষার্থীরা এখানে আসছেন সেবার মহান ব্রত নিয়ে দক্ষ নার্স হতে। কিন্তু পর্যাপ্ত ল্যাব সুবিধা ও শ্রেণিকক্ষের অভাবে তাদের শিক্ষা কার্যক্রমও এখন ধুঁকছে। এটি শুধু সাতক্ষীরার সংকট নয়, বরং দেশের নার্সিং শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর এক বড় আঘাত।
আমরা মনে করি, শুধু ‘বাজেট আসছে’ বা ‘জায়গা দেখা হচ্ছে’Ñএমন আশ্বাস দিয়ে এই ভয়াবহ ঝুঁকিকে আর আড়াল করার সুযোগ নেই। অনতিবিলম্বে শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ ও অস্থায়ী বিকল্প আবাসন এবং অ্যাকাডেমিক ভবনের ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে আগামী জাতীয় বাজেটের অপেক্ষায় না থেকে জরুরি তহবিল থেকে নতুন ভবন নির্মাণের কাজ শুরু করা হোক। মনে রাখতে হবে, কোনো প্রশাসনিক ‘দায়মুক্তি’ পত্রই একটি তাজা প্রাণের বিনিময় হতে পারে না। আমরা চাই নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ।












