বনলতা এক্সপ্রেস: জীবনের পথে এক ধ্যানমগ্ন যাত্রা
বিনোদন ডেস্ক; নিজের দেশ থেকে অনেক দূরে বসে একটা সিনেমা দেখলাম – ‘বনলতা এক্সপ্রেস’। এই যে বাংলাদেশ থেকে দূরে বসে বাংলা সিনেমা দেখা- এই দূরত্বই যেন পুরো বিষয়টাকে আরও গভীর করে তুলেছিল। তানিম নূর পরিচালিত সিনেমা ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ হুমায়ূন আহমেদের দার্শনিক ভাবনা থেকে খানিক অনুপ্রাণিত। কেবল গল্পভিত্তিক সিনেমা বানাননি তানিম নুর।
বনলতা এক্সপ্রেস এক বিশেষ অনুভব; যা মৌন আর বহুস্তরের ভাবনা জাগানিয়া। সিনেমার সেই ট্রেনযাত্রার মতোই এগিয়ে চলে এই মগ্ন ঘোরের আবেশ। এই যাত্রা ধীর, অনিবার্য, এবং জীবনের বিচিত্র দুর্বোধ্য মোড় অতিক্রম করে চলে।
সিনেমায় দেখানো এই ট্রেনটি শুধু একটি বাহন নয়। এ যেন জীবনেরই আয়না।
ট্রেনের একেকটি কামরার ভেতর বাস করে এক জীবন্ত বাংলাদেশ—খণ্ড খণ্ড হলেও সব যেন একসূত্রে গাঁথা। ট্রেনে আছে ক্ষমতা আঁকড়ে থাকা এক মন্ত্রী। আছে শোকগ্রস্ত এক বাবা, যিনি হারানোর স্মৃতি বয়ে বেড়াচ্ছেন। আছে যন্ত্রণা আর আশার মাঝখানে আটকে থাকা এক গর্ভবতী নারী। আরও আছে একজন চিকিৎসক, যিনি নিজের ভেতরে বয়ে বেড়াচ্ছেন এক ট্র্যাজেডি।
প্রতিটি চরিত্রের আছে নিজের মতো দুঃখ; নিজের মত ভীষণ নীরবতা। এরপরও যখন তাদের গল্পগুলো একে অপরের সঙ্গে মিশে যায়, তখন এক অসাধারণ সত্য উন্মোচিত হয়—এখানে কেউই আসলে একা নয়।
এক সুতায় অনেক গল্প বুনে নেওয়ার কৌশল জানেন নূর। তাতে এই নিমার্ণ কোনো সরলরৈখিক কাহিনিতে আটকে থাকেনি। ছোট ছোট মুহূর্ত মিলে চোখে সামনে ধরা দেয় বিশাল একটি অর্থপূর্ণ চিত্র। ব্যক্তিগত শোক রূপ নেয় সামষ্টিক গাথায়।
এই সিনেমা উপলব্ধি করায়- জীবনে আনন্দের চেয়ে দুঃখই বেশি। অথচ সেই ক্ষণিকের আনন্দই আমাদের বাঁচিয়ে রাখে।
‘বনলতা এক্সপ্রেস’সিনেমার শক্তি এখানেই—এর উপলব্ধি এককভাবে কোনো শ্রেণি, কণ্ঠ বা দৃষ্টিভঙ্গিতে নিজেকে সীমিত করে রাখে না। বরং প্রান্তিক, অবহেলিত, সাধারণ মানুষের জীবনকে তুলে ধরে সম্মান ও গভীরতার সঙ্গে।
তাই কখনো কখনো মনে হবে, আমরা কোনো সিনেমা দেখছি না—বরং এমন কিছু স্মৃতির ভেতর দিয়ে যাত্রা করছি যা আমরা আগে কখনো নিজেরা নেড়েচেড়ে দেখে উপলব্ধি করতে সক্ষম হইনি।
সিনেমা কিছু মুহূর্ত মনের গভীরে দাগ কেটে যায়। একজন বাবা, যিনি নিজের সন্তানের সঙ্গে স্মৃতিগুলো মাটি চাপা দেন। এক মৃত্যুপথযাত্রী নারী, যাকে বাঁচাতে সময়ের বিরুদ্ধেও লড়াই চলে। ওদিকে এক মন্ত্রী, যিনি ক্ষমতার গণ্ডি পেরিয়ে মানুষের জগতে ফিরে আসেন। এগুলো শুধু দৃশ্য নয়—এগুলো জাতির প্রতিচ্ছবি। এখানে শোক নিজের পথ খুঁজে নেয় সহনশীলতা আর আশার মধ্যে দিয়ে।
এবার সিনেমার গানের কথা বলি। শেষের দিকে আয়ুব বাচ্চুর পরিচিত কণ্ঠ শোনা গেল। তখন আর বিষয়টা শুধুই সিনেমার সমাপ্তি হয়ে থাকে না। বরং অনুভূতিকে বিমূর্ত করে তোলে। পর্দা নিভে যায়,অনুভূতি থেকে যায়—নিজের ভেতরে প্রতিধ্বনি তুলে।
‘বনলতা এক্সপ্রেস’ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, জীবন কখনো একরৈখিক নয়। জীবন হলো ভাঁজে ভাঁজে দুঃখ দিয়ে গড়া, স্মৃতির সেলাইয়ে বাঁধা, আর সম্পর্কের টানে এগিয়ে চলা যাত্রা।
এই সিনেমার সফলতা এখানেই—বনলতা এক্সপ্রেস এই যাত্রাকে পরিণত করে এক যৌথ অস্তিত্বে।
বনলতা এক্সপ্রেস নামের একটি ট্রেন সামনে এগিয়ে চলেছে। ঠিক আমাদের জীবনের মতোই।
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, গোপালগঞ্জ সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি ইউনিভার্সিটি; এবং পিএইচডি গবেষক, কার্টিন ইউনিভার্সিটি, অস্ট্রেলিয়া।












