অনির্বাণ নজরুল: ইতিহাসের অলংকার নয়, এক জ্বলন্ত মশাল
নজরুলবর্ষে-
শেখ সিদ্দিকুর রহমান
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম এবং প্রমিলা দেবীর বিয়ে ও তাদের দাম্পত্য জীবনের শুরুর অধ্যায়টি ছিল একাধারে এক সাহসী প্রেমের আখ্যান এবং তৎকালীন সমাজবাস্তবতার এক নির্মম প্রতিচ্ছবি। ১৯২৪ সালের এপ্রিল মাসে কুমিল্লায় তাদের বিয়ের পর নজরুল যখন প্রমিলা দেবীকে নিয়ে কলকাতায় সংসার পাতার সিদ্ধান্ত নেন, তখন এক চরম সামাজিক ও সাম্প্রদায়িক বিড়ম্বনার মুখোমুখি হতে হয়েছিল এই দম্পতিকে। তৎকালীন কলকাতার রক্ষণশীল সমাজব্যবস্থায় এক মুসলিম যুবক ও এক হিন্দু তরুণীর পরিণয়কে সহজভাবে গ্রহণ করার মতো উদারতা খুব একটা ছিল না। ফলে কলকাতায় একটি উপযুক্ত মাথা গোঁজার ঠাঁই বা বাসা খোঁজার ক্ষেত্রে তাদের যে ধরনের তিক্ত অভিজ্ঞতা হয়েছিল, তা ইতিহাসের এক বেদনাবিধুর অধ্যায়।
সাম্প্রদায়িক মানসিকতা ও বাসা খোঁজার বিড়ম্বনা
কলকাতায় এসে নজরুল ও প্রমিলা দেবী প্রথম যে সংকটে পড়েন, তা হলো বাড়িওয়ালাদের চরম সাম্প্রদায়িক গোঁড়ামি ও কুসংস্কার। কবি হিসেবে নজরুল তখন যথেষ্ট পরিচিত এবং জনপ্রিয়, কিন্তু যখনই কোনো বাড়িওয়ালা জানতে পারতেন যে ভাড়াটিয়া একজন মুসলমান এবং তার স্ত্রী হিন্দু পরিবারের মেয়ে, তখনই তারা বাসা ভাড়া দিতে সোজা অস্বীকৃতি জানাতেন। হিন্দু প্রধান এলাকার বাড়িওয়ালারা একজন মুসলমান যুবককে ঘর ভাড়া দিতে রাজি ছিলেন না। অন্যদিকে, মুসলিম প্রধান এলাকার রক্ষণশীল সমাজও একজন হিন্দু রমণীকে ঘরের বউ হিসেবে মেনে নেওয়ার ক্ষেত্রে চরম অনুদারতা দেখাত। প্রমিলা দেবীর মা গিরিবালা দেবীও এই বিয়ের পক্ষে থাকায় নিজের আত্মীয়স্বজন ও সমাজ কর্তৃক চরমভাবে লাঞ্ছিত ও বহিষ্কৃত হয়েছিলেন।
কলকাতায় এসে এই তিনজনের ছোট পরিবারটি যখনই কোনো বাড়ির খোঁজ পেত, সমাজের তথাকথিত ‘জাত’ যাওয়ার ভয়ে বাড়িওয়ালারা দরজায় তালা ঝুলিয়ে দিতেন। নজরুল তখন বাংলার বুকে সাম্যের গান গাইছেন, কিন্তু কলকাতার বুকে নিজের স্ত্রীর মাথা গোঁজার একটুখানি ঠাঁই মেলাতে তাকে লড়তে হচ্ছিল সমাজের অদৃশ্য এক সাম্প্রদায়িক দেয়ালের বিরুদ্ধে।”
হুগলি ও কৃষ্ণনগরে নির্বাসন
কলকাতার এই তীব্র বিড়ম্বনা, অপমান ও আবাসন সংকটের কারণেই নজরুল শেষ পর্যন্ত কলকাতায় স্থায়ী হতে না পেরে শহর ছাড়তে বাধ্য হন। কলকাতার দমবন্ধ করা পরিবেশ থেকে মুক্তি পেতে এবং প্রমিলা দেবীর শান্তিতে বসবাসের জন্য তিনি বেছে নেন কলকাতার বাইরের মফস্বল শহরগুলোকে। কলকাতা থেকে দূরে হুগলিতে গিয়ে তারা একটি বাসা ভাড়া নেন। সেখানেও দারিদ্র্য এবং সামাজিক কানাঘুষা তাদের পিছু ছাড়েনি, তবে কলকাতার সেই প্রকাশ্য বিড়ম্বনার চেয়ে তা ছিল কিছুটা সহনীয়। পরবর্তীতে তারা নদীয়া জেলার কৃষ্ণনগরের এক চুনকাম-খসে-পড়া সস্তা বাড়িতে আশ্রয় নেন। এই কৃষ্ণনগরেই নজরুল তাঁর জীবনের অন্যতম সেরা কিছু কবিতা ও গান রচনা করেছিলেন, যা ছিল মূলত এই সামাজিক বৈষম্য ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে এক একটি অগ্নিস্ফূলিঙ্গ। নজরুল ও প্রমিলার এই বিড়ম্বনা কেবল একটি বাসা না পাওয়ার গল্প ছিল না; এটি ছিল মূলত তৎকালীন বাঙালি সমাজের তীব্র সাম্প্রদায়িক সংকীর্ণতার এক জীবন্ত দলিল। যে কবি সারাজীবন হিন্দু-মুসলমানের মিলন চেয়েছেন, “মোরা একই বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু-মুসলমান” লিখেছেন তাঁকে নিজের ব্যক্তিগত জীবনেই প্রথম ঘর বাঁধার সময় এই সাম্প্রদায়িক ভেদাভেদের সবচেয়ে বড় আঘাতটি সইতে হয়েছিল। কিন্তু সমস্ত সামাজিক ও আবাসন বিড়ম্বনাকে তুচ্ছ করে প্রমিলা দেবী আমৃত্যু নজরুলের পাশে থেকে তাঁর সৃষ্টিশীলতার সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা হয়ে ছিলেন। নজরুল যখন কলকাতায় প্রমীলাকে নিয়ে বাসা পাচ্ছিলেন না হিন্দু-মুসলমান দম্পতি বলে তখনই তাঁর কলম থেকে বের হয়েছিল এই আগুন। তিনি তাঁর সাম্যবাদী কাব্যগ্রন্থেও মানুষ কবিতায় লিখেছিলেনÑ
গাহি সাম্যের গান
মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান,
নাই দেশ-কাল-পাত্রের ভেদ, অভেদ ধর্মজাতি,
সব দেশে, সব কালে, ঘরে-ঘরে তিনি মানুষের জ্ঞাতি।…
কবি দেখিয়ে দিলেন- মসজিদের মোল্লা মন্দিরের পুরহিত দুজনেই ভুখা মানুষকে তাড়িয়ে দেয়। অথচ দুজনেই দাবি করে তারা “খোদা/ভগবানের ঘর” পাহারা দিচ্ছে। নজরুল লিখেছেন, “খোদার ঘরে কে কপাট লাগায়, কে দেয় সেখানে তালা ? সব দ্বার খোলা রবে, চালা হাতুড়ি শাবল চালা।” আর প্রথম লাইন ছিল “গাহি সাম্যের গান, মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান”।
কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর চার সন্তানের নামকরণে শুধু স্নেহ নয়, তাঁর সাহিত্যিক মনন, আধ্যাত্মিক ভাবনা এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির চেতনারও প্রতিফলন ঘটেছে। তিনি এমন নাম বেছে নিয়েছিলেন, যেখানে আরবি-ফারসি ও সংস্কৃত দুই ধারার শব্দের অপূর্ব সমন্বয় দেখা যায়।
চার ছেলের নাম ও তার প্রেক্ষাপট সংক্ষেপে : কৃষ্ণ মুহাম্মদ: (জন্মের কিছুদিন পরই মারা যায়) “কৃষ্ণ” হিন্দুধর্মের অন্যতম প্রধান দেবতার নাম। “মুহাম্মদ” ইসলাম ধর্মের মহানবীর নাম। এই দুটি নাম একত্রে রেখে নজরুল বোঝাতে চেয়েছিলেন ধর্ম মানুষের বিভেদের নয়, মিলনের প্রতীক। তাঁর অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক অনন্য প্রকাশ এটি। অরিন্দম খালেদ (বুলবুল) (১৯২৬-১৯৩০)“অরিন্দম” একটি সংস্কৃত শব্দ, অর্থ শত্রুবিজয়ী। “খালেদ” আরবি শব্দ, অর্থ চিরস্থায়ী বা অমর। পরিবারের সবার কাছে তিনি “বুলবুল” নামেই পরিচিত ছিলেন। মাত্র চার বছর বয়সে গুটিবসন্ত-এ তাঁর মৃত্যু নজরুলের জীবনে গভীর শোক নিয়ে আসে। পরে সেই স্মৃতিতে কবি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ বুলবুল-এর নামকরণ করেন।
কাজী সব্যসাচী: “সব্যসাচী” শব্দটি মহাভারত-এ অর্জুন-এর একটি উপাধি; অর্থ যিনি দুই হাতেই সমান দক্ষ। নজরুল আশা করেছিলেন, তাঁর ছেলে বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী হবে। পরবর্তীকালে কাজী সব্যসাচী একজন খ্যাতিমান আবৃত্তিশিল্পী হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। কাজী অনিরুদ্ধ: “অনিরুদ্ধ” সংস্কৃত শব্দ; অর্থ অপ্রতিরোধ্য, যাকে রোধ করা যায় না।হিন্দু পুরাণে অনিরুদ্ধ শ্রীকৃষ্ণ-এর পৌত্র। এই নামেও নজরুল শক্তি, অগ্রযাত্রা ও উদার সাংস্কৃতিক চেতনার প্রকাশ ঘটিয়েছেন।
নজরুলের সন্তানদের নাম আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, তিনি কেবল কবিতায় নয়, নিজের পারিবারিক জীবনেও ধর্মীয় সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। তাঁর কাছে মানুষের পরিচয় ছিল মানবতা; ধর্ম ছিল ভালোবাসা ও সৌন্দর্যের মিলনক্ষেত্র। তাই তাঁর সন্তানদের নাম আজও বাংলা সংস্কৃতিতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য প্রতীক হিসেবে স্মরণ করা হয়। লেখক : সাবেক ব্যাংকার, গবেষক।












