আজ আন্তর্জাতিক ম্যানগ্রোভ বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষণ দিবস
সাকিবুর রহমান বাবলা
প্রকৃতি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণযোগ্য একটি মূল্যবান সম্পদ। এই উপলব্ধিই আন্তর্জাতিক ম্যানগ্রোভ বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষণ দিবসের মূল দর্শনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
নদী, সমুদ্র ও স্থলভাগের মিলনস্থলে গড়ে ওঠা ম্যানগ্রোভ বা সুন্দরবন উপকূলীয় জীবন, জীববৈচিত্র্য ও মানবসভ্যতার সুরক্ষায় প্রাকৃতিক দুর্গ হিসেবে কাজ করে। এই গুরুত্ব বিবেচনা করে প্রতি বছর ২৬ জুলাই পালিত হয় আন্তর্জাতিক ম্যানগ্রোভ বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষণ দিবস। ১৯৯৮ সালে ইকুয়েডরে ম্যানগ্রোভ ধ্বংসের বিরুদ্ধে পরিবেশকর্মী হেইকো মেইনা’র আত্মত্যাগের স্মরণে ইউনেস্কো ২০১৫ সালে দিবসটির স্বীকৃতি দেয়। ২০১৬ সাল থেকে এটি নিয়মিত পালিত হয়ে আসছে। এই দিবসের মূল লক্ষ্য হলো ম্যানগ্রোভের দ্রুত অবক্ষয় সম্পর্কে বিশ্ববাসীকে সচেতন করা এবং সংরক্ষণ কার্যক্রমে সরকার, বিজ্ঞানী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সমন্বিত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।
লবণাক্ত ও কর্দমাক্ত পরিবেশে নিউমাটোফোর বা শ্বাসমূলের মাধ্যমে টিকে থাকা ম্যানগ্রোভ বন প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিরুদ্ধে একটি জীবন্ত প্রতিরক্ষা বর্ম। গবেষণায় দেখা যায়, মাত্র ৫০০ মিটার প্রশস্ত একটি ম্যানগ্রোভ বেল্ট সমুদ্রের ঢেউয়ের শক্তি ৫০ থেকে ৯৯ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দিতে পারে। এছাড়া সিডর, আইলা, আম্পান ও রিমালের মতো প্রলয়ংকরী দুর্যোগে সুন্দরবন উপকূলের প্রধান রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করেছে। জীববৈচিত্র্যের ক্ষেত্রেও এর ভূমিকা অনন্য। অসংখ্য মাছ, চিংড়ি, কাঁকড়া, সরীসৃপ, পাখি ও স্তন্যপায়ী প্রাণীর প্রজনন ও খাদ্যের প্রধান উৎস হওয়ায় একে “সামুদ্রিক জীবনের নার্সারি” বলা হয়। এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় ম্যানগ্রোভ বন সাধারণ স্থলজ বনাঞ্চলের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি কার্বন ধরে রাখতে সক্ষম। এর মাটি ও শিকড়ে সংরক্ষিত এই কার্বনকে “ব্লু কার্বন” বলা হয়, যা বৈশ্বিক উষ্ণায়ন কমাতে সরাসরি ভূমিকা রাখে।
ম্যানগ্রোভ অঞ্চলের টেকসই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার অর্থ শুধু কিছু গাছ বাঁচানো নয়; বরং পুরো জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক জীবনচক্রকে সচল রাখা। এর ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে সুন্দরী, গেওয়া, কেওড়া ও গরানের মতো অনন্য উদ্ভিদ রক্ষা করা, বাঘ, হরিণ, কুমির, ডলফিন ও বিভিন্ন পাখির আবাসস্থল সুরক্ষিত রাখা, চোরা শিকার, অবৈধ সম্পদ আহরণ এবং অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার কঠোরভাবে দমন করা, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় নতুন বনায়ন ও নদী-খালের স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখা এবং কঠোর আইনি বাস্তবায়নের পাশাপাশি স্থানীয় জনগণকে সহ-ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সম্পৃক্ত করা।
পৃথিবীর ১২৩টি ক্রান্তীয় ও উপক্রান্তীয় দেশে বর্তমানে প্রায় ১,৪৭,২৫৬ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে ম্যানগ্রোভ বন বিস্তৃত। এর প্রায় ৪৭ শতাংশই রয়েছে ইন্দোনেশিয়া, ব্রাজিল, নাইজেরিয়া, মেক্সিকো ও অস্ট্রেলিয়ায়। প্রায় ৭০ প্রজাতির প্রকৃত ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদের এই অনন্য বাস্তুতন্ত্রে ৫,৭০০-এর বেশি প্রাণী প্রজাতি সরাসরি নির্ভরশীল। উপকূলীয় অঞ্চলের প্রায় ২৪০ কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকার সঙ্গে এটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বিভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী, প্রতিবছর ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে এটি প্রায় ৬৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সম্পদ রক্ষা করে এবং ১ কোটি ৫০ লাখেরও বেশি মানুষের ঝুঁকি কমাতে ভূমিকা রাখে। একই সঙ্গে বিশ্বজুড়ে ৪১ লাখেরও বেশি ক্ষুদ্র মৎস্যজীবীর জীবিকা ও খাদ্যনিরাপত্তার সঙ্গে ম্যানগ্রোভ প্রত্যক্ষভাবে সম্পর্কিত। তবে জলবায়ু পরিবর্তন, চিংড়ি চাষের অপরিকল্পিত সম্প্রসারণ এবং অতিরিক্ত সম্পদ আহরণের কারণে বিশ্বের প্রায় অর্ধেক ম্যানগ্রোভ অঞ্চল বর্তমানে চরম ঝুঁকির মুখে রয়েছে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সংবিধানের ১৮(ক) অনুচ্ছেদ, বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২, পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ এবং জীববৈচিত্র্য আইন, ২০১৭-এর আওতায় সুন্দরবন সংরক্ষণ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। পাশাপাশি সুন্দরবনের চারপাশের ১০ কিলোমিটার এলাকাকে পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করা হয়েছে এবং সহ-ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠনের মাধ্যমে এর ব্যবস্থাপনা জোরদার করা হয়েছে। বিশ্বের বৃহত্তম অবিভক্ত ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা নদীর বদ্বীপ অঞ্চলে প্রায় ১০,২৭৭ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত, যার প্রায় ৬,০১৭ বর্গকিলোমিটার বাংলাদেশে এবং ৪,২৬০ বর্গকিলোমিটার ভারতে অবস্থিত। ভারতের সুন্দরবন জাতীয় উদ্যান ১৯৮৭ সালে এবং বাংলাদেশের সুন্দরবন পূর্ব, পশ্চিম ও দক্ষিণ বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য ১৯৯৭ সালে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যের মর্যাদা লাভ করে। এটি বিশ্বের একমাত্র ম্যানগ্রোভ বন যেখানে রয়েল বেঙ্গল টাইগার বসবাস করে। পাশাপাশি এটি চিত্রা হরিণ, গঙ্গা ও ইরাবতী ডলফিন, লবণাক্ত পানির কুমিরসহ তিন শতাধিক প্রজাতির পাখি ও ১২০টির বেশি প্রজাতির মাছের গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল ও প্রজননকেন্দ্র।
ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলের ধারাবাহিক ধ্বংসের পেছনে কাজ করছে বেশ কিছু মারাত্মক বাণিজ্যিক ও মানবসৃষ্ট হুমকি। উপকূলীয় অঞ্চলে চিংড়ি ও মাছের ঘের স্থাপনের ফলে জোয়ার-ভাটার স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হয়ে লবণাক্ততার ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। শিল্পকারখানা, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বর্জ্য এবং প্লাস্টিক দূষণ পানি ও বায়ুকে দূষিত করছে। বড় নৌযানের তেল দূষণ এবং অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন শ্বাসমূলের মারাত্মক ক্ষতি করছে। উজানে বাঁধ নির্মাণের ফলে মিষ্টি পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় সুন্দরী গাছে ‘টপ ডাইং’ রোগ দেখা দিচ্ছে। এর পাশাপাশি সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও ঘন ঘন ঘূর্ণিঝড় এই বাস্তুতন্ত্রকে আরও বিপন্ন করে তুলছে। বিভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী, গত চার দশকে পৃথিবীর প্রায় অর্ধেক ম্যানগ্রোভ বন বিলুপ্ত হয়েছে এবং এটি এখনও অন্যান্য বনাঞ্চলের তুলনায় তিন থেকে পাঁচ গুণ দ্রুত হারে হারিয়ে যাচ্ছে।
এই সংকট উত্তরণে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ইউনেস্কো, ইউএনইপি, আইইউসিএন ও গ্লোবাল ম্যানগ্রোভ অ্যালায়েন্সের পাশাপাশি আধুনিক স্যাটেলাইট প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে বন পর্যবেক্ষণ ও পুনরুদ্ধার কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। তবে কেবল প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। এর ধারাবাহিকতা রক্ষায় উপকূলীয় অঞ্চলে অপরিকল্পিত চিংড়ি চাষ নিয়ন্ত্রণ, জলাধারগুলোর স্বাভাবিক জোয়ার-ভাটা নিশ্চিত করা, সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকায় শিল্পায়ন ও দূষণ রোধে কঠোর নজরদারি এবং আইনের কার্যকর প্রয়োগ, স্থানীয় জনগণের জন্য বিকল্প জীবিকার সুযোগ সৃষ্টি এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় ব্লু কার্বনভিত্তিক গবেষণা ও সংরক্ষণ কার্যক্রমকে আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
ম্যানগ্রোভ হারালে শুধু একটি বন হারায় না; হারিয়ে যায় উপকূলের নিরাপত্তা, জীববৈচিত্র্যের আশ্রয়, খাদ্যনিরাপত্তার ভিত্তি এবং জলবায়ুর ভারসাম্য। তাই ম্যানগ্রোভ সংরক্ষণ কেবল পরিবেশ রক্ষার কর্মসূচি নয়; এটি উপকূলীয় নিরাপত্তা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, খাদ্যনিরাপত্তা, জলবায়ু সহনশীলতা এবং টেকসই উন্নয়নের পূর্বশর্ত। কার্যকর আইন প্রয়োগ, বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা, স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে এই অমূল্য বাস্তুতন্ত্র রক্ষা করা এখন সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক দায়িত্ব।











