সম্পাদকীয়/প্রসঙ্গ: জাটকা সংরক্ষণই হোক আগামীর রূপালি বিপ্লবের সোপান
‘জাটকা ধরা থামাই যদি, ইলিশে ভরবে সাগর-নদী’Ñএই স্লোগানকে সামনে রেখে আজ ৭ এপ্রিল থেকে শুরু হচ্ছে ‘জাটকা সংরক্ষণ সপ্তাহ-২০২৬’। বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনীতি, কৃষ্টি ও রসনাবিলাসে ইলিশের স্থান অনন্য। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের এই উদ্যোগ কেবল একটি সরকারি আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং আমাদের জাতীয় সম্পদ রক্ষার এক জীবনমুখী আন্দোলন।
ইলিশ কেবল মাছ নয়, এটি বিশ্বদরবারে বাংলাদেশের এক অনন্য ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য। তথ্যমতে, দেশের মোট মৎস্য উৎপাদনের প্রায় ১২ শতাংশ আসে ইলিশ থেকে এবং প্রায় ৫০ লাখ মানুষের জীবিকা এর ওপর নির্ভরশীল। বিগত এক দশকে সরকারি নানা পদক্ষেপে ইলিশের উৎপাদন দ্বিগুণ হয়ে ৫ লাখ মেট্রিক টন ছাড়িয়েছে। তবে এই সাফল্যের ধারা অব্যাহত রাখতে জাটকা রক্ষার কোনো বিকল্প নেই।
মৎস্য বিজ্ঞানীদের মতে, মাত্র ২০ শতাংশ জাটকা রক্ষা করা গেলে ইলিশের উৎপাদন বছরে আরও প্রায় দেড় লাখ মেট্রিক টন বাড়ানো সম্ভব। কিন্তু বাস্তবে আমরা দেখি, নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল ও বেহুন্দি জালের অবাধ ব্যবহার জাটকা নিধনের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেবল নদীতে অভিযান চালিয়ে এই নিধনযজ্ঞ বন্ধ করা কঠিন; বরং এসব জালের কারখানা ও বিক্রয়কেন্দ্রে কঠোর নজরদারি এবং আইনি পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের দাবি।
জাটকা ধরা নিষিদ্ধ থাকাকালীন জেলেদের জীবনযাত্রায় স্থবিরতা নেমে আসে। সরকার ভিজিএফ কর্মসূচির মাধ্যমে চাল সহায়তা দিলেও অনেক ক্ষেত্রে তা পর্যাপ্ত নয় বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে সাতক্ষীরাসহ উপকূলীয় অঞ্চলের জেলেদের ঋণের কিস্তি ও সংসার চালানোর চাপ তাদের নিষিদ্ধ সময়েও নদীতে নামতে প্ররোচিত করে। তাই কেবল দ- বা জেল-জরিমানা নয়, জেলেদের জন্য পর্যাপ্ত বিকল্প কর্মসংস্থান ও সহায়তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সহায়তা বিতরণে স্বচ্ছতা বজায় রাখা গেলে জেলেদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ আরও বাড়বে।
নদীর নাব্য সংকট, শিল্পবর্জ্য এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ইলিশের বিচরণক্ষেত্র আজ হুমকির মুখে। এর মধ্যে জাটকা নিধন অব্যাহত থাকলে এই রূপালি শস্য অচিরেই দুষ্প্রাপ্য হয়ে উঠবে। এক্ষেত্রে কেবল সরকার বা মৎস্য অধিদপ্তরের ওপর দায় না চাপিয়ে সাধারণ ক্রেতা হিসেবে আমাদেরও সচেতন হতে হবে। ২৫ সেন্টিমিটারের ছোট ইলিশ কেনা থেকে বিরত থাকা এবং জাটকা নিধনের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।
আগামী ১৩ এপ্রিল পর্যন্ত পালিত হতে যাওয়া এই সংরক্ষণ সপ্তাহ সফল হোক। রূপালি ইলিশের প্রাচুর্য বজায় রাখতে জাটকা রক্ষা করা আমাদের অস্তিত্বের লড়াই। আজকের জাটকাকে বড় হতে দিলে তা আগামীকাল আমাদের জাতীয় অর্থনীতিকে আরও সমৃদ্ধ করবে। আসুন, জাতীয় স্বার্থে আমরা প্রতিজ্ঞা করিÑজাটকা ধরব না, জাটকা কিনব না এবং জাটকা খাব না। দেশের রূপালি সম্পদ রক্ষা পাক আমাদের সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায়।









