বুধবার, ১ জুলাই ২০২৬, ১৬ আষাঢ় ১৪৩৩
বুধবার, ১ জুলাই ২০২৬, ১৬ আষাঢ় ১৪৩৩

সুফিয়া কামাল: মানবতা, সৌন্দর্য ও নারী জাগরণের চিরন্তন কণ্ঠস্বর,,

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শনিবার, ২০ জুন, ২০২৬, ১২:২২ পূর্বাহ্ণ
সুফিয়া কামাল: মানবতা, সৌন্দর্য ও নারী জাগরণের চিরন্তন কণ্ঠস্বর,,

শেখ সিদ্দিকুর রহমান
আজ ২০ জুন, বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির এক প্রথিতযশা কবি, মানবতাবাদী, সমাজসংস্কারক এবং নারী জাগরণের অগ্রদূত সুফিয়া কামালের জন্মদিন। ১৯১১ সালের এই দিনে তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের বরিশাল জেলার শায়েস্তাবাদে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা সৈয়দ আব্দুল বারী এবং মাতা সাবেরা খাতুন। রক্ষণশীল পারিবারিক পরিবেশে বেড়ে ওঠায় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ তাঁর খুব সীমিত ছিল, কিন্তু অদম্য ইচ্ছাশক্তি, মেধা ও আত্মপ্রচেষ্টার মাধ্যমে তিনি নিজেকে গড়ে তুলেছিলেন বাংলা সাহিত্যের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হিসেবে।
শৈশব থেকেই সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি তাঁর গভীর আকর্ষণ ছিল। তিনি নারী জাগরণের পথিকৃৎ বেগম রোকেয়ার সংস্পর্শে এসে নারীর শিক্ষা, আত্মমর্যাদা ও সমাজ পরিবর্তনের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হন। তাঁর সাহিত্যজীবনের শুরু অল্প বয়সেই। তাঁর প্রথম প্রকাশিত কবিতা ছিল ‘বাসন্তী’। পরবর্তীতে ১৯৩৮ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘সাঁঝের মায়া’, যা বাংলা সাহিত্যে তাঁর একটি শক্তিশালী আবির্ভাবের ঘোষণা দেয়।
‘সাঁঝের মায়া’ কাব্যগ্রন্থের মুখবন্ধ লেখেন বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তিনি সুফিয়া কামালের কবিতার অনুভব ও সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে লিখেছিলেন-“সাঁঝের মায়ার কবিতাগুলি সাঁঝের মায়ার মতোই যেমন বিষাদঘন, তেমনি রঙিন—গোধূলির রঙের মতো রঙিন। এ সন্ধ্যা কৃষ্ণা-তিথির সন্ধ্যা নয়, শুক্লা চতুর্দশীর সন্ধ্যা। প্রতিভার পূর্ণচন্দ্র আবির্ভাবের জন্য বুঝি এমনি বেদনাপুঞ্জিত অন্ধকারের, বিষাদের প্রয়োজন আছে।
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও সুফিয়া কামালের কবিতা পড়ে তাঁর প্রতিভার প্রশংসা করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ তাঁর লেখনীতে সুফিয়া কামালের কবিত্বশক্তি, ভাষার সৌন্দর্য ও অনুভূতির আন্তরিকতার স্বীকৃতি দেন। রবীন্দ্রনাথের মতো বিশ্বকবির এই স্বীকৃতি সুফিয়া কামালের সাহিত্যজীবনে ছিল এক অনন্য সম্মান এবং অনুপ্রেরণার উৎস।
সুফিয়া কামালের কবিতার সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তাঁর সহজ-সরল ভাষা, গভীর মানবিকতা এবং হৃদয়স্পর্শী অনুভূতি। তিনি জটিল শব্দচয়নের মাধ্যমে নয়, মানুষের হৃদয়ের কথা মানুষের ভাষায় প্রকাশ করে পাঠকের ভালোবাসা অর্জন করেছেন। তাঁর কবিতায় বাংলার প্রকৃতির রূপ, নদী, পাখি, ফুল, ঋতুচক্র যেমন জীবন্ত হয়ে উঠেছে, তেমনি উঠে এসেছে মানুষের দুঃখ, বেদনা, ভালোবাসা, সংগ্রাম এবং স্বপ্ন।
তিনি শুধু কবিতার জগতে সীমাবদ্ধ ছিলেন না; সমাজ ও রাষ্ট্রের নানা সংকটময় সময়ে তিনি ছিলেন একজন সাহসী কণ্ঠস্বর। ভাষা আন্দোলন, স্বাধিকার আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীন বাংলাদেশে নারী অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে তাঁর অবদান ইতিহাসে চিরস্মরণীয়। দীর্ঘদিন তিনি বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং নারীর অধিকার, শিক্ষা ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় নিরলস সংগ্রাম করেছেন।
সাহিত্যে তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘সাঁঝের মায়া’, ‘মায়া কাজল’, ‘মন ও জীবন’, ‘উদাত্ত পৃথিবী’ এবং স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থ ‘একাত্তরের ডায়েরি’। সাহিত্য ও সমাজসেবায় অসামান্য অবদানের জন্য তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, একুশে পদক এবং স্বাধীনতা পুরস্কারসহ অসংখ্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সম্মাননায় ভূষিত হন।
১৯৯৯ সালের ২০ নভেম্বর এই মহীয়সী নারী পৃথিবী থেকে বিদায় নেন। কিন্তু তাঁর মৃত্যু তাঁর আদর্শের মৃত্যু নয়। তাঁর কবিতা, মানবপ্রেম, অসাম্প্রদায়িক চেতনা এবং নারী মুক্তির সংগ্রাম আজও আমাদের পথ দেখায়।
সুফিয়া কামাল ছিলেন এমন এক আলোকবর্তিকা, যিনি কলমকে ব্যবহার করেছেন সৌন্দর্যের জন্য, মানুষের মুক্তির জন্য এবং সমাজের অন্ধকার দূর করার জন্য। বাংলা ভাষা ও সাহিত্য যতদিন বেঁচে থাকবে, ততদিন তাঁর কবিতা ও তাঁর আদর্শ নতুন প্রজন্মের হৃদয়ে প্রেরণার আলো জ্বালিয়ে রাখবে।
“সাঝের মায়া”
অনন্ত সূর্যাস্ত-অন্তে আজিকার সূর্যাস্তের কালে
সুন্দর দক্ষিণ হস্তে পশ্চিমের দিকপ্রান্ত-ভালে
দক্ষিণা দানিয়া গেল, বিচিত্র রঙের তুলি তারথ
বুঝি আজি দিনশেষে নিঃশেষে সে করিয়া উজাড়
দানের আনন্দ গেল শেষ করি মহাসমারোহে।
সুমধুর মোহে
ধীরে ধীরে ধীরে
প্রদীপ্ত ভাস্কর এসে বেলাশেষে দিবসের তীরে
ডুবিল যে শান্ত মহিমায়,
তাহারি সে অন্তরাগে বসন্তের সন্ধ্যাকাশ ছায়।
ওগো ক্লান্ত দিবাকর! তব অন্ত-উৎসবের রাগে
হেথা মর্তে বনানীর পল্লবে পল্লবে দোলা লাগে।
শেষ রশ্মিকরে তব বিদায়ের ব্যথিত চুম্বন
পাঠায়েছ। তরুশিরে বিচিত্র বর্ণের আলিম্পন
করিয়াছে উন্মন অধীর
মৌনা, বাক্যহীনা, মূক বক্ষখানি স্তব্ধ বিটপীর।
তারো চেয়ে বিড়ম্বিতা হেথা এক বন্দিনীর আঁখি
উদাস সন্ধ্যায় আজি অস্তাচল-পথপরি রাখি
ফিরাইয়া আনিতে না পারে
দূর হতে শুধু বারে বারে
একান্ত এ মিনতি জানায়:
কখনও ডাকিয়ো তারে তোমার এ শেষের সভায়!
সাঙ্গ হলে সব কর্ম, কোলাহল হলে অবসান,
দীপ-নাহি-জ্বালা গৃহে এমনি সন্ধ্যায় যেন তোমার
আহ্বান

Ads small one

রোল নম্বরের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এক অদ্ভুত মানুষের গল্প

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ১ জুলাই, ২০২৬, ১০:২১ অপরাহ্ণ
রোল নম্বরের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এক অদ্ভুত মানুষের গল্প

আখলাকুর রহমান

খুব মধ্যরাতে যখন চারপাশ নিঝুম হয়ে আসে, তখন কখনো কি ভেবে দেখেছেন—পড়ালেখার মতো এত কঠিন এবং নিরস একটা বিষয়ে এত তীব্র রোমাঞ্চ কীভাবে লুকিয়ে থাকে? একটা ছেলে কিংবা একটা মেয়ে সারা বছর পড়াশোনা করল, দিনরাত এক করে পরীক্ষার খাতায় কী যেন সব লিখল, তারপর একটা খামবন্দি ফলাফলের জন্য দরদর করে ঘামতে লাগল। এই যে পুরো তীব্র উত্তেজনার একটা খেলা, এই খেলার মূল চাবিকাঠি কিন্তু লুকিয়ে আছে মাত্র গুটিকয়েক সংখ্যার ভেতর।

 

আমরা যাকে খুব সহজ ভাষায় বলি—রোল নম্বর। একটা খাতার ওপর কোনো নাম থাকে না, কোনো ধর্ম থাকে না, কোনো গোত্র থাকে না। অথচ আজ থেকে একশ বছর আগে এই উপমহাদেশে দৃশ্যটা এমন ছিল না। খাতার ওপর মস্ত বড় বড় অক্ষরে লেখা থাকত পরীক্ষার্থীর নাম। আর সেই নামের আড়ালে চলত এক অদ্ভুত অন্ধকারের খেলা। সেই অন্ধকার তাড়িয়ে প্রতিটি খাতার ওপর সংখ্যার এক জাদুকরী আলো যিনি জ্বেলেছিলেন, তিনি সাতক্ষীরার নলতা গ্রামের এক অতি সাধারণ অথচ অতি অসাধারণ মানুষ—খান বাহাদুর আহছানউল্লা।

১৮৭৩ সালের এক কনকনে শীতের রাতে যখন তিনি এই পৃথিবীতে এলেন, নলতা গ্রামের মেঠোপথ তখনো জানত না যে এই ছেলেটি একদিন পুরো ভারতবর্ষের শিক্ষা ব্যবস্থার খোলনলচে বদলে দেবে। তিনি বড় হলেন, পড়াশোনা করলেন এবং একসময় ব্রিটিশ ভারতের শিক্ষা বিভাগে প্রথম মুসলিম ‘ইন্ডিয়ান এডুকেশন সার্ভিস’ অফিসার হিসেবে যোগ দিলেন। চাকরি পাওয়ার পর তিনি একটা অদ্ভুত জিনিস লক্ষ্য করলেন।

 

পরীক্ষার খাতা যখন পরীক্ষকদের টেবিলে যায়, তখন খাতার ওপর জ্বলজ্বল করতে থাকা নামগুলো দেখে পরীক্ষকদের মনস্তত্ত্বে এক প্রচ্ছন্ন পক্ষপাতিত্ব কাজ করে। কার নাম ‘রাম’, কার নাম ‘রহিম’, কে কোলকাতার বাবুদের ঘরের সন্তান আর কে সাতক্ষীরার কাদা-জল মাখা মফস্বলের ছেলে—তা খাতার নাম দেখেই আলাদা করা যেত। ফলে দেখা যেত, মফস্বলের এক প্রান্তিক কিশোর অসামান্য লিখেও কেবল নামের কারণে কম নম্বর পাচ্ছে, আর শহরের কোনো প্রভাবশালী ঘরের সন্তান সাধারণ লিখেও পার পেয়ে যাচ্ছে। মেধার এই অসম লড়াই খান বাহাদুর আহছানউল্লাকে ভীষণভাবে পীড়িত করত। তিনি ভাবলেন, এই প্রাতিষ্ঠানিক অন্যায়ের একটা শেষ হওয়া দরকার।

 

ঈশ্বরের তৈরি মানুষের মধ্যে জাত-পাত থাকতে পারে, কিন্তু মানুষের তৈরি খাতার ভেতর মেধার কোনো জাত থাকতে পারে না। তিনি ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের কাছে এক অদ্ভুত এবং যুগান্তকারী প্রস্তাব পাঠালেন—পরীক্ষার খাতা থেকে পরীক্ষার্থীর নাম পুরোপুরি মুছে দিতে হবে। সেখানে থাকবে কেবল একটা গোপন ‘সংকেত নম্বর’ বা ‘রোল নম্বর’। পরীক্ষক খাতা কাটার সময় জানবেনই না তিনি কার ভাগ্য নির্ধারণ করছেন, তাঁর সামনে থাকবে শুধু মেধার নির্যাস। তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজ এবং খোদ ব্রিটিশ সরকারের বড় বড় কর্তারা এই প্রস্তাবে হেসেই খুন। তারা ভাবলেন, নাম ছাড়া আবার পরীক্ষা হয় নাকি! কিন্তু এই নরম স্বভাবের মানুষটি ভেতরে ভেতরে ছিলেন প্রচ- জেদি। তিনি একা হাতে সমস্ত আমলাতান্ত্রিক জটিলতা আর তীব্র বিরোধিতার দেয়াল ভেঙে চুরমার করে দিলেন। অবশেষে ভারতবর্ষের শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রথম চালু হলো পরীক্ষার খাতায় রোল নম্বর লেখার নিয়ম।

এই একটিমাত্র নিয়মের কারণে রাতারাতি বদলে গেল কোটি কোটি শিক্ষার্থীর ভাগ্য। নামহীন সেই খাতাগুলোর ভেতর দিয়ে মফস্বলের অবহেলিত ছেলেমেয়েরা তাদের যোগ্যতার প্রমাণ দিয়ে মেধার শীর্ষে উঠে আসতে লাগল। আজ আমরা যখন যেকোনো পরীক্ষার খাতায় নিজেদের রোল নম্বরটি লিখি, আমরা কেউ হয়তো মনে রাখি না যে এই ছয়-সাতটা সংখ্যার আড়ালে সাতক্ষীরার এক চিরস্মরণীয় মানুষের কতটা জেদ, কতটা লড়াই আর কতটা ভালোবাসা লুকিয়ে ছিল। ১৯৬৫ সালের ৯ই ফেব্রুয়ারি তিনি যখন নলতার মাটিতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন, তখন হয়তো চারপাশের প্রকৃতিও নীরবে বলেছিল, এই মানুষটি চিরকাল বেঁচে থাকবেন প্রতিটি পরীক্ষার্থীর কলমের ডগায়, প্রতিটি নামহীন খাতার পাতায়। লেখক : উদ্যোক্তা ও স্বপ্নদ্রষ্টা : আসিফা

সাতক্ষীরার জলবায়ু সংকট: উপকূলের আর্তনাদ ও অস্তিত্বের লড়াই

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ১ জুলাই, ২০২৬, ১০:১৪ অপরাহ্ণ
সাতক্ষীরার জলবায়ু সংকট: উপকূলের আর্তনাদ ও অস্তিত্বের লড়াই

শেখ সিদ্দিকুর রহমান

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের প্রান্তিক জেলা সাতক্ষীরা আজ বিশ্ব জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে নির্মম ও প্রত্যক্ষ শিকার। সমুদ্র, প্রমত্তা নদী আর সুন্দরবন ঘেরা এই জেলা এখন লবণাক্ততা, সুপেয় পানির তীব্র হাহাকার আর একের পর এক ধেয়ে আসা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সাথে প্রতিদিন অস্তিত্ব রক্ষার যুদ্ধ করছে। এক সময়ের শস্যশ্যামল এই জনপদে এখন শুধুই লবণের গ্রাস আর ভাঙনের শব্দ।

 

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বিশ্বজুড়ে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ক্রমাগত বাড়ছে, যার অবধারিত প্রভাব পড়ছে আমাদের এই উপকূলে। এর সাথে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে যুক্ত হয়েছে ফারাক্কা বাঁধের কারণে উজান থেকে আসা মিঠা পানির প্রবাহের অভাব। ফলে জোয়ারের সময় সমুদ্রের নোনা পানি অনায়াসে ঢুকে পড়ছে সাতক্ষীরার বুক চিরে বয়ে যাওয়া নদী ও খালগুলোতে। বিশেষ করে কালিগঞ্জ ও শ্যামনগর উপজেলার বিস্তীর্ণ অঞ্চলের মাটির লবণাক্ততা বর্তমানে ২৫ ডেসিসিমেন্স/মিটার পর্যন্ত গিয়ে ঠেকেছে।

 

কৃষি বিজ্ঞানীদের মতে, সাধারণ ধান যেখানে ৪ ডেসিসিমেন্সের বেশি লবণ সহ্য করতে পারে না, সেখানে এই মাত্রা কতটা ভয়াবহ তা সহজেই অনুমেয়। কালিগঞ্জের শ্রীকলা গ্রামের ভুক্তভোগী কৃষক শেখ মনিরুল ইসলাম ক্ষোভ আর হতাশা প্রকাশ করে জানান যে, আগে বর্ষাকালের টানা বৃষ্টিতে মাটির উপরিভাগের লবণ ধুয়ে-মুছে নদী ও সাগরে নেমে যেত, কিন্তু এখন জলবায়ুর খামখেয়ালিপনায় বৃষ্টিপাত হয়ে পড়েছে অত্যন্ত অনিয়মিত। ফলে বছরের পর বছর লবণ জমেই থাকছে এবং কৃষিজমি চিরতরে অনাবাদী হয়ে পড়ছে।

 

একই সুর শোনা গেল শ্যামনগর উপজেলার যতীন্দ্রনগর গ্রামের কৃষক শেখ মাহফুজুর রহমান মুকুলের কণ্ঠেও, তিনি জানান যে ফসলি জমির বুক ফেটে যেমন নোনা চৌচির হয়ে যাচ্ছে, তেমনি সুপেয় পানির শেষ উৎস পুকুরগুলোর মাছ মরে ভেসে উঠছে এবং পুরো এলাকার স্যানিটেশন ও গৃহস্থালি ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। এমনকি এই তীব্র লবণাক্ততার বিষাক্ত প্রভাব থেকে রেহাই পাচ্ছে না সাতক্ষীরার ঐতিহ্যবাহী ফল চাষও বিপর্যস্থ, পুরাতন সাতক্ষীরার আম চাষী আবু জাফর দীর্ঘশ্বাস ফেলে জানান যে, মাটিতে নোনা পানির অবাদ অনুপ্রবেশ ও ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আমূল বদলে যাওয়ার কারণে আমগাছের শিকড় পচে যাচ্ছে, মুকুল আসার আগেই পাতা ঝরে যাচ্ছে এবং ফলন দিন দিন অর্ধেকে নেমে আসছে।

এই বিপর্যয় কেবল সনাতন কৃষি বা ফল চাষেই সীমাবদ্ধ নেই, সাতক্ষীরার প্রধান অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি চিংড়ি শিল্পকেও তা মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলেছে। সাতক্ষীরা সদরের জোড়দিয়া গ্রামের ঘের ব্যবসায়ী ও চিংড়ি চাষী শেখ সাইফুর রহমান ও শেখ হাফিজুল ইসলাম বলেন, লবণাক্ততা বাড়লে চিংড়ি ভালো হয় এই ধারণাটি এখন সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণিত হচ্ছে। অতিরিক্ত এবং অনিয়মিত লবণাক্ততার কারণে ঘেরে নানা অজানা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঘটছে এবং অতিবৃষ্টি বা আকস্মিক জলোচ্ছ্বাসে ঘের ভেসে গিয়ে কোটি কোটি টাকার লোকসান গুনতে হচ্ছে।

 

প্রকৃতপক্ষে, সাতক্ষীরা এখন বৈশ্বিক দুর্যোগের অন্যতম প্রধান হটস্পট। সিডর, আইলা, আম্পান, ইয়াস কিংবা রেমালের মতো একেকটি প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় উপকূলের প্রতিরক্ষা বাঁধগুলোকে ল-ভ- করে দিয়ে গেছে। বেড়িবাঁধ ভেঙে নোনা পানি ঢুকে গ্রামের পর গ্রাম মাসের পর মাস তলিয়ে থাকে। এর প্রধান কারণ বেতনা, মরিচ্চাপ আর ঐতিহাসিক প্রাণসায়র খাল আজ পলি পড়ে প্রায় মৃত। নদীগুলো নাব্যতা হারানোয় নিষ্কাশন পথ বন্ধ হয়ে গেছে, যার ফলে শুধু প্রত্যন্ত গ্রাম নয়, খোদ সাতক্ষীরা শহরও সামান্য বৃষ্টিতেই ডুবে যাচ্ছে। টানা এক সপ্তাহের মাঝারি বৃষ্টিপাতেই শহরের ড্রেনেজ ব্যবস্থার অকার্যকারিতা প্রকাশ পায় এবং আমন বীজতলা, আউশ ধান ও সবজি ক্ষেত মাইলের পর মাইল পানির নিচে তলিয়ে থাকে।

 

এই বহুমুখী সংকটের মাঝে সবচেয়ে মর্মান্তিক রূপ নিয়েছে সুপেয় পানির জন্য হাহাকার। বৈজ্ঞানিক গবেষণার ইনভার্স ডিসটেন্স ওয়েইটিং (আইডিডব্লিউ) বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সাতক্ষীরার পশ্চিম ও দক্ষিণ অঞ্চলে পিএইচ, ইসি, টিডিএস এবং লবণাক্ততার পরিমাণ সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। ভূগর্ভস্থ পানিতে অ্যামোনিয়ার মাত্রা গ্রহণযোগ্য সীমার চেয়ে অনেক বেশি, অথচ জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় ক্লোরাইডের ভারসাম্য উধাও।

 

উপকূলীয় জেলাগুলোর প্রায় ৭৪ শতাংশ পরিবারে খাবার পানি সংগ্রহের মূল দায়িত্ব পালন করতে হয় নারী ও কিশোরীদের। মাইলের পর মাইল হেঁটে, ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে এক কলসি মিষ্টি পানি জোগাড় করতে গিয়ে নারীদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য ভেঙে পড়ছে, ব্যাহত হচ্ছে শিশুদের শিক্ষা। পানি ও যথাযথ স্যানিটেশনের অভাবে শিশুদের মাঝে ডায়রিয়া ও চর্মরোগসহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগ মহামারী আকারে ছড়াচ্ছে। জীবিকার তাগিদে এবং বাঁচার তাগিদে মানুষ বাধ্য হয়ে নিজের ভিটেমাটি ছেড়ে শহরের বস্তিগুলোতে আশ্রয় নিচ্ছে, যা নগরের ওপর বাড়তি সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করছে।

এই মহাসংকট থেকে উত্তরণের উপায় নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে লড়াই করছেন জেলা নাগরিক কমিটি স্থানীয় জনমানুষ ও বিশেষজ্ঞরা। সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছর এবং বিগত সময়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সাতক্ষীরার পোল্ডারগুলোর বেড়িবাঁধ সংস্কার ও নদী খননে শত শত কোটি টাকা বরাদ্দ দিলেও মাঠপর্যায়ে তার সুফল নিয়ে তীব্র অসন্তোষ রয়েছে। সাতক্ষীরা জেলা পানি কমিটির নেতা মফিজুল ইসলাম এ বিষয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ড কাগজে-কলমে কোটি কোটি টাকার বরাদ্দ দেখালেও বাস্তবে ভাঙনপ্রবণ বেড়িবাঁধগুলোর কোনো স্থায়ী ও বৈজ্ঞানিক সমাধান হচ্ছে না। ঠিকাদারি ও আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতার কারণে বর্ষা আসার আগে নামমাত্র কাজ হয়, যা প্রথম জোয়ারের চাপেই ভেসে যায়।

 

টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণে স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা না গেলে এই বরাদ্দ কেবলই অপচয়। বিশিষ্ট উন্নয়নকর্মী স্বদেশের নির্বাহী পরিচালক মাধব দত্ত বলেন, সনাতন পদ্ধতিতে ড্রেজার দিয়ে নদী খনন করে পলি সরানো সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। নদী বাঁচাতে এবং জলাবদ্ধতা দূর করতে হলে জোয়ার-ভাটার প্রাকৃতিক শক্তিকে কাজে লাগিয়ে অববাহিকা ব্যবস্থাপনা বা টিআরএম (টাইডাল রিভার ম্যানেজমেন্ট) পদ্ধতি অবিলম্বে চালু করতে হবে। একই সাথে তিনি টেকসই অর্থায়নের মাধ্যমে উপকূলীয় ব্লক ও সিসি ব্লকের স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের দাবি জানান।

 

পরিবেশবিদ অ্যাডভোকেট মুনীরউদ্দীন বলেন, পরিবেশগত বিপর্যয় ঠেকাতে সুন্দরবনের প্রাকৃতিক ঢালকে রক্ষা করতে হবে এবং উপকূলজুড়ে ব্যাপক হারে ম্যানগ্রোভ বনায়ন গড়ে তুলতে হবে। এর পাশাপাশি, কৃষিকে বাঁচাতে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) উদ্ভাবিত ব্রি ধান-৬৭, ৯২, ৯৩ এবং সর্বোচ্চ ১০ ডেসিসিমেন্স লবণ সহনশীল ব্রি ধান-৯৯ এর ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘটাতে হবে। শুধু সনাতন কৃষির ওপর নির্ভর না করে উপকূলের মানুষকে বিকল্প জীবিকা হিসেবে হাঁস-মুরগি পালন, কাঁকড়া চাষ ও ক্ষুদ্র কুটির শিল্পের দিকে ধাবিত করার সরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন।

সাতক্ষীরার মানুষ আজ আর কেবল প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মের সাথে লড়ছে না, তারা লড়ছে মানবসৃষ্ট বৈশ্বিক জলবায়ু অপরাধের বিরুদ্ধে টিকে থাকার এক অসম লড়াইয়ে। সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও স্থানীয় প্রবীণ নেতা গাজী নজরুল ইসলাম দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার আলোকে স্পষ্টভাবে বলেছেন, এই অঞ্চলের মানুষকে বাঁচাতে হলে দীর্ঘমেয়াদী ও আন্তর্জাতিক মানের টেকসই বেড়িবাঁধের কোনো বিকল্প নেই। এটি কেবল সাতক্ষীরার একার সমস্যা নয়, এটি সমগ্র বাংলাদেশের অস্তিত্বের প্রশ্ন।

 

সরকার, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক গবেষক এবং স্থানীয় প্রশাসন যদি এখনই সমন্বিত এবং শতভাগ স্বচ্ছতার সাথে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করে, তবে জলবায়ুর এই করাল গ্রাসে একদিন হয়তো বাংলাদেশের মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাবে এই ঐতিহ্যবাহী উপকূলীয় জনপদ। আর সেই দায় এড়াতে পারবে না ইতিহাস।

লেখক: অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার

 

সাতক্ষীরায় এসপির সাথে ক্রিকেট আম্পায়ার্স কমিটির সৌজন্য সাক্ষাৎ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ১ জুলাই, ২০২৬, ৭:১৮ অপরাহ্ণ
সাতক্ষীরায় এসপির সাথে ক্রিকেট আম্পায়ার্স কমিটির সৌজন্য সাক্ষাৎ

নিজস্ব প্রতিনিধি: বাংলাদেশ ক্রিকেট আম্পায়ার্স এন্ড স্কোরার্স এসোসিয়েশন সাতক্ষীরা জেলা শাখার সভাপতি ও জেলা পুলিশ সুপার আবু সালেহ মো. আশরাফুল আলমের সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন কমিটির সদস্যবৃন্দ। বুধবার (১ জুলাই) দুপুরে সাতক্ষীরা জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে উপস্থিত হয়ে এই সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন।

এসময় উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ক্রিকেট আম্পায়ার্স এন্ড স্কোরার্স এসোসিয়েশন সাতক্ষীরা জেলা শাখার সহ-সভাপতি শেখ রবিউল ইসলাম শিবলু, সাধারণ সম্পাদক মো.লুৎফর রহমান সৈকত, যুগ্ম সম্পাদক জি এম সাইফুল ইসলাম বাপ্পি, কোষাধ্যক্ষ শেখ আখেরুজ্জামান তাপস, সাংগঠনিক সম্পাদক মো. ফজলুল করিম, কার্যকরী সদস্য অহিদুজ্জামান শামিম, শেখ দারুজ্জামান রুবেল, মো. মহসিন আলী, এস এম হাবিবুল হাসান।