গুলিতে জেলের মৃত্যু, রেঞ্জ কার্যালয়সহ স্টেশন অফিসে হামলা: ২৪ ঘন্টা পরেও কোন ঘটনায় মামলা হয়নি
শ্যামনগর প্রতিনিধি: কাঁকড়া শিকার করতে সুন্দরবনে যেয়ে বনরক্ষীদের গুলিতে নিহত শ্যামনগর উপজেলার ৯নং সোরা গ্রামের বনজীবী আমিনুর রহমানের লাশের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। মঙ্গলবার সকালে সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালের মর্গে ময়না তদন্তের পর বিকাল চারটার দিকে তার মৃতদেহ উপজেলার ৯নং সোরা গ্রামের বাড়িতে পৌছায়। তবে আমিনুরের মৃত্যু ও সাতক্ষীরা রেঞ্জ কার্যালয়ে স্থানীয় গ্রামবাসীর হামলা, ভাংচুরসহ লুটপাটের ঘটনায় গত ২৪ ঘন্টাতেও কোন মামলা হয়নি। এর মধ্যে মঙ্গলবার সকালে বন ও পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলামসহ স্থানীয় বিএনপি ও জামায়াতের নেতৃবৃন্দ নিহত বনজীবীর পরিবারের সাথে সাক্ষাৎ করেন।
এদিকে সুন্দরবনে যাওয়া জেলেদের উপর বনরক্ষীদের গুলি বর্ষণ এবং সাতক্ষীরা রেঞ্জ কার্যালয়সহ বুড়িগোয়াালীনি স্টেশন অফিস ভাংচুর ও লুটপাটের ঘটনায় গুরুত্বপুর্ন তথ্য মিলেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিও চিত্র ঘেটে এবং স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায় সাতক্ষীরা রেঞ্জ কার্যালয়ে হামলার আগে স্থানীয় গ্রামবাসীদের উস্কানি দেয়া হয়। গাবুরা ইউনিয়ন যুববিভাগের সভাপতি ইয়াছিন আরাফাত ফেসবুক লাইভে এসে সবাইকে বনবিভাগের রেঞ্জ অফিসে জড়ো হওয়ার আহবান জানান। প্রায় সাত মিনিটের বক্তব্যে তিনি ঘোষনা দেন “আমিনুর হত্যার বিচার না পাওয়া পর্যন্ত আমরা বনবিভাগের অফিসের সামনে লাশ নিয়ে অবস্থান করবো’।
স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীদের মাধ্যমে জানা যায় বেলা ১১টার দিকে ইয়াছিন আরাফাতের আহবানের পর থেকে লোকজন গাবুরার ডুমুরিয়া, দৃষ্টিনন্দন ও চাঁদনীমুখা পয়েন্টে জড়ো হতে শুরু করে। বিকাল সাড়ে তিনটার দিকে ১০/১২টি ট্রলারযোগে প্রায় পাঁচ শতাধিক গ্রামবাসী আমিনুরের মৃতদেহ নিয়ে গাবুরা হতে নদী পার হয়ে নীলডুমুর খেয়াঘাটে পৌছায়। এসময় দাতিনাখালী এবং বুড়িগোয়ালীনি এলাকা হতে আগত আরও তিন/চারশ মানুষ ট্রলারে আসা গ্রামবাসীদের সাথে একত্রিত হয়ে রেঞ্জ অফিসের দিকে এগিয়ে যায়। একপর্যায়ে রেঞ্জ অফিসের সামনের রাস্তায় লাশ রেখে তারা সেখানকার সীমানা প্রাচীর ভাংচুর ও সেখানে স্থাপনকৃত জিআই পাইপগুলো খুলে নিয়ে রেঞ্জ অফিসের মধ্যে ঢুকে পড়ে।
নীলডুমুর গ্রামের আব্দুল মালেক ও ফয়সাল হোসেনসহ স্থানীয়রা জানায় রেঞ্জ অফিসে ঢুকে হামলাকারীরা জিআই পাইপ দিয়ে সিসি ক্যামেরাগুলো ভেঙে দেয়। এসময় তারা রেঞ্জ অফিসের নিচতলার ব্যালকনি ছাড়াও রেঞ্জ কার্যালয়ের গ্রিল, জানালা, গেট ভেঙে ফেলে। এসময় হামলাকারীরা নানা ধরনের শ্লোগান দেয়।
স্থানীয়দের ভাষ্য এবং বিভিন্ন ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষনে দেখা যায় শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত হামলায় নেতৃত্বে ছিলেন জামায়াত ও বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীরা। গাবুরা ইউনিয়ন যুববিভাগের আহবায়ক ইয়াছিন আরাফাত ছাড়াও গাবুরা ইউয়িন জামাতের ৯নং সোরা এলাকার দায়িত্বশীল আবিয়ার রহমান, গাবুরা ইউপির ৯নং ওয়ার্ড সদস্য আ’লীগ নেতা মঞ্জু গাজী, জামায়াত কর্মী রবিউল ইসলাম জোয়ারদার, ইউনিয়ন যুবদল নেতা রিপন সরাসরি হামলায় অংশ নেয়। এসময় হামলাকারীদের সাথে উপস্থিত ছিলেন গাবুরা ইউনিয়ন জামায়াতের আমির দিদারুল আলম, গাবুরা ইউনিয়ন বিএনপি সভাপতি ও স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান মাসুদুল আলমসহ তাদের কর্মী সমর্থকরা।
সাতক্ষীরা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক মশিউর রহমান জানান, হামলাকারীরা রেঞ্জ কার্যালয়ে প্রবেশ করেই ব্যাপক ভাংচুর চালায়। কলাপসিপল গেট ভেঙে ভিতরে ঢুকে হাতে থাকা জিআই পাইপ দিয়ে এলোপাতাড়ি পিটিয়ে তারা সামনে যা কিছু পড়ে সব ভেঙে ফেলে। এসময় হামলার সাথে জড়িতরা রান্নাঘরে ঢুকে প্লেট পিরিচ গামলাসহ সর্বস্ব ভেঙে দিয়ে চাল, ডালসহ রান্নার বেশকিছু উপকরণ লুট করে নিয়ে যায়। ফ্রিজ ও অফিসের এসি পর্যন্ত ভেঙে গুড়িয়ে দেয় তারা। এসময় রেঞ্জ কার্যালয়ের সিঁড়ির পাশে ছোপ ছোপ রক্ত পড়ে থাকতে দেখা যায়।
বনবিভাগের এ কর্মকর্তা আরও জানান বনরক্ষীর গুলিতে জেলের মৃত্যুর ঘটনা খুলনা রেঞ্জে ঘটেছে। অথচ হামলা, ভাংচুরসহ লুটপাট করা হলো সাতক্ষীরা রেঞ্জ কার্যালয় ওপ পাশের স্টেশন অফিসে। ঘটনার পিছনে অনেক বড় ষড়যন্ত্র রয়েছে- দাবি করে তিনি আরও জানান হামলাকারীরা রেঞ্জ কার্যালয়ে ঢুকে বনবিভাগের যাকে সামনে পেয়েছি তাকেই পিটিয়েছে। আহত তার পাঁচ স্ট্যাফের মধ্যে মেজা উদ্দীনের দুই হাত ভেঙে গেছে। এছাড়া মুমূর্ষু অবস্থায় থাকা ফয়জুর রহমানের মাথার হাঁড় ভেঙে ভিতরের দিকে ঢুকে যাওয়ায় তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য খুলনা পাঠানো হয়েছে। রেঞ্জ কার্যালয়সহ স্টেশন অফিসে হামলার ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে মামলা করার জন্য তাদের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
যুববিভাগের সভাপতি ইয়াছিন আরাফাতের বনরক্ষীরা দীর্ঘদিন ধরে বনজীবীদের উপর নিপীড়ন চালাচ্ছে। যে কারনে তার প্রতিবেশী গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করায় তিনি আবেগ সামলাতে না পেরে ফেসবুকে লাইভ করেছিলেন। ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকলেও তিনি হামরায় জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেন।
মাসুদুল আলম জানান, উত্তেজিত লোকজনকে ফিরিয়ে আনতে তিনি ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন। নিজের কর্মী সমর্থকদের নিয়ে তিনি হামলাকারীদের নিবৃত্ত করার চেষ্টা চালান।
শ্যামনগর থানার অফিসার ইনচার্জ খালেদুর রহমান জানান, বনবিভাগ মামলা করবে বলে জানালেও মঙ্গলবার বিকাল পর্যন্ত কোন অভিযোগ দেয়নি। এছাড়া জেলে নিহতের ঘটনায় তার পরিবার খুলনা জেলার কয়রা থানায় মামলা করতে গেছে।
এদিকে বনরক্ষীর গুলিতে নিহত বনজীবী আমিনুর রহমানের পরিবারের পাশে থাকার কথা জানিয়েছে বন ও পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম। মঙ্গলবার সকাল ১০টার দিকে তিনি সাতক্ষীরা জেলা বিএনপির যুগ্ম-আহবায়ক ড. মো. মনিরুজ্জামানের মাধ্যমে ভিডিও কলে আমিনুরের স্ত্রী ছকিনা খাতুনের সাথে কথা বলেন তিনি।
এসময় প্রতিমন্ত্রী নিহত বনজীবীর পরিবারকে সবধরনের সহায়তার আশ্বাষ দেন। একইসাথে যথাযথ তদন্তপুর্বক দোষী বনকর্মীর বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমুলক মাস্তি নিশ্চিতের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। নিহতের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়ে ড. মো. মনিরুজ্জামান স্ত্রীসহ পাঁচ সন্তান রেখে যাওয়া বনজীবী আমিনুরের পরিবারের জন্য বাসযোগ্য একটি বসতঘর নির্মান করে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। এসময় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সাবেক ডাকসু নেতা অধ্যাপক আবু সাঈদ, মাসুদুল আলম, সোলায়মান কবির, শেখ লিয়াকত আলী, গোলাম আলমগীর, শহীদুজ্জামান, রফিকুল ইসলাম, আজিজুল সরদার প্রমুখ।
একইভাবে উপজেলা জামায়াতের আমির মাওলানা আব্দুর রহমানের নেতৃত্বে জামায়াতের একটি প্রতিনিধি দল নিহত আমিনুরের পরিবারের পাশে দাড়ানোর ঘোষনা দিয়েছেন। বিএনপি নেতৃবৃন্দ ঘটনাস্থল ত্যাগ করার পরপরই ১৫/১৬ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল নিহত আমিনুরের বাড়িতে পৌছাায়। এসময় পরিবারের একমাত্র কর্মক্ষম ব্যক্তিকে হারানো অসহায় মানুষগুলোর জন্য নগদ সহায়তা প্রদান করেন। এসময় অন্যান্যের মধ্যে উপজেলা জামায়াতের মিডিয়া বিভাগের প্রধান মাওলানা আব্দুল হামিদ, পৌর জামায়াতের আমির হারুন-অর রশিদ সাচ্চুসহ বিভিন্ন পর্যায়ের দায়িত্বশীলগন উপস্থিত ছিলেন।












