সম্পাদকীয়: প্রসঙ্গ: সাতক্ষীরায় ক্যানসার চিকিৎসার শূন্যতা
উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরায় মরণব্যাধি ক্যানসারের প্রকোপ আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। স্থানীয় সচেতন মহল ও উন্নয়নকর্মীদের ধারণা, জেলাটিতে বর্তমানে ক্যানসার আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা আট হাজারেরও বেশি। জাতীয় গড়ের চেয়ে এই সংখ্যা কয়েক গুণ বেশি হওয়ার পেছনে দায়ী করা হচ্ছে এই অঞ্চলের ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত লবণাক্ততা, অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস ও পরিবেশ দূষণকে। ক্যানসার যেখানে এই অঞ্চলে এক নীরব মহামারি হিসেবে জেঁকে বসছে, সেখানে স্থানীয় সরকারি স্বাস্থ্যসেবার চিত্রটি চরম হতাশা ও উদ্বেগের।
দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো, সাতক্ষীরায় এত বড় একটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং ২৫০ শয্যার সদর হাসপাতাল থাকা সত্ত্বেও ক্যানসার রোগীদের জন্য কোনো বিশেষায়িত চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই। হাসপাতাল দুটির কোনোটিতেই আলাদা কোনো অনকোলজি (ক্যান্সার) বিভাগ, দক্ষ জনবল কিংবা কেমোথেরাপি ও রেডিওথেরাপির ন্যূনতম সুযোগ নেই। প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্তকরণের আধুনিক ডায়াগনস্টিক সুবিধাও এখানে অনুপস্থিত। ফলে রোগাক্রান্ত হওয়ার পর হতদরিদ্র ও মধ্যবিত্ত রোগীদের বাধ্য হয়ে ছুটতে হচ্ছে ঢাকা, খুলনা কিংবা প্রতিবেশী দেশ ভারতে।
ক্যানসার শুধু একটি মরণব্যাধিই নয়, এটি একটি পরিবারকে নিঃস্ব করে দেওয়ার মতো অর্থনৈতিক যুদ্ধও বটে। দীর্ঘমেয়াদি এই চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে গিয়ে জমিজমা ও শেষ সম্বল বিক্রি করে নিঃস্ব হয়ে পড়ছে শত শত পরিবার। টাকার অভাবে অনেকের চিকিৎসা মাঝপথেই বন্ধ হয়ে যায়, যা প্রকারান্তরে রোগীকে অবধারিত মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়। একটি কল্যাণকামী রাষ্ট্রে নাগরিকেরা চিকিৎসার খরচ জোগাতে গিয়ে এভাবে দেউলিয়া হয়ে পড়বেন, তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
সরকারি এই উদাসীনতা ও শূন্যতার মাঝেও আশার আলো দেখাচ্ছেন খুলনা মেডিকেল কলেজের অনকোলজি বিভাগের চিকিৎসক ডা. মনোয়ার হোসেন। সরকারি দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি ব্যক্তিগত উদ্যোগে সাতক্ষীরার বিনেরপোতা এলাকায় একটি ক্যানসার হাসপাতাল নির্মাণের কাজ শুরু করেছেন। একজন চিকিৎসকের এই মানবিক উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্র ও স্বাস্থ্য বিভাগের যে দায়িত্বটি সবার আগে পালন করার কথা ছিল, তা কেন একজন চিকিৎসকের ব্যক্তিগত বদান্যতার ওপর নির্ভর করবে?
সাতক্ষীরা জেলা নাগরিক কমিটি দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় সরকারি হাসপাতালে অন্তত ১০ শয্যার একটি প্রাথমিক ক্যানসার ইউনিট চালু এবং বিনামূল্যে ওষুধ সরবরাহের দাবি জানিয়ে আসছে। সীমান্তবর্তী ও প্রান্তিক এই জেলার মানুষের এই দাবি অত্যন্ত যৌক্তিক ও সময়ের দাবি।
আমরা মনে করি, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের আর কালক্ষেপণ করার সুযোগ নেই। অবিলম্বে সাতক্ষীরা জেলায় আক্রান্তদের প্রকৃত সংখ্যা নিরূপণে একটি সঠিক ‘ক্যানসার রেজিস্ট্রি’ বা ডাটাবেজ তৈরি করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে জরুরি ভিত্তিতে আধুনিক ক্যানসার ইউনিট ও রোগ নির্ণয় কেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দোরগোড়ায় ক্যানসার চিকিৎসার মতো মৌলিক সেবা পৌঁছে দেওয়া রাষ্ট্রের অন্যতম জরুরি দায়িত্ব। সাতক্ষীরার হাজারো ক্যানসার রোগীর জীবন ও তাঁদের পরিবারের অর্থনৈতিক সুরক্ষায় সরকার দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেবেÑএটাই আমাদের প্রত্যাশা।











