সম্পাদকীয়: প্রসঙ্গ: আদি যমুনার মরণদশা ও আমাদের উদাসীনতা
সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার ঐতিহাসিক ‘আদি যমুনা’ নদীর বর্তমান দশা পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের প্রতি আমাদের চরম উদাসীনতার এক জীবন্ত দলিল। যে নদী একসময় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের এই জনপদের প্রাণ ছিল, যার তীর ঘেঁষে গড়ে উঠেছিল ইতিহাস ও ঐতিহ্যের নানা স্মারক, তা আজ ময়লা-আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। একটি জীবন্ত নদীকে কীভাবে পরিকল্পিতভাবে মেরে ফেলা যায়, আদি যমুনার বর্তমান অবস্থা তারই এক উদ্বেগজনক উদাহরণ।
পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে পানি উন্নয়ন বোর্ডের উদ্যোগে নদীটির একটি বড় অংশ খনন করা হলেও মাত্র দুই বছরের মাথায় তা আবার ভরাট হয়ে গেছে। এর মূল কারণ, স্থানীয় প্রশাসন ও পৌরসভার যথাযথ নজরদারির অভাব এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার চরম বিপর্যয়। রাতের আঁধারে বাজারের প্লাস্টিক, ককশিট, ওয়ানটাইম কাপ ও ক্ষতিকর কেমিক্যালযুক্ত তরল বর্জ্য অবলীলায় ফেলা হচ্ছে নদীতে। ফলে নদীর জলজ জীববৈচিত্র্য আজ বিলুপ্তির পথে, আর নদীটি রূপ নিয়েছে মশা ও রোগজীবাণু তৈরির কারখানায়। এর ওপর যুক্ত হয়েছে অবৈধ দখলদারদের থাবা।
আদি যমুনা কেবল একটি ঐতিহাসিক নদীই নয়, এটি শ্যামনগর ও কালীগঞ্জ উপজেলার প্রায় আটটি ইউনিয়নের পানি নিষ্কাশনের একমাত্র প্রধান মাধ্যম। স্থানীয় পরিবেশকর্মী ও সচেতন মহলের আশঙ্কা অত্যন্ত যৌক্তিক—আসন্ন বর্ষা মৌসুমের আগে যদি এই বর্জ্যের স্তূপ অপসারণ করা না হয়, তবে শ্যামনগরের অন্তত ৪ থেকে ৫টি ইউনিয়ন ভয়াবহ ও দীর্ঘমেয়াদি জলাবদ্ধতার শিকার হবে। একটি পৌরসভার বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতার দায় কেন সাধারণ মানুষকে জলাবদ্ধতার দুর্ভোগ দিয়ে মেটাতে হবে, সেই প্রশ্ন এড়ানো যায় না।
বিগত দিনে নদী খননের নামে সরকারি অর্থের অপচয় বা লোকদেখানো কাজের যে অভিযোগ উঠেছে, তাও খতিয়ে দেখা দরকার। নদী সুরক্ষায় কেবল কোটি কোটি টাকার প্রকল্প নিলেই হবে না, সেই নদী যাতে পুনরায় বর্জ্যের ভাগাড়ে পরিণত না হয়, তার স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করতে হবে।
আমরা মনে করি, শ্যামনগরকে আসন্ন বর্ষার জলাবদ্ধতা থেকে বাঁচাতে এবং এই ঐতিহাসিক নদীর অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে অবিলম্বে দুটি পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। প্রথমত, ক্র্যাশ প্রোগ্রামের মাধ্যমে নদী থেকে সব অপচনশীল বর্জ্য দ্রুত অপসারণ করে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, পৌরসভা ও বাজার কমিটির সমন্বয়ে একটি আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে, যাতে কেউ নদীতে ময়লা ফেলার সাহস না পায়। নদীকে ডাস্টবিন বানানোর এই আত্মঘাতী প্রবণতা এখনই বন্ধ করতে হবে। প্রশাসন ও স্থানীয় সচেতন নাগরিক যৌথভাবে এগিয়ে না এলে আদি যমুনাকে বাঁচানো অসম্ভব।









