বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬, ৩ আষাঢ় ১৪৩৩
বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬, ৩ আষাঢ় ১৪৩৩

বাংলা নববর্ষ : আনন্দ ও ঐতিহাসিক পাঠ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ১৩ এপ্রিল, ২০২৬, ১২:৪৭ পূর্বাহ্ণ
বাংলা নববর্ষ : আনন্দ ও ঐতিহাসিক পাঠ

মনিরুজ্জামান মুন্না
পহেলা বৈশাখ বাংলার বাঙালির
কীর্তির অহংকার জাগায় আগামীর
গ্লানি ঝেড়ে শুচি হওয়ার দিন আনে সোনালীর।
‘বিশ্বকবির সোনারবাংলা, নজরুলেরই বাংলাদেশ, জীবনানন্দের রূপসী বাংলা রূপের যে আর নাইকো শেষ’। এখানে কোন কিছু সাজিয়ে নিতে হয় না, আপনা আপনিই সব সেজে ওঠে। মালা-চন্দন ছাড়াই প্রাকৃতিক নিয়মের ঐশ্বর্যে ঋতুতে ঋতুতে হাজির হয় এক একটি সাজবেশ। সুন্দর প্রকৃতির অফুরন্ত নিয়ামকভা-ার সৌন্দর্যের অবিরাম অনিবার্যতা নিশ্চিত করে চলেছে। যার সাথে মিশে থাকে আধ্যাত্মবাদী মরমী শোভার স্বর্গীয় আবেশও। বৈশাখের প্রথম দিনে অতীতকে ছেড়ে বৈচিত্র্যময় এ সৌন্দর্যকল্পে প্রভাবিত হয়ে শ্যামলী মায়ের কাছে বাঙালি একটি আনন্দময় সুন্দর বছর শুরু ও পার করার আর্জি জানায়। আগমনের বরণীয় স্বাগতমের আনুষ্ঠানিকতায়। আর এ উপলক্ষে দিগন্তজুড়ে লৌকিক আচার ও লোকজ ক্রিয়া-কলার জমজমাট আয়োজন চলে। জীবনানন্দ দাশের কাব্যকথার পরাবাস্তবতায় এমন অনেক ভাবনার খোরাক মেলে। যেমনÑ
‘সমস্ত দিনের শেষে শিশিরের শব্দের মতন
সন্ধ্যা আসে; ডানার রৌদ্রের গন্ধ মুছে ফেলে চিল;
পৃথিবীর সব রঙ নিভে গেলে পা-ুলিপি করে আয়োজন
তখন গল্পের তরে জোনাকির রঙে ঝিলমিল।’
‘এসে হে বৈশাখ…’ এ স্বাগতমী আহবার ও প্রার্থনাগীতির প্রতিপাদ্যে নতুন বছরে, নতুন প্রভাতে, নতুন আলোয়, নতুন প্রত্যয়ে, নতুন উদ্যমে, নতুন পথে অভিযাত্রা আমাদের। ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’র মতো অপবাদ সাথে নিয়ে স্বল্পউন্নত থেকে উন্নয়নশীলে, স্বল্পআয় থেকে মধ্যম আয়ে এবং সর্বোপরি প্রযুক্তির সাথে তাল মিলিয়ে ডিজিটাল বাংলাদেশ গ্লোবাল বিশ্বায়নে অংশিদার হয়েছে। সব মিলিয়ে বিশ্বদরবারে আজ বাংলাদেশ একটি স্বতন্ত্র অনুকরণীয় দৃষ্টান্তে উপস্থাপিত। বিশেষ করে ভাষার জন্য রক্তক্ষয়ী আন্দোলন। স্বাধীনতার জন্য দীর্ঘ মেয়াদী সংগ্রাম, নির্যাতন, আত্মাহুতি ও ত্যাগের লোমহর্ষক ঘটনার নজির একটি বিরল ইতিহাস। তাছাড়া বাংলার চিরায়াত-লোকায়ত শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, কৃষ্টি, সভ্যতা, ভাষা, শিক্ষা ইত্যাদি জীবন-জীবিকামুখী ও প্রকৃতি নির্ভর হওয়ায় তা অত্যন্ত বাস্তব আর গণমুখী। যা রক্ষা ও প্রতিপালনের দীক্ষায় নিবিড় ঘনিষ্ঠতাবদ্ধে সমৃদ্ধ ও ঋদ্ধ আমাদের চারপাশ। বৃহত্তর বাংলার (পূর্ব+পশ্চিম) অনেক গৌরবময় কৃষ্টির আদি পীঠস্থান এই বাংলাদেশ। তাই কি আতিথেয়তায়, কি ভাষায়, কি সংস্কৃতির মননী প্রগতিশীলতায় এর আত্মীকরণের সক্ষমতা অসীম। যে ক্ষমতা তার গৌরবকে ক্ষুন্ন করে না বরং মহিমান্বিত করে। তবে এই ক্ষমতার অপব্যবহার করে আমরা যেন আমাদের মূল সনাতনী বা আদিমতার সত্ত্বীয় সত্তার প্রাধান্য ও মূল্যের অগ্রাধিকারকে ভুলে না যাই।
ঘটনার ও পরিবেশ-পরিস্থিতির আকস্মিকতায় আমাদের সবচেয়ে মহোত্তম অসম্প্রদায়িক অর্জনগুলো ছড়িয়ে আছে পর পর কয়েক মাস জুড়ে। ফাল্গুনে কৃষ্ণচূড়ার রক্তিম রঙ আর পীচঢালা রাজপথে টগবগে জীবনের খুন মাখিয়ে এসেছিলো ভাষার স্বাধীনতা। চৈত্রে মায়ের চোখের তপ্ত আগুনে নৃশংস প্রতিহিংসাপরায়ন পাক বা পশ্চিমা ঔপনিবেশিক শক্তিকে পুড়িয়ে এসেছিলো স্বতন্ত্র রাষ্ট্র গঠনের স্বীকৃতি। বৈশাখে অন্তরের মলিনতা দূর করে উচ্ছ্বল আনন্দ আমেজে এসেছিলো নববর্ষ বরণের অমিয় বারতা। পৃথিবীর প্রত্যেকটি দেশ, জাতি ও গোষ্ঠীর আদিসত্তার পরিচয় বহনকারী নিজস্ব সংস্কৃতিগত লোকউৎসব রয়েছে। সংস্কৃতি ও উৎসবপ্রবণ বাঙালিরও রয়েছে তেমন কিছু নিজস্ব সাংস্কৃতিক লোকউৎসব। পহেলা বৈশাখে ‘নববর্ষ বরণ’ তার মধ্যে অন্যতম। যা সর্বোচ্চ সার্বজনীনতায় চিরায়ত সংস্কার, বিশ্বাস ও আচার-আচারণগত বৈশিষ্ট্যকে সনাক্ত করে। নির্দেশ করে ঐতিহ্য, ইতিহাস, কৃষ্টি ও সংস্কৃতির স্বকীয় মাধূর্য্যকে।
গুরুত্বের বিবেচনায় আমাদের ভাষা দিবস আজ আর্ন্তজাতিক মাতৃভাষা দিবসে পরিগণিত হয়েছে। আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধও আর্ন্তজাতিকভাবে একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল মর্মস্পর্শী ও হৃদয়বিদায়ক ঘটনাবহুল ইতিহাসে অভিষিক্ত। আমাদের পহেলা বৈশাখের বর্ণাঢ্য মঙ্গল শোভাযাত্রার বিচিত্র ঐতিহ্যের সমন্বিত ও নান্দনিক উপস্থাপনে গোটা বিশ্ব অভিভূত, বিমোহিত ও মুগ্ধ হয়ে এটিকেও আর্ন্তভূক্ত করে নিয়েছে বিরল বিস্ময়ী সংস্কৃতিক ঐতিহ্যে (এষড়নধষ রহঃধহমরনষব ড়ভ পঁষঃঁৎধষ যবৎরঃধমব নু টঘঊঝঈঙ রহ ২০১৬)।
সৌন্দর্যম-িত ও উৎবসময় বাংলা নববর্ষ বরণের এ দিনের সকল কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিকতায় থাকে নিখাদ বিনোদন, অবাধ আনন্দ, উদার মানসিকতার আত্মিক ঘনিষ্ঠতার ছোঁয়া। আনন্দ আর বর্ণিল বরণে বৈশাখের এ দিনের পরতে পরতে মিশে থাকে রঙের ছড়াছড়ি, উৎসবের মাতামাতি। রঙের ক্ষেত্রে যেমন আবেদন আছে লাল-সাদার তেমনি আছে বাসন্তী, গেরুয়া, সবুজেরও। বেশভূষায় যার উজ্জ্বলতা উৎসবের আনন্দকে আরও বেশি জ্বলজ্বলে করে তোলে এবং তা মন ও বয়সে চিরতারুণ্যে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। পোশাকে-খাবারে রঙ ও বাঙালিয়ানার ছাপ ছাড়াও তার দেখা মেলে বিভিন্ন রকমের বিকিকিনির অনুষঙ্গে। যেমন- টেপাপুতুল, নকশা করা শঙ্খ, কলস, কুলা, সোলার মালা, খেলনা, কাঁসা-পিতল-মাটির গয়না, শীতল পটি, হাতপাখা, বাঁশ ও বেতের পণ্য। যার সাথে মিশে থাকে খ্যাত-অখ্যাত কারু-চারু ও মৃৎ শিল্পীর নিপুণ হাতের ছোঁয়া। লোকজ ঐতিহ্যে এসব উপকরণ আমদের শেকড়ের সন্ধান দেয়। তাই নানান আঙ্গিক অঙ্গণে রঙরশ্মির ছিঁটে-ছঁটার স্পর্শের লেপনে ব্যস্ত সবে অপরূপ রূপ রূপায়নে। আগমনী বর্তার আহব্বানে জানিয়ে যায় পরস্পরে-
‘নতুন দিনের আমন্ত্রণে সূর্য গেলো ডুবে
আকাশে চাঁদ এসে জ্যোৎস্না জাগাবে
রৌদ্রদহন স্বপ্নবহন দ্যুতির বিচ্ছুরণ
উৎসবাদী রঙ মাখবার এলো মাহেন্দ্রক্ষণ।’
বাংলার প্রকৃতির মত বাঙালির স্বভাব-সুলভ বৈশিষ্ট্য বোধ হয় বিশ্বের অপর সকল জাতির থেকে একটু আলাদা। বিশ্বমানবতার মন্ত্রণাশিবির থেকে বাংলাদেশ অপেক্ষাকৃত অনুন্নত রাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত হলেও এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যরে স্বাভাবিক বিন্যাস সকল দীনতা, বিপন্নতা কাটিয়ে সর্বত্র প্রসন্নের সুবাতাস প্রবাহিত রাখে। প্রকৃতি-মাটি আর মানুষের সাথে ভারসাম্যপূর্ণ আবহাওয়ার চারিত্রিক সাদৃশ্যের নিগূঢ়তা বিশ্বসভায় সামিল করায় এক বিস্ময়ী আবহের অনন্য মাত্রায়। আর তাই তাকে যথার্থরূপে জানতে বুঝতে ও অনুভব করতে হলে আমাদের ফিরে-ফিরে আসতে হয় রাবীন্দ্রিক মনদেবতায়, নজরুলের সাম্যবাদীতায়, জীবনানন্দের রূপসী বাংলায়, জসীমউদ্দীনের পল্লী¬চেতনায় কিংবা সুফিয়া কামালের জীবন গাঁথায়।
অনন্ত মহাকাল বয়ে চলে আদিকাল হতে বর্তমানকালে। এই অনাদিকালকেও মানুষ খ-িত না করে পুনরায় কোন আরম্ভস্থল আবিষ্কারের পক্ষপাতী। হয়তোবা সে কারণেই সৃষ্টি হয়েছে বৎসরের। যা বিশেষ নিয়মে, বিশেষ সংখ্যক দিন-ক্ষণ নিয়ে আরম্ভ-প্রান্ত দ্বারা বেষ্টিত। ঘুরে-ঘুরে তার এ আসা-যাওয়া বা শুরু-শেষ হওয়ার যৌক্তিক বিশ্লে¬ষণ বিশেষ-বিশেষ দেশ-কাল ও জনগোষ্ঠীর দ্বারা সৃষ্ট হওয়ায় স্থান-কাল-পাত্রভেদে তারতম্য পরিলক্ষিত হয়। সে কারণে পৃথিবীর সকল দেশেই নিজস্ব নিয়মে অব্দ বা বর্ষ গণনার কোন না কোন রীতি বা প্রক্রিয়া প্রচলিত। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সে বর্ষ শুরু-শেষ এবং গণনার নেপথ্যে কিছু না কিছু পটভূমি থাকে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। বাংলাদেশের নিজস্ব অব্দ হলো ‘বঙ্গাব্দ’ বা ‘বাংলা সন’। প্রাচীনকালে আমাদের দেশে বর্ষ আরম্ভ হতো ‘অগ্রহায়ণ’ মাসে। তখন অগ্রাহায়ণ মাসের নাম ছিলো ‘মার্গশীর্ষ’ মাস। অপেক্ষাকৃত অজ্ঞ-অসচেতন বাঙালি জনসাধারণ তখনও চন্দ্র-সূর্যের গতি-প্রকৃতি দেখে বর্ষ গণনা করতে শেখেনি। ফলে নিছক বাহ্যিক প্রকৃতির স্বভাব, বৈশিষ্ট্য ও লক্ষণ দেখে তারা বর্ষ গণনা করতো। অগ্র অর্থ ‘শ্রেষ্ঠ’ আর হায়ন অর্থ ‘ব্রীহি’ বা ‘ধান’। সুতরাং এমনই একটি ব্যাখ্যা বিশ্লে¬ষণের ওপর ভর করে ধান জন্মের শীর্ষ সময় অগ্রহায়ণকে নববর্ষ হিসেবে মনোনীত করে নিয়েছিলো। তাছাড়া তখন তাদের কাছে রাজস্ব আদায় ও ঋণ পরিশোধের জন্য এই সময়টিই ছিলো মোক্ষম ও যথার্থ। প্রকৃতপক্ষে এক ফসলী কৃষি প্রধান এ অঞ্চলের কৃষকেরা তখন ধানের বড় ফলনটি এই সময়ে ঘরে তুলতো। সে কারণে বছরের অন্যান্য সময়ের তুলনায় তাদের মনটাও বেশ ফুরফুরে থাকতো। সে ফুরফুরে মনে তারা যেন বলে উঠতো-
‘প্রকৃতি আজ পাগলপারা নাচে দিশেহারা
জোরছে বাজাও ঢাক ঢোল বীণ একতারা
সজীব প্রাণে বিজলী জ্বালে মেঘ মেঘালী হাওয়া
প্রীতির দাওয়ায় বটের ছায়ায় পান্তাভাত খাওয়া।’
যুগের যান্ত্রিক কর্ম উন্মাদনায় সদা তৎপর থেকে অন্যান্য জাতি যখন চাহিদা-যোগান আর ভোগের আকর্ষণে অভিলাষের দৌরাত্মে লাগামহীন ঘোড়ার মত ছোটাছুটি করে, তৃণমুল বাঙালি তখন অল্পতে তুষ্ট থেকে ন্যূনতম চাহিদাকে সামলে নিয়ে নিঃসর্গের মুখোমুখি বসে। ক্ষণিকের জন্য হলেও বিধিবদ্ধ কাজ ভুলে সকল দুশ্চিন্তাকে ঝেড়ে ফেলে। ঘাসের গালিচায় বসে দিগন্তমোড়া বিন্তীর্ণ নীলাকাশের সৌন্দর্যসুধার আরামটুকু অন্তরে ভরে নিয়ে অনাবিল প্রশান্তি অনুভব করে। শুধু প্রকৃতির বিন্যাসী বৈচিত্রের অপরূপতার উপভোগ্যে নয়, শরীর মনের এমন প্রশান্তির খোরাক যোগাতে প্রতিনিয়ত গ্রাম-বাংলার ঘরে-ঘরে বর্ষে-বর্ষে, ঋতুতে-ঋতুতে কিংবা বিভিন্ন লোকায়ত পার্বণে নানান উৎসবের আয়োজন চলে। যদিও এ বাঙালি গোষ্ঠীর কারও-কারও জীবনে চরম আর্থিক দৈন্য আছে। আছে প্রাত্যহিক প্রয়োজনের অপ্রতুলতা, ক্ষুধা, অতৃপ্তি, বঞ্চনা-প্রবঞ্চনা আর স্বপ্নভঙ্গের নির্মম হাহাকার। তবুও সকল হীনতার ঘাত-প্রতিঘাত উপেক্ষা করে বিনোদনের সে সব অতীত ঐতিহ্যবহ পর্ব-পার্বণী উৎসবকে অবলীলায় লালন-পালন করে চলে। ভালোবাসার গভীরতার আত্মিক সত্তায় কিছুতেই সেগুলো ম্লান হতে পারে না। আর পারেনা বলেই হয়তো কাঁধ হতে সকল জোয়াল নামিয়ে, যুগযন্ত্রণার বেড়ি ভেঙ্গে প্রতিবেশী আত্মীয়-অনাত্মীয়কে ডেকে নিয়ে পরস্পরে আপন-আপন অঙ্গণে উৎসবের আয়োজন করে। সেদিন যেন সকল সঞ্চয় ঝেড়ে, সংশয় ভূলে আপনাকে আরও ফতুর করে দিতে ব্যগ্র হয়। আর এই ব্যগ্রতার ভেতর দিয়ে স্নাত হতে চায় মননের আনন্দলোকের ঝর্ণায়।
কতকগুলি বিশেষ উপলক্ষ্যের অবলম্বনে প্রান্তিক বাংলার আমজনতায় আমরা ঐসব বর্ণিল উৎসবের সন্ধান পাই। যার মধ্যে পহেলা বৈশাখ একটি অতি তাৎপর্যপূর্ণ ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির গুরুত্ববহ আয়োজন, যেখানে সকল জাত-পাত, মত-পথ, পেশা ও ধর্মালম্বীর মেলবন্ধন ঘটে। এ উৎসবের সাথে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সমর্থন ও সম্পৃক্ততা থাকে বলেই তা সকল প্রতিবন্ধকতা, সমালোচনার বাঁধা উৎরিয়ে উত্তীর্ণ হয় জাতীয় উৎসবের মত রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক মর্যাদায়। তাই গোটা বিশ্ব বিশেষত দুই বাংলার জনতার সংযোগী প্রভাবও এর মাঝে সমভাবেই বর্তিত হয়। মননের গহীনে আনন্দ আবেশে উচ্ছল শিহরণে ব্যক্ত হয়-
‘বৈশাখে সবই জাগে বাঙালি সাজে
সেই স্মৃতি কত মধুর স্বপ্ন হয়ে বাজে
রঙ্গরসের সঙ্গে মেশে মধুময় প্রকৃতি
ঢঙ্গি-ভঙ্গির মাধুর্যতায় কোমল কলাবতী।’
হিন্দু সৌর পঞ্জিকা বা সনাতনি পঞ্জিকা অনুসারে বাংলা বারো মাসের বিভিন্ন পার্বণ অনেক আগে থেকেই পালিত হতো। যার শুরু গ্রেগরীয় পঞ্জিকার এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময়ে। যখন পহেলা বৈশাখ ঋতুধর্মী উৎসব হিসেবে পালিত হতো। এবং তারও মূল তাৎপর্য ছিল কৃষিকাজ। কালের বিবর্তনে, প্রকৃতির ভারসম্যহীনতায়, চেতনার উন্মেষে, মননী চিন্তাশৈলীর আধুনিকায়নে ও জীবনধর্মের বাঁক পেরিয়ে ক্রমে অগ্রহায়ণের পরিবর্তে বৈশাখ হতে বর্ষ গননা শুরু হয়। সময়ের সে পারিপার্শি¦কতায় শুরু হয় ফসল উত্তোলনের তারতম্যসহ আরও অন্যান্য কাজের সন্নিবেশ। কারণ বিশাল ‘বিশাখা’ নক্ষত্রযুক্ত পূর্ণিমার নাম ‘বৈশাখী’। যে মাসে এই বৈশাখী হয়; তার নাম দেওয়া হয় বৈশাখ। তখন থেকে এর জ্যোৎস্নাস্নাত নান্দনিক বিন্যাস ও বিচিত্র শোভাকে প্রাধান্য দিয়ে এবং তার সাথে জীবন-জীবিকাকে একাত্ম করে নিতে পহেলা বৈশাখকে নববর্ষ মনোনীত করা হয়।
মোগল বাদশা ও রাজপুরুষগণ হিজরি সনের মহররম মাসের প্রথম দিনে পালন করতেন ‘নওরোজ’ উৎসব। এ উপলক্ষ্যে রাজ পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন উপহার সামগ্রী, খিলাত (রাজকীয় পোশাক) ও উপাধি লাভ করতেন। দূর্গ অভ্যন্তরে মহিলারা মিনা বাজারের আয়োজন করতেন। তবে দিল্লির অনুসরণে বাংলার সুবেদার ও নবাবেরা বাংলা নববর্ষে অর্থাৎ বৈশাখের প্রথম দিনে ‘পূন্যাহ’ নামে আর একটি অনুষ্ঠান উদযাপন করতেন। ঐ দিনে জমিদারগণ তাদের স্ব-স্ব এলাকার প্রজাসাধারণের কাছ থেকে বার্ষিক আদায়কৃত রাজস্ব দরবারে জমা দিয়ে নবাবের নিকট হতে পুরস্কার, খিলাত ও উপাধি গ্রহণ করতেন। ব্রিটিশ শাসনামলে নবাবদের অনুকরণে জমিদাররা কিছুদিন বাংলা নববর্ষের আদলে ‘পূন্যাহ’ উদযাপনের মাধ্যমে প্রজাদের নিকট থেকে বকেয়া খাজনা আদায়ের রেওয়াজ চালু রেখেছিলেন। জমিদারী প্রথা বিলুপ্তির মধ্য দিয়ে ‘পূন্যাহ’ পালনের সে রেওয়াজ বা ঐাতহ্য হারিয়ে যায়। এর পর পরই মোগলীয় প্রশাসনিক পৃষ্ঠপোষকতা খর্ব হওয়ায় বাংলায় পহেলা বৈশাখে নববর্ষ পালনের ক্ষেত্র প্রসারিত হয় এবং অধিকতর গণমানুষের সমর্থন ও সম্পৃক্ততায় তার ভিত্তি অপেক্ষাকৃত মজবুত হয়ে ওঠে। এর সাথে ‘হালখাতা’ নামক একটি আনুষ্ঠানিকতা যুক্ত হয়। ‘হাল’ শব্দের অর্থ নতুন আর ‘খাতা’ হচ্ছে হিসাব লিপিবদ্ধের পত্র। জমিদারদের প্রজাদের কাছ থেকে বার্ষিক খাজনা আদায়ের মতো এটি মূলত ব্যবসা অর্থাৎ বেচা-কেনা, ক্রেতা-বিক্রেতা বা অন্যান্য লেনদেনী কারবারের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয়। ব্যবসায়ীরা তাদের ক্রেতা বা পাওনাদারদের নিকট থেকে হিসাব-নিকাশের বার্ষিক জের বা বকেয়া পাওনা সমন্বয় বা পরিশোধের নিমিত্তে নতুন খাতা খোলার জন্য এই রেওয়াজী প্রথার প্রচলন শুরু করেন। সুতরাং ব্যবসা বা অন্যান্য লেনদেনের ক্ষেত্রে পূর্বের বা পেছনের বাকি-বকেয়া পরিশোধ হলে প্রস্তুতকৃত খাতায় নতুন করে বিনিময় বা কারবার করার জন্য নাম ঠিকানা তোলা হতো। নববর্ষের দিনক্ষণে মিষ্টিমুখ করানোর আনুষ্ঠানিকতার আয়োজনের মাধ্যমে পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হতো। এই দিনে বিগত দুঃখ-বেদনা আর হতাশার বিড়ম্বনাকে একরাশ হাসি-আনন্দের উৎসবমুখর আয়োজনে ঢেকে দিয়ে আগতকে স্বাগত জানানো হয়। বলা হয়-
‘নতুন বছরের প্রতিদিন
রঙে রঙে হোক রঙিন
প্রাণের যত উৎসব থাকুক অমলিন।’
চলবে——

Ads small one

তালায় বীমার নামে ২৫ লক্ষ টাকার আত্মসাতের প্রতিবাদে মানববন্ধন

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ১৭ জুন, ২০২৬, ১২:৩৯ পূর্বাহ্ণ
তালায় বীমার নামে ২৫ লক্ষ টাকার আত্মসাতের প্রতিবাদে মানববন্ধন

নিজস্ব প্রতিনিধি: তালা সদর ইউনিয়নের সংরক্ষিত ৪, ৫, ৬ নং ওয়ার্ডের সদস্য সাহিদা বেগমের বিরুদ্ধে বীমার নামে ১শত ৮ জনের ২৫লক্ষ টাকার আত্মসাতের অভিযোগে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেছেন ভুক্তোভোগী পরিবার। এসময় ভুক্তোভোগীরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), থানা পুলিশ, জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
মঙ্গলবার (১৬ জুন) বিকেল ৪টায় উপজেলার ডাঙ্গা নলতা মাঝারপাড়া এলাকায় অনুষ্ঠিত মানববন্ধনে ডাঙ্গানলতা, জাতপুর, আটরাই, খানপুর, জেয়ালা ও আশপাশের এলাকার শতাধিক ভুক্তভোগী অংশগ্রহণ করেন। পপুলার হেলথ এন্ড এডুকেশন সঞ্চয় ও ঋণদান কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেডের নামে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে সংগৃহীত প্রায় ২৫লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
মানববন্ধনে অংশগ্রহণকারী বক্তরা হলেন, কতুব উদ্দীন মাহমুদ, নুর আলি শেখ, পীর আলি শেখ, কালাম মাহামুদ, আরিজুল মালি, জহিরুল ইসলাম, জিহাদ মালি, নীলিমা বেগম, সুফিয়া বেগম, পারভীন, সুফিয়া রশিদা, রিজিয়া,সোরাইয়া, মুক্তা প্রমুখ।
সমাবেশ ও মানববন্ধনে বক্তারা অভিযোগ করেন তালা সদর ইউনিয়নের ৪, ৫ ও ৬নম্বর ওয়ার্ডের সংরক্ষিত সদস্য, জামায়াতে ইসলামীর মহিলা রোকন, পরলোভী, অর্থ আত্মসাতকারী সাহিদা বেগম পপুলার হেলথ এন্ড এডুকেশন সঞ্চয় ও ঋণদান কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেডের কর্মী হিসেবে পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন প্রলোভন ও অধিক মুনাফার আশ্বাস দিয়ে এলাকার সাধারণ মানুষকে সদস্য করেন। পরে প্রায় ১০৮ জন সদস্যের কাছ থেকে সঞ্চয় ও বীমার নামে প্রায় ২৫ লাখ টাকা সংগ্রহ করা হয়।
ভুক্তভোগীরা জানান, প্রতিষ্ঠানটির বীমা প্রকল্পের মেয়াদ ছিল ৫ বছর। কিন্তু বীমার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও ৮ থেকে ৯ বছর অতিবাহিত হলেও তারা তাদের জমাকৃত টাকা ও প্রাপ্য মুনাফা ফেরত পাননি। বারবার টাকা ফেরতের জন্য যোগাযোগ করা হলেও নানা অজুহাতে সময়ক্ষেপণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তারা।
তারা আরও জানান, দিনমজুরির আয়, ভ্যান চালানোর উপার্জন, ডিম বিক্রির টাকা, ক্ষুদ্র ব্যবসার লাভ এবং প্রবাসী স্বজনদের পাঠানো অর্থসহ কষ্টার্জিত সঞ্চয় ওই প্রতিষ্ঠানে জমা রেখেছিলেন। কিন্তু নির্ধারিত সময় পার হওয়ার পরও অর্থ ফেরত না পেয়ে তারা চরম আর্থিক সংকটে পড়েছেন।
বক্তারা বলেন, বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়ভাবে একাধিক সালিশ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সালিশে সাহিদা বেগম নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে টাকা পরিশোধের অঙ্গীকার করে স্ট্যাম্প ও ব্ল্যাংক চেক প্রদান করেন। কিন্তু প্রতিশ্রুত সময় পেরিয়ে গেলেও তিনি অর্থ পরিশোধ করেননি বলে অভিযোগ করা হয়।
মানববন্ধনে বক্তরা আরও বলেন, বিষয়টি নিয়ে জামায়াতে ইসলামী সাতক্ষীরা জেলা আমীর, উজেলা আমীর, ইউনিয়ন আমীরসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতাদের কাছে অভিযোগ দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত তারা কোনো কার্যকর প্রতিকার পাননি। দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে আত্মসাতের অভিযোগের সুষ্ঠু বিচার এবং ভুক্তভোগীদের পাওনা অর্থ ফেরত দেওয়ার দাবি জানান তারা।
তবে অভিযোগের বিষয়ে সংরক্ষিত মহিলা সদস্য শাহিদা বেগমের কাছে মোবাইল ফোনে জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে বলেন আমি খুলনা থেকে বাড়িতে আসছি। গাড়িতে থাকায় কিছু শোনা যাচ্ছেনা বলে মোবাইল সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন ।

বিশ্বজুড়ে সংকটে শরণার্থী

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ১৭ জুন, ২০২৬, ১২:৩৬ পূর্বাহ্ণ
বিশ্বজুড়ে সংকটে শরণার্থী

প্রকাশ ঘোষ বিধান
বিশ্বজুড়ে রেকর্ড সংখ্যক মানুষ যুদ্ধ, সহিংসতা ও নিপীড়নের কারণে বাস্তুচ্যুত হচ্ছে। তাই মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে তাদের পাশে দাঁড়ানো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়সহ আমাদের সবার দায়িত্ব। শরণার্থীদের প্রতি মানবিক হোন, এই আহ্বান অত্যন্ত সময়োপযোগী ও বৈশ্বিক নৈতিকতার দাবি।
আদিকাল থেকে নিপীড়ন থকে বাঁচতে অনেকে মাতৃভূমি ত্যাগ করেছেন। শরণার্থীর বেঁচে থাকার এবং নিরাপদে আশ্রয় খোঁজার মৌলিক মানবাধিকার রয়েছে। তাদের সঙ্গে কোনো প্রকার বৈষম্যমূলক আচরণ না করে সহানুভূতিশীল হওয়া প্রয়োজন। শরণার্থীদের প্রতি মানবিক আচরণ করা আমাদের নৈতিক ও বৈশ্বিক দায়িত্ব। বলপ্রয়োগ, যুদ্ধ এবং সহিংসতার কারণে নিজের মাতৃভূমি ছাড়তে বাধ্য হওয়া এই মানুষদের পাশে দাঁড়ানো প্রতিটি সচেতন নাগরিকের কর্তব্য।
২০ জুন বিশ্ব শরণার্থী দিবস। ২০০১ সালের ২০ জুন প্রথম বিশ্ব শরণার্থী দিবস পালিত হয়। ২০০০ সালের ডিসেম্বরের আগে দিবসটি আফ্রিকা শরণার্থী দিবস হিসেবে পালিত হতো। ১৯৫১ সালে শরণার্থীদের স্বীকৃতির বিষয়ে জাতিসংঘের সনদ গৃহীত হয়।
নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ছুটে আসা এই মানুষগুলোর জন্য খাবার, বস্ত্র, চিকিৎসা ও আশ্রয়ের মতো জরুরি সহায়তা প্রয়োজন হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা নিজ নিজ অবস্থান থেকে শরণার্থীদের মানবেতর জীবনযাপন সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করা এবং তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল হতে অন্যদের উৎসাহিত করা। বাস্তুচ্যুতদের পুনর্বাসন ও সুরক্ষায় কাজ করে এমন বিশ্বস্ত সংস্থাগুলোকে সহায়তা বা অনুদান প্রদান করতে পারেন।
বিশ্বজুড়ে দিন দিন বেড়েই চলেছে শরণার্থীদের সংখ্যা। বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ, সংঘাত ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা প্রায় ১২ কোটি, যার মধ্যে প্রায় ৪ কোটিরও বেশি মানুষ আন্তর্জাতিক শরণার্থী। ক্রমবর্ধমান এই বাস্তুচ্যুতির বিপরীতে জাতিসংঘের ইউএনএইচসিআর-এর তহবিল ও অন্যান্য মানবিক সহায়তা উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে। এর ফলে বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ শরণার্থী তীব্র খাদ্য সংকট ও মানবেতর জীবনযাপনে বাধ্য হচ্ছেন।
জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থার সর্বশেষ বৈশ্বিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুদ্ধ, সংঘাত, নিপীড়ন এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের কারণে বর্তমানে বিশ্বজুড়ে অন্তত ১১ কোটি ৭৮ লাখ মানুষ জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত অবস্থায় জীবনযাপন করছেন। মোট বাস্তুচ্যুত মানুষের মধ্যে প্রায় ৪ কোটি ৫০ লাখই শিশু। অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুত হয়ে ৬ কোটি ৮৬ লাখ মানুষ সংঘাতের কারণে নিজ দেশের ভেতরেই গৃহহীন হয়েছেন। ২০২৬ সালের মার্চের শুরু থেকে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ায় কেবল লেবাননেই ১০ লাখের বেশি মানুষ নতুন করে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। এক দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো ২০২৫ সালে এই সংখ্যা কিছুটা হ্রাস পেলেও, ২০২৬ সালের শুরুতে মধ্যপ্রাচ্যের নতুন সংঘাত পরিস্থিতিকে আবারও মারাত্মক করে তুলেছে।
বিশ্বজুড়ে শরণার্থীদের প্রায় ৭৩ ভাগ নি¤œ ও মধ্যম আয়ের দেশে বসবাস করায় তারা খাদ্য, বাসস্থান ও চিকিৎসার চরম সংকটে ভুগছেন। এর ওপর আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা তহবিল কাটছাঁট হওয়ায় সংকট আরও ঘনীভূত হচ্ছে। বিশ্বব্যাপী ৭০ শতাংশ শরণার্থীই ৫ বছর বা তার বেশি সময় ধরে দীর্ঘমেয়াদি নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছেন। আন্তর্জাতিক তহবিল সংকটের কারণে মানবিক সহায়তা সংকুচিত হচ্ছে, যা শরণার্থীদের মৌলিক স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সুরক্ষাকে চরম ঝুঁকিতে ফেলছে। এই সংকট উত্তরণে জাতিসংঘ ২০৩৫ সালের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি শরণার্থীদের মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীলতা অর্ধেকে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, যার মূল চাবিকাঠি হলো শরণার্থীদের স্থানীয় কর্মসংস্থান ও শিক্ষার সুযোগ দেওয়া এবং নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ স্বেচ্ছায় প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করা।
পৃথিবীর প্রতি ৭০ জন মানুষের মধ্যে ১ জন বর্তমানে নিজের ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে বিপন্ন শরণার্থী জীবন বেছে নিতে বাধ্য হয়েছেন। যদিও গত এক দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো বিশ্বব্যাপী বাস্তুচ্যুতির সামগ্রিক সংখ্যা সামান্য কমেছে, তবুও দীর্ঘমেয়াদি শরণার্থী সংকট ও মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে শুরু হওয়া সংঘাত বিশ্বব্যাপী চরম উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। শরণার্থীদের দুই-তৃতীয়াংশ সাত দেশের অধিবাসী। সে গুলো হলো- সিরিয়া, আফগানিস্তান, দক্ষিণ সুদান, ফিলিস্তিন, সুদান, মিয়ানমার ও সোমালিয়া। যাদের প্রায় সবাই মুসলিম।
জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থার তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বিশ্বে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা ১২ কোটি ১২ লাখ, যা ২০২৩ সালের চেয়ে ৬ দশমিক ২ শতাংশ বেড়েছে। বাস্তুচ্যুত মানুষের মধ্যে শিশু ৪০ শতাংশ (৪ কোটি ৪৯ লাখ) এবং শরণার্থীর সংখ্যা ৩ কোটি ৬৮ লাখ। আর বিশ্বে শরণার্থী হিসেবে বিভিন্ন দেশে থাকা মানুষের ৬৯ শতাংশের উৎস ৫ দেশ। এই ৫ দেশের মধ্যে ভেনেজুয়েলা থেকে ৬২ লাখ, সিরিয়া থেকে ৬০ লাখ, আফগানিস্তান থেকে ৫৮ লাখ, ইউক্রেন থেকে ৫১ লাখ ও দক্ষিণ সুদান থেকে ২৩ লাখ মানুষ বিভিন্ন দেশে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নিয়েছে। ইউএনএইচসিআরের পরিসংখ্যান বলছে, ৩৭ শতাংশ শরণার্থী অবস্থান করছে ৫টি দেশে। এর মধ্যে ইরানে রয়েছে ৩৫ লাখ, তুর্কিতে রয়েছে ৩৩ লাখ, কলম্বিয়াতে রয়েছে ২৮ লাখ, জার্মানিতে ২৭ লাখ ও উগান্ডায় রয়েছে ১৮ লাখ। প্রতি বছর শরণার্থী হিসেবে জন্ম নিচ্ছে ২৩ লাখ শিশু। মোট শরণার্থীর ৭৩ শতাংশের আশ্রয়দাতা নি¤œ ও মধ্যবিত্ত দেশ এবং ৬৭ শতাংশ শরণার্থীর আশ্রয়দাতা প্রতিবেশী দেশ।
শরণার্থী প্রসঙ্গে দুটি বিষয় কাজ করে। একটি অতিত বা পুরোনো, আরেকটি এখনও চলমান। ১৯৭১ সালে প্রায় ১ কোটি বাংলাদেশিকে স্বাধীনতা সংগ্রামে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় গ্রহণ করতে হয়েছিল। আর স্বাধীনতার পর থেকে প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের আগমন শুরু হয়। আরাকানে সৃষ্ট রাষ্ট্রীয় নির্যাতন ও সহিংসতা থেকে জীবন বাঁচানোর লক্ষ্যে রোহিঙ্গাদের দলগত আগমন বাংলাদেশে আশ্রয় গ্রহণের প্রচেষ্টা অব্যাহত। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ১৩ লাখ রোহিঙ্গা অবস্থান করছে।
শরণার্থী সংকট সমাধানে জাতিসংঘ শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা সংস্থাগুলো বিশ্বব্যাপী কাজ করে যাচ্ছে। বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ, সহিংসতা, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বর্তমানে রেকর্ড সংখ্যক মানুষ শরণার্থী হিসেবে জীবনযাপন করছেন। এর মধ্যে একটি বিশাল অংশ হলো নারী ও শিশু, যারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। এই সংকট মোকাবিলায় নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত করা, মানবিক সহায়তা প্রদান এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

সম্পাদকীয়/অনিয়মিত বিদ্যুৎ ও নিয়মিত দুর্ভোগ: সমাধান কোথায়?

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ১৭ জুন, ২০২৬, ১২:৩৬ পূর্বাহ্ণ
সম্পাদকীয়/অনিয়মিত বিদ্যুৎ ও নিয়মিত দুর্ভোগ: সমাধান কোথায়?

গ্রীষ্মের প্রচ- দাবদাহ আর আষাঢ়ের ভ্যাপসা গরমে সাতক্ষীরা জেলার জনজীবন বর্তমানে এক চরম বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দিনে-রাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের কারণে জেলার কয়েক লাখ গ্রাহকের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা স্থবির হয়ে পড়েছে। গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে, বিশেষ করে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতাধীন এলাকাগুলোতে এই পরিস্থিতি আরও বেশি শোচনীয়। চাহিদার তুলনায় বরাদ্দের এই বিশাল ঘাটতি কেবল যে মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে বিষিয়ে তুলছে তা নয়, বরং স্থবির করে দিচ্ছে জেলার সামগ্রিক অর্থনীতিকে।
বিদ্যুৎ সংকটের এই ভয়াবহ প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে শিশু, বৃদ্ধ এবং শিক্ষার্থীদের ওপর। প্রচ- গরমে একদিকে যেমন রোগব্যাধির প্রকোপ বাড়ছে, অন্যদিকে লোডশেডিংয়ের কারণে স্কুলপড়ুয়া ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। আধুনিক ডিজিটাল বাংলাদেশে যখন গ্রামাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের বাধ্য হয়ে মোমবাতি কিংবা হারিকেন জ্বালিয়ে পড়তে বসতে হয়, তখন তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক ও দুর্ভাগ্যজনক বাস্তবতাকে স্মরণ করিয়ে দেয়।
কেবল গৃহস্থালি ভোগান্তিই নয়, এই বিদ্যুৎ বিপর্যয় সাতক্ষীরার ব্যবসা-বাণিজ্য ও রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের আঘাত হানছে। জেলার অন্যতম অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি ভোমরা স্থলবন্দর ও কাস্টমস হাউস। বর্তমানের শতভাগ অনলাইননির্ভর দাপ্তরিক যুগে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় ইন্টারনেট ও কম্পিউটার বন্ধ থাকছে। ফলে আমদানি-রপ্তানি পণ্যের ফাইল তদারকি ও পণ্য খালাসে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হচ্ছে, যা দেশের সামগ্রিক রাজস্ব আয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। পাশাপাশি ঘন ঘন ভোল্টেজ ওঠানামা করায় সাধারণ মানুষের বাসাবাড়ির ফ্রিজ, টেলিভিশনসহ দামি বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম যেমন নষ্ট হচ্ছে, তেমনই কলকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়ছেন শিল্পোদ্যোক্তারা।
পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির বক্তব্য অনুযায়ী, চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ কম থাকার কারণেই তারা এলাকাভিত্তিক ‘ফিডার’ ধরে লোডশেডিং দিতে বাধ্য হচ্ছেন। আমরা বুঝি, জাতীয় গ্রিড থেকে পর্যাপ্ত সরবরাহ না পেলে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সীমাবদ্ধতা থাকে। কিন্তু এই তীব্র গরমে দিনের পর দিন এভাবে একটি উৎপাদনশীল জেলাকে অন্ধকারে ডুবিয়ে রাখা কোনো টেকসই সমাধান হতে পারে না।
আমরা মনে করি, সাতক্ষীরার অর্থনৈতিক গুরুত্ব বিবেচনা করে এই জেলায় বিদ্যুতের বরাদ্দ অবিলম্বে বাড়ানো প্রয়োজন। বিদ্যুৎ বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের উচিত দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে জাতীয় গ্রিড থেকে সাতক্ষীরায় বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে, লোডশেডিং যদি দিতেই হয়, তবে তা যেন সুনির্দিষ্ট ও পরিকল্পিত সূচি মেনে দেওয়া হয়, যাতে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরা মানসিকভাবে এবং কর্মক্ষেত্রে আগাম প্রস্তুতি নিতে পারেন। আমরা আশা করি, বিদ্যুৎ বিভাগ স্রেফ ‘চেষ্টা চলছে’ আশ্বাসের বৃত্ত থেকে বেরিয়ে দ্রুততম সময়ে সাতক্ষীরাবাসীকে এই দুঃসহ পরিস্থিতি থেকে মুক্তি দেবে।