বাংলা নববর্ষ : আনন্দ ও ঐতিহাসিক পাঠ
মনিরুজ্জামান মুন্না
পহেলা বৈশাখ বাংলার বাঙালির
কীর্তির অহংকার জাগায় আগামীর
গ্লানি ঝেড়ে শুচি হওয়ার দিন আনে সোনালীর।
‘বিশ্বকবির সোনারবাংলা, নজরুলেরই বাংলাদেশ, জীবনানন্দের রূপসী বাংলা রূপের যে আর নাইকো শেষ’। এখানে কোন কিছু সাজিয়ে নিতে হয় না, আপনা আপনিই সব সেজে ওঠে। মালা-চন্দন ছাড়াই প্রাকৃতিক নিয়মের ঐশ্বর্যে ঋতুতে ঋতুতে হাজির হয় এক একটি সাজবেশ। সুন্দর প্রকৃতির অফুরন্ত নিয়ামকভা-ার সৌন্দর্যের অবিরাম অনিবার্যতা নিশ্চিত করে চলেছে। যার সাথে মিশে থাকে আধ্যাত্মবাদী মরমী শোভার স্বর্গীয় আবেশও। বৈশাখের প্রথম দিনে অতীতকে ছেড়ে বৈচিত্র্যময় এ সৌন্দর্যকল্পে প্রভাবিত হয়ে শ্যামলী মায়ের কাছে বাঙালি একটি আনন্দময় সুন্দর বছর শুরু ও পার করার আর্জি জানায়। আগমনের বরণীয় স্বাগতমের আনুষ্ঠানিকতায়। আর এ উপলক্ষে দিগন্তজুড়ে লৌকিক আচার ও লোকজ ক্রিয়া-কলার জমজমাট আয়োজন চলে। জীবনানন্দ দাশের কাব্যকথার পরাবাস্তবতায় এমন অনেক ভাবনার খোরাক মেলে। যেমনÑ
‘সমস্ত দিনের শেষে শিশিরের শব্দের মতন
সন্ধ্যা আসে; ডানার রৌদ্রের গন্ধ মুছে ফেলে চিল;
পৃথিবীর সব রঙ নিভে গেলে পা-ুলিপি করে আয়োজন
তখন গল্পের তরে জোনাকির রঙে ঝিলমিল।’
‘এসে হে বৈশাখ…’ এ স্বাগতমী আহবার ও প্রার্থনাগীতির প্রতিপাদ্যে নতুন বছরে, নতুন প্রভাতে, নতুন আলোয়, নতুন প্রত্যয়ে, নতুন উদ্যমে, নতুন পথে অভিযাত্রা আমাদের। ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’র মতো অপবাদ সাথে নিয়ে স্বল্পউন্নত থেকে উন্নয়নশীলে, স্বল্পআয় থেকে মধ্যম আয়ে এবং সর্বোপরি প্রযুক্তির সাথে তাল মিলিয়ে ডিজিটাল বাংলাদেশ গ্লোবাল বিশ্বায়নে অংশিদার হয়েছে। সব মিলিয়ে বিশ্বদরবারে আজ বাংলাদেশ একটি স্বতন্ত্র অনুকরণীয় দৃষ্টান্তে উপস্থাপিত। বিশেষ করে ভাষার জন্য রক্তক্ষয়ী আন্দোলন। স্বাধীনতার জন্য দীর্ঘ মেয়াদী সংগ্রাম, নির্যাতন, আত্মাহুতি ও ত্যাগের লোমহর্ষক ঘটনার নজির একটি বিরল ইতিহাস। তাছাড়া বাংলার চিরায়াত-লোকায়ত শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, কৃষ্টি, সভ্যতা, ভাষা, শিক্ষা ইত্যাদি জীবন-জীবিকামুখী ও প্রকৃতি নির্ভর হওয়ায় তা অত্যন্ত বাস্তব আর গণমুখী। যা রক্ষা ও প্রতিপালনের দীক্ষায় নিবিড় ঘনিষ্ঠতাবদ্ধে সমৃদ্ধ ও ঋদ্ধ আমাদের চারপাশ। বৃহত্তর বাংলার (পূর্ব+পশ্চিম) অনেক গৌরবময় কৃষ্টির আদি পীঠস্থান এই বাংলাদেশ। তাই কি আতিথেয়তায়, কি ভাষায়, কি সংস্কৃতির মননী প্রগতিশীলতায় এর আত্মীকরণের সক্ষমতা অসীম। যে ক্ষমতা তার গৌরবকে ক্ষুন্ন করে না বরং মহিমান্বিত করে। তবে এই ক্ষমতার অপব্যবহার করে আমরা যেন আমাদের মূল সনাতনী বা আদিমতার সত্ত্বীয় সত্তার প্রাধান্য ও মূল্যের অগ্রাধিকারকে ভুলে না যাই।
ঘটনার ও পরিবেশ-পরিস্থিতির আকস্মিকতায় আমাদের সবচেয়ে মহোত্তম অসম্প্রদায়িক অর্জনগুলো ছড়িয়ে আছে পর পর কয়েক মাস জুড়ে। ফাল্গুনে কৃষ্ণচূড়ার রক্তিম রঙ আর পীচঢালা রাজপথে টগবগে জীবনের খুন মাখিয়ে এসেছিলো ভাষার স্বাধীনতা। চৈত্রে মায়ের চোখের তপ্ত আগুনে নৃশংস প্রতিহিংসাপরায়ন পাক বা পশ্চিমা ঔপনিবেশিক শক্তিকে পুড়িয়ে এসেছিলো স্বতন্ত্র রাষ্ট্র গঠনের স্বীকৃতি। বৈশাখে অন্তরের মলিনতা দূর করে উচ্ছ্বল আনন্দ আমেজে এসেছিলো নববর্ষ বরণের অমিয় বারতা। পৃথিবীর প্রত্যেকটি দেশ, জাতি ও গোষ্ঠীর আদিসত্তার পরিচয় বহনকারী নিজস্ব সংস্কৃতিগত লোকউৎসব রয়েছে। সংস্কৃতি ও উৎসবপ্রবণ বাঙালিরও রয়েছে তেমন কিছু নিজস্ব সাংস্কৃতিক লোকউৎসব। পহেলা বৈশাখে ‘নববর্ষ বরণ’ তার মধ্যে অন্যতম। যা সর্বোচ্চ সার্বজনীনতায় চিরায়ত সংস্কার, বিশ্বাস ও আচার-আচারণগত বৈশিষ্ট্যকে সনাক্ত করে। নির্দেশ করে ঐতিহ্য, ইতিহাস, কৃষ্টি ও সংস্কৃতির স্বকীয় মাধূর্য্যকে।
গুরুত্বের বিবেচনায় আমাদের ভাষা দিবস আজ আর্ন্তজাতিক মাতৃভাষা দিবসে পরিগণিত হয়েছে। আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধও আর্ন্তজাতিকভাবে একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল মর্মস্পর্শী ও হৃদয়বিদায়ক ঘটনাবহুল ইতিহাসে অভিষিক্ত। আমাদের পহেলা বৈশাখের বর্ণাঢ্য মঙ্গল শোভাযাত্রার বিচিত্র ঐতিহ্যের সমন্বিত ও নান্দনিক উপস্থাপনে গোটা বিশ্ব অভিভূত, বিমোহিত ও মুগ্ধ হয়ে এটিকেও আর্ন্তভূক্ত করে নিয়েছে বিরল বিস্ময়ী সংস্কৃতিক ঐতিহ্যে (এষড়নধষ রহঃধহমরনষব ড়ভ পঁষঃঁৎধষ যবৎরঃধমব নু টঘঊঝঈঙ রহ ২০১৬)।
সৌন্দর্যম-িত ও উৎবসময় বাংলা নববর্ষ বরণের এ দিনের সকল কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিকতায় থাকে নিখাদ বিনোদন, অবাধ আনন্দ, উদার মানসিকতার আত্মিক ঘনিষ্ঠতার ছোঁয়া। আনন্দ আর বর্ণিল বরণে বৈশাখের এ দিনের পরতে পরতে মিশে থাকে রঙের ছড়াছড়ি, উৎসবের মাতামাতি। রঙের ক্ষেত্রে যেমন আবেদন আছে লাল-সাদার তেমনি আছে বাসন্তী, গেরুয়া, সবুজেরও। বেশভূষায় যার উজ্জ্বলতা উৎসবের আনন্দকে আরও বেশি জ্বলজ্বলে করে তোলে এবং তা মন ও বয়সে চিরতারুণ্যে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। পোশাকে-খাবারে রঙ ও বাঙালিয়ানার ছাপ ছাড়াও তার দেখা মেলে বিভিন্ন রকমের বিকিকিনির অনুষঙ্গে। যেমন- টেপাপুতুল, নকশা করা শঙ্খ, কলস, কুলা, সোলার মালা, খেলনা, কাঁসা-পিতল-মাটির গয়না, শীতল পটি, হাতপাখা, বাঁশ ও বেতের পণ্য। যার সাথে মিশে থাকে খ্যাত-অখ্যাত কারু-চারু ও মৃৎ শিল্পীর নিপুণ হাতের ছোঁয়া। লোকজ ঐতিহ্যে এসব উপকরণ আমদের শেকড়ের সন্ধান দেয়। তাই নানান আঙ্গিক অঙ্গণে রঙরশ্মির ছিঁটে-ছঁটার স্পর্শের লেপনে ব্যস্ত সবে অপরূপ রূপ রূপায়নে। আগমনী বর্তার আহব্বানে জানিয়ে যায় পরস্পরে-
‘নতুন দিনের আমন্ত্রণে সূর্য গেলো ডুবে
আকাশে চাঁদ এসে জ্যোৎস্না জাগাবে
রৌদ্রদহন স্বপ্নবহন দ্যুতির বিচ্ছুরণ
উৎসবাদী রঙ মাখবার এলো মাহেন্দ্রক্ষণ।’
বাংলার প্রকৃতির মত বাঙালির স্বভাব-সুলভ বৈশিষ্ট্য বোধ হয় বিশ্বের অপর সকল জাতির থেকে একটু আলাদা। বিশ্বমানবতার মন্ত্রণাশিবির থেকে বাংলাদেশ অপেক্ষাকৃত অনুন্নত রাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত হলেও এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যরে স্বাভাবিক বিন্যাস সকল দীনতা, বিপন্নতা কাটিয়ে সর্বত্র প্রসন্নের সুবাতাস প্রবাহিত রাখে। প্রকৃতি-মাটি আর মানুষের সাথে ভারসাম্যপূর্ণ আবহাওয়ার চারিত্রিক সাদৃশ্যের নিগূঢ়তা বিশ্বসভায় সামিল করায় এক বিস্ময়ী আবহের অনন্য মাত্রায়। আর তাই তাকে যথার্থরূপে জানতে বুঝতে ও অনুভব করতে হলে আমাদের ফিরে-ফিরে আসতে হয় রাবীন্দ্রিক মনদেবতায়, নজরুলের সাম্যবাদীতায়, জীবনানন্দের রূপসী বাংলায়, জসীমউদ্দীনের পল্লী¬চেতনায় কিংবা সুফিয়া কামালের জীবন গাঁথায়।
অনন্ত মহাকাল বয়ে চলে আদিকাল হতে বর্তমানকালে। এই অনাদিকালকেও মানুষ খ-িত না করে পুনরায় কোন আরম্ভস্থল আবিষ্কারের পক্ষপাতী। হয়তোবা সে কারণেই সৃষ্টি হয়েছে বৎসরের। যা বিশেষ নিয়মে, বিশেষ সংখ্যক দিন-ক্ষণ নিয়ে আরম্ভ-প্রান্ত দ্বারা বেষ্টিত। ঘুরে-ঘুরে তার এ আসা-যাওয়া বা শুরু-শেষ হওয়ার যৌক্তিক বিশ্লে¬ষণ বিশেষ-বিশেষ দেশ-কাল ও জনগোষ্ঠীর দ্বারা সৃষ্ট হওয়ায় স্থান-কাল-পাত্রভেদে তারতম্য পরিলক্ষিত হয়। সে কারণে পৃথিবীর সকল দেশেই নিজস্ব নিয়মে অব্দ বা বর্ষ গণনার কোন না কোন রীতি বা প্রক্রিয়া প্রচলিত। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সে বর্ষ শুরু-শেষ এবং গণনার নেপথ্যে কিছু না কিছু পটভূমি থাকে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। বাংলাদেশের নিজস্ব অব্দ হলো ‘বঙ্গাব্দ’ বা ‘বাংলা সন’। প্রাচীনকালে আমাদের দেশে বর্ষ আরম্ভ হতো ‘অগ্রহায়ণ’ মাসে। তখন অগ্রাহায়ণ মাসের নাম ছিলো ‘মার্গশীর্ষ’ মাস। অপেক্ষাকৃত অজ্ঞ-অসচেতন বাঙালি জনসাধারণ তখনও চন্দ্র-সূর্যের গতি-প্রকৃতি দেখে বর্ষ গণনা করতে শেখেনি। ফলে নিছক বাহ্যিক প্রকৃতির স্বভাব, বৈশিষ্ট্য ও লক্ষণ দেখে তারা বর্ষ গণনা করতো। অগ্র অর্থ ‘শ্রেষ্ঠ’ আর হায়ন অর্থ ‘ব্রীহি’ বা ‘ধান’। সুতরাং এমনই একটি ব্যাখ্যা বিশ্লে¬ষণের ওপর ভর করে ধান জন্মের শীর্ষ সময় অগ্রহায়ণকে নববর্ষ হিসেবে মনোনীত করে নিয়েছিলো। তাছাড়া তখন তাদের কাছে রাজস্ব আদায় ও ঋণ পরিশোধের জন্য এই সময়টিই ছিলো মোক্ষম ও যথার্থ। প্রকৃতপক্ষে এক ফসলী কৃষি প্রধান এ অঞ্চলের কৃষকেরা তখন ধানের বড় ফলনটি এই সময়ে ঘরে তুলতো। সে কারণে বছরের অন্যান্য সময়ের তুলনায় তাদের মনটাও বেশ ফুরফুরে থাকতো। সে ফুরফুরে মনে তারা যেন বলে উঠতো-
‘প্রকৃতি আজ পাগলপারা নাচে দিশেহারা
জোরছে বাজাও ঢাক ঢোল বীণ একতারা
সজীব প্রাণে বিজলী জ্বালে মেঘ মেঘালী হাওয়া
প্রীতির দাওয়ায় বটের ছায়ায় পান্তাভাত খাওয়া।’
যুগের যান্ত্রিক কর্ম উন্মাদনায় সদা তৎপর থেকে অন্যান্য জাতি যখন চাহিদা-যোগান আর ভোগের আকর্ষণে অভিলাষের দৌরাত্মে লাগামহীন ঘোড়ার মত ছোটাছুটি করে, তৃণমুল বাঙালি তখন অল্পতে তুষ্ট থেকে ন্যূনতম চাহিদাকে সামলে নিয়ে নিঃসর্গের মুখোমুখি বসে। ক্ষণিকের জন্য হলেও বিধিবদ্ধ কাজ ভুলে সকল দুশ্চিন্তাকে ঝেড়ে ফেলে। ঘাসের গালিচায় বসে দিগন্তমোড়া বিন্তীর্ণ নীলাকাশের সৌন্দর্যসুধার আরামটুকু অন্তরে ভরে নিয়ে অনাবিল প্রশান্তি অনুভব করে। শুধু প্রকৃতির বিন্যাসী বৈচিত্রের অপরূপতার উপভোগ্যে নয়, শরীর মনের এমন প্রশান্তির খোরাক যোগাতে প্রতিনিয়ত গ্রাম-বাংলার ঘরে-ঘরে বর্ষে-বর্ষে, ঋতুতে-ঋতুতে কিংবা বিভিন্ন লোকায়ত পার্বণে নানান উৎসবের আয়োজন চলে। যদিও এ বাঙালি গোষ্ঠীর কারও-কারও জীবনে চরম আর্থিক দৈন্য আছে। আছে প্রাত্যহিক প্রয়োজনের অপ্রতুলতা, ক্ষুধা, অতৃপ্তি, বঞ্চনা-প্রবঞ্চনা আর স্বপ্নভঙ্গের নির্মম হাহাকার। তবুও সকল হীনতার ঘাত-প্রতিঘাত উপেক্ষা করে বিনোদনের সে সব অতীত ঐতিহ্যবহ পর্ব-পার্বণী উৎসবকে অবলীলায় লালন-পালন করে চলে। ভালোবাসার গভীরতার আত্মিক সত্তায় কিছুতেই সেগুলো ম্লান হতে পারে না। আর পারেনা বলেই হয়তো কাঁধ হতে সকল জোয়াল নামিয়ে, যুগযন্ত্রণার বেড়ি ভেঙ্গে প্রতিবেশী আত্মীয়-অনাত্মীয়কে ডেকে নিয়ে পরস্পরে আপন-আপন অঙ্গণে উৎসবের আয়োজন করে। সেদিন যেন সকল সঞ্চয় ঝেড়ে, সংশয় ভূলে আপনাকে আরও ফতুর করে দিতে ব্যগ্র হয়। আর এই ব্যগ্রতার ভেতর দিয়ে স্নাত হতে চায় মননের আনন্দলোকের ঝর্ণায়।
কতকগুলি বিশেষ উপলক্ষ্যের অবলম্বনে প্রান্তিক বাংলার আমজনতায় আমরা ঐসব বর্ণিল উৎসবের সন্ধান পাই। যার মধ্যে পহেলা বৈশাখ একটি অতি তাৎপর্যপূর্ণ ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির গুরুত্ববহ আয়োজন, যেখানে সকল জাত-পাত, মত-পথ, পেশা ও ধর্মালম্বীর মেলবন্ধন ঘটে। এ উৎসবের সাথে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সমর্থন ও সম্পৃক্ততা থাকে বলেই তা সকল প্রতিবন্ধকতা, সমালোচনার বাঁধা উৎরিয়ে উত্তীর্ণ হয় জাতীয় উৎসবের মত রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক মর্যাদায়। তাই গোটা বিশ্ব বিশেষত দুই বাংলার জনতার সংযোগী প্রভাবও এর মাঝে সমভাবেই বর্তিত হয়। মননের গহীনে আনন্দ আবেশে উচ্ছল শিহরণে ব্যক্ত হয়-
‘বৈশাখে সবই জাগে বাঙালি সাজে
সেই স্মৃতি কত মধুর স্বপ্ন হয়ে বাজে
রঙ্গরসের সঙ্গে মেশে মধুময় প্রকৃতি
ঢঙ্গি-ভঙ্গির মাধুর্যতায় কোমল কলাবতী।’
হিন্দু সৌর পঞ্জিকা বা সনাতনি পঞ্জিকা অনুসারে বাংলা বারো মাসের বিভিন্ন পার্বণ অনেক আগে থেকেই পালিত হতো। যার শুরু গ্রেগরীয় পঞ্জিকার এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময়ে। যখন পহেলা বৈশাখ ঋতুধর্মী উৎসব হিসেবে পালিত হতো। এবং তারও মূল তাৎপর্য ছিল কৃষিকাজ। কালের বিবর্তনে, প্রকৃতির ভারসম্যহীনতায়, চেতনার উন্মেষে, মননী চিন্তাশৈলীর আধুনিকায়নে ও জীবনধর্মের বাঁক পেরিয়ে ক্রমে অগ্রহায়ণের পরিবর্তে বৈশাখ হতে বর্ষ গননা শুরু হয়। সময়ের সে পারিপার্শি¦কতায় শুরু হয় ফসল উত্তোলনের তারতম্যসহ আরও অন্যান্য কাজের সন্নিবেশ। কারণ বিশাল ‘বিশাখা’ নক্ষত্রযুক্ত পূর্ণিমার নাম ‘বৈশাখী’। যে মাসে এই বৈশাখী হয়; তার নাম দেওয়া হয় বৈশাখ। তখন থেকে এর জ্যোৎস্নাস্নাত নান্দনিক বিন্যাস ও বিচিত্র শোভাকে প্রাধান্য দিয়ে এবং তার সাথে জীবন-জীবিকাকে একাত্ম করে নিতে পহেলা বৈশাখকে নববর্ষ মনোনীত করা হয়।
মোগল বাদশা ও রাজপুরুষগণ হিজরি সনের মহররম মাসের প্রথম দিনে পালন করতেন ‘নওরোজ’ উৎসব। এ উপলক্ষ্যে রাজ পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন উপহার সামগ্রী, খিলাত (রাজকীয় পোশাক) ও উপাধি লাভ করতেন। দূর্গ অভ্যন্তরে মহিলারা মিনা বাজারের আয়োজন করতেন। তবে দিল্লির অনুসরণে বাংলার সুবেদার ও নবাবেরা বাংলা নববর্ষে অর্থাৎ বৈশাখের প্রথম দিনে ‘পূন্যাহ’ নামে আর একটি অনুষ্ঠান উদযাপন করতেন। ঐ দিনে জমিদারগণ তাদের স্ব-স্ব এলাকার প্রজাসাধারণের কাছ থেকে বার্ষিক আদায়কৃত রাজস্ব দরবারে জমা দিয়ে নবাবের নিকট হতে পুরস্কার, খিলাত ও উপাধি গ্রহণ করতেন। ব্রিটিশ শাসনামলে নবাবদের অনুকরণে জমিদাররা কিছুদিন বাংলা নববর্ষের আদলে ‘পূন্যাহ’ উদযাপনের মাধ্যমে প্রজাদের নিকট থেকে বকেয়া খাজনা আদায়ের রেওয়াজ চালু রেখেছিলেন। জমিদারী প্রথা বিলুপ্তির মধ্য দিয়ে ‘পূন্যাহ’ পালনের সে রেওয়াজ বা ঐাতহ্য হারিয়ে যায়। এর পর পরই মোগলীয় প্রশাসনিক পৃষ্ঠপোষকতা খর্ব হওয়ায় বাংলায় পহেলা বৈশাখে নববর্ষ পালনের ক্ষেত্র প্রসারিত হয় এবং অধিকতর গণমানুষের সমর্থন ও সম্পৃক্ততায় তার ভিত্তি অপেক্ষাকৃত মজবুত হয়ে ওঠে। এর সাথে ‘হালখাতা’ নামক একটি আনুষ্ঠানিকতা যুক্ত হয়। ‘হাল’ শব্দের অর্থ নতুন আর ‘খাতা’ হচ্ছে হিসাব লিপিবদ্ধের পত্র। জমিদারদের প্রজাদের কাছ থেকে বার্ষিক খাজনা আদায়ের মতো এটি মূলত ব্যবসা অর্থাৎ বেচা-কেনা, ক্রেতা-বিক্রেতা বা অন্যান্য লেনদেনী কারবারের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয়। ব্যবসায়ীরা তাদের ক্রেতা বা পাওনাদারদের নিকট থেকে হিসাব-নিকাশের বার্ষিক জের বা বকেয়া পাওনা সমন্বয় বা পরিশোধের নিমিত্তে নতুন খাতা খোলার জন্য এই রেওয়াজী প্রথার প্রচলন শুরু করেন। সুতরাং ব্যবসা বা অন্যান্য লেনদেনের ক্ষেত্রে পূর্বের বা পেছনের বাকি-বকেয়া পরিশোধ হলে প্রস্তুতকৃত খাতায় নতুন করে বিনিময় বা কারবার করার জন্য নাম ঠিকানা তোলা হতো। নববর্ষের দিনক্ষণে মিষ্টিমুখ করানোর আনুষ্ঠানিকতার আয়োজনের মাধ্যমে পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হতো। এই দিনে বিগত দুঃখ-বেদনা আর হতাশার বিড়ম্বনাকে একরাশ হাসি-আনন্দের উৎসবমুখর আয়োজনে ঢেকে দিয়ে আগতকে স্বাগত জানানো হয়। বলা হয়-
‘নতুন বছরের প্রতিদিন
রঙে রঙে হোক রঙিন
প্রাণের যত উৎসব থাকুক অমলিন।’
চলবে——












