সম্পাদকীয়/প্রসঙ্গ: পানির জন্য ম্যারাথন!
oplus_0
সাতক্ষীরার শ্যামনগরে কলস কাঁধে তরুণ-তরুণীদের সাড়ে চার কিলোমিটারের এক ব্যতিক্রমী দৌড় বা ম্যারাথন কেবল কোনো প্রতীকী আয়োজন নয়; বরং এটি উপকূলীয় জনপদের এক চরম ও নিষ্ঠুর বাস্তবতার আর্তনাদ। যখন আমরা প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষ আর উন্নয়নের কথা বলছি, ঠিক তখন এক কলস নিরাপদ পানির জন্য উপকূলের মানুষকে মাইলের পর মাইল পথ পাড়ি দিতে হচ্ছেÑএটি সভ্যতার জন্য এক বড় পরিহাস। ‘রান ফর ওয়াটার-২.০’ শীর্ষক এই ম্যারাথন মূলত নীতিনির্ধারকদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে, নিরাপদ পানি পাওয়ার অধিকার থেকে এ অঞ্চলের মানুষ কতটা বঞ্চিত।
উপকূলীয় অঞ্চলে সুপেয় পানির সংকট আজ নতুন কোনো বিষয় নয়। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এই সংকট দিন দিন আরও ঘনীভূত ও অমানবিক হয়ে উঠছে। উপর্যুপরি ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ফলে মিষ্টি পানির পুকুরগুলো লোনা পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে, আর ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে যাওয়ায় নলকূপগুলো হয়ে পড়ছে অকেজো। ফলে এক কলস পানির সন্ধানে গৃহবধূ ও শিশুদের যে হাহাকার, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। পানির এই সংকট কেবল জীবনযাত্রাকেই দুর্বিষহ করছে না, বরং উপকূলের নারীদের প্রজনন স্বাস্থ্যসহ দীর্ঘমেয়াদী শারীরিক ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
আয়োজকদের ভাষায়, উপকূলের মানুষের এই কষ্টের কথা জাতীয় পর্যায়ে পৌঁছে দিতেই এই ম্যারাথন। প্রশ্ন হলো, আমাদের উন্নয়ন ভাবনায় উপকূলের এই তৃষ্ণা কতটুকু গুরুত্ব পাচ্ছে? বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা বা স্থানীয় যুব সংগঠনগুলো সীমিত সাধ্যে রেইন ওয়াটার হারভেস্টিং বা ফিল্টার বসানোর চেষ্টা করলেও, তা বিশাল জনসংখ্যার চাহিদার তুলনায় অতি সামান্য। এই সংকটের স্থায়ী সমাধান কেবল চ্যারিটি বা স্বল্পমেয়াদী প্রকল্পে সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন একটি সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদী রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা।
উপকূলীয় এলাকায় বড় পরিসরে সমুদ্রের পানি লবণমুক্ত করার (ডি-স্যালাইনাইজেশন) প্ল্যান্ট স্থাপন এবং নদী ও খাল সংস্কারের মাধ্যমে মিষ্টি পানির আধার তৈরি করা এখন সময়ের দাবি। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে ‘জলবায়ু ন্যায়বিচার’ নিশ্চিত করার জন্য জোরালো দরকষাকষিও জরুরি। কারণ, যে জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য উপকূলের মানুষ দায়ী নয়, তার চরম খেসারত তারা কেন দেবে? শ্যামনগরের এই ‘কলস ম্যারাথন’ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, পানি কোনো বিলাসিতা নয়, এটি মানুষের মৌলিক মানবাধিকার।
আশা করি, কলস কাঁধে দৌড়ানো তরুণদের এই বার্তা রাজধানীর শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষের কর্মকর্তাদের কান পর্যন্ত পৌঁছাবে। উপকূলের মানুষের তৃষ্ণা মেটাতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হলে, অদূর ভবিষ্যতে এই পানির সংকট এক বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয় ও জনপদ জনশূন্য হওয়ার কারণ হয়ে দাঁড়াবে।












