বুধবার, ২০ মে ২০২৬, ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
বুধবার, ২০ মে ২০২৬, ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

সুন্দরবনে জেলে হত্যাকারীর শাস্তি হবেই: নিহত পরিবারকে আশ্বস্ত করলেন বন প্রতিমন্ত্রী

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৯ মে, ২০২৬, ৩:৩৯ অপরাহ্ণ
সুন্দরবনে জেলে হত্যাকারীর শাস্তি হবেই: নিহত পরিবারকে আশ্বস্ত করলেন বন প্রতিমন্ত্রী

মো: হোসেন আলী: সাতক্ষীরার শ্যামনগরে সুন্দরবনের অভয়ারণ্য এলাকায় কাঁকড়া ধরতে গিয়ে বনবিভাগের গুলিতে জেলে আমিনুর রহমান গাজী (৪৫) নিহত হওয়ার ঘটনায় পুরো এলাকায় চরম উত্তেজনা ও ক্ষোভ বিরাজ করছে। ঘটনার জেরে সোমবার বিকেলে বিক্ষুব্ধ বনজীবী ও স্থানীয়রা বনবিভাগের অফিসে হামলা ও ভাঙচুর চালায়। এদিকে মঙ্গলবার (১৯ মে) নিহত জেলের বাড়িতে গিয়ে শোকসন্তপ্ত পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছেন সরকারের প্রতিনিধি, বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতারা।

মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১১টার দিকে সাতক্ষীরা জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ড. মনিরুজ্জামানের নেতৃত্বে উপজেলা বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা গাবুরা ইউনিয়নের ৯ নম্বর সোরা গ্রামে নিহত আমিনুর রহমানের বাড়িতে যান। এ সময় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিমন্ত্রী ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে নিহতের পরিবারের সদস্যদের খোঁজখবর নেন এবং সমবেদনা জানান।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, সুন্দরবনে জেলে নিহতের ঘটনাটি অত্যন্ত মর্মান্তিক ও হৃদয়বিদারক। সরকার নিহতের পরিবারের পাশে থাকবে এবং ঘটনার সঠিক ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।

নিহত আমিনুর রহমান পাঁচ সন্তান রেখে গেছেন। বিএনপির পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয় এবং সন্তানদের ভবিষ্যতের দায়িত্বে পাশে থাকার আশ্বাস দেন নেতারা।

ড. মনিরুজ্জামান বলেন, বৈধ পাস নিয়ে জীবিকার তাগিদে বনে যাওয়া একজন অসহায় জেলের ওপর এভাবে গুলি চালানো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। বিএনপি সবসময় এই পরিবারের পাশে থাকবে এবং নিহতের এতিম সন্তানদের সহায়তায় সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে।

অন্যদিকে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে নিহতের বাড়িতে যান বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর একটি প্রতিনিধি দল। এসময় শ্যামনগর উপজেলা জামায়াতের আমির মাওলানা আব্দুর রহমান নিহতের পরিবারের হাতে আর্থিক সহায়তা তুলে দেন।

তিনি বলেন, পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে পরিবারটি অসহায় হয়ে পড়েছে। জামায়াতে ইসলামী সবসময় নির্যাতিত ও বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে থাকে। নিহতের সন্তানদের দায়িত্ব নিতে এবং ভবিষ্যতে পরিবারের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি।

প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, গত ১৩ মে সাতক্ষীরা রেঞ্জের বুড়িগোয়ালিনী স্টেশন থেকে বৈধ পাস নিয়ে সুন্দরবনে প্রবেশ করেন আমিনুরসহ চার জেলে। সোমবার সকাল ৭টার দিকে খুলনা রেঞ্জের নলিয়ান স্টেশনের পাটকোস্টা হেলাবাসী অভয়ারণ্য এলাকায় কাঁকড়া আহরণের সময় বনবিভাগের স্মার্ট পেট্রোলিং টিম তাদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। এতে ঘটনাস্থলেই নিহত হন আমিনুর রহমান গাজী।

এ ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়লে সোমবার বিকেলে শত শত বনজীবী ও স্থানীয় বাসিন্দা মরদেহ নিয়ে বুড়িগোয়ালিনী এলাকায় বনবিভাগের সাতক্ষীরা রেঞ্জ অফিস ও স্টেশন অফিসে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে যান। একপর্যায়ে তারা অফিসে হামলা, ভাঙচুর ও বনকর্মীদের মারধর করেন বলে অভিযোগ ওঠে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বিক্ষুব্ধ জনতা অফিসের আসবাবপত্র ভাঙচুরের পাশাপাশি কর্মীদের খুঁজে বের করে মারধর করে। এতে বনকর্মী তপন, মেজবাহ, ফারুক, এখলাছুর ও ফায়জুর আহত হন।

খবর পেয়ে বিজিবি ও পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং আহত বনকর্মীদের উদ্ধার করে শ্যামনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে।

শ্যামনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খালেদুর রহমান জানান, জেলে নিহতের ঘটনা এবং পরবর্তী হামলা-ভাঙচুরের পর এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তবে এখনো কোনো পক্ষ লিখিত অভিযোগ বা মামলা দায়ের করেনি। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

গাবুরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জিএম মাছুদুল আলম জানান, নিহত আমিনুর রহমানের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য সাতক্ষীরা সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে। ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ আজ বিকেলে গাবুরায় নিয়ে গিয়ে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হবে। পুরো গাবুরা ইউনিয়নে এখন শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

Ads small one

আজ সুপার সাইক্লোন’ আম্পানের ৬ বছর: ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি উপকূলের কয়েক লাখ মানুষ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ২০ মে, ২০২৬, ৯:৪২ পূর্বাহ্ণ
আজ সুপার সাইক্লোন’ আম্পানের ৬ বছর: ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি উপকূলের কয়েক লাখ মানুষ

মো. আসাদুজ্জামান সরদার: আজ ২০ মে। এদিনে সাতক্ষীরা উপকূলসহ গোটা জেলায় আঘাত হেনেছিল সুপার সাইক্লোন আম্পান। ছয় বছর পেরিয়ে গেলেও সেই ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছে সাতক্ষীরার উপকূল। আর্থিক ক্ষতি কাটিয়ে আজো ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি উপকূলের কয়েক লাখ মানুষ। ২০২০ সালের ২০ মে সুপার সাইক্লোন আম্পানের তা-বের স্মৃতি আজও ভুলতে পারেনি তারা।

আবহাওয়া অফিসের তথ্যমতে, ২০২০ সালের ২০ মে সাতক্ষীরা উপকূলে ঝড়ের সর্বোচ্চ গতিবেগ একপর্যায়ে ঘণ্টায় ১৪৮ কিলোমিটারে পৌঁছায়। টানা ১৫ ঘণ্টা চলে ঝড়, সৃষ্টি হয় ১২ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাস। প্রাথমিক হিসাবে ক্ষক্ষতির পরিমাণ ছিল প্রায় ১১০০ কোটি টাকা।

জেলা প্রশাসনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সাতক্ষীরায় ঘূর্ণিঝড় আম্পানের আঘাতে ১২ হাজার ৬৯৮টি মৎস্য ঘেরে ১৭৬ কোটি ৫ লাখ টাকার ক্ষতি হয়। কৃষিতে ১৩৭ কোটি ৬১ লাখ ৩০ হাজার টাকার ক্ষতির মধ্যে রয়েছেÑ৬৫ কোটি ১৮ লাখ ৪০ হাজার টাকার আম, ৬২ কোটি ১৬ লাখ টাকার সবজি, ১০ কোটি ২২ লাখ ৪০ হাজার টাকার পান এবং ২ লাখ ৫০ হাজার টাকার তিল। পশু সম্পদ খাতে ক্ষতির পরিমাণ ছিল ৯৫ লাখ ৪৮ হাজার ৬১৬ টাকা।

 

আম্পানের তা-বে জেলার মোট ৮৩ হাজার ৪১৩টি ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছিল; এর মধ্যে সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয় ২২ হাজার ৫১৫টি এবং আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয় ৬০,৯১৬টি। এছাড়া জেলার ৮১ কিলোমিটার রাস্তা এবং ৫৬ দশমিক ৫০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

আম্পানের আঘাতে সাতক্ষীরা উপকূলের শ্যামনগরের বুড়িগোয়ালিনী, গাবুরা, পদ্মপুকুর, কাশিমাড়ি এবং আশাশুনি উপজেলার শ্রীউলা ও প্রতাপনগর ইউনিয়নের অধিকাংশ বেড়িবাঁধ ভেঙে এলাকা প্লাবিত হয়। মেরামত করতে না পারায় দীর্ঘ দুই বছরের বেশি সময় ধরে এই ইউনিয়নগুলোর হাজার হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে ছিল। বহু এলাকায় প্লাবিত লোকালয়ের মধ্যেই নিয়মিত জোয়ার-ভাটা চলেছে এবং দুর্গত পরিবারগুলোকে নদীর ঢেউয়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করতে হয়েছে।

প্রতাপনগরের বাসিন্দা সাইদুল ইসলাম জানান, সেই দিনের কথা আজও আমাদের মনে আছে। ঘূর্ণিঝড় আইলায় আমাদের এলাকায় খুব বেশি ক্ষতি হয়নি, কিন্তু ‘আম্পান’ ঘূর্ণিঝড়ের সময়ে বেড়িবাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছিল। দুই বছরের বেশি সময় ধরে লোকালয়ে জোয়ার-ভাটা চলেছিল। ফলে ঘরবাড়ি, কৃষিজমি ও মৎস্যঘের মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

তিনি আরো বলেন, ঘূর্ণিঝড়ের বছরগুলো পেরিয়ে গেলেও উপকূলীয় এলাকার মানুষ এখনো মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারেনি। এখনো জোয়ারের জলোচ্ছ্বাসের আতঙ্ক, ভয় এবং কাজকর্মের তীব্র অভাব রয়েছে। একই সঙ্গে যোগাযোগব্যবস্থাও এখনো বিভিন্ন সমস্যার তিমিরে নিমজ্জিত। এলাকার মূল দাবি-রিং বাঁধের বদলে বেড়িবাঁধের মজবুত ও স্থায়ী টেকসই নির্মাণ হওয়া চাই। কয়েকটি জায়গায় সংস্কার করা হলেও অধিকাংশ জায়গায় ধস রয়েছে।

 

যেকোনো সময়ে প্রবল জোয়ারের চাপে এই বাঁধগুলো ভেঙে বিস্তীর্ণ এলাকা আবারও প্লাবিত হতে পারে।”
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড-এর তথ্য অনুযায়ী, শ্যামনগর, আশাশুনি ও সাতক্ষীরার উপকূলীয় অঞ্চলের বেশ কিছু বেড়িবাঁধ এখনো ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এদিকে, মেগা প্রকল্পের আওতায় শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা ইউনিয়নে বেড়িবাঁধ উন্নয়ন কাজ চলমান রয়েছে।

গাবুরা ইউপি চেয়ারম্যান মাসুদুল আলম বলেন, আম্পানের সেই ভয়াবহ ক্ষত ও দীর্ঘদিনের অবর্ণনীয় কষ্ট কাটিয়ে গাবুরার মানুষ এখন আবার নতুন করে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে। সরকারের বিশেষ নজরদারি পানি উন্নয়ন বোর্ডের সমন্বিত প্রচেষ্টায় ভাঙন কবলিত প্রধান পয়েন্টগুলোতে টেকসই ও আধুনিক বেড়িবাঁধ নির্মাণের কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে। বর্তমানে এখানে বড় আকারের মেগা প্রকল্প চলমান রয়েছে, যার কাজ শেষ হলে এই এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের কষ্ট অনেক কমে যাবে। আমরা আশাবাদী, এই প্রকল্পগুলো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে গাবুরা তথা পুরো উপকূলীয় অঞ্চল সম্পূর্ণ নিরাপদ হবে এবং এই জনপদের মানুষ টেকসই সুরক্ষাসহ নতুন করে তাদের কর্মসংস্থান ও মাথা গোঁজার ঠাঁই ফিরে পাবে।

প্রতাপনগর ইউপি চেয়ারম্যান আবু দাউদ ঢালী জানান, ঘূর্ণিঝড় আম্পানের আঘাতে সাতক্ষীরার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল আমার প্রতাপনগর ইউনিয়ন। তবে সেই ভয়াবহ ক্ষত ও দীর্ঘদিনের অবর্ণনীয় কষ্ট কাটিয়ে প্রতাপনগর এখন আবার নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সাহায্য-সহযোগিতার মাধ্যমে এই ইউনিয়নকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আমরা দিনরাত কাজ করে যাচ্ছি। টেকসই বাঁধের কাজ সম্পন্ন হলে এবং এই চলমান পুনর্বাসন প্রক্রিয়া সফল হলে এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ চিরতরে দূর হবে বলে আমি বিশ্বাস করি।

খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আগুন

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ২০ মে, ২০২৬, ৯:২৭ পূর্বাহ্ণ
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আগুন

অনলাইন ডেস্ক: খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রধান ভবনের তৃতীয় তলায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। আজ বুধবার ভোর ৬টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। ফায়ার সার্ভিসের ১০ ইউনিটের প্রায় এক ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে।

জানা গেছে, ভোর ৬টার দিকে আগুন লাগার খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছায় ফায়ার সার্ভিসের তিনটি ইউনিট। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পরে আরো সাতটি ইউনিট যোগ দেয়। প্রায় এক ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হন ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা।

 

এ ব্যাপারে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু না জানালেও কয়েকজন কর্মচারীরা জানান, হাসপাতালের প্রধান ভবনের তৃতীয় তলায় অপারেশন থিয়েটারে এ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। কক্ষটি তালাবদ্ধ ছিল।

 

এদিকে আগুন লাগার খবরে পুরো হাসপাতালজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেক রোগী ও তাদের স্বজনরা শয্যা ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে আসেন। তবে এ ঘটনায় কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।

 

ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক সরকার মাসুদ জানান, ধারণা করা হচ্ছে বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকেই আগুনের সূত্রপাত। তবে কেউ হতাহত হননি। ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের কাজ চলছে।

চুকনগর গণহত্যা: ভদ্রা নদীর রক্তস্রোত আর এক ‘সুন্দরী’র বেঁচে থাকার ইতিহাস

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ২০ মে, ২০২৬, ১:০৪ পূর্বাহ্ণ
চুকনগর গণহত্যা: ভদ্রা নদীর রক্তস্রোত আর এক ‘সুন্দরী’র বেঁচে থাকার ইতিহাস

সরদার এম এ মজিদ
খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার চুকনগর বাজার। ১৯৭১ সালের ২০ মে এই জনপদেই সংঘটিত হয়েছিল ইতিহাসের অন্যতম নৃশংস ও বৃহত্তম গণহত্যা। ভারতে আশ্রয় নেওয়ার উদ্দেশ্যে আসা ১০ থেকে ১৫ হাজার শরণার্থী সেদিন ট্রানজিট হিসেবে চুকনগর বাজারে জড়ো হয়েছিলেন। বাগেরহাটের রামপাল, মোড়লগঞ্জ, কচুয়া, শরণখোলা, মংলা এবং খুলনার দাকোপ, বটিয়াঘাটাসহ বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ ঘরবাড়ি, জমিজমার মায়া ত্যাগ করে স্রেফ প্রাণ বাঁচাতে এখানে এসেছিলেন।
১৯ মে রাত থেকেই চুকনগরের পাতাখোলা বিল, কাঁচাবাজার, চাঁদনী ফুটবল মাঠ, কালীমন্দির ও ভদ্রা নদীর ঘাট সংলগ্ন এলাকায় তিল ধারণের জায়গা ছিল না। কেউ দূর-দূরান্ত থেকে হেঁটে, কেউ নৌকায় বা গাড়িতে এসে কেবল একটু জিরিয়ে নিচ্ছিলেন। কেউ খাচ্ছিলেন চিঁড়ে-মুড়ি, কেউবা দুপুরের রান্নার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। কিন্তু স্থানীয় কিছু দুষ্কৃতকারী এই বিপুল জমায়েতের খবর পৌঁছে দেয় সাতক্ষীরার পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ক্যাম্পে।
২০ মে সকাল নয়টার দিকে একটি ট্যাংক ও একটি সাজোঁয়া জিপ নিয়ে সাতক্ষীরা-চুকনগর মহাসড়ক ধরে মালতিয়া মোড়ের ঝাউতলায় এসে থামে পাকিস্তানি সেনারা। গাড়ির শব্দ থামায় পাশে পাটক্ষেতে কর্মরত মালতিয়া গ্রামের বৃদ্ধ চিকন আলী মোড়ল (৭০) উঁকি দিয়ে দেখার চেষ্টা করেন। মুক্তিযোদ্ধারা ওঁৎ পেতে আছে ভেবে পাকিস্তানি সেনারা তাৎক্ষণিক চিকন আলীকে গুলি করে হত্যা করে।
ওই গুলির শব্দে হাজার হাজার মানুষের মধ্যে হুড়োহুড়ি ও দিক-বিদিক ছোটাছুটি শুরু হয়ে যায়। আর তখনই নির্বিচারে ব্রাশফায়ার শুরু করে হানাদাররা। যুবক, বৃদ্ধ, নারী কিংবা শিশু—কারো প্রতি দয়া দেখায়নি তারা। প্রাণভয়ে শত শত মানুষ ভদ্রা নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়লে, নদীর বুকেও গুলি চালানো হয়। মুহূর্তের মধ্যে ভদ্রা নদীর পানি রক্তে লাল হয়ে যায়। দোকানপাটের অলিগলি বা কালভার্টের নিচে লুকিয়েও শেষ রক্ষা হয়নি অনেকের। মাত্র দুই থেকে তিন ঘণ্টার এই তা-বে চুকনগর পরিণত হয় এক বিশাল লাশের স্তূপে।
গণহত্যার পরদিন, অর্থাৎ শুক্রবার সকালে মালতিয়া গ্রামের এরশাদ আলী মোড়ল তাঁর নিহত বাবা চিকন আলীর লাশের সন্ধানে ওই বধ্যভূমিতে যান। প্রতিটি লাশের মুখ দেখার সময় হঠাৎ তাঁর চোখ আটকে যায় এক মর্মস্পর্শী দৃশ্যে। তিনি দেখেন, এক মৃত মায়ের লাশের ওপর পড়ে আছে আনুমানিক ৫-৬ মাসের এক কন্যাসন্তান, যে তখনও মায়ের স্তন চোষার চেষ্টা করছে।
চোখের জল মুছতে মুছতে এরশাদ আলী সেই পরিচয়হীন শিশুটিকে কোলে তুলে বাড়ি নিয়ে যান এবং আদর করে নাম রাখেন ‘সুন্দরী’।
লোকমুখে কুড়িয়ে পাওয়া এই শিশুর খবর ছড়িয়ে পড়লে কেশবপুর থানার মঙ্গলকোটের কালিয়া গ্রামের নিঃসন্তান মাদার দাস দম্পতি শিশুটিকে লালন-পালনের আগ্রহ প্রকাশ করেন। জাতি-ধর্মের ঊর্ধ্বে উঠে মানবিক কারণে এরশাদ আলী ও স্থানীয়রা শিশুটিকে মাদার দাসের হাতে তুলে দেন।
মাদার দাসের ঘরেই সুন্দরী আস্তে আস্তে বড় হয়ে ওঠেন। ১৫ বছর বয়সে তাঁর বিয়ে হয় চুকনগরের মালতিয়া গ্রামের দিনমজুর বাটুল দাসের সঙ্গে। অত্যন্ত দরিদ্র বাটুল দাসের ঘরে সুমনের মা ও ডেভিড দাসের মা হিসেবে সুন্দরীর চরম অর্থকষ্টের সংসারজীবন শুরু হয়।
পরবর্তীতে বিভিন্ন গণমাধ্যম, সাংবাদিক ও গবেষকদের লেখালিখির মাধ্যমে চুকনগর গণহত্যার এই জীবন্ত সাক্ষীর কথা দেশজুড়ে জানাজানি হয়। একপর্যায়ে বিষয়টি সরকারের দৃষ্টিগোচর হলে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের পক্ষ থেকে সুন্দরীর স্থায়ী বাসস্থানের জন্য চুকনগরের নন্দী বাড়ির পেছনে ১১ শতক জমি ও একটি বাড়ি উপহার দেওয়া হয়।
আজ স্বামী, সন্তান ও নাতি-নাতনিদের নিয়ে সেই সরকারি বাড়িতেই সুন্দরীর দিন কাটছে। তিনি আজ শুধু একজন সাধারণ নারী নন, বরং ১৯৭১ সালের ২০ মে চুকনগরের সেই ভয়াবহ নৃশংসতার এক জীবন্ত ও ঐতিহাসিক সাক্ষী। বিশ্বের ইতিহাসে এই মর্মন্তুদ দিনটি যেন চিরস্মরণীয় হয়ে থাকে এবং সুন্দরীর জীবনসংগ্রাম যেন ইতিহাসের পাতায় যথাযথভাবে লিপিবদ্ধ হয়Ñআজকের দিনে এটাই সকলের প্রত্যাশা।