আমচাষী সুরক্ষায় প্রয়োজন সাতক্ষীরার পাইকারি বাজার সম্প্রসারণ

উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরা আজ দেশের আম অর্থনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ নাম। ভৌগোলিক অবস্থান, জলবায়ু ও মাটির বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কারণে এ জেলার আম শুধু আগেভাগে পাকে না, স্বাদ ও গুণগত মানেও আলাদা পরিচিতি পেয়েছে। গ্রাম থেকে শহর—পুকুরপাড় থেকে বাড়ির আঙিনা—সবখানেই আমগাছের উপস্থিতি যেন এই অঞ্চলের কৃষি ঐতিহ্যের জীবন্ত প্রতীক।
চলতি মৌসুমে প্রায় ৪০০ কোটি টাকার আম বিক্রি ও রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। হিমসাগর, আ¤্রপালি, ন্যাংড়া, গোবিন্দভোগ ও গোপালভোগসহ ৩০-৪০টি জাতের আম শুধু দেশীয় বাজারেই নয়, আন্তর্জাতিক বাজারেও ধীরে ধীরে জায়গা করে নিচ্ছে। ২০১৫ সাল থেকে বিদেশে রপ্তানির জন্য চেষ্টা শুরু করে কৃষি বিভাগ। তবে ২০১৬ সাল থেকে সাতক্ষীরার আম প্রথম ইটালীতে রপ্তানির মাধ্যমে বিদেশের মাটিতে আম রপ্তানি শুরু হওয়া এবং ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে এর চাহিদা তৈরি হওয়াÑএটি বাংলাদেশের কৃষিপণ্যের জন্য ইতিবাচক বার্তা।
প্রশাসনের কেমিক্যালমুক্ত আম উৎপাদন এবং ক্যালেন্ডারভিত্তিক ৫ মে সংগ্রহ কার্যক্রম চালুর উদ্যোগ প্রশংসনীয়। এতে ভোক্তার স্বাস্থ্য সুরক্ষার পাশাপাশি অপরিপক্ক আম বাজারজাত হওয়া নিয়ন্ত্রণে আসছে। নির্ধারিত সময় অনুযায়ী আম সংগ্রহ শুরু হওয়ায় চাষিরাও ভালো দাম পাওয়ার আশা করছেন। ঐদিন সদর উপজেলার ফিংড়ি ইউনিয়নের আমচাষি আবু সাইদের বাগানে আয়োজিত অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে আম সংগ্রহ কার্যক্রমের উদ্বোধন করা হয়। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জেলা প্রশাসক (ভারপ্রাপ্ত) বিষ্ণুপদ পাল। তিনি জানান, আম এখন এক গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনার দ্বারপ্রান্তে। প্রাকৃতিক অনুকূলতা, চাষিদের অভিজ্ঞতা ও প্রশাসনিক উদ্যোগ—সবই রয়েছে। এখন প্রয়োজন সমন্বিত পরিকল্পনা ও কার্যকর বাস্তবায়ন। বাজার ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন ও রপ্তানি কাঠামো শক্তিশালী করা গেলে সাতক্ষীরার আম শুধু দেশের গর্বই নয়, আন্তর্জাতিক বাজারেও একটি শক্তিশালী ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারবে। আজ থেকে বিভিন্ন জাতের আম সংগ্রহ শুরু হওয়া এই ব্যবস্থাপনাকে আরও সুসংগঠিত করেছে।
তবে গোবিন্দভোগ, গোপালভোগ, হিমসাগর, ল্যাংড়া ও আম্রপালি আম দেশ—বিদেশে বেশ কদর অর্জন করেছে। ফলে বাজারে আগে ওঠায় তুলনামূলক ভালো দাম আশা করেন এখানকার চাষিরা। এই আশাব্যঞ্জকের আড়ালে একটি বড় সমস্যা ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছেÑবাজার ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা।
জেলা কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫—২৬ মৌসুমে সাতক্ষীরায় মোট ৪ হাজার ১৩৭ হেক্টর জমিতে আমের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে হিমসাগর ১ হাজার ৫৫৫ হেক্টর, আম্রপালি ৮৯৯ হেক্টর, ন্যাংড়া ৫৬৪ হেক্টর, গোবিন্দভোগ ৩৮২ হেক্টর, গোপালভোগ ২১৯ হেক্টর, লতা ১৪৩ হেক্টর, মল্লিকা ৮০ হেক্টর, বোম্বাই ৫০ হেক্টর, হাঁড়িভাঙ্গা ২ হেক্টর ও অন্য স্থানীয় জাত ২৪৩ হেক্টর জমিতে চাষ হয়েছে। উপজেলাভিত্তিক আবাদে সাতক্ষীরা সদর উপজেলায় ১,২৫০ হেক্টর, কলারোয়ায় ৬৫৮, তালায় ৭১৫, দেবহাটায় ৩৭০, কালিগঞ্জে ৮৩৯, আশাশুনিতে ১৪৫ ও শ্যামনগরে ১৬০ হেক্টর জমিতে আমের আবাদ রয়েছে।
গত মৌসুমে জেলায় আম উৎপাদন হয়েছিল ৭০ হাজার ৮৮০ মেট্রিক টন। চলতি মৌসুমে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৭০ হাজার ৯০০ মেট্রিক টন, বিদেশে রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১০০ মেট্রিক টন আম। এছাড়াও জেলায় আমবাগানের সংখ্যা ৫ হাজার ২৯৯টি এবং মোট আমচাষির সংখ্যা ৫০ হাজার ৭৪৫ জন। এর মধ্যে নিবন্ধিত চাষি রয়েছেন ৩৫১ জন। তবে ৫০ হাজারের বেশি চাষির সম্পৃক্ততাÑএত বড় একটি খাতের জন্য একটি মাত্র পাইকারি বাজার কোনোভাবেই যথেষ্ট নয়। সুলতানপুর বড়বাজারকেন্দ্রিক বেচাকেনা চাষিদের জন্য ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জায়গার অভাব, যানজট ও বিশৃঙ্খলার কারণে তারা প্রায়ই ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তাই বাজার ব্যবস্থাপনা নিয়ে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করছেন আম চাষিরা। তাদের অভিযোগ, সাতক্ষীরায় একটি মাত্র বাজার (সাতক্ষীরা সুলতানপুর বড়বাজার) থাকায় সবাইকে সেখানেই আম বিক্রি করতে হচ্ছে। বাজার ও সংলগ্ন রাস্তায় পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় বিক্রির সময় চাষিদের পড়তে হচ্ছে নানা ভোগান্তিতে। এতে করে ন্যায্যমূল্য থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন তারা।
এখানেই মূল প্রশ্নÑসাতক্ষীরার আম কি শুধুই উৎপাদনের সাফল্যে সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি একটি পূর্ণাঙ্গ কৃষি অর্থনীতিতে রূপ নেবে? যদি দ্বিতীয়টি লক্ষ্য হয়, তবে বাজার সম্প্রসারণ, ভ্রাম্যমাণ পাইকারি হাট, সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং জেলা পর্যায়ে আম মেলার আয়োজন এখন সময়ের দাবি। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন হলে চাষিরা সরাসরি উপকৃত হবেন এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যও কমবে।
অন্যদিকে, রপ্তানি খাতেও স্থিতিশীলতা দরকার। এক বছরে ১২০ মেট্রিক টন, পরের বছরে ৮০, আবার ১০০Ñএই ওঠানামা প্রমাণ করে পরিকল্পনার ধারাবাহিকতার অভাব রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকতে হলে মান নিয়ন্ত্রণ, আধুনিক প্যাকেজিং ও কোল্ড চেইন ব্যবস্থার উন্নয়ন জরুরি।
সাতক্ষীরার আম এখন এক সম্ভাবনার মোড়ে দাঁড়িয়ে। প্রাকৃতিক সুবিধা, চাষির পরিশ্রম ও প্রশাসনিক উদ্যোগÑসবই আছে। যা প্রয়োজন, তা হলো সমন্বিত পরিকল্পনা ও কার্যকর বাজার ব্যবস্থাপনা। সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যদি দ্রুত পদক্ষেপ নেয়, তবে সাতক্ষীরার আম শুধু দেশের নয়, বৈশ্বিক বাজারেও বাংলাদেশের এক গর্বিত ব্র্যান্ড হয়ে উঠতে পারে। তাই চাষিদের দাবিÑআরও বাজার স্থাপন, আমচাষী সুরক্ষায় পাইকারি বাজার সম্প্রসারণ এবং আম মেলার আয়োজনÑএসবই বাস্তবসম্মত ও সময়োপযোগী প্রস্তাব। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়বে, সরবরাহ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আসবে এবং চাষিরা তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য পাবেন। একই সঙ্গে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হবে। লেখক: গণমাধ্যমকর্মী






