কৃষিখাতের সংকট ও সম্ভাবনা
মোহাম্মদ মুজাহিদ
কৃষি পণ্য পরিবহন সংকটে চাষীর কাঁধে ক্ষতির বোঝা বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি কৃষি। দেশের অধিকাংশ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। অথচ এই কৃষিখাতের প্রাণ চাষীরা আজও নানা সংকটে জর্জরিত। উৎপাদন খরচ বেড়েছে, প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি বেড়েছে, বাজারে ন্যায্য মূল্য পাওয়া কঠিন হয়েছে এসবের সঙ্গে নতুন করে যোগ হয়েছে কৃষি পণ্য পরিবহন সংকট। আর এই সংকটের ভার গিয়ে পড়ছে সরাসরি কৃষকের কাঁধে।
একজন কৃষক যখন মাঠে ফসল ফলান, তখন তার সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা থাকে সঠিক সময়ে সেই পণ্য বাজারে পৌঁছানো। কিন্তু বাস্তবতা হলো, গ্রামীণ সড়কের বেহাল অবস্থা, পর্যাপ্ত যানবাহনের অভাব, অতিরিক্ত ভাড়া এবং মাঝেমধ্যে প্রশাসনিক জটিলতার কারণে সেই পণ্য সময়মতো বাজারে পৌঁছাতে পারে না। ফলে নষ্ট হয় ফসল, কমে যায় মান, আর পড়ে যায় দাম।
বিশেষ করে পচনশীল কৃষি পণ্য যেমন শাকসবজি, ফলমূল, দুধ বা মাছ পরিবহনে সামান্য দেরিই বড় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। একদিকে চাষী উৎপাদনে সর্বোচ্চ শ্রম ও খরচ বিনিয়োগ করেন, অন্যদিকে বাজারে পৌঁছানোর আগেই যদি পণ্য নষ্ট হয়ে যায়, তবে সেই ক্ষতির দায়ভার তাকে একাই বহন করতে হয়। এতে করে কৃষকের আগ্রহ কমে যাচ্ছে, অনেকেই কৃষি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন যা ভবিষ্যতের জন্য ভয়াবহ সংকেত।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য। পরিবহন সংকটের সুযোগ নিয়ে তারা কৃষকের কাছ থেকে কম দামে পণ্য কিনে নেয়। কৃষক বাধ্য হয়ে লোকসানে বিক্রি করেন, কারণ তার কাছে পণ্য ধরে রাখার বা নিজে বাজারে নেওয়ার সুযোগ নেই। ফলে ভোক্তা পর্যায়ে দাম বাড়লেও, কৃষক তার ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত থাকেন।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য জরুরি ভিত্তিতে কিছু কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। প্রথমত, গ্রামীণ সড়কব্যবস্থার উন্নয়ন করতে হবে, যাতে সহজে ও দ্রুত পণ্য পরিবহন সম্ভব হয়। দ্বিতীয়ত, কৃষিপণ্য পরিবহনের জন্য বিশেষায়িত যানবাহন ও কোল্ড স্টোরেজ ব্যবস্থা বাড়াতে হবে। তৃতীয়ত, কৃষকদের জন্য পরিবহন খাতে ভর্তুকি বা সহায়তা প্রদান করা যেতে পারে, যাতে তারা ন্যায্য খরচে পণ্য বাজারে নিতে পারেন।
এছাড়া স্থানীয় পর্যায়ে কৃষক সমবায় গড়ে তুলে যৌথভাবে পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন করা যেতে পারে। এতে খরচ কমবে এবং কৃষকরা শক্তিশালী অবস্থানে দাঁড়াতে পারবেন। পাশাপাশি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সরাসরি বাজারের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করা গেলে মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাবও কমে আসবে।
কৃষি খাতকে টিকিয়ে রাখতে হলে কৃষকদের টিকিয়ে রাখা জরুরি। আর কৃষকদের টিকিয়ে রাখতে হলে তাদের উৎপাদিত পণ্য সঠিকভাবে বাজারে পৌঁছানোর নিশ্চয়তা দিতে হবে। নতুবা “ফসল আছে, কিন্তু লাভ নেই” এই দুঃখজনক বাস্তবতা আরও গভীর হবে।
সময়ের দাবি কৃষকের ঘাম ঝরানো ফসল যেন ন্যায্য মূল্য পায়, আর সেই পথের সবচেয়ে বড় বাধা পরিবহন সংকট দূর করতে হবে এখনই। না হলে কৃষকের কাঁধে ক্ষতির বোঝা আরও ভারী হতে থাকবে, যার প্রভাব পড়বে পুরো দেশের অর্থনীতির ওপর।












