ঘরের সরিষায় ঘরের তেল : সাতক্ষীরার মাটিতেই মিটবে চাহিদা
আখলাকুর রহমান
আমাদের শৈশবের সেই শীতের সোনালী দুপুরগুলোর কথা মনে পড়ে, যখন উঠোনজুড়ে রোদের ওমে মা-চাচিরা কড়া ঝাঁঝালো সরিষার তেল মেখে দিতেন শরীরে, আর রান্নাঘর থেকে ভেসে আসত খাঁটি তেলের ফোড়নের এক অবিনাশী সুবাস। সরিষার তেল কেবল আমাদের রসনাবিলাসের অনুষঙ্গ নয়, ওটা আমাদের মাটির ঘ্রাণ, আমাদের শেকড়ের এক পরম স্মৃতিমেদুর আত্মিক সন্তুষ্টি। অথচ আধুনিক করপোরেট বিজ্ঞাপনের মোড়কে এসে আজ সয়াবিন আর পাম তেলের মতো কৃত্রিম চর্বি আমাদের রান্নাঘর দখল করেছে, যা পুষ্টিগুণের দিক থেকে আমাদের সুস্থতাকে বিন্দুমাত্র তৃপ্তি দিতে পারছে না।
চিকিৎসাবিজ্ঞান স্পষ্টাক্ষরে বলছে, খাঁটি সরিষার তেলে থাকা ওমেগা-থ্রি এবং ওমেগা-সিক্স ফ্যাটি অ্যাসিড আমাদের হৃদযন্ত্রকে সুরক্ষিত রাখে এবং শরীরের ক্ষতিকর কোলেস্টেরল কমাতে সাহায্য করে। আজ যখন এই ভোজ্য তেলের বাজারে কৃত্রিমতার আগ্রাসন দেখি, তখন আমাদের নিজেদের উর্বর জেলা সাতক্ষীরার দিগন্তজোড়া হলুদ সরিষা ক্ষেতগুলোর দিকে তাকালে এক অপার সম্ভাবনা এবং একই সাথে চরম আত্মবিস্মৃতির গল্প মনে পড়ে।
একটি সাধারণ গাণিতিক হিসাব ও কৃষি গবেষণার দিকে নজর দিলে এই মাটির আসল শক্তি টের পাওয়া যায়। সাতক্ষীরা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, সাতক্ষীরার সাতটি উপজেলায় প্রতি বছর গড়ে প্রায় ১২ থেকে ১৩ হাজার হেক্টর জমিতে উন্নত জাতের দেশী সরিষা চাষ হয়, যা থেকে প্রায় ১৮ থেকে ২০ হাজার মেট্রিক টন সরিষা উৎপাদিত হচ্ছে।
অন্যদিকে, পুষ্টিবিজ্ঞানীদের মতে একজন সুস্থ মানুষের বছরে গড়ে প্রায় ১০ থেকে ১২ লিটার ভোজ্য তেল গ্রহণ করা উচিত এবং সেই হিসাবে সাতক্ষীরার প্রায় বাইশ লাখ মানুষের জন্য বছরে তেলের মোট চাহিদা দাঁড়ায় সর্বোচ্চ ২২ থেকে ২৪ হাজার মেট্রিক টন। অর্থাৎ, আমরা যদি আমাদের উৎপাদিত এই বিপুল পরিমাণ দেশী সরিষাকে আধুনিক ও স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে শতভাগ দেশী প্রযুক্তিতে পুরোপুরি প্রক্রিয়াজাত বা ক্রাসিং করতে পারি, তবে বাইরের কোনো আমদানিকৃত সয়াবিনের মুখাপেক্ষী না হয়েই সাতক্ষীরার সিংহভাগ মানুষের বার্ষিক তেলের চাহিদা এই নিজেদের মাটি থেকেই পূরণ করা সম্ভব।
কিন্তু এই বিপুল সম্ভাবনা আজ মার খাচ্ছে সঠিক বিপণন, প্রক্রিয়াজাতকরণের আধুনিক অভাব এবং আমাদের নিজেদের অবহেলার কারণে। আমাদের স্থানীয় প্রশাসন এবং উদ্যোক্তাদের উচিত খ-িত চিন্তার বৃত্ত থেকে বের হয়ে সাতক্ষীরার এই খাঁটি সরিষাকে কেন্দ্র করে একটি সুসংগঠিত উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে কোনো রাসায়নিকের ভেজাল ছাড়াই ঘানির সেই আদিম ও খাঁটি ঝাঁঝ অক্ষুণ্ন থাকবে।
ইসলামে খাঁটি ও হালাল রিজিকের ওপর বিশেষ তাগিদ দেওয়া হয়েছে এবং নিজের হাতের উপার্জনকে সর্বোত্তম বলা হয়েছে, যা আমাদের এই দেশী কৃষিভিত্তিক আত্মনির্ভরতার দর্শনকেই সমর্থন করে। করপোরেট সয়াবিনের ক্ষতিকর চর্বিতে নিজেদের লিভার আর হার্টকে বিপন্ন না করে, আমাদের আবার সেই মাটির খাঁটি ঐতিহ্যের কাছেই ফিরে যেতে হবে।
এই আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের যুগে সাতক্ষীরার সাধারণ মানুষের মুখে এবং পত্রিকার পাতায় এই কঠিন সত্যটিই উচ্চারিত হওয়া প্রয়োজন যে, মাটির সোনা মাটিতে রেখে পরমুখাপেক্ষী হওয়ার চেয়ে বড় ট্র্যাজেডি আর কিছু হতে পারে না; আমাদের ঘরের সরিষা আর ঘানির যুগলবন্দিতেই লুকিয়ে আছে সাতক্ষীরার মানুষের স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক মুক্তির আসল মহাকাব্য।
লেখক : উদ্যোক্তা ও স্বপ্নদ্রষ্টা : আসিফা












