স্নানযাত্রা: ভক্তি, সমতা ও আত্মশুদ্ধির এক চিরন্তন মহোৎসব
সচ্চিদানন্দ দে সদয়
সোমবার পূর্ণিমা তিথি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে এক বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ দিন। এই দিনেই পালিত হয় ভগবান শ্রী জগন্নাথদেব-এর পবিত্র স্নানযাত্রা মহোৎসব। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, এই দিনে ভগবান জগন্নাথ, বলদেব, সুভদ্রা এবং সুদর্শন চক্র-কে ১০৮টি কলশের সুগন্ধি ও পবিত্র জলে মহাঅভিষেক করানো হয়। লক্ষ লক্ষ ভক্তের বিশ্বাস, এই মহোৎসবের দর্শন ও স্মরণ মানুষকে ঈশ্বরের প্রতি আরও নিবেদিত হতে উদ্বুদ্ধ করে এবং আত্মশুদ্ধির পথ প্রশস্ত করে। তবে এসব আধ্যাত্মিক ফলাফল ধর্মীয় বিশ্বাসের অংশ, যা ব্যক্তিগত আস্থার ওপর নির্ভরশীল।
স্নানযাত্রা কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়; এটি ভারতীয় উপমহাদেশের হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, মানবিক মূল্যবোধ এবং সমতার দর্শনের এক অনন্য প্রতীক। এমন এক সময়ে, যখন সমাজে বিভাজন, অসহিষ্ণুতা, ভোগবাদ এবং নৈতিক অবক্ষয়ের নানা চিত্র সামনে আসে, তখন জগন্নাথের এই মহোৎসব আমাদের মনে করিয়ে দেয়Ñধর্মের মূল শিক্ষা মানুষকে ভালোবাসা, বিনয়, আত্মসংযম ও সহমর্মিতার পথে পরিচালিত করা। বৈষ্ণব ঐতিহ্যে প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, ব্রহ্মার মানসপুত্র স্বায়ম্ভুব মনু ভগবানের দর্শন লাভের জন্য কঠোর তপস্যা ও যজ্ঞ সম্পন্ন করেন। সেই যজ্ঞবেদী থেকেই জ্যৈষ্ঠ পূর্ণিমায় ভগবান জগন্নাথের আবির্ভাব ঘটে বলে বিশ্বাস করা হয়।
আবির্ভাবের পর তিনি সুগন্ধি ও শীতল জলে অভিষেক করার নির্দেশ দেন, যাতে ভক্তসমাজ পবিত্রতার শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে। পরবর্তীকালে রাজা ইন্দ্রদ্যু¤œ স্বপ্নাদেশ পেয়ে পুরীতে জগন্নাথ, বলদেব, সুভদ্রা ও সুদর্শন চক্রকে প্রতিষ্ঠা করেন এবং ১০৮টি কলশের জল দিয়ে মহাঅভিষেকের সূচনা করেন বলে ঐতিহ্যে বর্ণিত রয়েছে। সেই ধারা আজও অব্যাহত রয়েছে। ইতিহাস ও ধর্মীয় ঐতিহ্য এখানে একে অপরের পরিপূরক। গবেষকরা যেমন এই উৎসবের সাংস্কৃতিক বিবর্তন বিশ্লেষণ করেন, তেমনি ভক্তরা এটিকে ভগবানের লীলারূপে অনুভব করেন।
এই দ্বৈত দৃষ্টিভঙ্গিই স্নানযাত্রাকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।হিন্দু দর্শনে ১০৮ সংখ্যার বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। জপমালার দানা ১০৮টি, বহু মন্ত্র ১০৮ বার জপের বিধান রয়েছে, আবার বিভিন্ন শাস্ত্রেও ১০৮ সংখ্যাকে পূর্ণতার প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। তাই ১০৮ কলশের জল দিয়ে ভগবানের স্নান কেবল একটি আচার নয়; এটি পূর্ণ আত্মসমর্পণ ও সর্বাঙ্গীণ পবিত্রতার প্রতীক। স্নানযাত্রার পর ভগবান প্রায় পনেরো দিন সাধারণ দর্শনের বাইরে থাকেন। এই সময়কে “অনবসর” বলা হয়। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, অতিরিক্ত স্নানের কারণে তিনি অসুস্থ হন এবং সেবায়েতরা তাঁকে সেবা করেন। এই কাহিনির অন্তর্নিহিত শিক্ষা গভীর। ঈশ্বর নিজেই মানুষের জীবনের সুখ-দুঃখ, অসুস্থতা ও বিশ্রামের প্রতীকী অভিজ্ঞতার সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করেছেন।
ভক্তদের জন্য এটি ধৈর্য, অপেক্ষা এবং বিশ্বাসের শিক্ষা। এরপর নবযৌবন দর্শন এবং রথযাত্রার মাধ্যমে নতুন উদ্যমে তাঁর আবির্ভাব যেন পুনর্জাগরণের বার্তা বহন করে। জগন্নাথ সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো সর্বজনীনতা। স্নানযাত্রার দিন ভগবান নিজেই মন্দির থেকে বেরিয়ে আসেন, যেন তিনি মানুষের কাছে পৌঁছে যান। এখানে জাতপাতের বিভাজন, ধনী-গরিবের ভেদ কিংবা সামাজিক মর্যাদার পার্থক্য গৌণ হয়ে যায়।
আজকের পৃথিবীতে ধর্মের নামে যখন বিভেদ সৃষ্টি হয়, তখন জগন্নাথের এই উৎসব আমাদের শেখায়Ñসত্যিকারের ধর্ম মানুষকে বিভক্ত করে না; বরং একত্রিত করে। স্নানযাত্রার মূল শিক্ষা বাহ্যিক নয়, অন্তর্নিহিত। যেমন ভগবানের বিগ্রহ পবিত্র জলে স্নাত হয়, তেমনি মানুষের মনও হিংসা, লোভ, অহংকার, প্রতারণা ও বিদ্বেষ থেকে মুক্ত হওয়া উচিত। যদি একজন মানুষ প্রতিদিন অন্যকে কষ্ট দেয়, দুর্নীতি করে, অসত্য বলে, কিন্তু বছরে একদিন বড় আয়োজন করে পূজা করেÑতবে ধর্মের প্রকৃত উদ্দেশ্য পূরণ হয় না।
প্রকৃত ভক্তি হলো চরিত্রে সততা, আচরণে নম্রতা এবং সমাজের প্রতি দায়িত্বশীলতা। বর্তমান সময়ে মানুষ প্রযুক্তিতে যত এগিয়েছে, মানসিক শান্তি যেন তত দূরে সরে গেছে। প্রতিযোগিতা, ভোগবাদ, সামাজিক অস্থিরতা এবং পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা মানুষের জীবনে চাপ বাড়াচ্ছে। এমন বাস্তবতায় স্নানযাত্রা আমাদের মনে করিয়ে দেয়Ñঅন্তরের পরিচ্ছন্নতা বাহ্যিক চাকচিক্যের চেয়ে বড়। মানুষে মানুষে ভালোবাসাই ধর্মের মূল ভিত্তি।
অহংকার নয়, বিনয় মানুষকে মহৎ করে। ঈশ্বরের আরাধনা তখনই অর্থবহ, যখন তা মানুষের কল্যাণে প্রতিফলিত হয়। ধর্মীয় উৎসব মানেই কেবল আলোকসজ্জা বা আয়োজন নয়। যদি স্নানযাত্রা উপলক্ষে অসহায় মানুষকে খাদ্য সহায়তা দেওয়া যায়, হাসপাতালের রোগীদের পাশে দাঁড়ানো যায়, গাছ লাগানো যায়, পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখা যায় কিংবা অসহায় শিশুদের মুখে হাসি ফোটানো যায়Ñতবে সেটিই হবে ভগবানের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা। জগন্নাথের দর্শন মানুষের মধ্যে সেবার মনোভাব জাগ্রত করুকÑএটাই হওয়া উচিত আমাদের প্রত্যাশা।
বাংলাদেশেও বিভিন্ন জগন্নাথ মন্দিরে স্নানযাত্রা ও রথযাত্রা উপলক্ষে পূজা, কীর্তন, প্রসাদ বিতরণ এবং ধর্মীয় আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এসব অনুষ্ঠান শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়; বরং সম্প্রীতি, সংস্কৃতি এবং সামাজিক সৌহার্দ্যেরও বাহক। বাংলাদেশের বহুত্ববাদী সমাজে এ ধরনের উৎসব পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহাবস্থানের পরিবেশকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।স্নানযাত্রা আমাদের শেখায়Ñমানুষের প্রকৃত পরিচয় তার ধর্মীয় পরিচয়ে নয়, তার মানবিকতায়। ভগবান জগন্নাথের করুণাময় দর্শনের মূল শিক্ষা হলো ভালোবাসা, সমতা, আত্মশুদ্ধি এবং মানবকল্যাণ।
আমরা যদি এই উৎসবের বাহ্যিক আচার পালনের পাশাপাশি অন্তরের অশুচিতা দূর করতে পারি, অন্যের প্রতি সহানুভূতিশীল হতে পারি, সততা ও ন্যায়ের পথে চলতে পারি, তবেই স্নানযাত্রার প্রকৃত তাৎপর্য উপলব্ধি করা সম্ভব হবে। ভক্তদের বিশ্বাস অনুযায়ী, ভগবানের স্নানযাত্রা দর্শন আত্মিক কল্যাণের এক বিরল সুযোগ। আর সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি এমন এক উৎসব, যা মানুষকে বিভেদ ভুলে একসঙ্গে চলার আহ্বান জানায়।
লেখক: সংবাদ কর্মী












