পানি প্রবাহ যেখানে, সাম্যের হাসি সেখানে
সচ্চিদানন্দ দে সদয়
বাংলাদেশ-নদীমাতৃক দেশের এক অনন্য উদাহরণ। এই ভূখ-ের জন্ম, বিকাশ ও সভ্যতা গড়ে উঠেছে নদী, খাল-বিল ও পানির ওপর নির্ভর করে। অথচ সময়ের বিবর্তনে সেই পানিই আজ সংকটের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। বিশ্ব পানি দিবস-২০২৬-এর প্রতিপাদ্য “পানি প্রবাহ যেখানে, সাম্যের হাসি সেখানে” আমাদের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন তুলে ধরে-বাংলাদেশে কি সত্যিই পানি প্রবাহ আছে? আর থাকলেও তা কি সবার জন্য সমানভাবে নিশ্চিত? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের চোখে পড়ে এক জটিল বাস্তবতা-কোথাও পানি বেশি, কোথাও কম; কোথাও পানির গুণগত মান ভয়াবহ, কোথাও প্রাপ্যতা সীমিত; কোথাও নদী শুকিয়ে যাচ্ছে, আবার কোথাও বন্যা গ্রাস করছে জনপদ। এই বৈপরীত্যই বাংলাদেশের পানি ব্যবস্থাপনার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ৭০০টিরও বেশি নদী রয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এদের অনেকই আজ মৃতপ্রায়। নদীর নাব্যতা হ্রাস, দখল, দূষণ এবং অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণের কারণে নদীগুলোর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে। পদ্মা, যমুনা, মেঘনার মতো প্রধান নদীগুলো এখনো শক্তিশালী হলেও দেশের অভ্যন্তরীণ অসংখ্য শাখা নদী ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। এসব নদী হারিয়ে যাওয়ার অর্থ শুধু পানি হারানো নয়; এটি কৃষি, মৎস্য, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ওপর সরাসরি আঘাত। নদীর প্রবাহ কমে যাওয়ায় ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ বাড়ছে। ফলে একদিকে নদী শুকিয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে মাটির নিচের পানি দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে-যা একটি দ্বিমুখী সংকট তৈরি করছে। বাংলাদেশে পানি সংকটের অন্যতম বড় দিক হলো এর বৈষম্য। শহরের একটি শ্রেণি সহজেই বোতলজাত পানি কিনতে পারে, কিন্তু গ্রামের দরিদ্র মানুষকে অনেক দূর হেঁটে পানি আনতে হয়। রাজধানী ঢাকায় ওয়াসার মাধ্যমে পানি সরবরাহ থাকলেও তার মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অনেক এলাকায় পানির রং, গন্ধ ও স্বাদ নিয়ে অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে, গ্রামীণ এলাকায় এখনো অনেক মানুষ নিরাপদ পানির বাইরে রয়েছে। এই বৈষম্য কেবল ভৌগোলিক নয়; এটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক। দরিদ্র জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে। ফলে পানি সংকট একটি সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল, বিশেষ করে সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাট অঞ্চলে লবণাক্ততা একটি বড় সমস্যা। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, জলোচ্ছ্বাস এবং ভেড়িবাঁধের দুর্বলতার কারণে লবণ পানি ভেতরে ঢুকে পড়ছে। এর ফলে কৃষিজমি অনাবাদি হয়ে যাচ্ছে, পানীয় পানির সংকট বাড়ছে এবং মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে উঠছে। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে দূর-দূরান্ত থেকে মিঠা পানি সংগ্রহ করছে। নারীরা এবং শিশুরা সবচেয়ে বেশি কষ্ট পাচ্ছে। বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে আবার ভিন্ন চিত্র। এখানে শুষ্ক মৌসুমে খরা দেখা দেয়। বৃষ্টিপাত কম হওয়ায় কৃষি উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার কারণে পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। ফলে কৃষকরা সেচের জন্য পর্যাপ্ত পানি পাচ্ছেন না। এই অঞ্চলে পানি সংকট খাদ্য নিরাপত্তার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। শহরে পানি সংকট একটু ভিন্ন রূপে দেখা দেয়। এখানে পানির প্রাপ্যতা থাকলেও মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। শিল্প বর্জ্য, পয়ঃনিষ্কাশন এবং প্লাস্টিক দূষণের কারণে নদী ও খাল দূষিত হচ্ছে। ফলে পানি পরিশোধন করা কঠিন হয়ে পড়ছে। ঢাকার আশপাশের নদীগুলোর অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। অনেক নদী কার্যত মৃত হয়ে গেছে। বাংলাদেশের নদীগুলো আজ দূষণের ভারে ন্যুব্জ। শিল্প বর্জ্য, রাসায়নিক পদার্থ, প্লাস্টিক এবং গৃহস্থালি বর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলা হচ্ছে।
এর ফলে পানির গুণগত মান নষ্ট হচ্ছে, মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণী বিলুপ্ত হচ্ছে এবং মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। দূষণ নিয়ন্ত্রণে আইন থাকলেও এর প্রয়োগ দুর্বল। বাংলাদেশে ভূগর্ভস্থ পানি একটি প্রধান উৎস। কিন্তু অতিরিক্ত উত্তোলনের কারণে পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। একই সঙ্গে আর্সেনিক সমস্যা এখনো পুরোপুরি সমাধান হয়নি। অনেক এলাকায় পানিতে আর্সেনিকের মাত্রা বিপজ্জনক। এটি একটি নীরব স্বাস্থ্য সংকট তৈরি করছে। জলবায়ু পরিবর্তন বাংলাদেশের পানি সংকটকে আরও জটিল করে তুলছে। ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, খরা, জলোচ্ছ্বাস-সবকিছুই পানির স্বাভাবিক চক্রকে ব্যাহত করছে। ভবিষ্যতে এই সমস্যা আরও তীব্র হতে পারে। বাংলাদেশে পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিভিন্ন নীতি থাকলেও বাস্তবায়নে ঘাটতি রয়েছে। বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের অভাব, দুর্বল মনিটরিং এবং রাজনৈতিক প্রভাব বড় বাধা। বাংলাদেশে পানি খাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তারা নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কাজ করছে। তবে তাদের কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করা প্রয়োজন। দেশের বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয় উদ্যোগে পানি সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনায় ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, কমিউনিটি ব্যবস্থাপনা-এসব উদ্যোগ টেকসই সমাধানের পথ দেখাচ্ছে। বাংলাদেশের পানি সংকট মোকাবেলায় জরুরি কিছু পদক্ষেপ-নদী পুনরুদ্ধার, দূষণ নিয়ন্ত্রণ, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণ, ভূগর্ভস্থ পানির সঠিক ব্যবহার, জনসম্পৃক্ততা বৃদ্ধি।
এখনই সময় পানি সংকট এখন আর ভবিষ্যতের আশঙ্কা নয়; এটি বর্তমান বাস্তবতা। “পানি প্রবাহ যেখানে, সাম্যের হাসি সেখানে”-এই প্রতিপাদ্য বাস্তবায়ন করতে হলে আমাদের সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। সরকার, উন্নয়ন সংস্থা এবং জনগণের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই সংকট মোকাবেলা সম্ভব নয়। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আমরা আজ কী সিদ্ধান্ত নিই তার ওপর। এখনই যদি আমরা সচেতন না হই, তবে আগামী প্রজন্মের জন্য একটি ভয়াবহ পানি সংকট রেখে যাব। লেখক: সংবাদ কর্মী












