বর্জ্যের স্তূপে মরণদশা আদি যমুনার, শ্যামনগরে জলাবদ্ধতার শঙ্কা
পীযূষ বাউলিয়া পিন্টু, মুন্সিগঞ্জ (শ্যামনগর): যে নদীতে একসময় শ্যাওলা-কচুরিপানার ফুল ফুটত, ভেসে বেড়াত নানা প্রজাতির মাছ; সেই নদী এখন রূপ নিয়েছে ময়লা-আবর্জনা আর মশা তৈরির কারখানায়। সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার বুক চিরে বয়ে যাওয়া ঐতিহাসিক ‘আদি যমুনা’ নদীটি এখন পরিণত হয়েছে পৌরসভার অঘোষিত ডাস্টবিনে।
ব্যবসায়ী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, প্রতিদিন রাতের আঁধারে বাজারের অপচনশীল প্লাস্টিক বর্জ্য ও ক্ষতিকর কেমিক্যালযুক্ত তরল বর্জ্য ফেলা হচ্ছে নদীতে। এতে নদীর পানি ও পরিবেশ যেমন দূষিত হচ্ছে, তেমনি ছড়াচ্ছে তীব্র দুর্গন্ধ।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের (বাপাউবো) উদ্যোগে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে শ্যামনগরের শ্মশানঘাটা থেকে কালীগঞ্জের কাঁকশিয়ালী নদীর মোহনা পর্যন্ত আদি যমুনা নদীটি খনন করা হয়েছিল। খননের পর নদীতে পানি প্রবাহ শুরু হলেও দুই বছর যেতে না যেতেই উপজেলার ভেতরের প্রায় দুই কিলোমিটার অংশ বর্জ্যের স্তূপে ভরাট হয়ে গেছে। এর ওপর চলছে অবৈধ দখলদারদের থাবা।
ইতিহাসবিদ সতীশচন্দ্র মিত্রের ‘যশোর-খুলনার ইতিহাস’ গ্রন্থেও এই আদি যমুনার ঐতিহাসিক গুরুত্বের উল্লেখ রয়েছে। এই নদীর তীরেই গড়ে উঠেছিল ঐতিহ্যবাহী যশোরেশ্বরী কালী মন্দির, মোগল আমলের ঐতিহাসিক মসজিদ, উপমহাদেশের প্রথম গির্জা ও জমিদার বাড়ি। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বারুণী স্নানের মহোৎসবও এই নদীর বুকেই উদযাপিত হয়। আদি যমুনা নদীটি শ্যামনগর ও কালীগঞ্জ উপজেলার প্রায় ৮টি ইউনিয়নের পানি নিষ্কাশনের একমাত্র প্রধান মাধ্যম।
যমুনা বাঁচাও আন্দোলন কমিটির সদস্যসচিব সাবেক অধ্যক্ষ আশেক ই এলাহী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “পত্রপত্রিকায় লেখালেখি হলেও প্রশাসন কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না। আসন্ন বর্ষা মৌসুমের আগে এই বর্জ্য অপসারণ করা না হলে শ্যামনগরের অন্তত ৪ থেকে ৫টি ইউনিয়ন ভয়াবহ জলাবদ্ধতার শিকার হবে।”
ডিপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট মাসুদুল আলম দোহা বলেন, শ্যামনগরকে পৌরসভা করা হলেও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কোনো বালাই নেই। বিগত সরকারের আমলে নদী খননের নামে বড় অঙ্কের টাকা লোপাট হয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, লোকদেখানো মাটি কেটে পাড়ে রাখা হয়েছিল, যার তদন্ত হওয়া দরকার।
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা সিডিও’র নির্বাহী পরিচালক গাজী আল ইমরান জানান, বর্জ্য ও অবৈধ দখলের কারণে নদীর জোয়ার-ভাটা বন্ধ হয়ে গেছে। এমনকি নদীটির নাম পরিবর্তন করে ‘যমুনা খাল’ করারও চক্রান্ত চলছে।
পরিবেশকর্মী শেখ কামরুজ্জামান বলেন, ককশিট, ওয়ানটাইম কাপ ও ওষুধের অপচনশীল বর্জ্য ফেলার কারণে নদীটির মাছ, কাঁকড়া ও কচ্ছপসহ জলজ প্রাণবৈচিত্র্য আজ বিলুপ্তির পথে। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ টিকিয়ে রাখতে এবং আসন্ন বর্ষায় শহরকে জলাবদ্ধতার হাত থেকে বাঁচাতে দ্রুত নদীটি পরিষ্কার ও দখলমুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল ও পরিবেশকর্মীরা।








