সরকারি কাজে জামায়াত নেতার বিরুদ্ধে চাঁদা দাবির অভিযোগ
শ্যামনগরে নদী রক্ষা বাঁধ প্রকল্প হুমকির মুখে
পত্রদূত রিপোর্ট: সাতক্ষীরার শ্যামনগরে জাইকা ও বাংলাদেশ সরকারের যৌথ অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন একটি গুরুত্বপূর্ণ নদীভাঙন প্রতিরোধ ও বাঁধ সুরক্ষা প্রকল্প বন্ধের মুখে পড়েছে। স্থানীয় এক ইউপি চেয়ারম্যান ও জামায়াত নেতার বিরুদ্ধে বারবার কাজ বন্ধ করা, মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
পরিস্থিতি এতটাই বেগতিক যে, প্রকল্পের নিরাপত্তা নিশ্চিত ও অনুকূল পরিবেশ তৈরির দাবি জানিয়ে সাতক্ষীরার জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (বাপাউবো) প্রকল্প পরিচালক ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোহাম্মদ আরিফুজ্জামান ভূঁইয়া।
অভিযুক্ত ব্যক্তির নাম হাজী মো. নজরুল ইসলাম। তিনি শ্যামনগর উপজেলার ৯নম্বর বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এবং উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর কর্মপরিষদ ও শুরা সদস্য।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, খোলপেটুয়া, মালঞ্চ ও কালিন্দী নদীর তীররক্ষা এবং বাঁধ সংস্কারের এই প্রকল্পের প্রায় ৬০ শতাংশ কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। পোল্ডার-৫ এলাকার পূর্ব দুর্গাবাটি, পশ্চিম দুর্গাবাটি, দাতিনাখালী ও ঝাপালিতে জিওব্যাগ ডাম্পিং ও সিসি ব্লক স্থাপনের কাজ করছে ‘ডিএল-উন্নয়ন (জেভি)’ ও ‘ডকইয়ার্ড অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস লিমিটেড’-এর পক্ষে সাব-ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান ‘আর-রাদ করপোরেশন’।
গত ১৩ মে জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠানো একাধিক পৃষ্ঠার অভিযোগপত্রে বলা হয়, শুরু থেকেই চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম কাজ বন্ধ করতে নানা চাপ সৃষ্টি করে আসছিলেন। গত বছরের ২ সেপ্টেম্বর তিনি সরাসরি প্রকল্প কার্যালয়ে গিয়ে বড় অঙ্কের চাঁদা দাবি করেন। চাঁদা না দিলে অফিস ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও যন্ত্রপাতি নষ্ট করার হুমকি দেওয়া হয়।
বিষয়টি নিয়ে এর আগে সেনাবাহিনী ক্যাম্প, জেলা প্রশাসন ও থানায় লিখিত অভিযোগ করা হলেও কোনো কার্যকর প্রতিকার মেলেনি বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগপত্রে আরও জানা যায়, গত ১৪ এপ্রিল পূর্ব দুর্গাবাটি এলাকায় মানববন্ধনের নামে একদল বহিরাগত ও স্থানীয় জামায়াত নেতাকর্মীকে সাথে নিয়ে প্রকল্প এলাকায় চড়াও হন চেয়ারম্যান। সেখানে কর্মরত শ্রমিক ও কর্মকর্তাদের মারধরের পাশাপাশি একটি স্কেভেটর (মাটি কাটার যন্ত্র) চালক ও তার সহকারীকে ভেতরে আটকে রেখে আগুন দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। পরে সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এই ঘটনার পর থেকে শ্রমিকদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে এবং অনেকেই কাজ ছেড়ে চলে গেছেন।
আর-রাদ করপোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. সবুজ আলী খান অভিযোগ করেন, “চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে প্রকল্প পরিদর্শনে গেলে চেয়ারম্যানের পক্ষ থেকে আমার কাছে ১২ লাখ টাকা কমিশন (চাঁদা) দাবি করা হয়। টাকা না দেওয়ায় এখন শ্রমিক ও সাব-ঠিকাদারদের হুমকি দিয়ে কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। পুরো প্রকল্প এখন ঝুঁকির মুখে।”
এর আগে গত ১৫ এপ্রিল নির্মাণাধীন বাঁধের একাংশ ভেঙে ফেলে প্রায় ১০ লাখ টাকার ক্ষতি করা হয়েছে বলেও থানায় অভিযোগ করেছিল ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানটি।
চাঁদা দাবি ও হুমকির অভিযোগ অস্বীকার করে বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হাজী মো. নজরুল ইসলাম বলেন, “সরকারি সামাজিক বনায়নের জায়গায় অবৈধভাবে ব্লক নির্মাণের চেষ্টা করা হচ্ছিল। পরিবেশ রক্ষার স্বার্থেই আমি এলাকাবাসীকে নিয়ে বাধা দিয়েছি। আমার বিরুদ্ধে আনা চাঁদা দাবির অভিযোগ সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং জমি সংক্রান্ত পূর্ব বিরোধের জের।”
পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা বলছেন, বর্ষা মৌসুমের আগে সিসি ব্লক ও বাঁধ সুরক্ষার কাজ শেষ না হলে জোয়ারের পানিতে বিস্তূর্ণ এলাকা প্লাবিত হবে। জনবসতি ও কৃষিজমি বিলীন হওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সহযোগী সংস্থা জাইকার কাছে বাংলাদেশ সরকারের ভাবমূর্তিও ক্ষুণœ হবে।
যোগাযোগ করা হলে সাতক্ষীরার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক শেখ মঈনুল ইসলাম মঈন জানান, বিষয়টি তারা মুখে শুনলেও এখনো দাপ্তরিকভাবে লিখিত অভিযোগ পাননি। অভিযোগ পেলে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সাতক্ষীরার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এস. এম. রাজু আহমেদ বলেন, “নতুন পুলিশ সুপার যোগদান করেছেন, বিষয়টি এখনো আমাদের নজরে আসেনি। তবে সরকারি উন্নয়নমূলক কাজ বাস্তবায়নের স্বার্থে জেলা পুলিশ সব ধরনের সহযোগিতা করবে।”








