সুন্দরবনে ‘বনরক্ষীদের গুলিতে’ জেলের মৃত্যু, বন কার্যালয়ে হামলা ও ভাঙচুর, বিজিবি মোতায়েন
শ্যামনগর প্রতিনিধি: সুন্দরবনের অভয়ারণ্য এলাকায় কাঁকড়া ধরার সময় বনবিভাগের টহল দলের ছোড়া গুলিতে আমিনুর রহমান (৪৫) নামে এক জেলে নিহত হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। সোমবার (১৮ মে) সকালে সুন্দরবনের খুলনা রেঞ্জের পাটকোস্টার ঝিলে (শতমুখি খাল) এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। নিহত আমিনুর সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা ইউনিয়নের ৯ নম্বর সোরা গ্রামের মৃত আকছেদ আলী গাজীর ছেলে। তিনি তিন সন্তানের জনক ছিলেন।
এদিকে বনরক্ষীদের গুলিতে জেলে নিহতের খবর ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় বনজীবীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও উত্তেজনা দেখা দেয়। একপর্যায়ে বিকেল চারটার দিকে দুই শতাধিক বিক্ষুব্ধ বনজীবী দলবদ্ধ হয়ে বনবিভাগের সাতক্ষীরা রেঞ্জ ও বুড়িগোয়ালিনী স্টেশন কার্যালয়ে হামলা চালান। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলাকায় পুলিশ ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) মোতায়েন করা হয়েছে।
নিহত আমিনুরের সহযোগী জেলে আহম্মদ মোড়ল জানান, তিন দিন আগে বনবিভাগের কাছ থেকে পাস (অনুমতিপত্র) নিয়ে দুটি নৌকায় করে তারা চারজন সুন্দরবনে কাঁকড়া ধরতে যান। সোমবার সকাল সাতটার দিকে খুলনা রেঞ্জের পাটকোস্টার ঝিলে এলাকায় নৌকায় বসে তারা কাঁকড়া শিকার করছিলেন। এ সময় পার্শ্ববর্তী টহল ফাঁড়ির ইনচার্জ মোবারক হোসেনের নেতৃত্বে বনবিভাগের খুলনা স্মার্ট পেট্রোল টিমের সদস্যরা তাদের ডাক দেন। এতে ভয় পেয়ে জেলেরা সাড়া না দিয়ে পালানোর চেষ্টা করলে পেছন থেকে এক রাউন্ড গুলি ছোড়া হয়। এতে ঘটনাস্থলেই আমিনুর রহমান গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। পরবর্তীতে দুপুর একটার দিকে সহযোগীরা তার মরদেহ নিয়ে এলাকায় ফিরে আসেন।
এদিকে জেলে নিহতের ঘটনায় ক্ষুব্ধ বনজীবীরা বিকেল চারটার দিকে সাতক্ষীরা রেঞ্জ অফিস ও পার্শ্ববর্তী বুড়িগোয়ালীনি স্টেশন অফিসে চড়াও হন। তারা প্রায় ৪০ মিনিট ধরে ইটপাটকেল নিক্ষেপ, সীমানা বেড়া ও আসবাবপত্র ভাঙচুর করেন। হামলায় একজন ফরেস্টারসহ পাঁচজন বনকর্মী আহত হয়েছেন।
আহতরা হলেনÑফরেস্টার শেখ মো. ফারুক আহমেদ (৫৫), বনরক্ষী মো. মেজবাউল ইসলাম (৪৫), ফায়জুর রহমান (৪০), আজাদুল ইসলাম (৪২) ও স্বেচ্ছাসেবক এখলাছুর রহমান (২৭)। তাদের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে।
বুড়িগোয়ালিনী স্টেশন কর্মকর্তা ফজলুর রহমান জানান, হামলার বিষয়টি আঁচ করতে পেরে তারা আগেই প্রশাসনকে অবহিত করেছিলেন। পরে পুলিশ ও বিজিবি এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
ঘটনার পর থেকে এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশের পাশাপাশি নীলডুমুর ১৭ ব্যাটালিয়নের বিজিবি সদস্যরা টহল দিচ্ছেন।
নীলডুমুর ১৭ ব্যাটালিয়নের লেফটেন্যান্ট কমান্ডার ফরিদুল ইসলাম ও সহকারী পরিচালক নূর হোসেনের নেতৃত্বে পুরো এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বিজিবির এই টহল কার্যক্রম চলমান থাকবে বলে জানা গেছে।
গাবুরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাসুদুল আলম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “জলদস্যুরা সুন্দরবনজুড়ে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করলেও বনবিভাগ বা কোস্টগার্ড তাদের টিকিটি ছুঁতে পারছে না। অথচ নিরীহ জেলেদের ওপর গুলি চালিয়ে লাখ লাখ বনজীবীর মনে ভীতি ছড়ানো হচ্ছে।” তিনি ইতিমধ্যে খুলনার ডিএফও, সাতক্ষীরার এসিএফ ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) বিষয়টি জানিয়েছেন।
জানতে চাইলে সাতক্ষীরা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) মো. মশিউর রহমান বলেন, “বর্তমানে সুন্দরবনে দস্যু দমনে বনবিভাগ ও কোস্টগার্ডের যৌথ অভিযান চলছে। ঘটনাটি খুলনা রেঞ্জে ঘটেছে। প্রকৃতপক্ষে কাদের গুলিতে ওই জেলের মৃত্যু হয়েছে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। তবে তদন্তে কোনো বনরক্ষীর সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ মিললে অবশ্যই প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শামসুজ্জাহান কনক বলেন, “গুলিতে এক বনজীবী নিহতের ঘটনায় উপকূলীয় এলাকায় উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল, যা থেকে কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে। বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। অপরাধী যেই হোক না কেন, তাকে আইনের আওতায় আনার জন্য পুলিশকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।”








