বাংলাদেশের লোকজ সংস্কৃতি-সংকট, পরিবর্তন ও উত্তরণের পথ
সচ্চিদানন্দ দে সদয়
একটি জাতির আত্মপরিচয় নির্মাণে ভাষা, ইতিহাস ও সংস্কৃতি একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। এই তিনের সমন্বয়ে গড়ে ওঠে জাতিসত্তা, আর সেই সত্তার সবচেয়ে জীবন্ত প্রকাশ ঘটে সংস্কৃতির মাধ্যমে। বাংলাদেশ-একটি নদীমাতৃক, কৃষিনির্ভর, গ্রামীণ সমাজের ঐতিহ্যে গড়ে ওঠা দেশ-তার সংস্কৃতির দিক থেকে এক অসামান্য বৈচিতত্র্য ও ঐশ্বর্য্যরে অধিকারী। হাজার বছরের বিবর্তনে এখানে সৃষ্টি হয়েছে লোকজ ঐতিহ্যের এক বিস্তৃত ভা-ার, যা শুধু বিনোদনের উপাদান নয়, বরং মানুষের জীবনবোধ, সামাজিক সম্পর্ক, মূল্যবোধ ও চেতনার প্রতিফলন। কিন্তু বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন জাগে-এই ঐতিহ্য কি আগের মতো জীবন্ত আছে? নাকি আধুনিকতার প্রবল গ্রোতে ধীরে ধীরে তা বিলীন হয়ে যাচ্ছে? বাস্তবতা বলছে, বাংলাদেশের লোকজ সংস্কৃতি আজ এক জটিল সন্ধিক্ষণে অবস্থান করছে, যেখানে একদিকে রয়েছে প্রযুক্তি ও বিশ্বায়নের অগ্রযাত্রা, অন্যদিকে রয়েছে নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয় রক্ষার চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশের সংস্কৃতির মূল শিকড় গ্রামবাংলায় প্রোথিত। দীর্ঘকাল ধরে এ দেশের মানুষের জীবন ছিল কৃষিকেন্দ্রিক, প্রকৃতিনির্ভর এবং সামষ্টিক। সেই জীবনধারার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিল নানান উৎসব, আচার ও বিনোদনের মাধ্যম। নবান্ন উৎসব ছিল নতুন ফসল ঘরে তোলার আনন্দঘন মুহূর্ত, যা শুধু কৃষকের নয়, পুরো সমাজের জন্য ছিল এক উৎসব। একইভাবে বর্ষাকালে নদীভিত্তিক জীবনের প্রতিচ্ছবি হিসেবে নৌকাবাইচ ছিল এক অনন্য ঐতিহ্য। শীতকালে যাত্রাপালা, পুঁথিপাঠ, পালাগান-এসব ছিল বিনোদনের পাশাপাশি শিক্ষার মাধ্যম। এসবের মাধ্যমে সমাজের নৈতিকতা, ইতিহাস, ধর্মীয় কাহিনি ও সামাজিক বার্তা মানুষের কাছে পৌঁছে যেত। বৈশাখী মেলা ছিল অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যেখানে গ্রামীণ উৎপাদন, কারুশিল্প ও লোকজ শিল্পের বিকাশ ঘটত। এই সংস্কৃতিগুলো শুধু উৎসব নয়; এগুলো ছিল মানুষের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে তোলার মাধ্যম। প্রতিবেশী, আত্মীয়, বন্ধু-সবাই একত্রিত হয়ে আনন্দ ভাগাভাগি করত। ফলে সামাজিক বন্ধন দৃঢ় হতো, পারস্পরিক সহযোগিতা ও সহমর্মিতা বাড়ত। বিশ্বায়ন, নগরায়ণ ও প্রযুক্তির বিকাশ বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থায় এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। বিশেষ করে গত দুই দশকে মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও স্যাটেলাইট টেলিভিশনের বিস্তার মানুষের জীবনযাত্রায় আমূল পরিবর্তন এনেছে। এই পরিবর্তন একদিকে যেমন মানুষের জীবনকে সহজ ও গতিশীল করেছে, অন্যদিকে তা সংস্কৃতির ওপরও গভীর প্রভাব ফেলেছে। এখন মানুষ বিনোদনের জন্য আর গ্রামীণ উৎসব বা লোকজ আয়োজনের ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং তারা ঘরে বসেই বিশ্বব্যাপী নানা ধরনের বিনোদন উপভোগ করতে পারছে। ফলে ধীরে ধীরে লোকজ সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহ কমে যাচ্ছে। তরুণ প্রজন্ম, যারা ভবিষ্যতের ধারক-বাহক, তারা দেশীয় ঐতিহ্যের চেয়ে বিদেশি সংস্কৃতির প্রতি বেশি আকৃষ্ট হচ্ছে। এটি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হলেও, নিয়ন্ত্রণহীন হলে তা সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতার দিকে নিয়ে যেতে পারে। বর্তমানে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দেখা যাচ্ছে, একসময় জনপ্রিয় ছিল এমন অনেক লোকজ সংস্কৃতি প্রায় হারিয়ে গেছে। নবান্ন উৎসব এখন অনেক জায়গায় শুধুমাত্র আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ। নৌকাবাইচ আয়োজন কমে গেছে নদীর নাব্যতা সংকট ও পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে। যাত্রাপালা, যা একসময় গ্রামীণ বিনোদনের প্রাণ ছিল, এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে। পুঁথিপাঠ, বায়োস্কোপ, সাপ খেলা, লাঠিখেলা-এসব ঐতিহ্য এখন কেবল ইতিহাসের অংশ। বৈশাখী মেলাগুলোও তাদের আগের রূপ হারিয়ে ফেলেছে; অনেক ক্ষেত্রে তা বাণিজ্যিকতার কারণে স্বকীয়তা হারাচ্ছে। গ্রামীণ খেলাধুলা-যেমন দাড়িয়াবান্ধা, গোল্লাছুট, কানামাছি-এসবও এখন শিশুদের কাছে অপরিচিত হয়ে যাচ্ছে। তার জায়গা দখল করেছে মোবাইল গেম ও ভার্চুয়াল বিনোদন। সংস্কৃতির পরিবর্তন শুধু বিনোদনের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি মানুষের চিন্তা-চেতনা, মূল্যবোধ ও সামাজিক সম্পর্কেও প্রভাব ফেলছে। আগে যেখানে একটি উৎসব মানেই ছিল সম্মিলিত অংশগ্রহণ, এখন সেখানে ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা বেড়েছে। মানুষ এখন নিজ নিজ জগতে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে। পারস্পরিক যোগাযোগ কমে যাচ্ছে, ফলে সামাজিক বন্ধন দুর্বল হয়ে পড়ছে। সহমর্মিতা, সহযোগিতা ও সম্প্রীতির যে ঐতিহ্য ছিল, তা ধীরে ধীরে ক্ষীণ হয়ে যাচ্ছে। সংস্কৃতির পরিবর্তনের পেছনে পরিবেশগত কারণও গুরুত্বপূর্ণ। নদীর নাব্যতা হ্রাস, জলবায়ু পরিবর্তন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ-এসব কারণে অনেক ঐতিহ্যবাহী আয়োজন সম্ভব হচ্ছে না। যেমন, নদী ভরাট হয়ে যাওয়ায় নৌকাবাইচ আয়োজন কঠিন হয়ে পড়েছে। অর্থনৈতিক কারণও একটি বড় ভূমিকা রাখছে। গ্রামীণ মানুষ এখন জীবিকার চাপে আগের মতো সময় দিতে পারছে না। অনেক ক্ষেত্রেই ঐতিহ্যবাহী পেশাগুলো টিকে থাকতে পারছে না, ফলে সংশ্লিষ্ট সংস্কৃতিও হারিয়ে যাচ্ছে। অতীতে জমিদার বা স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা সাংস্কৃতিক আয়োজনের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। বর্তমানে সেই পৃষ্ঠপোষকতা কমে গেছে। সরকারি উদ্যোগ থাকলেও তা পর্যাপ্ত নয় এবং অনেক ক্ষেত্রে বাস্তবায়নে দুর্বলতা রয়েছে। একটি সমন্বিত সাংস্কৃতিক নীতির অভাবও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। লোকজ সংস্কৃতি সংরক্ষণে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও কার্যকর উদ্যোগের প্রয়োজন রয়েছে। এতসব চ্যালেঞ্জের মধ্যেও আশার আলো রয়েছে। বাংলাদেশে এখনও লোকজ সংস্কৃতির প্রতি মানুষের একটি আবেগ রয়েছে। পহেলা বৈশাখ উদযাপন, লোকসংগীতের জনপ্রিয়তা, গ্রামীণ মেলা-এসবই প্রমাণ করে যে সংস্কৃতি এখনও পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন-স্কুল-কলেজের পাঠ্যক্রমে লোকজ সংস্কৃতি অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। শিক্ষার্থীদের সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় নিয়মিত লোকজ উৎসব আয়োজন করতে হবে, যাতে মানুষ সরাসরি অংশগ্রহণের সুযোগ পায়। লোকশিল্পী ও কারুশিল্পীদের আর্থিক সহায়তা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে তারা তাদের কাজ চালিয়ে যেতে পারেন। টেলিভিশন, রেডিও ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে লোকজ সংস্কৃতি ভিত্তিক অনুষ্ঠান বাড়াতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে তরুণদের আকৃষ্ট করতে হবে। আধুনিক উপস্থাপনার মাধ্যমে ঐতিহ্যকে নতুনভাবে তুলে ধরতে হবে। সংস্কৃতি একটি জাতির আত্মা। এটি হারিয়ে গেলে জাতির পরিচয়ও সংকটে পড়ে। বাংলাদেশ তার হাজার বছরের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির জন্য বিশ্বে পরিচিত। এই ঐতিহ্য রক্ষা করা শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়; এটি প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব। আধুনিকতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হবে, কিন্তু সেই পথে যেন আমরা আমাদের শিকড় ভুলে না যাই। আমাদের প্রয়োজন একটি ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি-যেখানে আধুনিকতা ও ঐতিহ্য পাশাপাশি চলবে। আজ যদি আমরা সচেতন না হই, তাহলে আগামী প্রজন্ম শুধু বইয়ের পাতায় পড়বে নবান্ন, নৌকাবাইচ বা যাত্রাপালার গল্প। কিন্তু যদি আমরা এখনই উদ্যোগ নিই, তাহলে হয়তো আবারও ফিরে আসবে সেই হারানো দিন-যেখানে গ্রামবাংলা ভরে উঠবে উৎসবের আনন্দে, আর বাংলাদেশ তার নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয়ে বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে। লেখক: সংবাদ কর্মী












