সোমবার, ৮ জুন ২০২৬, ২৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
সোমবার, ৮ জুন ২০২৬, ২৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

বাংলাদেশের লোকজ সংস্কৃতি-সংকট, পরিবর্তন ও উত্তরণের পথ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: শুক্রবার, ১০ এপ্রিল, ২০২৬, ১১:৪৮ অপরাহ্ণ
বাংলাদেশের লোকজ সংস্কৃতি-সংকট, পরিবর্তন ও উত্তরণের পথ

সচ্চিদানন্দ দে সদয়
একটি জাতির আত্মপরিচয় নির্মাণে ভাষা, ইতিহাস ও সংস্কৃতি একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। এই তিনের সমন্বয়ে গড়ে ওঠে জাতিসত্তা, আর সেই সত্তার সবচেয়ে জীবন্ত প্রকাশ ঘটে সংস্কৃতির মাধ্যমে। বাংলাদেশ-একটি নদীমাতৃক, কৃষিনির্ভর, গ্রামীণ সমাজের ঐতিহ্যে গড়ে ওঠা দেশ-তার সংস্কৃতির দিক থেকে এক অসামান্য বৈচিতত্র্য ও ঐশ্বর্য্যরে অধিকারী। হাজার বছরের বিবর্তনে এখানে সৃষ্টি হয়েছে লোকজ ঐতিহ্যের এক বিস্তৃত ভা-ার, যা শুধু বিনোদনের উপাদান নয়, বরং মানুষের জীবনবোধ, সামাজিক সম্পর্ক, মূল্যবোধ ও চেতনার প্রতিফলন। কিন্তু বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন জাগে-এই ঐতিহ্য কি আগের মতো জীবন্ত আছে? নাকি আধুনিকতার প্রবল গ্রোতে ধীরে ধীরে তা বিলীন হয়ে যাচ্ছে? বাস্তবতা বলছে, বাংলাদেশের লোকজ সংস্কৃতি আজ এক জটিল সন্ধিক্ষণে অবস্থান করছে, যেখানে একদিকে রয়েছে প্রযুক্তি ও বিশ্বায়নের অগ্রযাত্রা, অন্যদিকে রয়েছে নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয় রক্ষার চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশের সংস্কৃতির মূল শিকড় গ্রামবাংলায় প্রোথিত। দীর্ঘকাল ধরে এ দেশের মানুষের জীবন ছিল কৃষিকেন্দ্রিক, প্রকৃতিনির্ভর এবং সামষ্টিক। সেই জীবনধারার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিল নানান উৎসব, আচার ও বিনোদনের মাধ্যম। নবান্ন উৎসব ছিল নতুন ফসল ঘরে তোলার আনন্দঘন মুহূর্ত, যা শুধু কৃষকের নয়, পুরো সমাজের জন্য ছিল এক উৎসব। একইভাবে বর্ষাকালে নদীভিত্তিক জীবনের প্রতিচ্ছবি হিসেবে নৌকাবাইচ ছিল এক অনন্য ঐতিহ্য। শীতকালে যাত্রাপালা, পুঁথিপাঠ, পালাগান-এসব ছিল বিনোদনের পাশাপাশি শিক্ষার মাধ্যম। এসবের মাধ্যমে সমাজের নৈতিকতা, ইতিহাস, ধর্মীয় কাহিনি ও সামাজিক বার্তা মানুষের কাছে পৌঁছে যেত। বৈশাখী মেলা ছিল অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যেখানে গ্রামীণ উৎপাদন, কারুশিল্প ও লোকজ শিল্পের বিকাশ ঘটত। এই সংস্কৃতিগুলো শুধু উৎসব নয়; এগুলো ছিল মানুষের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে তোলার মাধ্যম। প্রতিবেশী, আত্মীয়, বন্ধু-সবাই একত্রিত হয়ে আনন্দ ভাগাভাগি করত। ফলে সামাজিক বন্ধন দৃঢ় হতো, পারস্পরিক সহযোগিতা ও সহমর্মিতা বাড়ত। বিশ্বায়ন, নগরায়ণ ও প্রযুক্তির বিকাশ বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থায় এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। বিশেষ করে গত দুই দশকে মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও স্যাটেলাইট টেলিভিশনের বিস্তার মানুষের জীবনযাত্রায় আমূল পরিবর্তন এনেছে। এই পরিবর্তন একদিকে যেমন মানুষের জীবনকে সহজ ও গতিশীল করেছে, অন্যদিকে তা সংস্কৃতির ওপরও গভীর প্রভাব ফেলেছে। এখন মানুষ বিনোদনের জন্য আর গ্রামীণ উৎসব বা লোকজ আয়োজনের ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং তারা ঘরে বসেই বিশ্বব্যাপী নানা ধরনের বিনোদন উপভোগ করতে পারছে। ফলে ধীরে ধীরে লোকজ সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহ কমে যাচ্ছে। তরুণ প্রজন্ম, যারা ভবিষ্যতের ধারক-বাহক, তারা দেশীয় ঐতিহ্যের চেয়ে বিদেশি সংস্কৃতির প্রতি বেশি আকৃষ্ট হচ্ছে। এটি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হলেও, নিয়ন্ত্রণহীন হলে তা সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতার দিকে নিয়ে যেতে পারে। বর্তমানে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দেখা যাচ্ছে, একসময় জনপ্রিয় ছিল এমন অনেক লোকজ সংস্কৃতি প্রায় হারিয়ে গেছে। নবান্ন উৎসব এখন অনেক জায়গায় শুধুমাত্র আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ। নৌকাবাইচ আয়োজন কমে গেছে নদীর নাব্যতা সংকট ও পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে। যাত্রাপালা, যা একসময় গ্রামীণ বিনোদনের প্রাণ ছিল, এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে। পুঁথিপাঠ, বায়োস্কোপ, সাপ খেলা, লাঠিখেলা-এসব ঐতিহ্য এখন কেবল ইতিহাসের অংশ। বৈশাখী মেলাগুলোও তাদের আগের রূপ হারিয়ে ফেলেছে; অনেক ক্ষেত্রে তা বাণিজ্যিকতার কারণে স্বকীয়তা হারাচ্ছে। গ্রামীণ খেলাধুলা-যেমন দাড়িয়াবান্ধা, গোল্লাছুট, কানামাছি-এসবও এখন শিশুদের কাছে অপরিচিত হয়ে যাচ্ছে। তার জায়গা দখল করেছে মোবাইল গেম ও ভার্চুয়াল বিনোদন। সংস্কৃতির পরিবর্তন শুধু বিনোদনের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি মানুষের চিন্তা-চেতনা, মূল্যবোধ ও সামাজিক সম্পর্কেও প্রভাব ফেলছে। আগে যেখানে একটি উৎসব মানেই ছিল সম্মিলিত অংশগ্রহণ, এখন সেখানে ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা বেড়েছে। মানুষ এখন নিজ নিজ জগতে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে। পারস্পরিক যোগাযোগ কমে যাচ্ছে, ফলে সামাজিক বন্ধন দুর্বল হয়ে পড়ছে। সহমর্মিতা, সহযোগিতা ও সম্প্রীতির যে ঐতিহ্য ছিল, তা ধীরে ধীরে ক্ষীণ হয়ে যাচ্ছে। সংস্কৃতির পরিবর্তনের পেছনে পরিবেশগত কারণও গুরুত্বপূর্ণ। নদীর নাব্যতা হ্রাস, জলবায়ু পরিবর্তন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ-এসব কারণে অনেক ঐতিহ্যবাহী আয়োজন সম্ভব হচ্ছে না। যেমন, নদী ভরাট হয়ে যাওয়ায় নৌকাবাইচ আয়োজন কঠিন হয়ে পড়েছে। অর্থনৈতিক কারণও একটি বড় ভূমিকা রাখছে। গ্রামীণ মানুষ এখন জীবিকার চাপে আগের মতো সময় দিতে পারছে না। অনেক ক্ষেত্রেই ঐতিহ্যবাহী পেশাগুলো টিকে থাকতে পারছে না, ফলে সংশ্লিষ্ট সংস্কৃতিও হারিয়ে যাচ্ছে। অতীতে জমিদার বা স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা সাংস্কৃতিক আয়োজনের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। বর্তমানে সেই পৃষ্ঠপোষকতা কমে গেছে। সরকারি উদ্যোগ থাকলেও তা পর্যাপ্ত নয় এবং অনেক ক্ষেত্রে বাস্তবায়নে দুর্বলতা রয়েছে। একটি সমন্বিত সাংস্কৃতিক নীতির অভাবও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। লোকজ সংস্কৃতি সংরক্ষণে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও কার্যকর উদ্যোগের প্রয়োজন রয়েছে। এতসব চ্যালেঞ্জের মধ্যেও আশার আলো রয়েছে। বাংলাদেশে এখনও লোকজ সংস্কৃতির প্রতি মানুষের একটি আবেগ রয়েছে। পহেলা বৈশাখ উদযাপন, লোকসংগীতের জনপ্রিয়তা, গ্রামীণ মেলা-এসবই প্রমাণ করে যে সংস্কৃতি এখনও পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন-স্কুল-কলেজের পাঠ্যক্রমে লোকজ সংস্কৃতি অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। শিক্ষার্থীদের সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় নিয়মিত লোকজ উৎসব আয়োজন করতে হবে, যাতে মানুষ সরাসরি অংশগ্রহণের সুযোগ পায়। লোকশিল্পী ও কারুশিল্পীদের আর্থিক সহায়তা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে তারা তাদের কাজ চালিয়ে যেতে পারেন। টেলিভিশন, রেডিও ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে লোকজ সংস্কৃতি ভিত্তিক অনুষ্ঠান বাড়াতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে তরুণদের আকৃষ্ট করতে হবে। আধুনিক উপস্থাপনার মাধ্যমে ঐতিহ্যকে নতুনভাবে তুলে ধরতে হবে। সংস্কৃতি একটি জাতির আত্মা। এটি হারিয়ে গেলে জাতির পরিচয়ও সংকটে পড়ে। বাংলাদেশ তার হাজার বছরের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির জন্য বিশ্বে পরিচিত। এই ঐতিহ্য রক্ষা করা শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়; এটি প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব। আধুনিকতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হবে, কিন্তু সেই পথে যেন আমরা আমাদের শিকড় ভুলে না যাই। আমাদের প্রয়োজন একটি ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি-যেখানে আধুনিকতা ও ঐতিহ্য পাশাপাশি চলবে। আজ যদি আমরা সচেতন না হই, তাহলে আগামী প্রজন্ম শুধু বইয়ের পাতায় পড়বে নবান্ন, নৌকাবাইচ বা যাত্রাপালার গল্প। কিন্তু যদি আমরা এখনই উদ্যোগ নিই, তাহলে হয়তো আবারও ফিরে আসবে সেই হারানো দিন-যেখানে গ্রামবাংলা ভরে উঠবে উৎসবের আনন্দে, আর বাংলাদেশ তার নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয়ে বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে। লেখক: সংবাদ কর্মী

Ads small one

তথ্যের সত্যতা নিশ্চিতকরণে সচেতনতা ও ফ্যাক্ট-চেকিং শীর্ষক সেমিনার

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ৮ জুন, ২০২৬, ৩:৪৫ অপরাহ্ণ
তথ্যের সত্যতা নিশ্চিতকরণে সচেতনতা ও ফ্যাক্ট-চেকিং শীর্ষক সেমিনার

খুলনা আঞ্চলিক তথ্য অফিস পিআইডি’র আয়োজনে ‘তথ্যের সত্যতা নিশ্চিতকরণে সচেতনতা ও ফ্যাক্ট-চেকিং’ শীর্ষক দিনব্যাপী সেমিনার আজ (সোমবার) চুয়াডাঙ্গা ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত হয়। সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসক লুৎফুন নাহার।

সেমিনারে প্রধান অতিথি বলেন, আমরা তথ্য ভান্ডারের মধ্যে বসবাস করছি, যেখানে সব তথ্যের সত্যতা খালি চোখে যাচাই করা সম্ভব নয়। প্রত্যেক নাগরিক বুঝে হোক না বুঝে হোক প্রতিনিয়ত তথ্য শেয়ার করছেন। এতে অপতথ্যের অনিয়ন্ত্রিত ছড়াছড়ি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ সর্বত্র বৃদ্ধি পাচ্ছে। গুণগত শিক্ষার মতো গুণগত সংবাদ পরিবেশনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফ্যাক্ট চেকিং রাজনৈতিক নেতা, সরকারি দপ্তর ও সাংবাদিকদের কাজের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে। ফলস্বরূপ প্রত্যেক ঘটনার গ্রহণযোগ্যতা যেমন বৃদ্ধি পায় তেমনি জনগণের তথ্য অধিকার নিশ্চিত হয়। তিনি সাংবাদিকদের কোন প্রতিবেদন তৈরির পূর্বে গভীরভাবে পর্যালোচনা করতে এবং সত্য প্রকাশে অবিচল থাকতে অনুরোধ করেন। আঞ্চলিক তথ্য অফিস খুলনার আয়োজনে তথ্যের সত্যতা নিশ্চিতকরণে সচেতনতা ও ফ্যাক্ট চেকিং সেমিনারটি অত্যন্ত সময়োপযোগী বলে তিনি সংশ্লিষ্টদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন।

সেমিনারে মূলপ্রবন্ধ উপস্থাপন করেন খুলনা আঞ্চলিক তথ্য অফিসের সিনিয়র তথ্য অফিসার মো: মেহেদী হাসান। মূলপ্রবন্ধে অপতথ্যরোধে ফ্যাক্ট চেকিং এর গুরুত্ব তুলে ধরা এবং বিভিন্ন প্রয়োজনীয় টুলস সম্পর্কে ধারনা দেয়া হয়।

খুলনা আঞ্চলিক তথ্য অফিসের উপপ্রধান তথ্য অফিসার এ এস এম কবীরের সভাপতিত্বে সেমিনারে চুয়াডাঙ্গা জেলা তথ্য অফিসার শিল্পী মন্ডল, চুয়াডাঙ্গা প্রেসক্লাবের সভাপতি নাজমুল হক স্বপন, জেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি এ্যাড. মানিক আকবার-সহ অন্যান্য গণমাধ্যমকর্মীরা বক্তব্য রাখেন। সেমিনারটি সঞ্চালনা করেন সহকারী তথ্য অফিসার মোঃ রমজান আলী।

সেমিনারে চুয়াডাঙ্গার ৩৫ জন প্রিন্ট, ইলেক্ট্রনিক ও অনলাইন মিডিয়ার কর্মীরা অংশ নেন। তথ্যবিবরণী

ওয়েটার তত্ত্বের দেশে ক্যারিয়ারের মৃত্যু

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ৮ জুন, ২০২৬, ৩:৩৯ অপরাহ্ণ
ওয়েটার তত্ত্বের দেশে ক্যারিয়ারের মৃত্যু

মো: মামুন হাসান

বাংলাদেশে একজন শিক্ষার্থী যদি বলে সে ডাক্তার হতে চায়, আমরা তাকে বাহবা দিই। ইঞ্জিনিয়ার হতে চাইলে গর্ব করি। বিসিএসের প্রস্তুতি নিলে আত্মীয়স্বজন পর্যন্ত তাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। কিন্তু একই শিক্ষার্থী যদি বলে সে ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগে পড়তে চায়, তখন অনেকের মুখে একটাই প্রশ্ন শোনা যায় “হোটেলে চাকরি করবে নাকি?”

এই প্রশ্নটি শুধু একটি প্রশ্ন নয়; এটি আমাদের সমাজের দীর্ঘদিনের অজ্ঞতা, সংকীর্ণতা এবং পেশাগত বৈষম্যের প্রতিচ্ছবি। অবাক লাগে, যে সমাজ বিদেশে গিয়ে পাঁচতারকা হোটেলের সেবা দেখে মুগ্ধ হয়, সেই সমাজ নিজের দেশে হসপিটালিটি পেশাজীবীদের সম্মান দিতে কৃপণতা করে। যে অভিভাবক সন্তানকে বিদেশে পাঠিয়ে আন্তর্জাতিক হোটেলে চাকরি পেলে গর্ব করেন, তিনিই দেশে একই বিষয়ে পড়াশোনা করতে চাইলে নিরুৎসাহিত করেন।এর চেয়ে বড় আত্মবিরোধিতা আর কী হতে পারে?

বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের অন্যতম অবহেলিত অথচ সম্ভাবনাময় শিক্ষাখাত ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট। এই অবহেলার কারণ দক্ষতার অভাব নয়, সুযোগের অভাবও নয়; মূল সমস্যা আমাদের মানসিকতায়। আমরা এখনো মনে করি সাদা অ্যাপ্রোন পরলে সম্মান আছে, টাই পরে অফিসে বসলে মর্যাদা আছে, কিন্তু অতিথি ব্যবস্থাপনা, হোটেল পরিচালনা বা পর্যটন শিল্পে কাজ করলে সম্মান কমে যায়। অথচ বিশ্বের উন্নত দেশগুলো বহু আগেই এই সংকীর্ণ চিন্তা থেকে বেরিয়ে এসেছে।

সুইজারল্যান্ডের মতো দেশে হোটেল ম্যানেজমেন্ট একটি এলিট শিক্ষা হিসেবে বিবেচিত হয়। বিশ্বের অনেক রাষ্ট্রপ্রধান, ব্যবসায়ী এবং বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তারাও হসপিটালিটি বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। কারণ এই শিক্ষা মানুষকে শুধু হোটেল পরিচালনা নয়, নেতৃত্ব, যোগাযোগ, সংকট মোকাবিলা এবং মানুষকে বোঝার দক্ষতা শেখায়। কিন্তু বাংলাদেশে এখনো অনেক শিক্ষার্থী আত্মীয়স্বজনের কটূক্তির ভয়ে এই বিষয়ে ভর্তি হতে সাহস পায় না। আরেকটি প্রশ্ন আমাদের বিবেককে নাড়া দেওয়া উচিত। দেশের বড় বড় পাঁচতারকা হোটেলগুলোতে বিদেশি শেফ, বিদেশি কনসালট্যান্ট, বিদেশি ম্যানেজার কেন কাজ করেন? তারা কি আমাদের চেয়ে বেশি মেধাবী? অবশ্যই নয়। তাদের বড় শক্তি হলো তারা এমন সমাজ থেকে এসেছে, যেখানে দক্ষতাকে সম্মান করা হয়। আর আমরা এখনো ডিগ্রির নাম দেখে সম্মান দিই, দক্ষতার মূল্য নয়। ফলে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা বিদেশে চলে যাচ্ছে।

 

যে পদগুলোতে বাংলাদেশের তরুণরা কাজ করতে পারত, সেগুলোতে বিদেশিরা নিয়োগ পাচ্ছে। আমরা একদিকে বেকারত্বের অভিযোগ করছি, অন্যদিকে কর্মসংস্থানের একটি বিশাল ক্ষেত্রকে অবজ্ঞা করছি। এটা কি আত্মঘাতী নয়? আরও দুঃখজনক হলো, দেশের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিষয়ে পড়াশোনার সুযোগ থাকলেও সে বিষয়ে সচেতনতা তৈরির উদ্যোগ খুবই সীমিত। ক্যারিয়ার গাইডেন্সে এই খাতের আলোচনা প্রায় অনুপস্থিত। যেন এটি কোনো গুরুত্বপূর্ণ পেশাই নয়, কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ উল্টো।

বিশ্ব অর্থনীতিতে পর্যটন ও আতিথেয়তা শিল্প এখন অন্যতম বৃহৎ নিয়োগদাতা খাত। দুবাই, সিঙ্গাপুর, মালদ্বীপ, থাইল্যান্ড কিংবা তুরস্কের অর্থনীতির দিকে তাকালেই বোঝা যায় কীভাবে পর্যটন ও হসপিটালিটি লাখ লাখ মানুষের জীবন বদলে দিয়েছে।

বাংলাদেশের রয়েছে কক্সবাজার, সুন্দরবন, সেন্ট মার্টিন, পাহাড়ি অঞ্চল, প্রতœতাত্ত্বিক ঐতিহ্য এবং সমৃদ্ধ সংস্কৃতি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমরা কি সেই সম্ভাবনা কাজে লাগানোর জন্য প্রয়োজনীয় মানবসম্পদ তৈরি করছি? উত্তর খুব সুখকর নয়। আমরা এখনো এমন এক সমাজে বাস করি, যেখানে অনেক মানুষ মনে করেন হোটেল ম্যানেজমেন্ট মানে ট্রে হাতে অতিথির সামনে দাঁড়িয়ে থাকা। অথচ তারা জানেন না, সেই হোটেলের ব্যবস্থাপক শত কোটি টাকার সম্পদ পরিচালনা করেন, শত শত কর্মীর নেতৃত্ব দেন এবং একটি আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের সুনাম রক্ষার দায়িত্ব পালন করেন। সমস্যা আসলে পেশার নয়; সমস্যা আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির।

আমরা সন্তানদের শেখাই “মানুষ কী বলবে”। কিন্তু শেখাই না “তুমি কী হতে চাও”। আমরা মর্যাদা খুঁজি পেশার নামে, দক্ষতায় নয়। ফলাফল হলো, অনেক তরুণ নিজের আগ্রহের জায়গা ছেড়ে সামাজিক চাপের কাছে হার মানে। কেউ হয়তো ভালো হসপিটালিটি ম্যানেজার হতে পারত, কেউ আন্তর্জাতিক মানের শেফ, কেউ পর্যটন উদ্যোক্তা। কিন্তু সমাজের ভ্রুকুটির কারণে তারা অন্য পথে চলে যায়।

বাংলাদেশ যদি সত্যিই দক্ষতা নির্ভর অর্থনীতি গড়তে চায়, তাহলে এই মানসিকতা বদলাতেই হবে। আজ প্রয়োজন একটি সামাজিক আন্দোলনের। এমন একটি আন্দোলন, যা বলবে সব পেশার মর্যাদা সমান নয়, কিন্তু সব সম্মানজনক পেশার মর্যাদা থাকা উচিত। আর হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট নিঃসন্দেহে একটি সম্মানজনক, আধুনিক এবং আন্তর্জাতিক পেশা।

প্রশ্ন একটাই আর কতদিন আমরা অজ্ঞতার কারণে একটি সম্ভাবনাময় খাতকে অবহেলা করব? আর কতদিন আমরা বিদেশি দক্ষ জনবল আমদানি করব, অথচ নিজের দেশের তরুণদের স্বপ্নকে তুচ্ছজ্ঞান করব? আর কতদিন আমরা পেশাকে নয়, পেশার নামকে সম্মান দেব? সম্ভবত সময় এসেছে আয়নায় নিজেদের দেখার। কারণ হোটেল ম্যানেজমেন্টের সংকট আসলে এই খাতের নয়; সংকট আমাদের সামাজিক মানসিকতার। আর এই মানসিকতার পরিবর্তন না হলে আমরা শুধু একটি শিক্ষাবিষয়কে নয়, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতির একটি বড় সম্ভাবনাকেও হারাতে থাকব।

লেখক: মো: মামুন হাসান, ইনস্ট্রাক্টর (টেক) ও বিভাগীয় প্রধান, ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট।

 

 

শার্শা প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি আসাদুজ্জামান আসাদকে হয়রানিমূলক গ্রেপ্তার

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ৮ জুন, ২০২৬, ৩:২৯ অপরাহ্ণ
শার্শা প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি আসাদুজ্জামান আসাদকে হয়রানিমূলক গ্রেপ্তার

এম এ রহিম, বেনাপোল (যশোর): যশোরের শার্শা প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক বিডিনিউজ২৪ডটকম এর বেনাপোল প্রতিনিধি আসাদুজ্জামান আসাদকে হয়রানিমূলক গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তার আটকের প্রতিবাদে মুক্তির দাবীতে শার্শা থানার সামনে অবস্থান নিয়েছেন গণমাধ্যম কর্মীরা। নিঃস্বর্ত মুক্তি চান তারা।

বেনাপোল প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক বকুল মাহবুব জানান, সোমবার গভীর রাতে যশোরের শার্শা জামতলার নিজবাড়ী থেকে সুনির্দিষ্ট কোন অভিযোগ ছাড়াই যশোর ডিবি পুলিশ পরিচয়ে গ্রেপ্তার করা হয় সিনিয়র সাংবাদিক আসাদকে। সিসি ক্যামেরা খুলে নিয়ে যাওয়া হয়। বেদম মারপিট করে আহত করা হয় সাংবাদিকের ভাগ্নে কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থী তরঙ্গকে। পরে পরিবারের কাছ থেকে মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয় তাকে।

সাংবাদিককে আটকের প্রতিবাদে সোমবার সকাল থেকে থানার সামনে অবস্থান নিয়েছে বিভিন্ন এলাকার সাংবাদিকেরা। নিঃস্বর্ত মুক্তি চান তারা। থানায় আটক রাখা হয়েছে তাকে।
এসব বিষয়ে জানার চেষ্টা করলে ফোন রিসিভ করেন নি শার্শা থানার ওসি।

সাংবাদিক জামাল হোসেন ও মনির হোসেন জানান, নির্বাচিত সরকারের সময় একজন সিনিয়র সাংবাদিককে এভাবে হয়রানিমূলক আটক স্বাধীন সাংবাদিকতার উপর হস্তক্ষেপ। সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হয়। তার মুক্তির দাবী জানান তারা।

সাংবাদিকের হয়রানিমুলক গ্রেপ্তারের নিন্দা ও প্রতিবাদসহ মুক্তির দাবী জানান যশোরসহ বিভিন্ন এলাকার গণমাধ্যম কর্মীরা।