সোমবার, ৮ জুন ২০২৬, ২৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
সোমবার, ৮ জুন ২০২৬, ২৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

বাংলা নববর্ষ : আনন্দ ও ঐতিহাসিক পাঠ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৬, ১:৩১ পূর্বাহ্ণ
বাংলা নববর্ষ : আনন্দ ও ঐতিহাসিক পাঠ

মনিরুজ্জামান মুন্না
পূর্বে প্রকাশের পর
ঐতিহাসিক বিবর্তন বা পরম্পরার সমীক্ষায় আর বলার অপেক্ষা রাখেনা যে, বাংলা সনের বৈশাখ মাসের প্রথম দিনটিই বাংলায় নববর্ষ উদ্যাপনের দিন। দিনটি বছরের বাকি অন্যন্য দিনের মত নয় এ কারণে যে, এর মধ্যে পুরাতনের নতুনে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠার সুযোগ থাকে। সুযোগ থাকে ক্ষান্তকে জ্যান্তে বা শেষকে শুরুতে ফিরে ভাববার। আঁধারের প্রভাতে, পাখির কলতানে, স্নিগ্ধ সমীরণে, কাক্সিক্ষত আনুষ্ঠানিকতায় ও আহব্বান গীতে সূচিত হয় এ পটপরিবর্তন বা দিন বদলের মাহেন্দ্রক্ষণ। তাই বাংলা নববর্ষ বাঙালির নব চেতনার আলোকে নতুন জীবনে অবগাহনের দিন। কালের ক্রমবিকাশের হাত ধরে এই দিন উৎসাহময় উৎসব আর সম্ভাবনার দীপালি জ্বেলে নতুন আশার আলো ছড়ায়। থেকে-থেকে নতুনকে চির নতুনে বরণ করে নেওয়ার আকুল আর্তি ব্যক্ত ও দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। নব উন্মেষ ও উম্মীলনের লাবণ্যে আতীতের জীর্ণতাকে মুছে নেওয়ার এক অভূতপূর্ব তাগিদ সৃষ্টি হয়।
বছরের প্রথম দিনটি অন্যান্য প্রতিদিনের মতই একটি দিন হওয়া সত্ত্বেও এই দিনটির প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মধ্যে একটি বিশেষ মর্ম, গুরুত্ব আর স্বতন্ত্রতা দীপ্তমান হয়, যা ক্ষণিকের জন্য হলেও আমাদেরকে শৃঙ্খলমুক্ত আনন্দে বেঁচে থাকার আস্বাদ যোগাবে, স্বপ্ন দেখার প্রেরণা দেবে। সর্বোপরি একটি সন্ত্রাস ও শোষণমুক্ত সুন্দর সম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বাংলাদেশ গড়ার শপথে বলীয়ান হওয়ার দীক্ষায় দীক্ষিত করবে। আর সে শিক্ষায় বৈশাখ জগত-জীবনের মেঘাকাশের মনছায়ে দুঃখবিনাশী রামধনু হয়ে আবীর ছিঁটাবে। সে আবীরজলে ভেজাভেজি খেলেত খেলতে আমরা যেন বলিÑ
‘দিয়ে যাই আজ নতুনের ডাক
দুয়ারে যে এসেছে বৈশাখ
স্বপ্নের ভেলায় ভেসে ভেসে
বরণ করি তারে ভালোবেসে।’
বাঙালি সংস্কৃতি বাঙালি জীবনেরই ঐক্যতান। এক ভাষা, এক সুর একই আনন্দ বেদনার সহগামী বাঙালি সংস্কৃতিতে মিশেছে নানা ধর্মের, বর্ণের ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ভিন্ন-ভিন্ন আচার-উপাচার ও বৈশিষ্ট্য। রাষ্ট্রিক ও সামাজিক সহাবস্থানে ধর্মীয় সংস্কৃতির ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্ট্য থাকা সত্ত্বেও ব্যাপ্তিময় বর্ষবরণের ঐতিহাসিক সংস্কৃতির সাথে তা অত্যন্ত নিবিড়ভাবে একীভূত হয়েছে। নিরপেক্ষ চেতনার আলোকে গড়ে ওঠা এ উৎসবের মহিমা মিশে থাকে বাংলার দিগন্ত জুড়ে; পথে-প্রান্তরে। সে করিতকর্মার প্রভাবে পহেলা বৈশাখে বাংলা নববর্ষ পালন আজ বাঙালি সংস্কৃতির একটি অবিচ্ছেদ্য ও অপরিহার্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে আবহমানকাল ধরে বাঙালি অধ্যুষিত বৃহত্তর জনপদে এ সার্বজনীন অসাম্প্রদায়িক উৎসবটি অবলীলায় পালিত হয়ে আসছে। দিনটি পালনের সদা-সর্বদা স্বতঃস্ফূর্ত তৎপরতা ও বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা পরিলক্ষিত হয়। আর এরই মাঝে বাঙালি খুঁজে ফেরে সম্প্রীতি, গণতন্ত্র ও মুক্তি সংগ্রামের মৌল চেতনাবোধের তাৎপর্য। সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক আন্দোলনের ক্ষেত্রেও ভারতীয় উপমহাদেশের ঐতিহাসিক বিবর্তন বিভাজনে বাঙালির নববর্ষ পায় ভিন্নমাত্র।
দেশ জাতি ও জাতীয়তা ভিত্তিক জীবনদর্শন থেকেই সাংস্কৃতিক বলয়ের উদ্ভব। সুতরাং জীবনদর্শনের মৌলিকত্বে তারতম্যের কারণে সাংস্কৃতির রূপ-কাঠামো ও বৈশিষ্ঠগত ভিন্নতা লক্ষণীয়। জাতি বা গোষ্ঠীর আলোকিত আদর্শকে ধারণ ও লালন করতে হলে তার স্বকীয় ধারার সূস্থ সংস্কৃতি চর্চার কোন বিকল্প নেই। কারণ সংস্কৃতির আওতা ও পরিধি জাতীয় জীবনের সকল দিক ও বিভাগকে পরিব্যাপ্ত করে। ফলশ্রুতিতে সংস্কৃতিকে কেবল চিত্ত বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ না করে, আত্মউন্মোচনের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করার মধ্যেই সামষ্টিক সাফল্য নিহিত। এ দৃষ্টিকোণ থেকে আমরা মনে করি নববর্ষ উদ্যাপন সাংস্কৃতিক রীতি ও জাতিগত নিদর্শনের এক গুরুত্বপূর্ণ আনুষ্ঠানিক ধারা। প্রাচীনকাল থেকে বিভিন্ন দেশে, জাতিতে ও গোষ্ঠীতে বিভিন্নভাবে নববর্ষ পালনের রেওয়াজ প্রচলিত। যার মধ্যে প্রত্যেকের নিজস্ব ঐতিহ্যগত সংস্কৃতির পরিচয় বিধৃত।
পাহাড়ীয় কয়েকটি উপজাতি সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী প্রধান ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসব হল ‘বৈসুক’, ‘সাংগ্রাই’ ও ‘বিজু’। এক একটি উৎসব এক একটি উপজাতীয় গোষ্ঠীবলয়ের জন্য নির্ধারিত। তবে মজার ব্যাপার হচ্ছে তাদের এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ উৎসবই চৈত্রসংক্রান্তি ও বর্ষবরণকে ঘিরেই। তাই এই তিনটি উৎসবের আদ্যাক্ষর নিয়ে একটি সমন্বিত নাম দেওয়া হয় ‘বৈসাবী’। বর্ষ বরণের উৎসবকে ত্রিপুরা জাতিগোষ্ঠীরা বলে ‘বৈসুক’, মারমারা বলে ‘সাংগ্রাই’ এবং চাকমারা বলে ‘বিজু’। তাই তাদের সম্মেলিত নামটি দাঁড়িয়েছে (বৈ+সা+বি) ‘বৈসাবি’। যার উদ্দেশ্য, বৈশিষ্ঠ, ধরন ও পালন রীতি প্রায় একই। বৃহত্তর ঐক্যের স্বার্থে এই দিনে তারা একে অপরে দ্বন্দ্ব-বিদ্বেষ ভূলে অহিংসা ভালোবাসা ও মৈত্রীর সুদৃঢ় বন্ধন সৃষ্টিতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়।
মারমারা বছরের শেষ দিনে একই সাথে শেষ ও শুরুর ভাবনা নিয়ে ‘রিলংপোয়ে’, পেইংচোয়ে, ‘আক্যে’ ও ‘আতাদা’ পালন করে। এর মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও আনন্দদায়ক ইভেন্ট হচ্ছে ‘রিলংপেয়ে’। বাংলায় যার অর্থ ‘জলোৎসব’। এটি এক ধরনের জলকেলি বা জলখেলা। যার জন্য আগে থেকে প্যা-েল করে রাখে। ঐ প্যা-েলে যুবক-যুবতীরা একে অন্যের প্রতি জল ছিটিয়ে বা ফিচকারী মেরে কাবু বা ঘায়েল করার প্রতিযোগিতায় শামিল হয়। তাদের ভাষায় এটিকে সংক্রান বা সৌভাগ্য বয়ে আনার উৎসব বলা হয়। এ সবের পাশাপাশি কিছু নৃত্য-গানের আয়োজন থাকে। অপেক্ষাকৃত বয়স্করা এই দিনে উপাসনালয়ে গিয়ে সংশ্লিষ্ট পূজা-অর্চনায় মশগুল থাকেন। (অদ্বৈতমল্লবর্মনের ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ উপন্যাসে এরকম কিছু লোকজ অনুষ্ঠানের পরিচয় পাওয়া যায়। কারণটা মনে হয়- এই উপন্যাসের সকল চরিত্রই পিছিয়ে পড়া মালো সম্প্রদায়ভূক্তদের নিয়ে)।
ত্রিপুরা সম্প্রদায় বৈসুতে শিশু-কিশোর ও তরুণ-তরুণীরা এক অপরের বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে এবং প্রিয়জনের সাথে সাক্ষাত করে ফুলের শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা নিবেদন করে। আর বয়স্করা মন্দিরে গিয়ে সার্বিক সুখ-শান্তি ও সম্মৃদ্ধির জন্য করুণাময়ের কাছে প্রার্থনা করে। এ গোষ্ঠীর বৈসু বিজুকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়- ‘হারিবৈসু বিজু’, ‘বিষুমা বিজু’ ও ‘বিচিকাতল বিজু’। এসব বিজুতে তারা গেংগুলিদের (চারণকবি) দিয়ে পালাগানের আসর পাতে এবং ঐতিহ্যবাহী গড়াই নিত্য পরিবেশন করে।
চাকমারা খাগড়াছড়ি জেলার চেঙ্গি নদীতে ফুল ভাসিয়ে দিয়ে ‘বিজু উৎসব’ পালনের মাধ্যমে বৈসাবী’র কার্যক্রম শুরু করে। চেঙ্গী নদী ছাড়াও সুবিধাজনক কাছাকাছি কোন ছড়া, ঝরণা ও ঝিরিতেও এ কার্য সম্পন্ন করে থাকে। অতিপ্রত্যূষে ঐতিহ্যবাহী বর্ণিল পোশাকের সাজে প্রথমে নদী বা মনোনীত জলাশয়ে ধারে শৃঙ্খল ও সারিবদ্ধভাবে মঙ্গলপ্রদীপ জ্বালিয়ে গঙ্গাদেবী ও উপগুপ্ত বুদ্ধকে নিবেদন করে নদীর জলে ফুল উৎসর্গকরে ভাসিয়ে দিয়ে বিজু সম্পন্ন করা হয়। ভাসানো ফুলের বিসর্জনে পুরোনো বছরের দুঃখ-বেদনার গ্লানি মুছে জগত ও জীবনে সুখ-শান্তি বিরাজ করার কামনার প্রার্থনা জানায়। নিজ নিজ সাজবেশ ও গৃহসজ্জায় এদিনে ফুলের আধিক্য দেখা যায়। সাথে থাকে সংশ্লিষ্ট কিছু উৎসবী আরতি (নৃত্য ও সংগীত)। তিনটি পর্ব বা ক্যাটাগরিতে তাদের এ উৎসব সম্পন্ন হয়। ‘ফুল বিজু’, ‘মুলবিজু ও গজ্জাপয্যা। যেখানে বাঙলা ও বাঙালির চিরায়ত ধারার চর্যপদী, ধ্রুপদী, শাস্ত্রীয় ও আঞ্চলিক (জাতি/গোষ্ঠী) লোকজ সংগীত আর নৃত্যেরই প্রাধন্য দেওয়া হয়। ফলে একই উপসস্থাপনায় আবহমান সনাতনি ধারার সাথে পাহাড়ীয়া উপজাতি, আদিবাসী, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী, পিছিয়ে পড়া সম্প্রদয় ও আঞ্চলিক লোকজ উৎসবী, পর্ব ও পার্বণী নৃত্যের এক অদ্ভূত মনোমুগ্ধকর আবহ সৃষ্টি হয়। অবশ্য মাঝে মধ্যে আধুনিকতার কিছু-কিছু ধারা উপধারার সংযোগ ঘটলেও আমরা যেন আমাদের মূল বা শাস্ত্রীয়, ধ্রুপদী, চর্যাপদী ও লোকজ ধারার সনাতনি স্বরূপে ফিরতে চাই, মিলতে চাই। এর কদর-সমাদর ও প্রভাবকে অন্য সবকিছুর থেকে উর্দ্ধে রাখতে চাই। নৃত্য-নুপুরের নিক্কনী গর্জন আর সংগীতের তন্ময়ী লহরী প্রতিহত করবে অপসংস্কৃতি আর অপশক্তির আগ্রাসন। পহেলা বৈশাখে বিভিন্ন অঞ্চলে অঞ্চল ভিত্তিক ও জাতি-উপজাতি ভিত্তিক ঐসব রকমারী পরিবেশনায় আমরা যেন বার-বার যেন হারিয়ে যাই ‘বিজু’, সাংগ্রাই, ‘বৈসাবি’ বৈসু, বিষু, চাংক্রান, চাংলান সহ পাহাড় আর সমতলের মানুষের উৎসবী গ্রোতধারায়। গীতির কথা আর নৃত্যের লহরীত ছন্দ-মাধুর্যের নুপুরী বাজনায়।
পূর্বেই বলা হয়েছে যে, নববর্ষ মানে বছরের প্রথম দিন। দিনটিকে নানা উৎসব, আনন্দ ও আনুষ্ঠানিকতায় বরণ করে নেওয়া হয়। কিন্তু পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ, জাতি ও গোষ্ঠীর মাঝে দিনটির নির্ধারণ, নির্বাচন ও উদ্যাপনের ধরন, প্রকৃতি ও প্রক্রিয়া ভিন্ন। যা দেশ-জাতি বা গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক বিশেষত্বের প্রকাশক। খ্রিস্টানরা ইংরেজি সনের প্রথম দিন অর্থাৎ ১ জানুয়ারিকে নববর্ষ হিসেবে পালন বা উদ্যাপন করে। অবশ্য এ উদযাপনের জমকালো শুভ সূচনা হয় ৩১ ডিসেম্বর রাত ১২ টার পর পরই। তাই তাদের নববর্ষ উদ্যাপনের নামকরণ করা হয়েছে ‘থার্টিফাস্ট নাইট’। ইহুদিদের নিকট নববর্ষ ‘রাশহাস্না’ নামে পরিচিত। ইরানে ‘নওরোজ’ পরিচয়ে সাতদিন ব্যপী নববর্ষের অনুষ্ঠানাদি চলে। হিজরী সনের প্রথম মাস মর্হরম এর প্রথম তারিখ আইব নববর্ষ পালিত হয়। দিনটি পালনে কার্যত মুসলমানদের ধর্মীয় ভাব-গাম্ভীর্যের রেওয়াজ প্রতিফলিত হয়।
আমাদের দেশে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেও মূলত প্রায় সবাই বাঙালি। অর্থাৎ মুসলমান বা বিভিন্ন ধর্মাবলম্বিদের চেয়ে বাঙালির সংখ্যা বেশি। ফলশ্রুতিতে একে রাষ্ট্রীয় আচার, সামাজিক আচার, যেভাবেই বাঙালি আবহমান লোকায় কৃষ্টি, জাতীয়তার ঐতিহ্য যেভাবেই বলি না কেন তার সাথে ধর্মীয় মূল্যবোধের অনিবার্য সামাজিক রূপকের নির্যাসে বাংলাদেশে পহেলা বৈশাখে নববর্ষ পালিত হয়ে থাকে। সুতরাং সর্বজনীন স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে তা যথেষ্ট প্রভাবিত, উদ্বেলিত ও প্রতিষ্ঠিত। নববর্ষের আনুষ্ঠানিকতা নির্দেশিত হয় জাতি, ধর্ম, বর্ণ ও গোষ্ঠিগত আদর্শের বহিরাবরণে, সাধারণ মানবিক আচার-আচারণে, প্রথা সংস্কার ও সংস্কৃতির বহিঃপ্রকাশে। ক্রমান্বয়ে চাহিদা ও গুরুত্বের বিচারে এ নববর্ষ উদযাপন এখন এখানে অতীব গুরুত্ব পেয়েছে। অন্তত এই দিনটির জন্য হলেও পাশ্চাত্য অনুসারী, অপসংস্কৃতির অনুকরণ অনুরাগী প্রগতিশীল আধুনিক বাঙালি সমাজও স্মরণ ও বরণ করে দেখায় বাঙালি কিভাবে হতে হয়। এ দৃষ্টিকোণ থেকে নববর্ষের আনুষ্ঠানিকতায় সম্পৃক্ত ও আকর্ষিত হওয়াটা হয়তোবা কারও কারও কাছে লোকদেখানো মায়াবিকতা, আবেগ নির্ভরতা ও আন্তরিকতা বিবর্জিত উৎসাহী অভিনয়ের ফলও হতে পারে। এই যোগ্যতায় বৈশাখের ভাবদর্শন উপলক্ষ হয়ে জীবন ঘনিষ্ঠতার অন্যতম অনুষঙ্গে আমাদের সাহিত্যকেও প্রভাবিত ও সম্মৃদ্ধ করে চলেছে। যেমন কালিমা মোছাতে অন্ধত্ব ঘোচাতে রবীন্দ্রনাথ এর কলমে উঠে এসেছেÑ
‘এসো হে বৈশাখ, এসো, এসো
তাপসনিশ্বাস বায়ে মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে।’
আবার মিথ্যা-পুরাতনকে বিদায় জানিয়ে উল্লাস চিত্তে নজরুল বলেনÑ
‘তোরা সব জয়ধ্বনি কর
ঐ নতুনের কেতন ওড়ে কালবৈশাখীর ঝড়…।’
বৈশাখের নির্ভরতায় উদ্ভাসিত সাহিত্যে আমরা সমাজ সংসারের ঘাত-প্রতিঘাতময় আনন্দ-বিরহ ও আবেগ-বিবেকের তাত্ত্বিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার প্রতিচ্ছবি খুঁজে পাই। সে কারণে বাংলাকে বলা হয় বারো মাসে তের পার্বণের দেশ। বাঙালির সংস্কার, বিশ্বাস, আচরণগত বৈশিষ্ট, জীবন-জীবিকার উপকরণ সবকিছুই বাঙালিকে উৎসবপ্রবণ বা উৎসবপ্রিয় জাতি হিসেবে চিহ্নিত করে। সংস্কৃতি যদি হয় একটি দেশের এবং জাতির জীবনপদ্ধতি চিন্তাধারা ও মননশীলতার প্রকাশ, তাহলে অবশ্যই তা কেবল সার্বজনীন লোকউৎসবের মাধ্যমে নানা ধর্মের, বর্ণের, গোষ্ঠীর সহাবস্থানের ও সহসম্পৃক্তির ভিত্তিতেই প্রকাশিত বা পালিত হতে হয়। বৈশাখ মাসও এক সময় ফসলী মাস হিসেবে জানান দিত। তাই বৈশাখ মাসে তখন ‘নবান্ন’ অনুষ্ঠানও করতো। গ্রাম-গঞ্জে মেলা বসতো। যার প্রয়াস, চাহিদা উপকরণ গ্রামীন জনপদ ও বাঙালিয়ানাকে ঘিরেই। বাংলার আবহমান কৃষ্টি ও ঐতিহ্য ধারণে মেলায় মৃৎশিল্প, কুটিরশিল্প, কারুপণ্য, খেলনা, পোশাক, প্রসাধনী বা সাজসজ্জা সামগ্রী ও তৈজসপত্রের বেচাকেনা হতো। বিনোদনের জন্য নাগরদোলা, পুতুলনাচ, সার্কাস, জাদু, বায়স্কোপ, জারী-সারী, পট ও পালাগান চলতো। এর পাশাপাশি কুস্তিখেলা, বলিখেলা, লাঠিখেলা, ঘুড়ি উড়ানো, ষাড়ের লড়াই, মোরগ লড়াই, গরু বা ঘোড় দৌড়, নৌকা বাইচ, লোক সংগীত ইত্যাদির আয়োজন হতো। এছাড়া ব্যবসায়ীদের বকেয়া, মহাজনদের সুদ ও জমিদারদের খাজনা আদায়ের উদ্দেশ্যে প্রচলিত ‘হালখাতা’ ও ‘পূণ্যাহ’ এর আয়োজনের কথা তো আগে বলা হয়েছে।
প্রসঙ্গক্রমে এ কথাও একটু বলে নিতে হয় যে- আগের দিনে গ্রাম বাংলায়-শহরে সর্বজনীন ও ঢালাও ভাবে যেমন সর্বত্র বিপুল উৎসাহে নানান উৎসব, মোলা ও আনন্দ যজ্ঞের আয়োজন হতো, এখন আর তা ততটা সেভাবে হয় না। অবশ্য এ তারতম্যের জন্য সময়, পরিবেশ ও পরিস্থিতিগত কিছু সংগত কারণও রয়েছে। যেমনÑ
প্রথমত: মেলা বসানো বা উৎসবের আবহ সৃষ্টির জন্য উপযোগী প্রশস্ত মাঠ, ময়দান, মুক্তপ্রাঙ্গন বা পতিত জমি ব্যবহারের সুযোগ সীমিত হয়ে এসেছে।
দ্বিতীয়ত: এ জাতীয় উৎসবি আয়োজন এবং মেলার স্থায়িত্ব খুবই কম হওয়ায় এর গুরুত্ব, আগ্রহ ও আমেজ এখন অনেক সীমিত হয়ে এসেছে।
তৃতীয়ত: যান্ত্রিক ও বিজ্ঞান নির্ভর আধুনিক ডিজিটাল যুগের সাথে তালমেলানোর জোয়ারে ভেসে চাহিদা, রুচি, ব্যবহার্যসামগ্রী সবকিছুতে পরিবর্তনের হাওয়া বইছে। সে কারণে এগুলি এখন জীবিকা পেশা বা বানিজ্যিকভাবে নেওয়ার ক্ষেত্র ও গুরুত্ব সংকুচিত হয়ে এসেছে।
চতুর্থত : ফেসবুক, ইউটিউব ও ইলেকট্রিক মিডিয়ার আকাশ সাংস্কৃতির প্রভাব ও আগ্রসনে উন্মুক্ত বৈঠকী বা মঞ্চ সাংস্কৃতির কদর খর্ব হয়েছে। শুধু ক্ষণিকের ভালোলাগা তাড়নায় নামমাত্র উপস্থাপনায় ও টিকিয়ে রাখা হয়।
ফলশ্রুতিতে তৃণমূল শ্রমজীবী জনগোষ্ঠীর অভাবী সংসারের টানাপোড়নেই বৈশাখ কেন্দ্রিক অনেক অনুষ্ঠানাদি কমে বা সীমিত হয়ে যাওয়ার প্রচলন চোখে পড়ে। ছোটবেলায় আমার দেখা এমন দুটি মেলার স্থলে এখন আর মেলা হয় না। এসব মেলার লোকজ ঐতিহ্যের পটভূমি আছে। অবশ্য আমার দেখা সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার কয়লা মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠের বৈশাখী মেলাটি এখনো দায়সারাভাবে বসে। স্কুলটির প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ আব্দুর রউফ জানান- মেলাটি ঠিক কবে থেকে চালু হয়েছে তার সঠিক হিসাব কেউ বলতে পারে না। তবে অনেকের ধারনা প্রাচীন মোঘল আমল থেকেই এটির সূত্রপাত। সেই নিরিখে আবহমান কালের চিরায়ত প্রাচীন ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের এটি একটি অবিচ্ছিন্ন অংশ। যাকে টিকিয়ে রাখা আমাদের নৈতিক কর্তব্য। নববর্ষ ছাড়া অন্যন্য কর্মকা- ও অনুষ্ঠানাদির মাধ্যমেও আমরা আমাদের হাজার বছরের গৌরবোজ্জ্বল সাংস্কৃতিক স্বতন্ত্র টিকিয়ে রাখার সুযোগ নিয়ে থাকি। নববর্ষের মতো সে সবের ভিত্তিমূলে আমাদের স্বাধীন জাতিসত্তার গুরুত্বপূর্ণ বিকাশ গড়ে চলেছে। চৈতন্যের প্রতিশ্রুতিতে যা এতই প্রবল ও অটল যে শেষ পর্যন্ত উপমহাদেশের মধ্যে এক স্বতন্ত্র ভাষা এবং স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় উদ্বুদ্ধ করে। অবশ্য একাথাও সত্য যে সবকিছুকে ছাপিয়ে নববর্ষের আবেগী আবেদন ও প্রচলনের ইতিহাস আরও গভীরের, আরও প্রাচীনের।
‘রোদ-বৃষ্টি ঝড়ের দিন
বাজে বোশেখের মাতাল বীণ
আনন্দ বহে রাত-দুপুর
দিনগুলি যায় মিষ্টি-মধুর।’
চলবে—–

পূর্বে প্রকাশের পর
বৈশাখের এ সময়টিতে বর্ষাকালের ন্যায় বৃষ্টি না থাকলেও প্রায়শই ঝড়-বৃষ্টি বাজ-বিজলী হানা দেয়। তাই মেজাজের দিক থেকে বৈশাখ অন্য সময়ের চেয়ে একটু ভিন্ন যায়। মনে হয় যেন একটি স্বতন্ত্রিক সত্তায় বাকি এগারো মাসের সন্নিবেশী আমেজ বয়ে বেড়ায়। ঋতু বৈচিত্র্যের সবকিছুকে কিঞ্চিতভাবে হলেও আগাম জানান দেওয়ানোর, সহানোর ও প্রস্তুতি গ্রহণ করানোর দায়িত্ব কাঁধে নেয়। কৃষিনির্ভর আমাদের জন জীবনে বৈশাখ আসে আনন্দ-বেদনা সংবলিত কাব্যের মতো করে। অতীত গ্লানিকে ঝেড়ে আগামি সমৃদ্ধির সোনালী উল্লাস উদ্ভাসে। আদি থেকে বৈশাখের উল্লেখ ‘বর্ষবরণ’ হিসেবে। যা বাঙালির ঐতিহ্যগত কৃষ্টি ও সংস্কৃতির এক গুরুত্বময় ঐতিহ্যবাহী নিদর্শনও বটে। প্রকৃতির এমন প্রচ্ছন্ন-অপ্রচ্ছন্ন পট পরিবর্তনের সার্বিক মূল্যায়নে আমাদের এ দেশ নাতিশীতোষ্ণ কিংবা ধন-ধান্য পুষ্পে ভরা’র স্বীকৃতিতে গৌরবান্বিত। তাই সে অনুভবে বলতে ইচ্ছে করেÑ
‘বাঁশবাগানে থাকে বাঁশ; ঘাসবাগানে ঘাস
তোমার প্রভাব সাথে থাকে যেন বার মাস।’
বৈশাখ মাসের প্রথম দিন থেকে প্রায় সারা মাস জুড়ে ঐতিহ্যম-িত বিশেষ বিশেষ অনুষ্ঠানে ভরপুর থাকে। সেজন্য অন্তত এই সময়টুকুতেই বাংলার জন-জীবনে কষ্টের কোন হাতছানি ছায়াপাত করে না। সব ভুলে সবাই যেন প্রকৃতির স্বাভাবিক বিন্যাস বৈচিত্র্য আর আনুষ্ঠানিকতার সাথে একাকার হয়ে য়ায়। অনটনের তীব্রতা আর রিক্ত স্মৃতির গোপন ব্যথার বেহালা যেমন বাজে, প্রাপ্তির সাজানো ডালায় সজীব হয়ে মনও তেমনি নেচে ওঠে। আলো ঝলমল রোদের উষ্ণতা কিংবা ভাসা ভাসা শতদলী মেঘের শীতলতা পরশ বুলায়। ভারসম্যময় ক্ষণিকের এ প্রসন্নতায় বছর ব্যাপী দীর্ঘ সময়ের নানান দৌড়-ঝাঁপের ক্লান্তি যেন এক কিস্তিতে প্রশমিত হয়। এ সময়ে বিভিন্ন দুর্যোগ-দুর্ভোগে প্রকৃতি কখনও যেমন উর্দ্ধত। তেমনি কোন গঠনমূলক পরিমার্জিত ও সহনীয় অবস্থা বিরাজ করানোর দায়িত্বও যেন তার। আমরা জানি আবহাওয়ার সার্বিক তারতম্যগত পরিবেশ সৃষ্টিই প্রকৃতির নিয়ম। আর এই নিয়ম ধরে চলতে গিয়ে এবং আমাদেরকে সহনশীল খাঁটি হয়ে গড়ে উঠতে বৈশাখে প্রকৃতি আমাদের উপর সচেতনভাবেই অমনটি ঘটায়। এমন উপলব্ধিতে বৈশাখ নিয়ে আমাদের অভিব্যক্তিÑ
‘আসা-যাওয়ার নিয়ম মেনে এলে বছর ঘুরে
ভালো লাগার মন্ত্র রেখে আবার যাবে ফিরে
সর্বমুখী চিত্রে তুমি এক অকৃত্রিম প্রকৃতি
কমনার কামিনীতে প্রাণের আরতি।’
দ্বন্দ্ব-সংঘাত আর নানান বৈরিতার মাঝে নিসর্গের সৌন্দর্যকে টিকিয়ে রাখতে বৈশাখের উদ্যত প্রকৃতি যেমন কখনও কখনও সংযমী। তেমনি সে সংযমি শিক্ষায় আমরা যেন সমবেত হই অসম্প্রদায়িক সম্প্রীতির কোন মঙ্গল শোভা যাত্রায়; মিলন মেলায়। নতুন উদ্যোমে, নতুন স্বপ্নে, নতুন সংকল্পে আর একবার মিলে যাই মধুময় একাত্মতায়, আনন্দ খেলায়, কৃষ্টির বিপণনী পসরায়। রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘বৈশাখ’ কবিতায় লিখেছেনÑ
‘হে ভৈরব, হে রুদ্র বৈশাখ
ধুলায় ধুসর রুক্ষ উড্ডীন পিঙ্গল জটাজাল
তপঃ ক্লিষ্ট তপ্ত তণু, মুখে তুলি বিষাণ ভয়াল
কারে দাও ডাক।’
মানবতার মুক্তির প্রশ্নে, সমৃদ্ধি আর উন্নয়নের স্বার্থে সবকিছুকে পিছে ফেলে আমরা উদ্বেলিত ও দীপ্ত পদক্ষেপে এগিয়ে যাই প্রাণের টানে। যার গতিশীলতা যেন আর থমকে না যায় বর্ষ অন্তের এ পথ এঁকে নেওয়া সীমান্ত রেখায়। আত্মিক বন্ধনের নিছক স্বপ্নিল কল্পনায় কিংবা সস্তা অবেগি জল্পনায় নয়। সত্য ও শুদ্ধতার প্রাধান্যে, জাতীয় ঐক্যের গুরুত্বে বলে যাইÑ
‘আকাশ আমায় দাওয়াত দিলো চাঁদের দেশে ঘুরতে
সাগর আমায় দাওয়াত দিলো মুক্ত নিয়ে ফিরতে
ফাগুন আমায় দাওয়াত দিলো রূপের শোভা ছুঁইতে
বৈশাখ আমায় দাওয়াত দিলো সাম্যের গীত গাইতে।’
১৯৪৭ পরবর্তী সময়ে বিশেষ করে যখন বাংলার একটি অংশকে অর্থাৎ পূর্ববাংলাকে পাকিস্তানের আওতাভূক্ত করে দেওয়া হলো তখন থেকে বাংলার এ অংশটির পূর্বপাকিস্তান পরিচয়ে আত্মপ্রকাশ ঘটে। নামের এই পরিবর্তনের কারণে কিছু কিছু বিষয়ে পরিবর্তন বা তারতম্য ঘটতে থাকে। ঠিক এমনই এক প্রেক্ষাপটে এ অঞ্চলের কিছু পাকিস্তানপন্থী স্বার্থন্বষী মুসলিম অভিজাত বাঙালি ধনাঢ্য ব্যবসায়ী ও চাকুরীজীবী শিক্ষিত সমাজ রাষ্ট্রীয় আনুগত্য প্রদর্শন, অনুকম্পা বা অনুগ্রহ লাভের মানসে বিছিন্ন প্রপাগা-া শুরু করে। প্রচলিত বাংলা সনের বিভিন্ন মাসের তারিখ গণনার ব্যাপারটি যেহেতু ইংরেজির ন্যায় আর্ন্তজাতিক স্বতঃসিদ্ধে প্রচলিত বা বিশ্বমান নির্ধারিত নিয়ম পদ্ধতির মত নয়, সেহেতু এটিকে তাদের করে নেওয়ার কৃতিত্ব জাহির করতে একটু সংস্কারের মাধ্যমে তারতম্য সৃষ্টির দাবি জানায়। প্রদেশের কিছু মহল বিশেষের এমন দাবী ও প্রয়াসের প্রেক্ষিতে পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকার ‘বাংলা একডেমি’কে প্রচলিত বাংলা সনের বিভিন্ন মাসের তারিখ নির্ধারন পদ্ধতি সংস্কারের মাধ্যমে বর্ষপঞ্জি প্রনয়ণের নির্দেশ দেয়। নির্দেশনা পেয়ে একাডেমির কর্মপরিষদ ১৯৬২ সালের ২২ অক্টোবর বৈঠকে বসে। বৈঠকে একটি কমিটি গঠন এবং গঠিত কমিটির দায়িত্ব অর্পনের মাধ্যমে বিষয়টি সুরাহা করার সিদ্ধান্ত হয়। এবং ঐ বৈঠকেই তাৎক্ষণিক ভাবে সৈয়দ আলী আহসান, অধ্যক্ষ এম আব্দুল কাসেম ও তারাপদ ভট্টাচর্য্যকে নিয়ে তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি প্রাথমিক কমিটিও গঠন করে দেওয়া হয়। এই কমিটি ১৯৬৩ সালের ১০ জুন প্রথম বৈঠকে বসলে আরও কয়েকজন বিশেষজ্ঞদের আমন্ত্রণ ও অর্ন্তভূক্তির পরিকল্পনায় আবার ১৩ জুন দ্বিতীয় দফা বৈঠকে বসে। যেখানে আমন্ত্রিতদের মধ্য থেকে কয়েকজনকে সংযুক্ত করে পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হয়। সর্বসম্মতিক্রমে বর্ধিত এ কমিটিতে ছিলেন- ১। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ (সভাপতি), ২। সৈয়দ আলী আহসান (সদস্য), ৩। সতীশচন্দ্র শিরোমণি জ্যোতির্ভূষণ (সদস্য), ৪। অবিনাশচন্দ্র কাব্য জ্যোতিষতীর্থ (সদস্য), ৫। তারাপদ ভট্টাচার্য কাব্য ব্যাকরণ পুরাণ স্মৃতিতীর্থ জ্যোতিশান্ত্রী (সদস্য)। এ কমিটির শেষসভা হয় ১৯৬৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি। যেখানে প্রচলিত বাংলাসনের বিভিন্ন তারিখ নির্ধারণকল্পে সর্বসম্মতিক্রমে নি¤œ লিখিত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
১) যেহেতু রাশি, নক্ষত্র এবং ঋতুর সঙ্গে বাংলা সনের পর্যায়ক্রম নির্ণয় করা হয় সেহেতু বৈশাখ মাস পয়লা এপ্রিল থেকে গণনা করা সম্ভবপর নহে।
২) ইংরেজি মাস ২৮, ৩০ কিংবা ৩১ দিনে হয় কিন্তু আমাদের সিদ্ধান্তে বাংলা মাস গণনার সুবিধার জন্য বৈশাখ মাস হইতে ভাদ্র মাস পর্যন্ত প্রতি মাসে ৩১ দিন হিসাবে গননা করা হইবে এবং আশ্বিন হইতে চৈত্র পর্যন্ত বাকি সাত মাসের প্রতি মাস ৩০ দিন হিসাবে গণনা করা হইবে।
৩) অতিবর্ষের (লিপইয়ার) চৈত্র মাস ৩১ দিনে হইবে। ৪ দ্বারা যে সাল বিভাজ্য, তা অতিবর্ষ বলিয়া পরিগণিত হইবে।
এইসব সিদ্ধান্ত ও নিয়মতন্ত্রের বেড়ীবদ্ধে সেই থেকে বাংলা একাডেমি ১৩৭৩, ১৩৭৪, ১৩৭৭ অর্থাৎ কিছুটা গতানুগতিক, অনিয়মিত ও সীমিত আকারে বাংলা বর্ষপঞ্জি তৈরি ও সরবরাহ করে আসছিলো। যা সে সময়ে রাষ্ট্রায়ত্ত কিছু অফিস আদালত, ব্যাংক-বিমায় টানিয়ে দেওয়া হত। পঞ্জিতে পহেলা বৈশাখ বাংলা নববর্ষের উল্লেখ থাকলেও ঐদিন সরকারী ছুটি ধার্য ছিল না। কিন্তু এ বাংলায় পূর্বপ্রচলিত ওপার বাংলার সনাতনী বর্ষপঞ্জির প্রভাব এবং ব্যবহার বা অনুসরনের অভ্যাস এতটা প্রকট ছিলো যে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠোপোষকতা বাধ্যবাধকতা থাকা সত্ত্বেও তাঁদের সে উদ্যোগী প্রচেষ্টার ফসল মোটেই কার্যকরী ও গণমুখী হতে পারেনি। তাছাড়া ইংরেজী বা খ্রিষ্ট্রীয় সনকে মডেল বা পাশাপাশি রেখে বাংলা সনের সংস্করণ হওয়ায় এবং সংস্কারিত বাংলাসনটি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিতে প্রচলনের জন্য নির্ধারণ করা সত্ত্বেও ইংরেজি সনের ব্যাপক প্রচার-প্রসার, প্রয়োগ ও ব্যবহার চালু থাকার কারণে পুরো প্রক্রিয়াটির প্রয়োজন, গুরুত্ব, চাহিদা এবং মর্যাদা খর্ব হয়। অবশ্য উন্নয়ন, উন্নতি, বিশ্বায়ন ও আন্তর্জাতিকতার ক্ষেত্রে সুবিধার প্রশ্নে বিষয়টির ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ভিন্ন হতে পারে।
তারপর ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীনের মাধ্যমে ‘বাংলাদেশ’ সৃষ্টির পর প্রস্তুতকৃত পঞ্জিটির কার্যকারিতা বা মান্যতার পুরো ব্যাপরটিই যেন অন্ধকারে মিলে যায়। এই অবস্থা চলতে চলতে ১৯৮৮ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ’র নেতৃত্বে সংস্কারকৃত সেই বাংলা বর্ষপঞ্জিকে স্বীকৃতি দিলে হারিয়ে যাওয়া গণসমর্থনহীন, অগ্রহণযোগ্য, অকার্যকর ও মৃত বিষয়টি জীবিত হয়ে ওঠে। সোজা-সাপটায় হিসাবটা বোঝাতে চাইলে অনেকটা এভাবেই বলতে হয় যে গড়পড়তা বৈশাখ থেকে ভাদ্র পর্যন্ত ৫ মাস ৩১ দিনে (৫দ্ধ৩১ = ১৫৫ দিন) এবং আশ্বিন থেকে চৈত্র পর্যন্ত ৭ মাস ৩০ দিনে (৭দ্ধ৩০ = ২১০ দিন) গণ্য হবে। সর্বমোট ঃ ১৫৫ + ২১০ = ৩৬৫ দিন। আর লিপইয়ারের (অতিবর্ষ) কারণে ৪ দ্বারা বিভাজ্য বর্ষে চৈত্রমাস একবার করে ৩১ দিনে ধার্য্য হবে। এই হিসাবটির কারণে প্রায়শই আমাদের দেশে পহেলা বৈশাখসহ অন্যান্য পালনীয় দিন পূর্বের হিসাব থেকে ১ দিন এগিয়ে আসে। অতিবর্ষের কারণে ১৯২০ সাল ৪ দ্বারা বিভাজ্য হওয়ায় এবং চৈত্রমাস ৩১ দিন ধরে নেওয়ায় আগামি বাংলা ১৪২৭ বর্ষের নববর্ষ দুই বাংলায় একই দিনে পড়ে। অর্থাৎ শুধু অতিবর্ষেই একবার দুইবাংলায় নববর্ষ একযোগে সম্পন্ন হওয়ার সুযোগ মিলবে। সুতরাং বর্তমানে পূর্বের আংশিক প্রচলিত সেই সংস্কারকৃত পঞ্জিকাটির অনুসরণের প্রচলন গুরুত্বের সাথে প্রবর্তিত হওয়ায় বাঙালিত্বের স্বকীয়তা, কৃষ্টি ও ঐতিহ্যের সম্মিলন মারাত্মক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হওয়ায় দুই বাংলায় (পশ্চিমবাংলাসহ) সম্মিলিতভাবে বর্ষপঞ্জি নিরূপণের ক্ষেত্রে দারুন জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে। নক্ষত্রের গতিবিধির তারতম্যের ফলে তিথী বা ক্ষণের যে তারতম্য ঘটে তাতেও সে অংশিকতার প্রভাব পড়ে। অর্থাৎ দুইবাংলার জন্য দুইরকম পঞ্জিকার সৃষ্টি হয়। তবে যেহেতু রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা, বাধ্যবাধকতা ও মান্যতাকে উপেক্ষা করার বিষয়টি এখন আর আগের মত নেই। কারণ এই দেশ, সরকার, আইন, স্বাধীনতা সবই অর্জন করে পাওয়া, সবই একান্ত আমাদের, সেহেতু প্রকৃত বাঙালিরা অপ্রকাশ্যের এক নীরব প্রতিবাদী ক্ষোভের অর্ন্তজ্বালা বয়ে বেড়ায় নববর্ষে এবং প্রতিটি পর্ব-পার্বণ, জন্ম-মৃত্যু, বিবাহ ইত্যাদি পালনের আনুষ্ঠানিকতায়। নিরুৎসাহে অনেকটা লুকোচুরি খেলার মত অপ্রকৃত বিষয়কে (ভ্রান্ত দিন-ক্ষণ) সামনে ও সামলে নিয়ে প্রকৃত বিষয়ের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। ক্ষেত্র বিশেষে আসল-নকল দুই রূপেরই দুবার প্রস্তুতি ও সজ্জা সম্পন্ন করতে হয়। ‘বনেরা বনে সুন্দর, শিশুরা মাতৃক্রোড়ে’ কবির এ কাব্যের মত যেন বলতে ইচ্ছে করে আগে যা ছিলো তাই দাও ফিরায়ে।
প্রতিবারের মত কোলকাতার ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা গবেষণা ও প্রসার কেন্দ্র’ বাংলা বর্ষকে স্বাগত জানাতে পহেলা বৈশাখে ঢাকার আদলে একটি বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রার আয়োজন করে। দক্ষিণ কোলকাতার গাঙ্গুলি বাগান থেকে শুরু হয়ে তা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে গিয়ে শেষ হয়। একইভাবে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা কোলকাতা’ নামের একটি সংগঠন দক্ষিণ কোলকাতার সুকান্ত সেতু থেকে ঢাকুরিয়া পর্যন্ত আরও একটি শোভাযাত্রা করে। এছাড়াও পশ্চিমবঙ্গের কয়েকটি স্থান থেকে অন্যান্য সংগঠন বেশ ধূমধামে শোভাযাত্রা করে। তবে সংগত কারণেই তা বাংলাদেশের পরের দিন। প্রসঙ্গটি নিয়ে আবারও একটু দুঃখের সাথে বলতে হয় যে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা পাঁচদশক অতিক্রম করলেও বিগত চার দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলা বর্ষের হিসাব-নিকাশে তারতম্য সৃষ্টি হওয়ায় বৃহত্তর বাংলায় (ওপার বাংলাসহ) সনাতনবাদী সংস্কৃতির সাথে দিনটির সুনির্দিষ্ট ও বিধিবদ্ধ তিথি-লগ্নের সাদৃশ্য হারিয়ে ফেলেছি। যার প্রভাবে বর্তমানে আমাদের দেশে দিনটি একদিন এগিয়ে এসে পূর্বের হিসাবের চৈত্র মাসের শেষ দিনে পহেলা বৈশাখ হয়। আমাদের দেশে বর্তমান চলমান বছর, মাস ও দিন-ক্ষণ গনণার প্রবর্তিত ধারাটি এক সময়ের সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অভিজ্ঞ একদল প্রাজ্ঞ মনীষী, খ্যাতমান জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও সুশীল বুদ্ধিজীবীদের সমন্বয়ে গঠিত বোর্ড দ্বারা নির্ধারত হওয়ায় এর যোগ্যতা ও কার্যকারিতার যৌক্তিক বিষয়ের তাত্ত্বিকতা হয়তোবা নিছক হটকারিতা নয়। এমন একটি ভাবনার ভরে এবং রাষ্ট্র প্রণীত বিধির মান্যতা ও বাধ্যবধকতায় এর প্রতি আপাত শ্রদ্ধা ও মৌন সম্মতি থাকলেও লোকায়ত অর্থে তা বর্তমানের প্রেক্ষাপটে সর্বজনসিদ্ধের সে সক্ষমতাকে বিতর্কিত করেছে। সম্প্রতি কোন কেন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান বাংলা নববর্ষপালন এবং তৎসংশ্লিষ্ট মঙ্গল শোভাযাত্রাকে ধর্মের সাথে সাংঘর্ষিক বলে মত প্রকাশ করে তা পালন থেকে বাঙালিকে বিরত রাখার জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছে। তাদের জানা উচিত এটা কোন ধর্মীয় সংস্কৃতি নয়, এটা দৈশিক সংস্কৃতি বা জাতিগত লোকাচার। যা হাজার বছর ধরে পালিত হয়ে আসছে। বছরে বছরে যার সাথে যুক্ত হচ্ছে কিছু কিছু নতুন উপাদান। বিযুক্ত হচ্ছেও কিছু কিছু। জাতি-ধর্ম-বর্ণ ভেদের উর্দ্ধে থাকা এই লোকজ মহউৎসবে আমরা যেন কোন ব্যক্তি স্বার্থ বা অসৎ উদ্দেশ্য চরিতার্থে উত্তেজিত ও অমানবিক না হয়ে উঠি।
আমরা বাঙালি হিশেবে সকলে নিশ্চয়ই অবগত থাকি যে, পহেলা বৈখাশের আগের দিন ‘চৈত্রসংক্রান্তি’র একটা অতীব গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান বাঙালি জাতির অপর এক বৃহত্তর ধর্মাগোষ্ঠী ‘সনাতনধর্মাবলম্বী’রা পালন করে থাকেন। যা ব্যাপক অর্থে পহেলা বৈশাখের ন্যায় বাঙালিরই অনুষ্ঠান বলে বিবেচিত হয়। ‘চৈত্র সংক্রান্তি’ বলতে চৈত্র মাসের শেষ দিনকে বোঝালেও আসলে এই সংক্রন্তি উদ্যাপনের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয় তার আরও দুই দিন আগে থেকে। এর আনুষ্ঠানিকতার অন্যতম আকর্ষণ ‘চড়ক পুজা’ ‘দেউল পুজা’। যে পুজার কর্মযজ্ঞের সাথে সম্পৃক্ত থাকে বেশ কিছু অনুষঙ্গ।
প্রথম দিনে সন্ন্যাসীদের নিজগোত্র পরিত্যাগ ও শিবগোত্র শিরধার্যে গলায় উত্তরীয় (পৈতে) ধারণ করে ‘ঘাট সন্ন্যাস’, ‘খেজুর ভাঙা’ ও ‘বালাদার’ এর মাধ্যমে হাজরা (ভূতের দেবতা) আমন্ত্রণ কর্ম সম্পাদন।
দ্বিতীয় দিনে ‘শিবস্নান’ ‘নীলপুজা’। নীল পুজার সময় বিধিবদ্ধ পুজা-অর্চণা ছাড়াও শিব ঠাকুরের তুষ্টি লাভে ইস্তুতিমূলক প্রশংসা বা গুণ র্কীর্তন। নিত্য-গীতে মহাদেবের সহিত লীলাবতীর বিবাহ উৎসবের আনন্দঘন প্রতিকী আবহ সৃষ্টি করা হয়।, ‘হাজরা ভেট’ বা ভূতদের খাবার প্রদান ইত্যাদি।
তৃতীয় দিনে প্রথম দিনের ঘাট সন্নাসের মত মন্দিরে শিবের মাথায় ফুল রেখে বিশেষ নিয়মে তার স্খলন ঘটানো হয়। ‘কাঁটা ঝাপ’ অর্থাৎ খেজুর গাছের মাথায় কাঁটার ওপর দাঁড়িয়ে ঝাঁপ দেওয়া। ‘আগুন ঝাঁপ’ অর্থাৎ প্রজ্জ্বলিত আগুনের বিশেষ কু-লি করে তার ভিতর ঝাপ দেওয়া। ‘বাণ ফোঁড়’Ñ লৌহ শলাকা দ্বারা জিহবা বিদ্ধ করা। ‘বড়শি ফোঁড়’Ñপিঠে হুক বা বড়শি ফুটিয়ে নিয়ে শূন্যে পাক খাওয়া এবং ‘চড়পটাস বা চড়ক’ সম্পাদন।
এছাড়াও এ সবের পাশাপাশি শিবকে উপলক্ষ্য করে সন্ন্যাসীরা সম্পাদন করেন আরও মজার-মজার কিছু ঐচ্ছিক কর্মক্রিয়া। তবে ঘটনার বীভৎসতায় ১৮৬৩ সালে ইংরেজ গভর্নমেন্ট ‘বান ফোঁড়’ বন্ধ করে দেন এবং ‘বড়শি ফেঁড়ে’র পরিবর্তে পিঠে বিশেষ কায়দায় দড়ি বেঁধে নিয়ে পাক খাওয়ার বিধান চালু করেন। তাছাড়া ‘চৈত্রসংক্রান্তি’র জন্য চৈত্র মাসের এই শেষের তিন দিনের ঐসব কর্মযজ্ঞ সম্পন্নকালে বিশেষকরে সন্ন্যাসীরা, সন্তানবতী মহিলা ও মানতিরা উপবাস ব্রত পালন করেন আর বাকি অন্যরা নিরামিষভোজী’ হন। তাই বর্তমান সময়ে আমাদের দেশে চৈত্র সংক্রান্তির দিনে পহেলা বৈশাখ পালিত হয় বলে একদিকে আমিষসহ অন্যান্য নানান সুস্বাদু খাবার আর সাজানো পসরা পাশাপাশি আনন্দ আয়োজনের জোয়ার বয়ে যায়। অন্যদিকে চলে নানান শাস্ত্রীয় বিধি-বিধানে আবিষ্ট হয়ে নির্ধারিত পূজা-অর্চনায় ব্রতী হওয়া, নিরামিষভোজ ও উপবাসের কষ্টসাধ্য সাধনা। প্রতি বছর দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘটিত এই সংক্রান্তী সংক্রন্ত যজ্ঞে বিশেষত: চড়কে সরাসরি অংশ নিয়ে সন্নাসীদের কেউ কেউ অসুস্থ, আহত কিংবা নিহতও হয়ে থাকে।
সুতরাং একই দেশে দ্বৈতরীতির প্রচলনের প্রভাবে চৈত্রমাসের অন্তত এই সময়টিতে নববর্ষের দিবস নির্বাচনে হের-ফের ঘটিয়ে আনুষ্ঠানিকতার তারতম্য সৃষ্টি হওয়ায় পারস্পরিক সহাবস্থান, সংহতি, সাম্য ও সম্প্রীতির সর্বোবৃহৎ নিদর্শনী দৃষ্টান্তটি সমুন্নত রাখতে মারাত্মক বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হচ্ছে। আমরা জানি- সাংস্কৃতিক পরিচর্যার মধ্য দিয়ে মানবিক মূল্যবোধ জাগিয়ে তুলে সুস্থ, সত্য, সুন্দর, সভ্য ও প্রকৃত বাঙালি মানুষ হয়ে বেড়ে ওঠার চেতনা উৎসারিত হয়। তাই আমাদের ভাবনা হচ্ছে- অজ্ঞতা, বিচক্ষণহীনতা বা অবিবেচনা প্রসূত সিদ্ধান্তের সংকীর্ণতায় চলমান শুভধারায় কখনো কোন অশুভতা ভর করছে কিনা। বৃহত্তর বাংলার বাঙালির মাঝে একযোগে বাংলা নববর্ষ পালনে এমন বৈপরীত্য, বিব্রত ও বিড়ম্বনাকর পরিস্থিতির পরিত্রাণ বা উত্তোরণ ঘটানোর জন্য আন্তরিক ও সচেষ্ট হওয়া উচিত। ফলে আতীতি ঐতিহ্যের সর্ববৃহৎ প্রথাগত প্রচলনটির এই বৈষম্যকর ছন্দপতনী সিদ্ধান্তটি পুনঃসমন্বিতকরণের মাধ্যমে পূর্বের পঞ্জিটি (১৯৮৮ পূর্ববর্তী) পুনঃপ্রবর্তনে কার্যকরী ভূমিকা গ্রহণে উদ্যোগী হতে কৃষ্টি-সংস্কৃতি, ইতিহাস-ঐতিহ্য বান্ধব বর্তমান সরকার ও সংশ্লি¬ষ্ট মহলের কাছে জোর দাবী রাখে। পাশাপাশি এটিও ভাববার দাবী রাখে যে- সময় বেঁধে দিয়ে, নির্দেশনা আরোপ করে উৎসবটির মর্যাদা ও অবাধ অখ-তার বৈশিষ্ঠ্য ব্যাহত হচ্ছে কিনা। তবে কোন ক্ষতি বা অহিতকর ঘটনা ও লঞ্চনার আশঙ্কায় সময়, পরিবেশ-পরিস্থিতি প্রেক্ষাপট সেটা অনুমোদন করলে ভিন্ন কথা।
কোন চাপিয়ে দেওয়া, আমদানী করা কিংবা সংস্কার করা সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ প্রতিরোধে নববর্ষ পালিত হোক যুগে যুগে বাঙালিত্বের বিজয়ে, সনাতনী নিয়মে, নিরপেক্ষ যথার্থ চেতনার আত্মিক শক্তি ও অটুট ঐক্যের মহিমালোকে। বাংলা সনের উত্তরাধিকারের অংশিদারিত্বে বাংলা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর একটি অংশ পৃথিবীতে বাঙালি ও বাংলাদেশ নামীয় স্বতন্ত্র জাতিরাষ্ট্র গঠনে সক্ষম হয়েছে। এর অতীত গৌরব গাঁথার লালন ও প্রতিপালনে আমরা যেন সম্মিলিতভাবে মুক্ত মনে স্বদেশে তার কৃষ্টি ও ঐতিহ্য সুরক্ষার অবারিত সুযোগ নিতে পারি। পরিশেষে আমাদের জাতীয় সংগীত রচয়িতা কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ দিয়েই শেষ করিÑ
হে নতুন, এসো তুমি সম্পূর্ণ গগন পূর্ণ করি
পুঞ্জ পুঞ্জ রূপে।
সহায়ক গ্রন্থ:
(১) আইন-ই-আকবরী : আবুল ফজল আল্লামী, অনুবাদ : আহমদ ফজলুর রহমান, বাংলা একাডেমী- ১৯৯৩। (২) বাংলা সনের জন্ম কথা : মুহম্মাদ আবু তালিব, বাংলা একাডেমী- ২০০৩। (৩) বাংলা সনের জন্ম কথা : মোকাররাম আলী খান, সাঁকোবাড়ী প্রকাশন-২০১১। (৪) মধ্যযুগের বাংলা : সুকুমার সেন। (৫) সরল বাংলা অভিধান : সুবল চন্দ্র মিত্র (সংকলিত)। (৬) তারিখ-ই-বাঙ্গালাহ (ফরাসি গ্রন্থ ১৭৬৩) : মুনশি সলিমুল্লাহ। (৭) আহওয়াল-ই-মহব্বতজঙ্গ (ফরাসি গ্রন্থ) : ইউসুফ আলী খান। (৮) বাংলা বর্ষপঞ্জি ও বাংলা একাডেমি : ড. মোমেন চৌধুরী। (৯) বার ভূঞা : আনন্দনাথ রায় প্রণীত। (১০) আকবরনামা : আবুল ফজল প্রণীত। লেখক : সাধারণ সম্পাদক, সাতক্ষীরা সিকান্দার একাডেমি

Ads small one

তথ্যের সত্যতা নিশ্চিতকরণে সচেতনতা ও ফ্যাক্ট-চেকিং শীর্ষক সেমিনার

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ৮ জুন, ২০২৬, ৩:৪৫ অপরাহ্ণ
তথ্যের সত্যতা নিশ্চিতকরণে সচেতনতা ও ফ্যাক্ট-চেকিং শীর্ষক সেমিনার

খুলনা আঞ্চলিক তথ্য অফিস পিআইডি’র আয়োজনে ‘তথ্যের সত্যতা নিশ্চিতকরণে সচেতনতা ও ফ্যাক্ট-চেকিং’ শীর্ষক দিনব্যাপী সেমিনার আজ (সোমবার) চুয়াডাঙ্গা ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত হয়। সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসক লুৎফুন নাহার।

সেমিনারে প্রধান অতিথি বলেন, আমরা তথ্য ভান্ডারের মধ্যে বসবাস করছি, যেখানে সব তথ্যের সত্যতা খালি চোখে যাচাই করা সম্ভব নয়। প্রত্যেক নাগরিক বুঝে হোক না বুঝে হোক প্রতিনিয়ত তথ্য শেয়ার করছেন। এতে অপতথ্যের অনিয়ন্ত্রিত ছড়াছড়ি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ সর্বত্র বৃদ্ধি পাচ্ছে। গুণগত শিক্ষার মতো গুণগত সংবাদ পরিবেশনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফ্যাক্ট চেকিং রাজনৈতিক নেতা, সরকারি দপ্তর ও সাংবাদিকদের কাজের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে। ফলস্বরূপ প্রত্যেক ঘটনার গ্রহণযোগ্যতা যেমন বৃদ্ধি পায় তেমনি জনগণের তথ্য অধিকার নিশ্চিত হয়। তিনি সাংবাদিকদের কোন প্রতিবেদন তৈরির পূর্বে গভীরভাবে পর্যালোচনা করতে এবং সত্য প্রকাশে অবিচল থাকতে অনুরোধ করেন। আঞ্চলিক তথ্য অফিস খুলনার আয়োজনে তথ্যের সত্যতা নিশ্চিতকরণে সচেতনতা ও ফ্যাক্ট চেকিং সেমিনারটি অত্যন্ত সময়োপযোগী বলে তিনি সংশ্লিষ্টদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন।

সেমিনারে মূলপ্রবন্ধ উপস্থাপন করেন খুলনা আঞ্চলিক তথ্য অফিসের সিনিয়র তথ্য অফিসার মো: মেহেদী হাসান। মূলপ্রবন্ধে অপতথ্যরোধে ফ্যাক্ট চেকিং এর গুরুত্ব তুলে ধরা এবং বিভিন্ন প্রয়োজনীয় টুলস সম্পর্কে ধারনা দেয়া হয়।

খুলনা আঞ্চলিক তথ্য অফিসের উপপ্রধান তথ্য অফিসার এ এস এম কবীরের সভাপতিত্বে সেমিনারে চুয়াডাঙ্গা জেলা তথ্য অফিসার শিল্পী মন্ডল, চুয়াডাঙ্গা প্রেসক্লাবের সভাপতি নাজমুল হক স্বপন, জেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি এ্যাড. মানিক আকবার-সহ অন্যান্য গণমাধ্যমকর্মীরা বক্তব্য রাখেন। সেমিনারটি সঞ্চালনা করেন সহকারী তথ্য অফিসার মোঃ রমজান আলী।

সেমিনারে চুয়াডাঙ্গার ৩৫ জন প্রিন্ট, ইলেক্ট্রনিক ও অনলাইন মিডিয়ার কর্মীরা অংশ নেন। তথ্যবিবরণী

ওয়েটার তত্ত্বের দেশে ক্যারিয়ারের মৃত্যু

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ৮ জুন, ২০২৬, ৩:৩৯ অপরাহ্ণ
ওয়েটার তত্ত্বের দেশে ক্যারিয়ারের মৃত্যু

মো: মামুন হাসান

বাংলাদেশে একজন শিক্ষার্থী যদি বলে সে ডাক্তার হতে চায়, আমরা তাকে বাহবা দিই। ইঞ্জিনিয়ার হতে চাইলে গর্ব করি। বিসিএসের প্রস্তুতি নিলে আত্মীয়স্বজন পর্যন্ত তাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। কিন্তু একই শিক্ষার্থী যদি বলে সে ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগে পড়তে চায়, তখন অনেকের মুখে একটাই প্রশ্ন শোনা যায় “হোটেলে চাকরি করবে নাকি?”

এই প্রশ্নটি শুধু একটি প্রশ্ন নয়; এটি আমাদের সমাজের দীর্ঘদিনের অজ্ঞতা, সংকীর্ণতা এবং পেশাগত বৈষম্যের প্রতিচ্ছবি। অবাক লাগে, যে সমাজ বিদেশে গিয়ে পাঁচতারকা হোটেলের সেবা দেখে মুগ্ধ হয়, সেই সমাজ নিজের দেশে হসপিটালিটি পেশাজীবীদের সম্মান দিতে কৃপণতা করে। যে অভিভাবক সন্তানকে বিদেশে পাঠিয়ে আন্তর্জাতিক হোটেলে চাকরি পেলে গর্ব করেন, তিনিই দেশে একই বিষয়ে পড়াশোনা করতে চাইলে নিরুৎসাহিত করেন।এর চেয়ে বড় আত্মবিরোধিতা আর কী হতে পারে?

বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের অন্যতম অবহেলিত অথচ সম্ভাবনাময় শিক্ষাখাত ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট। এই অবহেলার কারণ দক্ষতার অভাব নয়, সুযোগের অভাবও নয়; মূল সমস্যা আমাদের মানসিকতায়। আমরা এখনো মনে করি সাদা অ্যাপ্রোন পরলে সম্মান আছে, টাই পরে অফিসে বসলে মর্যাদা আছে, কিন্তু অতিথি ব্যবস্থাপনা, হোটেল পরিচালনা বা পর্যটন শিল্পে কাজ করলে সম্মান কমে যায়। অথচ বিশ্বের উন্নত দেশগুলো বহু আগেই এই সংকীর্ণ চিন্তা থেকে বেরিয়ে এসেছে।

সুইজারল্যান্ডের মতো দেশে হোটেল ম্যানেজমেন্ট একটি এলিট শিক্ষা হিসেবে বিবেচিত হয়। বিশ্বের অনেক রাষ্ট্রপ্রধান, ব্যবসায়ী এবং বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তারাও হসপিটালিটি বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। কারণ এই শিক্ষা মানুষকে শুধু হোটেল পরিচালনা নয়, নেতৃত্ব, যোগাযোগ, সংকট মোকাবিলা এবং মানুষকে বোঝার দক্ষতা শেখায়। কিন্তু বাংলাদেশে এখনো অনেক শিক্ষার্থী আত্মীয়স্বজনের কটূক্তির ভয়ে এই বিষয়ে ভর্তি হতে সাহস পায় না। আরেকটি প্রশ্ন আমাদের বিবেককে নাড়া দেওয়া উচিত। দেশের বড় বড় পাঁচতারকা হোটেলগুলোতে বিদেশি শেফ, বিদেশি কনসালট্যান্ট, বিদেশি ম্যানেজার কেন কাজ করেন? তারা কি আমাদের চেয়ে বেশি মেধাবী? অবশ্যই নয়। তাদের বড় শক্তি হলো তারা এমন সমাজ থেকে এসেছে, যেখানে দক্ষতাকে সম্মান করা হয়। আর আমরা এখনো ডিগ্রির নাম দেখে সম্মান দিই, দক্ষতার মূল্য নয়। ফলে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা বিদেশে চলে যাচ্ছে।

 

যে পদগুলোতে বাংলাদেশের তরুণরা কাজ করতে পারত, সেগুলোতে বিদেশিরা নিয়োগ পাচ্ছে। আমরা একদিকে বেকারত্বের অভিযোগ করছি, অন্যদিকে কর্মসংস্থানের একটি বিশাল ক্ষেত্রকে অবজ্ঞা করছি। এটা কি আত্মঘাতী নয়? আরও দুঃখজনক হলো, দেশের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিষয়ে পড়াশোনার সুযোগ থাকলেও সে বিষয়ে সচেতনতা তৈরির উদ্যোগ খুবই সীমিত। ক্যারিয়ার গাইডেন্সে এই খাতের আলোচনা প্রায় অনুপস্থিত। যেন এটি কোনো গুরুত্বপূর্ণ পেশাই নয়, কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ উল্টো।

বিশ্ব অর্থনীতিতে পর্যটন ও আতিথেয়তা শিল্প এখন অন্যতম বৃহৎ নিয়োগদাতা খাত। দুবাই, সিঙ্গাপুর, মালদ্বীপ, থাইল্যান্ড কিংবা তুরস্কের অর্থনীতির দিকে তাকালেই বোঝা যায় কীভাবে পর্যটন ও হসপিটালিটি লাখ লাখ মানুষের জীবন বদলে দিয়েছে।

বাংলাদেশের রয়েছে কক্সবাজার, সুন্দরবন, সেন্ট মার্টিন, পাহাড়ি অঞ্চল, প্রতœতাত্ত্বিক ঐতিহ্য এবং সমৃদ্ধ সংস্কৃতি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমরা কি সেই সম্ভাবনা কাজে লাগানোর জন্য প্রয়োজনীয় মানবসম্পদ তৈরি করছি? উত্তর খুব সুখকর নয়। আমরা এখনো এমন এক সমাজে বাস করি, যেখানে অনেক মানুষ মনে করেন হোটেল ম্যানেজমেন্ট মানে ট্রে হাতে অতিথির সামনে দাঁড়িয়ে থাকা। অথচ তারা জানেন না, সেই হোটেলের ব্যবস্থাপক শত কোটি টাকার সম্পদ পরিচালনা করেন, শত শত কর্মীর নেতৃত্ব দেন এবং একটি আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের সুনাম রক্ষার দায়িত্ব পালন করেন। সমস্যা আসলে পেশার নয়; সমস্যা আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির।

আমরা সন্তানদের শেখাই “মানুষ কী বলবে”। কিন্তু শেখাই না “তুমি কী হতে চাও”। আমরা মর্যাদা খুঁজি পেশার নামে, দক্ষতায় নয়। ফলাফল হলো, অনেক তরুণ নিজের আগ্রহের জায়গা ছেড়ে সামাজিক চাপের কাছে হার মানে। কেউ হয়তো ভালো হসপিটালিটি ম্যানেজার হতে পারত, কেউ আন্তর্জাতিক মানের শেফ, কেউ পর্যটন উদ্যোক্তা। কিন্তু সমাজের ভ্রুকুটির কারণে তারা অন্য পথে চলে যায়।

বাংলাদেশ যদি সত্যিই দক্ষতা নির্ভর অর্থনীতি গড়তে চায়, তাহলে এই মানসিকতা বদলাতেই হবে। আজ প্রয়োজন একটি সামাজিক আন্দোলনের। এমন একটি আন্দোলন, যা বলবে সব পেশার মর্যাদা সমান নয়, কিন্তু সব সম্মানজনক পেশার মর্যাদা থাকা উচিত। আর হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট নিঃসন্দেহে একটি সম্মানজনক, আধুনিক এবং আন্তর্জাতিক পেশা।

প্রশ্ন একটাই আর কতদিন আমরা অজ্ঞতার কারণে একটি সম্ভাবনাময় খাতকে অবহেলা করব? আর কতদিন আমরা বিদেশি দক্ষ জনবল আমদানি করব, অথচ নিজের দেশের তরুণদের স্বপ্নকে তুচ্ছজ্ঞান করব? আর কতদিন আমরা পেশাকে নয়, পেশার নামকে সম্মান দেব? সম্ভবত সময় এসেছে আয়নায় নিজেদের দেখার। কারণ হোটেল ম্যানেজমেন্টের সংকট আসলে এই খাতের নয়; সংকট আমাদের সামাজিক মানসিকতার। আর এই মানসিকতার পরিবর্তন না হলে আমরা শুধু একটি শিক্ষাবিষয়কে নয়, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতির একটি বড় সম্ভাবনাকেও হারাতে থাকব।

লেখক: মো: মামুন হাসান, ইনস্ট্রাক্টর (টেক) ও বিভাগীয় প্রধান, ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট।

 

 

শার্শা প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি আসাদুজ্জামান আসাদকে হয়রানিমূলক গ্রেপ্তার

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: সোমবার, ৮ জুন, ২০২৬, ৩:২৯ অপরাহ্ণ
শার্শা প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি আসাদুজ্জামান আসাদকে হয়রানিমূলক গ্রেপ্তার

এম এ রহিম, বেনাপোল (যশোর): যশোরের শার্শা প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক বিডিনিউজ২৪ডটকম এর বেনাপোল প্রতিনিধি আসাদুজ্জামান আসাদকে হয়রানিমূলক গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তার আটকের প্রতিবাদে মুক্তির দাবীতে শার্শা থানার সামনে অবস্থান নিয়েছেন গণমাধ্যম কর্মীরা। নিঃস্বর্ত মুক্তি চান তারা।

বেনাপোল প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক বকুল মাহবুব জানান, সোমবার গভীর রাতে যশোরের শার্শা জামতলার নিজবাড়ী থেকে সুনির্দিষ্ট কোন অভিযোগ ছাড়াই যশোর ডিবি পুলিশ পরিচয়ে গ্রেপ্তার করা হয় সিনিয়র সাংবাদিক আসাদকে। সিসি ক্যামেরা খুলে নিয়ে যাওয়া হয়। বেদম মারপিট করে আহত করা হয় সাংবাদিকের ভাগ্নে কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থী তরঙ্গকে। পরে পরিবারের কাছ থেকে মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয় তাকে।

সাংবাদিককে আটকের প্রতিবাদে সোমবার সকাল থেকে থানার সামনে অবস্থান নিয়েছে বিভিন্ন এলাকার সাংবাদিকেরা। নিঃস্বর্ত মুক্তি চান তারা। থানায় আটক রাখা হয়েছে তাকে।
এসব বিষয়ে জানার চেষ্টা করলে ফোন রিসিভ করেন নি শার্শা থানার ওসি।

সাংবাদিক জামাল হোসেন ও মনির হোসেন জানান, নির্বাচিত সরকারের সময় একজন সিনিয়র সাংবাদিককে এভাবে হয়রানিমূলক আটক স্বাধীন সাংবাদিকতার উপর হস্তক্ষেপ। সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হয়। তার মুক্তির দাবী জানান তারা।

সাংবাদিকের হয়রানিমুলক গ্রেপ্তারের নিন্দা ও প্রতিবাদসহ মুক্তির দাবী জানান যশোরসহ বিভিন্ন এলাকার গণমাধ্যম কর্মীরা।