মুক্ত মতামত/ সাতক্ষীরায় জ্বালানি সংকট নিরসনে ‘ফুয়েল কার্ড’ এখন সময়ের দাবি
মাসুদ রানা
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভয়াবহ যুদ্ধের উত্তাপ এবার সরাসরি আছড়ে পড়েছে বাংলাদেশের জ্বালানি বাজারে। দেশজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে তীব্র জ্বালানি সংকট। সাতক্ষীরার প্রতিটি পেট্রোল পাম্পের সামনে এখন দিগন্তবিস্তৃত মোটরসাইকেলের সারি। তবে এই দীর্ঘ লাইনে কেবল সাধারণ মানুষই নন, রয়েছেন চিকিৎসক, সাংবাদিক, পুলিশ ও প্রশাসনের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও মিলছে না পর্যাপ্ত তেল, যার ফলে ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে জরুরি সেবা খাত।
ভোগান্তির কবলে জরুরি সেবাদানকারীরা সবচেয়ে বিপাকে পড়েছেন গণমাধ্যমকর্মীরা। সংবাদের সন্ধানে যাদের প্রতিনিয়ত ছুটতে হয়, তাদের দিনের বড় একটি অংশ ব্যয় হচ্ছে পাম্পের লাইনে।সিনিয়র সাংবাদিক এস এম রেজাউল ইসলাম আক্ষেপ করে বলেন, “নিউজ কভার করতে যাব নাকি তেল খুঁজতে বের হব? ৮-১০ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার পর যখন সিরিয়াল আসে, তখন শুনছি তেল শেষ। এভাবে চললে জনগনের কাছে তথ্য পৌঁছানো অসম্ভব হয়ে পড়বে।”
একই চিত্র চিকিৎসকদের ক্ষেত্রেও। একজন ভুক্তভোগী পশু চিকিৎসক জানান “অনেক দূরে যাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু বাইকে তেল নেই। ১০ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে মাত্র ৩০০ টাকার তেল পেয়েছি। এই সময়ের মূল্য কি ৩০০ টাকায় পরিমাপ করা সম্ভব?
তীব্র এই সংকটের মাঝেও একদল অসাধু ব্যক্তি মেতে উঠেছে কালোবাজারিতে। অভিযোগ উঠেছে, কিছু বাইকার যাদের ট্যাংকে পর্যাপ্ত তেল আছে, তারা পাম্প থেকে তেল নিয়ে কৌশলে পাইপ দিয়ে প-াস্টিক পটে সংগ্রহ করছে। পরবর্তীতে সেই তেল প্রতি লিটারে ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা বাড়তি দামে বাইরে বিক্রি করা হচ্ছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, পাম্পে কখন তেল আসবে সেই তথ্য আগাম জেনে নিয়ে একটি চক্র ১০-১২ ঘণ্টা আগেই মোটরসাইকেল দিয়ে সিরিয়াল বুকিং দিয়ে রাখছে। ফলে প্রকৃত সংকটে থাকা বাইক চালকরা যখন পাম্পে পৌঁছান, তখন তারা সিরিয়ালের শেষে পড়ে যান এবং তাদের তকদিরে জোটে ‘তেল শেষ’ লেখা সাইনবোর্ড।
বিদ্যমান এই নৈরাজ্য রুখতে প্রস্তাবিত সমাধানগুলো হতে পারেÑ
ফুয়েল কার্ড প্রবর্তন: প্রতিটি যানবাহনের জন্য নির্দিষ্ট ‘ফুয়েল কার্ড’ চালু করা। এই কার্ডে গাড়ির রেজিস্ট্রেশন নম্বর, ড্রাইভিং লাইসেন্স এবং তেল গ্রহণের তারিখ সংরক্ষিত থাকবে। তিন দিনের বিরতি: একবার তেল নেওয়ার পর পরবর্তী তিন দিন ওই কার্ডে আর তেল দেওয়া হবে না। সমন্বিত সরবরাহ: সকল পাম্পে একই সময়ে তেল সরবরাহ করতে হবে যাতে এক পাম্পে ভিড় না জমে। কার্ডধারীদের নির্দিষ্ট পাম্প নির্ধারণ করে দিতে হবে।
কঠোর নজরদারি ও জরিমানা: তেল দেওয়ার আগে চালকের হেলমেট, লাইসেন্স ও গাড়ির ট্যাংক পরীক্ষা করতে হবে। যদি দেখা যায় কারো ট্যাংকে ৩ লিটারের বেশি তেল আছে কিন্তু তিনি লাইনে দাঁড়িয়েছেন, তবে তাকে তাৎক্ষণিক জরিমানার আওতায় আনতে হবে। পেশাজীবীদের জন্য নির্ধারিত সময়: সরকারি চাকরিজীবী, চিকিৎসক ও সাংবাদিকদের মতো জরুরি পেশার মানুষের জন্য নির্দিষ্ট সময় বা আলাদা কাউন্টারের ব্যবস্থা করতে হবে।
শৃঙ্খলা রক্ষায় বাহিনী মোতায়েন: প্রতিটি পাম্পে বিশৃঙ্খলা ও কালোবাজারি রুখতে পুলিশ, সেনাবাহিনী অথবা বিজিবি সদস্যদের মোতায়েন করা এখন সময়ের দাবি। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাব কতটা দীর্ঘস্থায়ী হবে তা অনিশ্চিত। তবে দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা এবং শৃঙ্খলা না ফিরলে এই জ্বালানি সংকট জনরোষে রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।









