শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ্ব ও ভূ-রাজনীতি: আমাদের আবেগ ও বাস্তবতার টানাপোড়েন
শেখ সিদ্দিকুর রহমান
ইসলামী বিশ্বের মানচিত্রে শিয়া-সুন্নি মতভেদ কোনো নতুন বিষয় নয়। কয়েক শতাব্দী ধরে এই দুই ধারার মধ্যে তাত্ত্বিক ও আদর্শিক লড়াই চলছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি এবং বিশেষ করে ইরান বনাম ইসরায়েল-আমেরিকা দ্বন্দ্ব বাংলাদেশের ধর্মপ্রাণ মানুষের মধ্যে এক অদ্ভুত মানসিক ও আদর্শিক বৈপরীত্য তৈরি করেছে। যে শিয়া মতবাদকে কট্টর সুন্নি আলেমগণ অনেক সময় ‘কাফের’ বা ‘ইসলামের গন্ডি বহির্ভূত’ বলে ফতোয়া দেন, সেই ইরানের পক্ষে আজ রাজপথে স্লোগান উঠছে। এই ধর্মীয় অনুভূতি ও রাজনৈতিক অবস্থানের ব্যবচ্ছেদ করা এখন সময়ের দাবি।
আদর্শিক দেয়াল ও শিয়া-সুন্নি বিতর্ক : বাংলাদেশের মুসলিম সমাজের সিংহভাগ সুন্নি মতাদর্শের অনুসারী। কওমি ও সালাফি ঘরানার আলেমদের বড় একটি অংশ শিয়াদের আকিদাগত বিশ্বাসের কারণে তাদের ইসলামের মূল ধারা থেকে বিচ্যুত মনে করেন। বিশেষ করে সাহাবায়ে কেরামদের প্রতি শিয়াদের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে সুন্নিদের মধ্যে চরম ক্ষোভ বিদ্যমান। অনেক ক্ষেত্রে ধর্মীয় জলসাগুলোতে শিয়াদের ‘অমুসলিম’ হিসেবে অভিহিত করার নজিরও কম নয়। যদি আদর্শই শেষ কথা হয়, তবে একজন সুন্নি মুসলমানের কাছে শিয়া প্রধান ইরান কখনোই ভ্রাতৃত্বের প্রতীক হওয়ার কথা ছিল না। কিন্তু অদ্ভুতভাবে যখন বৈশ্বিক রাজনীতির প্রসঙ্গ আসে, তখন এই ‘কাফের’ ফতোয়া যেন আলমারিতে বন্দি হয়ে যায়।
ইসরায়েল ভীতি বনাম ইরান প্রীতি: ইরানের প্রতি এই আকস্মিক সহমর্মিতার মূলে শিয়াদের প্রতি ভালোবাসা কাজ করছে না; বরং কাজ করছে ইসরায়েল ও আমেরিকার প্রতি চরম ঘৃণা। বাংলাদেশের সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষের কাছে ফিলিস্তিন ইস্যুটি অত্যন্ত সংবেদনশীল। দীর্ঘকাল ধরে আরবরা যখন ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো প্রতিরোধ গড়তে ব্যর্থ হয়েছে, তখন ইরানের সরব উপস্থিতি তাদের মনে আশার আলো জাগিয়েছে। এখানে ‘শত্রুর শত্রু আমার বন্ধু’ নীতিটি প্রকট। সুন্নিরা দেখছে, কথিত ‘কাফের’ ইরানই আজ গাজা ও ফিলিস্তিনের পাশে দাঁড়িয়েছে, অথচ অনেক সুন্নি আরব রাষ্ট্র নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে। এই দৃশ্যপটই বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে ইরানের প্রতি একটি কৃত্রিম কিন্তু শক্তিশালী ধর্মীয় আবেগ তৈরি করেছে।
আরব বিশ্বের অনীহা ও রাজনৈতিক মেরুকরণ: আমরা অনেকেই লক্ষ্য করি না যে, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব বা বাহরাইনের মতো সুন্নি রাষ্ট্রগুলো ইরানকে চরম সন্দেহের চোখে দেখে। এর কারণ কেবল ধর্মীয় নয়, বরং ভূ-রাজনৈতিক। ইরান তার ‘বিপ্লব’ রপ্তানি করতে চায় এবং মধ্যপ্রাচ্যে শিয়া আধিপত্য বিস্তার করতে চায়-এমন একটি ভয় আরব রাজতন্ত্রগুলোর মধ্যে প্রবল। বিশেষ করে হুতি বিদ্রোহী, হিজবুল্লাহ এবং ইরাকের মিলিশিয়াদের মাধ্যমে ইরান যেভাবে প্রভাব বাড়াচ্ছে, তাতে সংযুক্ত আরব আমিরাত বা সৌদি আরব নিজেদের অস্তিত্বের সংকট দেখছে। ফলে তারা অনেক সময় ইরানের চেয়ে ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক রক্ষা করাকেই নিরাপদ মনে করছে। অথচ বাংলাদেশে বসে আমরা কেবল ধর্মীয় চশমা দিয়ে বিচার করছি, যেখানে আরবরা বিচার করছে জাতীয় নিরাপত্তা ও ক্ষমতার ভারসাম্য দিয়ে।
জাতীয় স্বার্থ ও আমাদের হুরমুজ সংকট: সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, আমাদের এই আবেগ অনেক সময় জাতীয় স্বার্থকেও ছাপিয়ে যায়। হুরমুজ প্রণালী দিয়ে আমাদের পণ্যবাহী জাহাজ চলাচলে যখন ইরান বাধা দেয় বা অনুমতি দিতে অস্বীকৃতি জানায়, তখন বাংলাদেশে তেমন কোনো প্রতিবাদ দেখা যায় না। একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে প্রশ্ন জাগে-আমাদের কাছে দেশের মর্যাদা বড়, না কি একটি নির্দিষ্ট দেশের ধর্মীয় পরিচিতি বড়? হুরমুজ প্রণালীতে বাংলাদেশি জাহাজের হয়রানি আমাদের অর্থনীতি ও সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ। কিন্তু ইরানের প্রতি অন্ধ আবেগের কারণে এই বিষয়গুলো জনসমক্ষে আলোচনাতেই আসে না।
ধর্মীয় অনুভূতি অবশ্যই ব্যক্তিগত ও পবিত্র। কিন্তু সেই অনুভূতি যখন ভূ-রাজনীতির জটিল সমীকরণে ব্যবহৃত হয়, তখন সেখানে স্বচ্ছতা থাকা প্রয়োজন। শিয়ারা যদি সুন্নিদের দৃষ্টিতে কাফেরই হয়, তবে তাদের কর্মকান্ডকে কেন ‘ইসলামী বিজয়’ হিসেবে দেখা হবে? আবার যদি তারা ভাই হয়, তবে আরব রাষ্ট্রগুলোর সাথে তাদের কেন এই রক্তক্ষয়ী বিরোধ? বাংলাদেশের ধর্মপ্রাণ মানুষকে বুঝতে হবে যে, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক কেবল ফতোয়া দিয়ে চলে না। এখানে প্রতিটি দেশ নিজের স্বার্থ দেখে। আমাদের আবেগ যেন এমন না হয় যা দেশের স্বার্থকে ছোট করে আর বিদেশের সংকীর্ণ স্বার্থকে মহান করে তোলে। আবেগ ও বিবেকের সঠিক সমন্বয়ই কেবল আমাদের এই দ্বিচারিতা থেকে মুক্তি দিতে পারে। লেখক: গবেষক ও কলামিস্ট












