বাবার সেই না বলা কথাগুলো একত্রিত করে বলতে চাই
গাজী মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ
বাবা—মাত্র দুটি অক্ষরের একটি শব্দ। কিন্তু এই ছোট্ট শব্দের ভেতরে লুকিয়ে আছে একটি পরিবারের সবচেয়ে বড় শক্তি, সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য আশ্রয়, সবচেয়ে সাহসী অভিভাবক এবং সবচেয়ে নিঃস্বার্থ ভালোবাসার প্রতিচ্ছবি। পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি সন্তানই মায়ের ভালোবাসার প্রকাশ সহজে দেখতে পায়, কিন্তু বাবার ভালোবাসা অনেক সময় নীরব থাকে। তিনি কম কথা বলেন, নিজের কষ্ট আড়াল করে রাখেন, কিন্তু সন্তানের সুখের জন্য নিজের সবকিছু নিঃশব্দে বিলিয়ে দেন।
একজন বাবা হয়তো কখনো বলেন না, “আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি।” কিন্তু সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়তে দিনের পর দিন কঠোর পরিশ্রম করে তিনি সেই ভালোবাসারই সবচেয়ে বড় প্রমাণ রেখে যান। নিজের ইচ্ছা, স্বপ্ন এবং শখ বিসর্জন দিয়ে সন্তানের স্বপ্ন পূরণের জন্য সংগ্রাম করেন। অনেক বাবা নিজের প্রয়োজনকে দূরে সরিয়ে রেখে সন্তানের শিক্ষার খরচ জোগান, নতুন পোশাক না কিনে সন্তানের জন্য বই কিনে দেন, নিজের ক্লান্তি লুকিয়ে পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা করেন।
জীবনের প্রতিটি কঠিন মুহূর্তে বাবাই হয়ে ওঠেন সাহসের প্রতীক। সন্তান যখন প্রথম হাঁটতে শেখে, তখন তাঁর হাতই ভরসা দেয়। সন্তান যখন হোঁচট খায়, তখন বাবাই তাকে আবার উঠে দাঁড়ানোর শিক্ষা দেন। সন্তান যখন ব্যর্থ হয়, তখন তিনিই নীরবে পাশে দাঁড়িয়ে সাহস জোগান। অথচ এই মানুষটিই নিজের কষ্ট, দুঃখ আর চোখের জলকে সবার আড়ালে লুকিয়ে রাখেন।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সন্তান বড় হয়ে যায়, নিজের জীবন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। কিন্তু বাবা একইভাবে অপেক্ষা করেন একটি ফোনকলের জন্য, একটি খোঁজখবরের জন্য কিংবা সন্তানের সামান্য সময়ের জন্য। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর চুলে পাক ধরে, শরীর দুর্বল হয়ে আসে, কিন্তু সন্তানের প্রতি তাঁর ভালোবাসা কখনো কমে না। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই ভালোবাসা আরও গভীর হয়।
আজকের এই ব্যস্ত পৃথিবীতে আমরা অনেক সময় বাবার সেই নীরব ত্যাগগুলো ভুলে যাই। আমরা হয়তো তাঁকে ধন্যবাদ বলি না, তাঁর কষ্টের কথা জানতে চাই না কিংবা তাঁর সঙ্গে সময় কাটানোর প্রয়োজনীয়তাও অনুভব করি না। অথচ আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় নায়ক, সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা এবং সবচেয়ে বড় নিরাপত্তার নামই হলো বাবা।
আমি গাজী মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ। আমার জীবনের প্রতিটি সফলতা, প্রতিটি অর্জন এবং বড় হয়ে ওঠার পেছনে আমার বাবার অবদান অপরিসীম। তাঁর দোয়া, ত্যাগ, পরিশ্রম এবং অকৃত্রিম ভালোবাসা ছাড়া আমি আজকের আমি হতে পারতাম না। পৃথিবীর সমস্ত সম্পদ, সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য এবং বিলাসিতার চেয়েও আমার কাছে বাবার মূল্য অনেক বেশি। কারণ অর্থ-সম্পদ হারালে তা আবার ফিরে পাওয়া যায়, কিন্তু বাবার মতো একজন অভিভাবক, একজন পথপ্রদর্শক এবং একজন নিঃস্বার্থ ভালোবাসার মানুষকে কখনো ফিরে পাওয়া যায় না।
তবে আজকের এই লেখা শুধু আমার বাবাকে নিয়ে নয়। এটি পৃথিবীর প্রতিটি বাবার প্রতি একজন সন্তানের হৃদয়ের গভীরতম শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার প্রকাশ। কারণ প্রতিটি বাবাই তাঁর পরিবারের জন্য একজন নীরব যোদ্ধা। কেউ রোদে পুড়ে, কেউ বৃষ্টিতে ভিজে, কেউ দিন-রাত পরিশ্রম করে পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা করেন। তাঁদের ত্যাগের গল্প হয়তো সংবাদ শিরোনাম হয় না, কিন্তু প্রতিটি সন্তানের সফলতার পেছনে একজন বাবার অদৃশ্য অবদান জড়িয়ে থাকে।
বাবার সেই না বলা কথাগুলো একত্রিত করলে হয়তো একটি বাক্যই দাঁড়ায়—
“সন্তান, আমি তোমার জন্যই বেঁচে আছি। তোমার হাসিই আমার সুখ, তোমার সফলতাই আমার গর্ব, আর তোমার নিরাপত্তাই আমার সবচেয়ে বড় শান্তি।”
বাবা দিবস আমাদের শুধু একটি দিন উদযাপনের কথা মনে করিয়ে দেয় না; এটি আমাদের দায়িত্ব, ভালোবাসা এবং কৃতজ্ঞতার কথাও স্মরণ করিয়ে দেয়। আসুন, আমরা শুধু বাবা দিবসে নয়, বছরের প্রতিটি দিন বাবাকে সম্মান করি, তাঁর খোঁজ নিই, তাঁর কষ্ট বুঝতে চেষ্টা করি এবং তাঁকে জানাই— তিনি আমাদের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান মানুষ।
হে আল্লাহ, পৃথিবীর সকল বাবাকে সুস্থতা, দীর্ঘ নেক হায়াত, মানসিক প্রশান্তি ও সম্মান দান করুন। যেসব বাবা জীবিত আছেন, তাঁদের আপনার হেফাজতে রাখুন। আর যারা এই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন, তাঁদের কবরকে নূরে ভরে দিন এবং জান্নাতের সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করুন। আমিন।
বাবা দিবসে পৃথিবীর সকল বাবার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা, অফুরন্ত ভালোবাসা ও অন্তহীন কৃতজ্ঞতা।









