তীব্র গরমের মাঝে এক পশলা বৃষ্টি: সাতক্ষীরায় স্বস্তির পরশ
এসএম শহীদুল ইসলাম: টানা কয়েকদিনের তীব্র দাহদাহ আর ভ্যাপসা গরমে ওষ্ঠাগত হয়ে উঠেছিল সাতক্ষীরার মানুষের জীবন। কাঠফাটা রোদ আর বাতাসে আর্দ্রতার আধিক্যে জনজীবন হয়ে পড়েছিল বিপর্যস্ত। অবশেষে প্রকৃতি যেন তার কোল উজাড় করে দিল। সোমবার বিকেলে আকস্মিক মেঘের ঘনঘটা আর তারপরেই নামল বহুল প্রতীক্ষিত এক পশলা বৃষ্টি। ধূলিমলিন শহর আর তপ্ত প্রকৃতি মুহূর্তেই রূপ নিল এক স্নিগ্ধ, শান্ত অবয়বে।
গত এক সপ্তাহ ধরে সাতক্ষীরার তাপমাত্রা প্রতিনিয়ত বাড়ছিল। দুপুরের দিকে রাস্তাঘাট হয়ে পড়ছিল জনমানবহীন। তীব্র গরমে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছিলেন খেটে খাওয়া মানুষÑভ্যানচালক, দিনমজুর আর পথচারীরা। এ যেন ছিল এক অনন্ত চাতকের অপেক্ষাÑকবে আসবে মেঘ, কবে নামবে বৃষ্টি।
সোমবার বিকেল নামতেই আকাশের কোণে জমতে শুরু করে কালচে মেঘের ভেলা। এরপরই শুরু হয় ঝিরঝিরে হাওয়া। চারদিকের তপ্ত বাতাস নিমেষেই শীতল হয়ে ওঠে। তারপরই সন্ধ্যায় নামে সেই বহু কাঙ্ক্ষিত বৃষ্টি। ঝুম বৃষ্টি না হলেও, প্রায় আধা ঘণ্টার এই মাঝারি বৃষ্টিপাত পুরো সাতক্ষীরা শহর ও তার আশপাশের অঞ্চলে এনে দিয়েছে এক পরম স্বস্তি।
সাতক্ষীরা শহরের ইটাগাছা ঐরাকার বাসিন্দা কামরুল ইসলাম, হাবিবুর রহমান বাবুল, সাইফুল ইসলাম, ইয়াসীন আরাফাত বাবু,আফরোজা সুলতানাসহ অনেকেই বলেন, ”ঘর থেকে বের হতেই পারছিলাম না কয়েকদিন ধরে। এসি চালিয়েও যেন শান্তি ছিল না। এই বৃষ্টিটা যেন প্রকৃতির এক আশীর্বাদ। বুক ভরে একটু ঠান্ডা বাতাস নেওয়া যাচ্ছে এখন।”
বৃষ্টির পর সাতক্ষীরা শহরের চেনা রূপটাই যেন বদলে গেছে। শহরের পার্ক ও বাড়ির ছাদবাগানের গাছগুলোর পাতা থেকে ধুলোবালি ধুয়ে গিয়ে বের হয়ে এসেছে চকমকে সবুজ রঙ। প্রকৃতি যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পেয়েছে।
অনেকদিন পর শুকনো মাটিতে বৃষ্টির ফোঁটা পড়তেই চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে সেই চিরচেনা সোঁদা মাটির সুবাস, যা যান্ত্রিক শহরের মানুষকেও কিছুটা নস্টালজিক করে তুলেছে। বৃষ্টি নামতেই চিরন্তন বাঙালি স্বভাবের মতো শহরের গলিগুলোতে মেতে উঠেছিল শিশুরা। বৃষ্টিতে ভেজার আনন্দ যেন সব ক্লান্তি ভুলিয়ে দিয়েছে। বৃষ্টির পর আবহাওয়া শীতল হতেই শহরের মোড়ের চায়ের দোকানগুলোতে ভিড় বাড়তে শুরু করে। গরম ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে স্বস্তির আড্ডায় মেতে ওঠেন সব বয়সী মানুষ।
এই বৃষ্টি কেবল শহরের মানুষের মনেই স্বস্তি আনেনি, এনেছে প্রান্তিক কৃষকদের মুখেও। চলতি মৌসুমের ফসলের জন্য এই এক পশলা বৃষ্টি অত্যন্ত উপকারী বলে জানিয়েছেন স্থানীয় চাষিরা। পাট এবং শাকসবজির ফলন ভালো রাখতে এই বৃষ্টি দারুণ ভূমিকা রাখবে।
সাতক্ষীরা আবহাওয়া অফিসের উচ্চমান সহকারী জুলফিকার আলী রিপন জানান, সোমবার দুপুরে জেলার তাপমাত্রা ছিল ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বৃষ্টির পর রাত ৯টায় সেই তাপমাত্রা ২৬ ডিগ্রিতে নেমে আসে। এর আগে রাত ৮টার দিকে বৃষ্টিপাত শুরু হয়ে চলে সাড়ে ৮টা পর্যন্ত। জেলায় ১৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। তিনি আরও জানান, জেলায় গত এক সপ্তাহ ধরে ৩৫ থেকে ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বয়ে যায়।
তীব্র গরমের অবসান ঘটিয়ে প্রকৃতির এই হঠাৎ উপহারে সাতক্ষীরার মানুষের মুখে এখন একটাই কথাÑ”বাঁচলাম!” মেঘ কেটে গিয়ে আবার হয়তো রোদ উঠবে, কিন্তু এই এক পশলা বৃষ্টি নাগরিক জীবনে যে প্রশান্তি আর স্বস্তির পরশ বুলিয়ে দিয়ে গেল, তা সত্যিই অনন্য।








