ভারত-ঢাকা-খুলনামুখী রোগীরা, চিকিৎসা ব্যয়ে নিঃস্ব হচ্ছে একের পর এক পরিবার
পত্রদূত রিপোর্ট: সাতক্ষীরা জেলায় মরণব্যাধি ক্যান্সারে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। স্থানীয় সচেতন মহল ও উন্নয়নকর্মীদের আশঙ্কা, জেলায় বর্তমানে ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ৮ হাজারেরও বেশি। তবে বিপুলসংখ্যক এই রোগীর চিকিৎসার জন্য জেলার সরকারি হাসপাতালগুলোতে নেই কোনো বিশেষায়িত ব্যবস্থা। ফলে বাধ্য হয়েই হাজারো রোগীকে ছুটতে হচ্ছে ঢাকা, খুলনা কিংবা পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে। এতে একদিকে যেমন বাড়ছে শারীরিক ও মানসিক ভোগান্তি, অন্যদিকে চিকিৎসা ব্যয়ের ধাক্কায় নিঃস্ব হয়ে পড়ছে শত শত পরিবার।
জেলাভিত্তিক পূর্ণাঙ্গ ‘ক্যান্সার রেজিস্ট্রি’ বা সঠিক ডাটাবেজ না থাকায় সাতক্ষীরায় আক্রান্তের প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে কিছুটা ধোঁয়াশা রয়েছে। জাতীয় গড় (প্রতি ১ লাখে প্রায় ১০৬ জন আক্রান্ত) অনুযায়ী জেলায় ক্যান্সার রোগীর সংখ্যা আনুমানিক আড়াই হাজার হওয়ার কথা।
তবে মাঠপর্যায়ের চিত্র ভিন্ন। স্থানীয় উন্নয়নকর্মী শেখ আফজাল হোসেন জানান, সাতক্ষীরার আশাশুনি, কালিগঞ্জ ও শ্যামনগর উপজেলার উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ত পানির কারণে মানুষের মধ্যে ক্যান্সারের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে গেছে। তার দাবি, প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা আট হাজার ছাড়িয়ে যাবে। দ্রুত সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে এই অঞ্চলে মৃত্যুর ঝুঁকি ব্যাপক আকার ধারণ করতে পারে। স্থানীয় চিকিৎসকদের মতে, সাতক্ষীরায় বর্তমানে ব্লাড ক্যান্সার, স্তন, কিডনি, ফুসফুস, জরায়ুমুখ ও মুখগহ্বরের ক্যান্সারের প্রকোপ সবচেয়ে বেশি। তবে প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্তের সুযোগ এখানে সীমিত।
রোগীরা যখন গুরুতর অবস্থায় সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল বা সদর হাসপাতালে আসেন, তখন পরীক্ষা-নিরীক্ষার আধুনিক সুবিধা না থাকায় বিপাকে পড়তে হয়। হাসপাতাল দুটির কোনোটিতেই আলাদা কোনো অনকোলজি (ক্যান্সার) বিভাগ নেই; নেই কেমোথেরাপি বা রেডিওথেরাপির পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা। ফলে রোগ নির্ণয়ের জন্য রোগীদের বেসরকারি ক্লিনিকের ওপর নির্ভর করতে হয়, যা অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং সময়সাপেক্ষ।
চিকিৎসকরা বলছেনÑ ধূমপান, মদ্যপান, জর্দা-গুল সেবন, অতিরিক্ত লবণ ও চিনি গ্রহণ, অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস এবং পরিবেশ দূষণের কারণে সব বয়সীদের মধ্যেই এখন ক্যান্সারের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
ব্লাড ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগী পল্টু বাসার তাঁর যন্ত্রণাদায়ক অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে জানান, ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে তাঁর রোগ ধরা পড়ে। শুরুতে আত্মীয়-স্বজন ও জেলা প্রশাসনের সহায়তায় চিকিৎসা চললেও এখন তিনি অর্থসংকটে দিশেহারা।
অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক কবি পল্টু বাসার বলেন, “সরকারি হাসপাতালে কোনো ওষুধ বা সেবা নেই। বেসরকারি ক্লিনিকে চিকিৎসা করানোর মতো টাকাও আর অবশিষ্ট নেই। ক্যান্সার মানে শুধু শারীরিক কষ্ট নয়, এটি একটি ভয়াবহ অর্থনৈতিক যুদ্ধ। পরীক্ষা-নিরীক্ষা, যাতায়াত আর ওষুধের পেছনে মাসে লাখ টাকা চলে যায়। বেঁচে থাকার তাগিদে মানুষ জমি, শেষ সম্বলটুকু বিক্রি করে নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে।”
দীর্ঘদিন ধরে সাতক্ষীরায় ক্যান্সার চিকিৎসার দাবিতে আন্দোলন করছে জেলা নাগরিক কমিটি। কমিটির আহ্বায়ক শেখ আজাদ হোসেন বেলাল বলেন, “আমার বড় ভাই ক্যান্সারে আক্রান্ত, প্রতি দুই মাস পর পর তাঁকে বোম্বে (মুম্বাই) নিতে হয়। যার টাকা নেই, এই দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসায় তার বেঁচে থাকা মুশকিল। সাতক্ষীরায় এত বড় মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থাকতেও কেন একটি ১০ বেডের প্রাথমিক ক্যান্সার ইউনিট চালু করা হচ্ছে না?” নাগরিক কমিটির পক্ষ থেকে সরকারি হাসপাতালে ক্যান্সার রোগীদের বিনামূল্যে ওষুধ ও ফ্রি সেবার দাবি জানিয়ে ২১ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে।
অন্য এক নাগরিক নেতা ইদ্রিস আলী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “সীমান্তবর্তী এই জেলার মানুষ আর অবহেলার শিকার হতে চায় না। ক্যান্সার এখন নীরব মহামারি। জেলায় দ্রুত আধুনিক ডায়াগনস্টিক সুবিধা ও সঠিক ক্যান্সার ডাটাবেজ তৈরি করা রাষ্ট্রের জরুরি দায়িত্ব।”
সরকারি সুযোগ-সুবিধার এই শূন্যতার মাঝেও আশার আলো দেখাচ্ছেন সাতক্ষীরারই কৃতি সন্তান এবং খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অনকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক (সার্জারি বিশেষজ্ঞ) ডা. মনোয়ার হোসেন।
খুলনা মেডিকেলে নামমাত্র শয্যা নিয়ে ক্যান্সার ইউনিট চালু থাকলেও সাতক্ষীরার রোগীদের কষ্ট তাঁকে ব্যথিত করে। তাই সরকারি দায়িত্ব পালনের পর ভালোবাসার টানে নিয়মিত সাতক্ষীরায় ছুটে আসেন তিনি, গভীর রাত পর্যন্ত রোগীদের সেবা দিয়ে আবার ফিরে যান।
ডা. মনোয়ার হোসেন বলেন, “মেডিকেল কলেজগুলোতে পর্যাপ্ত পদ সৃষ্টি না হওয়ায় তৃণমূলের রোগীরা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।” সাতক্ষীরার রোগীদের খুলনা বা ঢাকামুখী হওয়া বন্ধ করতে তিনি নিজের সমস্ত জমানো সঞ্চয় দিয়ে বিনেরপোতা এলাকায় একখ- জমি কিনেছেন। সেখানে ব্যক্তিগত উদ্যোগে একটি ক্যান্সার হাসপাতাল নির্মাণের কাজ শুরু করেছেন তিনি। হাসপাতালটি চালু হলে এই অঞ্চলের প্রান্তিক রোগীরা স্বল্পমূল্যে উন্নত চিকিৎসা পাবেন বলে আশা প্রকাশ করেন এই চিকিৎসক।