ব্যাংক খাতে পরিবারভিত্তিক আমানতকারীর সংখ্যা বাড়লেও কোটিপতি আমানতকারীদের জমার পরিমাণ কমেছে। চলতি বছরের মার্চ থেকে জুন— এই তিন মাসে কোটিপতি আমানতকারীর সংখ্যা বেড়েছে ৫৬ জন। তবে একই সময়ে তাদের ব্যাংকে রাখা আমানতের পরিমাণ কমেছে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা।
অপরদিকে ক্ষুদ্র ও লাখপতি আমানতকারীর সংখ্যা যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে তাদের সঞ্চয়ের পরিমাণও। তিন মাসে এই শ্রেণির আমানতকারী বেড়েছেন ৩২ লাখ ৫৭ হাজার ৭৫৯ জন। তাদের ব্যাংক আমানত বেড়েছে ৩১ হাজার ১০০ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিবারভিত্তিক আমানতসংক্রান্ত প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
কোটিপতি বেড়েছে, টাকা কমেছে
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চে ব্যাংক খাতে কোটিপতি আমানতকারী ছিলেন ৪০ হাজার ৬৪৫ জন। তাদের ব্যাংক আমানতের স্থিতি ছিল ৯১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা।
জুনে কোটিপতি আমানতকারীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪০ হাজার ৭০১ জনে। অর্থাৎ তিন মাসে সংখ্যা বেড়েছে ৫৬ জন। কিন্তু এ সময় তাদের আমানতের স্থিতি কমে দাঁড়িয়েছে ৯০ হাজার ২০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ আমানত কমেছে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা।
এদিকে ৫০ কোটি টাকার বেশি আমানত রয়েছে— এমন গ্রাহকের সংখ্যাও এক বছরে কমেছে। গত বছরের জুনে এ ধরনের আমানতকারী ছিলেন ২৬ জন। তাদের মোট আমানত ছিল ২ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। চলতি বছরের জুনে এ সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ১৫ জনে। একই সঙ্গে তাদের আমানতের পরিমাণও কমে হয়েছে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা।
ছোট সঞ্চয়কারীদের আমানত বেড়েছে
কোটিপতি আমানতকারীদের বিপরীতে ছোট ও লাখপতি সঞ্চয়কারীদের ব্যাংকমুখী প্রবণতা বেড়েছে। মার্চে পরিবারভিত্তিক ক্ষুদ্র ও লাখপতি আমানতকারী ছিলেন ১৭ কোটি ১০ লাখ ১৮ হাজার ৩১০ জন। তাদের মোট আমানতের স্থিতি ছিল ১১ লাখ ২৫ হাজার ৩০০ কোটি টাকা।
জুনে এই শ্রেণির আমানতকারীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৭ কোটি ৪২ লাখ ৭৬ হাজার ৬৯ জন। তাদের আমানতের স্থিতি বেড়ে হয়েছে ১১ লাখ ৫৬ হাজার ৪০০ কোটি টাকা।
অর্থাৎ মাত্র তিন মাসে ক্ষুদ্র ও লাখপতি আমানতকারী বেড়েছেন ৩২ লাখ ৫৭ হাজার ৭৫৯ জন। একই সময়ে তাদের আমানত বেড়েছে ৩১ হাজার ১০০ কোটি টাকা।
পরিবারভিত্তিক আমানত বেড়েছে
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, মার্চে পরিবারভিত্তিক আমানতকারীর সংখ্যা ছিল ১৭ কোটি ১০ লাখ ৫৯ হাজার। তাদের মোট আমানতের স্থিতি ছিল ১২ লাখ ১৬ হাজার ৬০০ কোটি টাকা।
জুনে পরিবারভিত্তিক আমানতকারীর সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ১৭ কোটি ৪৩ লাখ ১৭ হাজার। তাদের মোট আমানতের স্থিতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২ লাখ ৪৬ হাজার ৬০০ কোটি টাকা।
অর্থাৎ তিন মাসে পরিবারভিত্তিক আমানত বেড়েছে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। একই সময়ে আমানতকারীর সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
সব মিলিয়ে জুনে ব্যাংক খাতে মোট আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২২ লাখ ১১ হাজার কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে ব্যাংক খাতে আমানত বেড়েছে প্রায় ১১ শতাংশ। আর চলতি বছরের মার্চ থেকে জুন— তিন মাসে আমানত বেড়েছে প্রায় আড়াই শতাংশ।
কেন কমছে বড় আমানতকারীদের টাকা
ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বড় আমানতকারীদের একটি অংশ এখন ব্যাংকে টাকা রাখার পরিবর্তে অন্য খাতে বিনিয়োগ করছেন। বিশেষ করে সরকারি ট্রেজারি বিল ও সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের প্রবণতা রয়েছে। কেউ কেউ ব্যাংক থেকে টাকা তুলে অন্য খাতেও সরিয়ে নিচ্ছেন।
এ কারণে কোটিপতি আমানতকারীর সংখ্যা সামান্য বাড়লেও তাদের মোট আমানতের পরিমাণ কমেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অপরদিকে ক্ষুদ্র ও লাখপতি আমানতকারীদের বড় অংশের কাছে ব্যাংক এখনও সঞ্চয়ের প্রধান মাধ্যম। ফলে এই শ্রেণির গ্রাহকদের আমানত বাড়ছে।
আমানতের চিত্রে বদল
ব্যাংক খাতের আমানতের চিত্রে এ পরিবর্তনকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ পরিবারভিত্তিক আমানতের অর্ধেকেরও বেশি রয়েছে ক্ষুদ্র ও লাখপতি সঞ্চয়কারীদের হাতে। কোটিপতি আমানতকারীদের মোট আমানতের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম।
এর বাইরে ব্যাংকগুলোতে করপোরেট খাতের আমানতও রয়েছে। এর পরিমাণ প্রায় ১০ লাখ কোটি টাকা।
ফলে সামগ্রিকভাবে ব্যাংক খাতে আমানত বাড়লেও সেই প্রবৃদ্ধির বড় অংশ আসছে ছোট ও মাঝারি সঞ্চয়কারীদের কাছ থেকে। বিপরীতে বড় আমানতকারীদের একটি অংশ ব্যাংকের বাইরে বিভিন্ন বিনিয়োগমাধ্যমে অর্থ সরিয়ে নেওয়ায় তাদের আমানতের স্থিতি কমেছে।