মশা পৃথিবীর সবচেয়ে জীবনঘাতী পতঙ্গ
প্রকাশ ঘোষ বিধান
মশা পৃথিবীর সবচেয়ে রক্তপিপাসু এবং জীবনঘাতী পতঙ্গ। মশা আকারে ছোট হলেও পৃথিবীর সবচেয়ে বিপজ্জনক এবং প্রাণঘাতী জীব। প্রতি বছর মশার কামড়ে হওয়া বিভিন্ন রোগে বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ মানুষ মারা যায়। আকারে ছোট হলেও মানুষের মৃত্যুর কারণ হিসেবে এর অবস্থান সবার উপরে।
মশা হলো একটি ছোট উড়ন্ত পতঙ্গ, যা তার কামড় এবং রোগ ছড়ানোর ক্ষমতার জন্য পরিচিত। মশা নিজে কোনো রোগ তৈরি করে না। এটি কামড়ের মাধ্যমে ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া ও পরজীবী এক দেহ থেকে অন্য দেহে ছড়ায়। রক্ত চোষার সময় মশা মানুষের শরীরে তার লালা প্রবেশ করায়। এই লালার মাধ্যমেই ভাইরাস বা প্যারাসাইট মানুষের রক্তে মিশে যায়।
মশা সত্যিই পৃথিবীর সবচেয়ে জীবনঘাতী পতঙ্গ এবং প্রাণী। আকারে অত্যন্ত ক্ষুদ্র হলেও এটি বিভিন্ন মারাত্মক রোগ ছড়ানোর মাধ্যমে প্রতি বছর বিশ্বে লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বাঘ, সাপ বা হাঙরের চেয়েও মশার কামড়ে মানুষ বেশি মারা যায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, মশার কামড়ে হওয়া বিভিন্ন রোগে প্রতি বছর প্রায় ৭ লাখ থেকে ১০ লাখ মানুষ মারা যায়।
জীবাণু বহনকারী এই মশা আসলেই পৃথিবীর সবচেয়ে জীবনঘাতী পতঙ্গ। আকারে অত্যন্ত ছোট হলেও, মানুষের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ এই মশা। পৃথিবীতে সাড়ে ৩ হাজারেরও বেশি প্রজাতির মশা রয়েছে। এদের মধ্যে কেবল স্ত্রী মশা মানুষকে কামড়ায়, কারণ ডিম পাড়ার জন্য তাদের রক্তের প্রয়োজন হয়। পুরুষ মশারা রক্ত খায় না, তারা গাছের রস খেয়ে বেঁচে থাকে। ৩টি প্রধান ক্ষতিকর মশা ও রোগ হলো; এডিস মশা: এই মশার গায়ে সাদা-কালো দাগ থাকে। এটি কামড়ালে ডেঙ্গু এবং চিকুনগুনিয়া রোগ হয়। অ্যানোফিলিস মশা: এই মশা কামড়ালে ম্যালেরিয়া জ্বর হয়। কিউলেক্স মশা: এই মশার মাধ্যমে ফাইলেরিয়া বা গোদ রোগ ছড়ায়।
প্রতিবছর ২০ আগস্ট পালিত হয় বিশ্ব মশা দিবস। ১৮৯৭ সালের ২০ আগস্ট চিকিৎসক রোনাল্ড রস অ্যানোফিলিস মশা বাহিত ম্যালেরিয়া রোগের কারণ আবিষ্কার করেছিলেন। ২০ আগস্ট মশা দিবস পালন করা হয় মূলত চিকিৎসক রোনাল্ড রসের আবিষ্কারকে সম্মান জানানোর জন্য। পরবর্তীকালে তিনি এই আবিষ্কারের জন্য নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হয়েছিলেন। ১৯৩০ এর দশক থেকে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। যুক্তরাজ্যের লন্ডন স্কুল অব হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিন দিবসটি প্রথম পালন করা শুরু করে।
মশা সবসময় জমে থাকা পানিতে ডিম পাড়ে। ডিম থেকে ছোট পোকা বা লার্ভা বের হয়। লার্ভাগুলো পানিতে বড় হয়ে কয়েকদিনের মধ্যে উড়ন্ত মশায় পরিণত হয়। প্রজাতি অনুযায়ী ডিম থেকে পূর্ণাঙ্গ মশা হওয়ার সময়ের পার্থক্য দেখা যায়। কিছু প্রজাতির ডিম থেকে পূর্ণাঙ্গ মশা হতে সময় লাগে পাঁচ দিনের মত, কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পূর্ণাঙ্গ মশা হতে ৪০ দিন বা কিছু প্রজাতির ক্ষেত্রে আরও বেশি সময় লাগে। পূর্ণাঙ্গ মশার শারীরিক আকৃতি শূকের ঘনত্ব ও পানিতে খাদ্যের সরবরাহের উপর নির্ভর করে।
এ পর্যন্ত পৃথিবীতে প্রায় ৩৫১২ প্রজাতির মশা দেখতে পাওয়া যায়। এর মধ্যে নতুন আবিষ্কৃত কিউলেক্স মাইমেটিকাসসহ বাংলাদেশে রয়েছে ১১৪ প্রজাতির মশা। একটি মশার ওজন সাধারণত ২.৫ মিলিগ্রাম। মশা ১ থেকে ৩ মাইল পর্যন্ত উড়ে যেতে পারে, যা ঘন্টায় সর্বোচ্চ ২.৫ কিলোমিটার বেগে উড়তে পারে। ওরা প্রতি সেকেন্ডে ২৫০ থেকে ৩০০ বার পর্যন্ত পাখা নাড়াতে পারে।
মশা এক প্রকারের ছোট মাছি প্রজাতির পতঙ্গ। অধিকাংশ প্রজাতির স্ত্রীমশা স্তন্যপায়ী প্রাণীর রক্ত পান করে থাকে। মশার দাঁত সংখ্যা ৪৭টি। মশা কিন্তু রক্ত খেয়ে বেঁচে থাকে না। মূলত রক্তের প্রোটিন অংশটি কাজে লাগিয়ে তারা ডিম পাড়ে। নারী মশা সচরাচর ৬-৮ সপ্তাহ বেঁচে থাকে। পুরুষ মশা কখনো হুল ফোটায় না। পুরুষ মশা কেবল একদিন বাঁচে। আর পুরুষ মশা একদিনের বেশি বাঁচলেও; তাদের পরিস্থিতি একেবারেই নাজুক হয়ে পড়ে। এই ছোট মাছি প্রজাতির পতঙ্গ দীর্ঘ ২৫০০ বছর ধরে পৃথিবীর বুকে টিকে আছে।
মশার ছড়ানো প্রধান মারাত্মক রোগসমূহ হলো ম্যালেরিয়া: অ্যানোফিলিস মশার মাধ্যমে ছড়ায়। আফ্রিকা মহাদেশে এর প্রকোপ সবচেয়ে বেশি। ডেঙ্গু: এডিস মশার মাধ্যমে ছড়ায়। বাংলাদেশসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে এটি এখন বড় মহামারী। চিকুনগুনিয়া: এটিও এডিস মশার কামড়ে হয়। এতে জয়েন্টে তীব্র ব্যথা হয়। জিকা ভাইরাস: গর্ভবতী নারীদের এই ভাইরাস আক্রান্ত করলে নবজাতকের মারাত্মক জন্মত্রুটি হতে পারে।
যেকোনো নোংরা বা জমে থাকা পানিতে মশা খুব দ্রুত ডিম পেড়ে সংখ্যাবৃদ্ধি করতে পারে। মশার হাত থেকে বাঁচতে বাড়ির আশেপাশে বালতি, টব বা ডাবের খোসায় পানি জমতে না দেওয়া। বালতি, ফুলের টব বা টায়ারে ৩ দিনের বেশি পানি জমিয়ে রাখা যাবে না। ঘুমানোর সময় অবশ্যই মশারি খাটিয়ে ঘুমাতে হবে। ঘরে যাতে মশা ঢুকতে না পারে, সেজন্য জানালায় জালি বা নেট লাগানো। ঘরের কোণে রসুন ও লবঙ্গের ধূপ দিলে মশা দূর হয়। মশা তাড়াতে নিরাপদ মসকুইটো রিপেলেন্ট ব্যবহার করা। মসকুইটো রিপেলেন্ট বা মশা তাড়ানোর উপাদান হলো এমন কিছু পদার্থ যা ত্বকে, পোশাকে বা ঘরে ব্যবহার করলে মশা দূরে থাকে এবং কামড়াতে পারে না। বাজারে ক্রিম, স্প্রে, লিকুইড ভেপোরাইজার, কয়েল ও রোল-অন আকারে বিভিন্ন ধরনের কার্যকর মসকুইটো রিপেলেন্ট পাওয়া যায়।
মশাকে যতই তুচ্ছ আর অবহেলা করা হোক না কেন, জীবাণু সংক্রমণকারী এই মশাই পৃথিবীতে সবচেয়ে জীবনঘাতী পতঙ্গ। মশা মারার ক্ষেত্রে আমাদের উদাসীনতা ও ব্যর্থতার কারণেই এখন ডেঙ্গু নতুন আতঙ্ক হয়ে দেখা দিয়েছে। মশা বাহিত রোগ ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, ম্যালেরিয়া থেকে বাঁচতে ব্যক্তিগত ও সামাজিক স্তরে জনসচেতনতা অত্যন্ত জরুরি। লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট









