বল্লী হাই স্কুলের বিজ্ঞান শিক্ষককে আটকে রেখে পুলিশে সোপর্দ!
সংবাদদাতা: সাতক্ষীরা সদর উপজেলার বল্লী মো. মুজিবুর রহমান মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এক সহকারী শিক্ষকের বিরুদ্ধে ধর্ম নিয়ে মন্তব্য করার ঘটনায় মঙ্গলবার (১৯ মে) ওই বিদ্যালয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও উত্তেজনা সৃষ্টি হলে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং অভিযুক্ত শিক্ষককে আটক করে। আটক শিক্ষকের নাম গৌরাঙ্গ সরকার। তিনি ওই বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগের সহকারী শিক্ষক। স্থানীয় সূত্র ও বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানায়, গত রোববার (১৭ মে) নবম শ্রেণিতে ক্লাস নেওয়ার সময় শিক্ষক গৌরাঙ্গ সরকার ধর্মের কিছু রীতিনীতি নিয়ে মন্তব্য করেন বলে অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় বাসিন্দা ও অভিভাবকদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
মঙ্গলবার সকালে ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী ও অভিভাবকেরা ঘটনার প্রতিবাদে এবং ওই শিক্ষকের শাস্তির দাবিতে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে জড়ো হন। তারা শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ঘটনার সত্যতা জানতে পারলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে খবর পেয়ে সাতক্ষীরা সদর থানা-পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয় এবং অভিযুক্ত শিক্ষককে হেফাজতে নেয়।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আজহারুল ইসলাম বলেন, শিক্ষক গৌরাঙ্গ সরকার ক্লাসে শিক্ষার্থীদের সামনে ধর্ম নিয়ে মন্তব্য করেছিলেন। অভিভাবকেরা বিষয়টি জানতে পেরে স্কুলে এসে প্রতিবাদ জানান। একপর্যায়ে অভিযুক্ত শিক্ষক নিজের ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চান। তবে উপস্থিত জনতা আইনি শাস্তির দাবিতে অনড় থাকলে পুলিশ এসে তাকে আটক করে নিয়ে যায়।”
বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও সাতক্ষীরা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অর্ণব দত্ত ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, অভিযুক্ত শিক্ষককে পুলিশ আটক করেছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখে আইন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সাতক্ষীরা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহা. মাসুদুর রহমান জানান, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে তাৎক্ষণিকভাবে ওই শিক্ষককে আটক করা হয়েছে। ঘটনাটি নিয়ে তদন্ত চলছে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট ধারায় মামলা দিয়ে আদালতে পাঠানো হবে। বর্তমানে ওই এলাকার পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে এবং বিদ্যালয় ও আশপাশের এলাকায় পুলিশি নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
এদিকে একাধিক সূত্র বলছেÑশিক্ষকদের মধ্যে চরম গ্রুপিং চলে আসছে ওই বিদ্যালয়ে। গত ০৫ মার্চ ২০২৬ তারিখে সাতক্ষীরায় ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষককে লাঞ্ছিত করে চেয়ার দখলের ঘটনায় করা মামলায় সহকারী শিক্ষক ও স্থানীয় জামায়াত নেতাকে কারাগারে পাঠিয়েছিল আদালত। ২০২৪ সালের ওই ঘটনার পর আদালতে মামলা করেন ভুক্তভোগী। ৫ মার্চ (বৃহস্পতিবার) দুপুরে সাতক্ষীরা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক নজরুল ইসলাম আসামির জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে তাঁকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন।
ভুক্তভোগী মো. জামিলুজ্জামান সাতক্ষীরা সদর উপজেলার বল্লী ইউনিয়নের বাসিন্দা ও মুজিবুর রহমান মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক। মামলার আসামি এ কে এম আজহারুজ্জামান একই ইউনিয়নের হাজীপুর গ্রামের বাসিন্দা। তিনি বল্লী ইউনিয়ন জামায়াতের সেক্রেটারি ও ওই বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক।
মামলার বিবরণ ও আদালত সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট বেলা ১১টার দিকে একদল বহিরাগত নিয়ে বিদ্যালয়ে প্রবেশ করেন আজহারুজ্জামান। তাঁরা বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. জামিলুজ্জামানকে কক্ষ থেকে টেনেহিঁচড়ে বের করে দেন এবং শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেন। ওই বছরের ১৯ নভেম্বর জামিলুজ্জামান সাতক্ষীরার আদালতে মামলা করেন। আদালত বিষয়টি তদন্তের দায়িত্ব দেন পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (সিআইডি)। সিআইডির উপপরিদর্শক (এসআই) মাছুদ পারভেজ তদন্ত শেষে ঘটনার সত্যতা পেয়ে ২০২৫ সালের ১০ নভেম্বর আজহারুজ্জামানসহ ১০ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করেন।
এর আগে অভিযুক্ত আজহারুজ্জামান উচ্চ আদালত থেকে অন্তর্বর্তী জামিন নিয়ে নি¤œ আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশ পান। সেই নির্দেশনা অনুযায়ী জেলা জজ আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন চাইলে আদালত তা নাকচ করে দেন। পরবর্তীতে জামিনে মুক্তি পান আজহারুজ্জামান। মুজিবুর রহমান মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা জানান, জামিলুজ্জামান ২০০২ সাল থেকে ওই বিদ্যালয়ে কর্মরত এবং বিধি অনুযায়ী সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর প্রধান শিক্ষকের শূন্য পদে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছিলেন।
এছাড়া বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আব্দুল আলিমকেও হয়রানী করার চেষ্টা করা হয়েছিল। শিক্ষকদের মধ্যে চরম গ্রুপিংয়ের কারণে বিদ্যালয়ের লেখাপড়া রসাতলে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেন অনেকেই। একের পর এক শিক্ষকরা নাজেহাল হচ্ছেন বলেও দাবি করেন এলাকাবাসি। তাদের মতে, কোচিং পরিচালনার সাথে যুক্ত শিক্ষকদের ভক্ত শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করছে একটি বিশেষ মহল। এ অবস্থা থেকে তারা রেহাই চান।












