সম্পাদকীয়/সুন্দরবনে ফের দস্যু আতঙ্ক: পর্যটন মৌসুমের আগেই প্রয়োজন কঠোর নিরাপত্তা
তিন মাসের দীর্ঘ নিষেধাজ্ঞা শেষে গত ১ সেপ্টেম্বর সুন্দরবনের দুয়ার খোলার মধ্য দিয়ে উপকূলীয় এলাকার জেলে ও বনজীবীদের মধ্যে যে আশার সঞ্চার হয়েছিল, তা আবারও দস্যু আতঙ্কের কাছে ম্লান হতে বসেছে। অস্ত্রসহ কয়েকটি বাহিনীর সদস্যরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করলেও বনে নতুন করে বিভিন্ন দস্যু দলের তৎপরতা ও চাঁদা আদায়ের অভিযোগ উঠে আসছে। শ্যামনগরের উপকূলেই নয়, গোটা সুন্দরবন ঘিরে এখন জেলেদের মধ্যে এক অদৃশ্য তাড়া ও চাপা আতঙ্ক বিরাজ করছে।
জেলে ও বনজীবীদের অভিযোগ থেকে জানা যায়, বনে মাছ ও কাঁকড়া ধরতে নামার আগেই তাঁদের প্রতি নৌকাপ্রতি ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা, ক্ষেত্রবিশেষে আরও বেশি চাঁদা দিতে হচ্ছে। এনজিও বা মহাজনের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ ও ধারদেনা করে পাস-পারমিট নিয়ে বনে যাওয়া এই অসহায় মানুষগুলোর কাছে মাছ শিকারের আগেই এমন মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি অত্যন্ত মর্মান্তিক। টাকা দিতে না পারলে বা দেরি হলে গহিন বনের নদী-খালে জোটে নির্যাতন, হামলা কিংবা অপহরণের পর মুক্তিপণ দাবি। সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক দস্যু বাহিনীর হাতে জেলে অপহরণ, পুলিশি অভিযান এবং কোস্ট গার্ডের কাছে দস্যুদের বিপুল অস্ত্রসহ আত্মসমর্পণের ঘটনাপ্রবাহ স্পষ্ট করে যে, সুন্দরবনে দস্যুতার শেকড় এখনো পুরোপুরি উপড়ে ফেলা সম্ভব হয়নি।
সুন্দরবন কেবল জেলেদের রুটিরুজির কেন্দ্র নয়, এটি জাতীয় অর্থনীতি ও পর্যটনের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। সামনেই বনের পর্যটন মৌসুম শুরু হতে যাচ্ছে। প্রতিবছর এ মৌসুমে দেশি-বিদেশি হাজার হাজার পর্যটক সুন্দরবনের সৌন্দর্যে অবগাহন করতে আসেন। যদি বনজীবীদের নিরাপত্তাই সুসংহত না হয়, তবে বনের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর থেকে পর্যটকদের আস্থা উঠে যাবে, যা স্থানীয় অর্থনীতি ও পর্যটন খাতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
কোস্ট গার্ড বা পুলিশের তাৎক্ষণিক অভিযান প্রশংসাযোগ্য হলেও সাময়িক বা খ-কালীন তৎপরতা দিয়ে এই দীর্ঘমেয়াদি ব্যাধি দূর করা অসম্ভব। দস্যুদমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সুন্দরবনের খাঁড়ি ও গহিন নদীগুলোতে নিয়মিত টহল ও বিশেষ অভিযান অব্যাহত রাখতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, সুন্দরবনের দস্যু দমনে কেবল বনের ভেতরের সশস্ত্র ব্যক্তিদের ধরলেই চলবে না; দস্যুদের পেছনে থাকা অর্থদাতা, অস্ত্র সরবরাহকারী ও আশ্রয়দাতা তথাকথিত মহাজন বা মদদদাতাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা অত্যন্ত জরুরি।
সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত না করতে পারলে উপকূলীয় প্রান্তিক মানুষের জীবিকা যেমন হুমকির মুখে পড়বে, তেমনি আসন্ন পর্যটন মৌসুমও অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হবে। বনজীবী ও পর্যটকদের নিরবচ্ছিন্ন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসন ও সব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অবিলম্বে সমন্বিত ও জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে।












