মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট ২০২৬, ৩ ভাদ্র ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট ২০২৬, ৩ ভাদ্র ১৪৩৩

নদীশাসনের অপপ্রভাব: সাতক্ষীরায় স্থায়ী জলাবদ্ধতার মূল কারণ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ১৯ আগস্ট, ২০২৬, ১২:০২ পূর্বাহ্ণ
নদীশাসনের অপপ্রভাব: সাতক্ষীরায় স্থায়ী জলাবদ্ধতার মূল কারণ

অধ্যক্ষ আশেক-ই-এলাহী
সাতক্ষীরা জেলার বেশির ভাগ এলাকা বছরের দীর্ঘ সময় পানির নিচে তলিয়ে থাকে। স্থায়ী জলাবদ্ধতার কারণে মানুষকে প্রায় সময়ই ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে দিনাতিপাত করতে হয়। দৈনন্দিন স্বাভাবিক কাজকর্ম ও প্রয়োজনীয় ক্রিয়াকলাপের মতো কোনো শুষ্ক স্থানও খুঁজে পাওয়া কঠিন। একদিকে নোংরা পানির সঙ্গে সাপ ও বিষাক্ত পোকামাকড়ের আতঙ্ক, অন্যদিকে জলাবদ্ধতায় বন্দী জীবনÑসব মিলিয়ে এক চরম মানবিক বিপর্যয় তৈরি হয়েছে পুরো জেলায়। একটু বেশি বৃষ্টি হলেই এই পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করে। তবে এ এলাকার বৃষ্টিপাতের স্বাভাবিক ধারা বিশ্লেষণ করলে একে খুব বেশি অস্বাভাবিক বলা যায় না; বরং অপরিকল্পিত ব্যবস্থার কারণেই এই জলমগ্নতা। সাতক্ষীরা পৌরসভাসহ জেলা শহর ও বিভিন্ন উপজেলায় এই দুর্ভোগের প্রকোপ সবচেয়ে বেশি।
অনিয়ন্ত্রিত পানিতে ঘরবাড়ির বারান্দা পর্যন্ত তলিয়ে গেছে, চলাচলের পথগুলো গভীর পানির নিচে। বহু পরিবারে রান্না করার মতো কোনো শুকনো জায়গা নেই। শৌচাগার ও নিষ্কাশনব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। সবচেয়ে বেশি কষ্টে আছেন নারী ও শিশুরা। কেউ মারা গেলে মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষদের লাশের সৎকারের জন্য জেলার অন্য কোনো উঁচুতে থাকা আত্মীয়ের বাড়ি বা সরকারি গোরস্থানের ওপর ভরসা করতে হচ্ছে। অন্যদিকে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষকে কলাগাছের ভেলা বানিয়ে তার ওপর লাশ রেখে সৎকার কার্য সম্পন্ন করতে দেখা যায়। সাতক্ষীরায় এটি যেন মানুষের নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় সীমান্ত জেলা সাতক্ষীরা সরাসরি বঙ্গোপসাগরের কোলঘেঁষে অবস্থিত। গঙ্গা নদীর প্রধান দুই শাখা—কপোতাক্ষ ও ইছামতী এই জেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে সাগরে পতিত হয়েছে। সাগর সংলগ্ন হওয়ায় স্বাভাবিক জোয়ার-ভাটার প্রভাবে এখানকার নদীগুলোর গতিশীল থাকার কথা। সাগরে গঙ্গার পানি সরবরাহ এবং জোয়ার-ভাটার মেলবন্ধনের কারণে পুরো জেলাজুড়ে একসময় অসংখ্য নদী ও খাল জালের মতো ছড়িয়ে ছিল। তা সত্ত্বেও বিপুলসংখ্যক মানুষ আজ পানিবন্দী জীবন যাপন করছেন।
উপকূলীয় জেলা হয়ে এবং চারপাশে নদী-খালের অস্তিত্ব থাকার পরও কেন পানি নামছে না—এই প্রশ্নের উত্তর স্পষ্ট। নদীগুলোর ওপর অপরিকল্পিত অবকাঠামো তৈরি করা, প্রাকৃতিক জোয়ার-ভাটার পথ রুদ্ধ করা, মাছ চাষের নামে নদী-খাল ইজারা দেওয়া এবং অবৈধ দখলদারিই এর মূল কারণ। পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক পথগুলোকে ব্যক্তিস্বার্থ ও মুনাফা অর্জনের মাধ্যম বানানো হয়েছে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, উন্নয়নের নামে বিভিন্ন সময় অপরিকল্পিত ও ক্ষতিকর প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। ক্ষমতার সুবিধা নিয়ে প্রায় প্রতিটি সরকারের আমলেই নদী ও খাল দখলের মহোৎসব চলেছে।
ষাটের দশকে, বিশেষ করে ১৯৬২ সালের দিকে, পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) মিষ্টি পানির আধার তৈরি ও কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির (সবুজ বিপ্লব) দোহাই দিয়ে নদীশাসনের উদ্যোগ নেয়। সে সময় বেড়িবাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে সাতক্ষীরাকে বিভিন্ন পোল্ডারে বিভক্ত করা হয়। ফলে নদীগুলোর স্বাভাবিক জোয়ার-ভাটা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। আদিকাল থেকেই সাগরের লোনা পানি ও উজানের মিষ্টি পানির সংমিশ্রণে এই উপকূলীয় পলিগঠন প্রক্রিয়া সক্রিয় ছিল। জোয়ার-ভাটার জোরালো স্রোতেই নদীগুলো প্রাকৃতিক উপায়ে তাদের নাব্য ধরে রাখত। আবার জোয়ারের সঙ্গে আসা পলি জমে জমির উচ্চতা ও উর্বরতা দুটোই বৃদ্ধি পেত। কিন্তু বেড়িবাঁধ নির্মাণের পর স্রোতহীন নদীগুলোতে ধীরে ধীরে পলি জমে তলদেশ উঁচু হতে শুরু করে। এতে প্রাকৃতিক ভূমিগঠন প্রক্রিয়া ব্যাহত হয় এবং নিচু বিল এলাকাগুলো আরও নিচু ও অবমিত হয়ে পড়ে।
পরবর্তী সময়ে সড়ক ও জনপথ বিভাগ এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) যোগাযোগের উন্নতির নামে নদী-খালের প্রবাহ আটকে বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করে। স্থানীয় পরিবেশ, প্রতিবেশ ও টেকসই জীবনযাত্রার কথা চিন্তা না করেই জনপ্রতিনিধিরাও এসব স্থাপনা নির্মাণের অনুমোদন দিয়ে যান। সাতক্ষীরার এই জলাবদ্ধতা হঠাৎ তৈরি হয়নি, এর পদধ্বনি পাওয়া গিয়েছিল অনেক আগেই। গত কয়েক দশকে এ সমস্যা নিয়ে অসংখ্য আলোচনা, গবেষণা ও প্রবন্ধ প্রকাশিত হলেও নীতিপ্রণেতারা সমাধান খুঁজছেন সেই পাউবোর কাঠামোগত ব্যবস্থার মাধ্যমেই, যা মূলত সংকটের মূল কারণ।
সাতক্ষীরার প্রধান প্রধান নদীগুলো এখন মৃতপ্রায়। প্রতিবছর নদী খননের নামে কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ হলেও কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। প্রতি বর্ষায় মানুষ পানিবন্দী হয়, ফসল নষ্ট হয় এবং বিপুলসংখ্যক মানুষ নিঃস্ব হয়ে পড়ে। অথচ এই সংকটকে পুঁজি করে কেবল একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর পকেট ভারী হচ্ছে।
একমুখী স্লুইসগেট বা জলকপাট হলো নদী ধ্বংসের অন্যতম প্রধান কারণ। পানি উন্নয়ন বোর্ড একের পর এক এসব গেট তৈরি করেছে। অন্যদিকে সড়ক ও সেতু নির্মাণের সময় নদীর প্রকৃত প্রস্থ বিবেচনায় না নিয়ে সরু পুল ও অতিরিক্ত পিলার ব্যবহার করা হয়েছে, যা নদীর করুণ মৃত্যুকে ত্বরান্বিত করেছে। আজকের এই সংকটের জন্য প্রধানত পানি উন্নয়ন বোর্ড, সড়ক ও জনপথ বিভাগ, স্থানীয় সরকার বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো দায়ী। একই সঙ্গে নদী-খাল ইজারা প্রদানকারী কর্তৃপক্ষ ও উদাসীন জনপ্রতিনিধিরাও এর দায় এড়াতে পারেন না।
সাতক্ষীরার ভূমিগঠন ও প্রাকৃতিক ব্যবস্থার প্রধান দুই রূপকার হলো কপোতাক্ষ ও ইছামতী নদী। বঙ্গোপসাগরের প্রভাবে খোলপেটুয়া, রায়মঙ্গল, মালঞ্চ, চুনার, আড়পাংশিয়া এবং অন্যান্য স্থানীয় নদী যেমন বেতনা, লাবণ্যবতী, আদি যমুনা ও মরিচ্চাপ জোয়ার-ভাটার মাধ্যমে প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা করত। ব্রিটিশ আমলে জেলার নদীগুলোর সংযোগ রক্ষা করার জন্য প্রধানত তিনটি মানবসৃষ্ট খাল কাটা হয়েছিল। এর মধ্যে সাতক্ষীরা শহরের ওপর দিয়ে প্রবাহিত প্রাণসায়র খাল (যা বেতনা ও মরিচ্চাপকে যুক্ত করেছে), কালীগঞ্জের কাকশিয়ালী খাল (আদি যমুনা থেকে খোলপেটুয়ার শাখা গণঘেসিকে যুক্ত করেছে) এবং শ্যামনগরের চৌদ্দরশি খাল (খোলপেটুয়া ও কপোতাক্ষের সংযোগ) উল্লেখযোগ্য।
এ অঞ্চলের নদী ও খালগুলো একসময় একটি অপরটির সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত ছিল। একটি নদী অন্যটির উদ্বৃত্ত পানি ধারণ করে সাগরের দিকে নিয়ে যেত। লোনা ও মিষ্টি পানির এই সংমিশ্রণ পুরো এলাকার প্রতিবেশব্যবস্থাকে অনন্য বৈশিষ্ট্য দিয়েছিল। সুতরাং যেকোনো উন্নয়ন পরিকল্পনায় এই প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় নেওয়া জরুরি ছিল। কিন্তু অবকাঠামো নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান কিংবা নীতিপ্রণেতারা এর তোয়াক্কা করেননি। ফলে ভুল পরিকল্পনার চড়া মাশুল আজ দিতে হচ্ছে স্থানীয় অধিবাসীদের।
বর্তমানে সাতক্ষীরার একমাত্র জীবিত নদী বলা চলে ইছামতীকে। এর উৎপত্তিস্থল ভারতে হওয়ায় বছরের অন্তত ৭-৮ মাস উজান থেকে পানি আসে। ১৯৭২-৭৩ সালে স্থানীয় মানুষের তীব্র প্রতিবাদ সত্ত্বেও দেবহাটার শাকরায় ইছামতী ও লাবণ্যবতীর সংযোগস্থলে ১৫ ভেন্টের একটি স্লুইসগেট তৈরি করা হয়। একই সময়ে ইছামতীর ভাতশালায় সাপমারা নদীর মুখে এবং মরিচ্চাপের সংযোগস্থলে টিকেট, কামালকাটি, শালখালী ও বালিথাসহ বিভিন্ন স্থানে বহু স্লুইসগেট বসানো হয়। ফলে অল্প দিনের মধ্যেই লাবণ্যবতী, সাপমারা ও মরিচ্চাপ নদী শুকিয়ে যায়। পরবর্তীতে এর প্রভাবে বেতনা ও খোলপেটুয়া নদীও তাদের নাব্য হারায়। জোয়ার-ভাটা বন্ধ হওয়ায় পলি জমে নদীগুলোর তলদেশ ভরাট হয়ে গেছে। এখন সামান্য বৃষ্টিতেই তৈরি হয় স্থায়ী জলাবদ্ধতা।
গত দুই দশক ধরে সাতক্ষীরার মানুষ ইছামতীর সঙ্গে অন্যান্য নদীর আগের মতো অবাধ জোয়ার-ভাটা পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়ে আসছেন। ইছামতীর জোয়ারের পানি লাবণ্যবতী, সাপমারা, মরিচ্চাপ, খোলপেটুয়া ও আদি যমুনা হয়ে নেমে যেত, আবার সেসব নদীর পানির টানে ইছামতীও পলি মুক্ত থাকত। দূরবর্তী হলেও এর প্রভাব বেতনা ও কপোতাক্ষ পর্যন্ত প্রসারিত ছিল। কপাট বসিয়ে সেই প্রাকৃতিক পথ বন্ধ করে দেওয়ার পর এখন বাঁধ বা কৃত্রিম খনন কোনো কাজে আসছে না। মুক্ত জোয়ার-ভাটা তৈরি করা ছাড়া সাতক্ষীরাকে বাঁচানোর আর কোনো পথ নেই।
একসময় বেতনা নদীর একটি শাখা খেজুরডাঙি হয়ে কদমতলা ও ঝাউডাঙা পার হয়ে সোনায় নদীতে মিশত। সেখান থেকে কাটা একটি খালের মাধ্যমে শহরের বুক চিরে এলাচর হয়ে মরিচ্চাপের সঙ্গে সংযোগ ঘটিয়ে প্রাণসায়র খালের জন্ম হয়। ফলে সমগ্র সদর এলাকায় পানির অবাধ প্রবাহ ছিল। কিন্তু খেজুরডাঙিতে ৬ ভেন্টের স্লুইসগেট বসানোর পর পুরো এলাকা স্থায়ী জলাবদ্ধতার কবলে পড়ে। সম্প্রতি জনদাবির মুখে প্রাণসায়রের এলাচর অংশটি উন্মুক্ত করায় খালটি কিছু প্রাণ ফিরে পেয়েছে। তবে বিনেরপোতার কাছে খেজুরডাঙির স্লুইসগেটটি সরিয়ে দিলে সাতক্ষীরা সদরের প্রায় ৮০ শতাংশ জলাবদ্ধতা দূর হতো এবং বেতনা নদীও পুনরায় প্রবাহমান হয়ে উঠত।
একইভাবে ইছামতী নদী কালীগঞ্জের বসন্তপুর থেকে আদি যমুনা নাম নিয়ে শ্যামনগরের মাদার নদী হয়ে মালঞ্চ ও সাগরে মিশত। কিন্তু পানি উন্নয়ন বোর্ড কালীগঞ্জের নাজিমগঞ্জে স্লুইসগেট নির্মাণ করে এবং মাদার নদীর সংযোগ পুরোপুরি আটকে দিলে আদি যমুনার গতি স্তব্ধ হয়ে যায়। স্থানীয়দের দীর্ঘ আন্দোলনের ফলে মাদার নদীর মুখে একটি ছোট স্লুইসগেট নির্মাণ করা হলেও এটি সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করা হয়নি। তা সত্ত্বেও কিছুটা গতি ফিরে আসায় ওই অঞ্চলের জলাবদ্ধতা কিছুটা কমেছে। আদি যমুনার কিছু অংশ খনন করা হলেও এখনো বিস্তীর্ণ এলাকা অবৈধ দখলে রয়েছে।
এদিকে সাতক্ষীরার পানি সাগরে নামার অন্যতম পথ খোলপেটুয়া নদীর মুখে (শ্যামনগরের কাশিমাড়ী ও পদ্মপুকুরের মধ্যবর্তী স্থানে) সম্প্রতি বিশাল চর জেগে উঠেছে। দ্রুত ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে এই পলি অপসারণ করা না হলে আগামী কিছু বছরের মধ্যে সাতক্ষীরার পানি নিষ্কাশনের শেষ পথটিও বন্ধ হয়ে যাবে, যা পুরো জেলার জন্য বিপর্যয় ডেকে আনবে।
অন্যদিকে কপোতাক্ষ নদের যে অংশটি সাগরের আড়পাংশিয়া নদীর সঙ্গে যুক্ত ছিল, আশাশুনি ও পাইকগাছার মধ্যবর্তী অংশে ভুল পরিকল্পনার কারণে শুষ্ক মৌসুমে তা শুকিয়ে যায়। এর ফলে সুন্দরবনে মিষ্টি পানি প্রবাহের পরিধি মারাত্মকভাবে কমে এসেছে।
শ্যামনগর সংলগ্ন দক্ষিণ উপকূলে অবস্থিত বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের অস্তিত্বের মূল ভিত্তিই হলো নোনা ও মিষ্টি পানির ভারসাম্য। নদীশাসনের কারণে উজান থেকে মিষ্টি পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় সুন্দরবনের প্রতিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এই অঞ্চলটি বঙ্গোপসাগরের সামুদ্রিক মাছের অন্যতম প্রধান প্রজননক্ষেত্র ছিল, যা মিষ্টি পানির অভাব ও অতিরিক্ত লবণাক্ততার কারণে এখন চরম হুমকির মুখে।
সড়ক ও জনপথ বিভাগ যশোর-মুন্সিগঞ্জ এবং খুলনা-সাতক্ষীরা সড়ক নির্মাণের সময় বেতনা, লাবণ্যবতী, কলকাতার খাল, প্রাণসায়র ও আদি যমুনার স্বাভাবিক গতিপথে বাধার সৃষ্টি করেছে। নির্মিত সেতুগুলোর সরু নকশা ও অতিরিক্ত পিলার নদীর নাব্যতা দ্রুত বিনষ্ট করেছে।
সাতক্ষীরাকে স্থায়ী মানবিক ও পরিবেশগত বিপর্যয় থেকে রক্ষা করতে হলে ইছামতীসহ সব কটি নদীর সঙ্গে জোয়ার-ভাটার প্রাকৃতিক প্রবাহ পুনরায় চালুর কোনো বিকল্প নেই। কৃত্রিম বাধা অপসারণ করে নদীকে তার স্বাভাবিক গতিতে ফিরতে দেওয়াই এই জলাবদ্ধতা নিরসনের একমাত্র উপায়। একই সঙ্গে সুন্দরবন ও স্থানীয় জীববৈচিত্র্য রক্ষায় কপোতাক্ষ, খোলপেটুয়া ও ইছামতীর সংযোগ পথগুলোকে দ্রুত ঝুঁকিমুক্ত করতে হবে।

Ads small one

সম্পাদকীয়/ খাল উন্মুক্ত ও জলাবদ্ধতা নিরসন: স্থানীয় উদ্যোগ থেকে স্থায়ী সমাধানের পথ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ১৯ আগস্ট, ২০২৬, ১২:৩০ পূর্বাহ্ণ
সম্পাদকীয়/ খাল উন্মুক্ত ও জলাবদ্ধতা নিরসন: স্থানীয় উদ্যোগ থেকে স্থায়ী সমাধানের পথ

সাতক্ষীরার উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষি, পরিবেশ ও মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রার অন্যতম বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে কৃত্রিম জলাবদ্ধতা। বিশেষ করে বর্ষাকালে সামান্য ভারী বৃষ্টিপাত হলেই বিঘার পর বিঘা ফসলি জমি ও বসতবাড়ি তলিয়ে থাকে পানির নিচে। শ্যামনগর উপজেলার বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের শিমনখালী ও বুড়িগোয়ালিনী খালসহ অন্যান্য জলধারা দখল, নেট-পাটা দিয়ে বাঁধ দেওয়া এবং অবৈজ্ঞানিক ইজারা বা চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের কারণে আজ এই বিপত্তি চরম আকার ধারণ করেছে। পাঁচ হাজার বিঘা কৃষি জমির জলনিষ্কাশন পথ অবরুদ্ধ হয়ে পড়ার ঘটনা কেবল কৃত্রিম সংকটের জলন্ত প্রমাণ নয়, বরং স্থানীয় কৃষি অর্থনীতির ওপর সরাসরি আঘাত।
এ অবস্থায় বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়ন পরিষদে অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিক গণশুনানিটি অত্যন্ত সময়োপযোগী এবং প্রশংসনীয় উদ্যোগ। স্থানীয় জনগণ, সমাজসেবক ও জনপ্রতিনিধিদের মুখোমুখি বসে সমস্যার কথা তুলে ধরা এবং তা সমাধানের সুনির্দিষ্ট আশ্বাস স্থানীয় শাসনের ইতিবাচক দিক প্রকাশ করে। বিশেষ করে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের পক্ষ থেকে জলধারা উন্মুক্তকরণ, নেট-পাটা উচ্ছেদ এবং চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত বাতিলের জন্য রেজুলেশন গ্রহণের ঘোষণা উপকূলবাসীর দীর্ঘদিনের দাবির প্রতিফলন।
তবে কেবল আশ্বাস বা সাময়িক নেট-পাটা অপসারণের মধ্য দিয়েই এই দীর্ঘস্থায়ী সংকটের অবসান সম্ভব নয়। অতীতের অভিজ্ঞতা বলে, উচ্ছেদ অভিযানের কিছুদিনের মধ্যেই পুনরায় প্রভাবশালীদের দখলে চলে যায় উপকূলীয় খালগুলো। তাই প্রয়োজন আইনি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপের মাধ্যমে খালের ইজারা বা বন্দোবস্ত স্থায়ীভাবে বাতিল করা। পাশাপাশি, প্রতিটি খালের স্বাভাবিক নাব্য ফিরিয়ে আনতে পরিকল্পিত পুনঃখনন অত্যন্ত জরুরি।
উপকূলের জীববৈচিত্র্য, খাদ্য নিরাপত্তা এবং মানুষের জীবন-জীবিকা রক্ষার স্বার্থে এই দুটি খালসহ এলাকার সব জলধারাকে দখলমুক্ত ও উন্মুক্ত রাখা আবশ্যক। আমরা আশা করি, ইউনিয়ন পরিষদ থেকে গৃহীত সিদ্ধান্ত দ্রুত উপজেলা সমন্বয় সভা ও জেলা প্রশাসনে অনুমোদিত হবে এবং প্রশাসন জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করে উপকূলীয় জলাশয়গুলোকে দখলমুক্ত করে কৃষি ও কৃষকের সুরক্ষা নিশ্চিত করবে।

মৎস্য ঘেরে হামলা-লুটপাট, দেবহাটা থানায় অভিযোগ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ১৯ আগস্ট, ২০২৬, ১২:২৬ পূর্বাহ্ণ
মৎস্য ঘেরে হামলা-লুটপাট, দেবহাটা থানায় অভিযোগ

 

নিজস্ব প্রতিনিধি: দেবহাটায় ২৫ বিঘা আয়তনের একটি মৎস্য ঘেরে অনধিকার প্রবেশ, ভাঙচুর, সশস্ত্র হামলা ও মাছসহ নগদ টাকা লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে। মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) সকালে দেবহাটা উপজেলার বালিথা গ্রামের ‘ধাপার ঘেরে’ এ ঘটনা ঘটে। ভুক্তভোগী রওশন আরা রুবী জানান, স্বামী ফজলুল কাদের খোকনের মৃত্যুর পর পৈতৃক সূত্রে প্রাপ্ত ওই সম্পত্তিতে দীর্ঘদিন ধরে তিনি ও তাঁর ছেলে বাগদা ও গলদা চিংড়ি চাষ করে আসছেন। মঙ্গলবার সকালে শরিফুল, আলমগীর ও তুহিনের নেতৃত্বে একদল সন্ত্রাসী ঘেরে হামলা চালিয়ে বসতঘর ভাঙচুর করে এবং নগদ টাকাসহ বিপুল পরিমাণ মাছ লুট করে নিয়ে যায়। এ ঘটনায় রওশন আরার ছেলে যায়েদ বিন কাদের (২৪) বাদী হয়ে চারজনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা ৫০-৬০ জনকে আসামি করে দেবহাটা থানায় একটি লিখিত এজাহার দায়ের করেছেন। এজাহারে উল্লিখিত আসামিরা হলেনÑ শরিফুল ইসলাম (৪৮), আলমগীর হোসেন (৫০), মো. তুহিনুর রহমান এবং মো. রেজাউল করিম। অভিযোগে বলা হয়, গত ২ আগস্ট অভিযুক্ত ব্যক্তিরা ঘেরে গিয়ে ১৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে এবং তা না দিলে ঘের দখলের হুমকি দেয়। পরবর্তীতে মঙ্গলবার সকাল সাতটার দিকে রামদা, চাইনিজ কুড়াল, হকিস্টিক, জিআই পাইপ ও রডসহ দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে আসামিরা ঘেরে অনধিকার প্রবেশ করে। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে প্রধান আসামি শরিফুল ইসলাম বাদীকে শ্বাসরোধ করে হত্যার চেষ্টা করেন। একই সময় অন্য আসামিরা পাহারাদারের ঘর থেকে মাছ বিক্রির নগদ ৫ লাখ টাকা এবং বেড়জাল টেনে আনুমানিক ৬ লাখ টাকা মূল্যের ১২ মণ চিংড়ি ও সাদা মাছ লুট করে নিয়ে যায়। স্থানীদের বরাতে জানা গেছে, অভিযুক্তরা সংবদ্ধভাবে এলাকায় চাঁদাবাজি ও দখলদারির সঙ্গে জড়িত এবং তাঁদের বিরুদ্ধে পূর্বেও একাধিক মামলা রয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত করে দেবহাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল আলীম জানান, ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় অভিযোগ জমা দেওয়া হয়েছে। লিখিত এজাহারের ভিত্তিতে তদন্ত সাপেক্ষে দোষীদের বিরুদ্ধে দ্রুত কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

চীনে নেওয়ার কথা বলে ভারতের কারাগারে বন্দি জামালপুরের সিরাজুল ৪ বছর পর উদ্ধার

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ১৯ আগস্ট, ২০২৬, ১২:২৫ পূর্বাহ্ণ
চীনে নেওয়ার কথা বলে ভারতের কারাগারে বন্দি জামালপুরের সিরাজুল ৪ বছর পর উদ্ধার

এম এ রহিম, বেনাপোল (যশোর): চীনে ভালো কাজের প্রলোভন দেখিয়ে দালালের মাধ্যমে ভারতে নিয়ে যাওয়ার পর দীর্ঘ চার বছর কারাভোগ শেষে দেশে ফিরেছেন সিরাজুল ইসলাম (৫৭) নামের এক বাংলাদেশি নাগরিক। বিশেষ ট্রাভেল পারমিটের মাধ্যমে বেনাপোল চেকপোস্ট দিয়ে তিনি দেশে ফেরেন।

মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ভারতের হরিদাসপুর চেকপোস্ট দিয়ে ভারতীয় ইমিগ্রেশন ও বিএসএফ কর্তৃপক্ষ বেনাপোল চেকপোস্ট ইমিগ্রেশন ও বিজিবির (বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ) কাছে তাঁকে হস্তান্তর করে। ফেরত আসা সিরাজুল ইসলাম জামালপুর জেলার দেওয়ানগঞ্জ থানার চারমরিহাট গ্রামের ফরমান আলীর ছেলে।
বেনাপোল চেকপোস্ট ইমিগ্রেশন পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুর রহমান জানান, ২০২২ সালের জানুয়ারিতে দালাল চক্র চীনে পাঠানোর কথা বলে বুড়িমারী সীমান্ত দিয়ে সিরাজুলকে ভারতে নিয়ে যায়। সেখান থেকে বিহারে পৌঁছানোর পর দালাল তাঁকে ফেলে পালিয়ে যায়। পরে জীবিকার তাগিদে মাছ ধরার কাজ শুরু করলেও একই বছরের জুলাইয়ে বিএসএফের হাতে আটক হন তিনি।
পরবর্তীতে অবৈধ অনুপ্রবেশের দায়ে ভারতীয় আদালত তাঁকে চার বছরের কারাদ- দিয়ে বিহার জেলে পাঠায়। চলতি বছরের ১৭ আগস্ট সাজা মেয়াদ শেষ হওয়ায় ১৮ আগস্ট বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে তাঁকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়। ফেরত আনার পর প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শেষে তাঁকে বেনাপোল পোর্ট থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে।
যশোর জাস্টিস অ্যান্ড কেয়ারের এরিয়া কোঅর্ডিনেটর মুহিত চৌধুরী জানান, সিরাজুল ইসলামকে আপাতত তাঁদের শেল্টার হোমে রাখা হয়েছে। আইনি দাপ্তরিক কাজ সম্পন্ন করে তাঁকে পরিবারের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে।