বুধবার, ২০ মে ২০২৬, ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
বুধবার, ২০ মে ২০২৬, ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

নিউমোনিয়া শনাক্তকরণে আমার উদ্ভাবন ‘LungsAI’

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৯ মে, ২০২৬, ৪:৫৮ অপরাহ্ণ
নিউমোনিয়া শনাক্তকরণে আমার উদ্ভাবন ‘LungsAI’

শাহেদ রহমান

বর্তমান বিশ্বে চিকিৎসা প্রযুক্তি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স এখন আর কেবল গবেষণাগারের সীমাবদ্ধ বিষয় নয়, বরং মানুষের জীবন রক্ষার বাস্তব হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। প্রযুক্তিপ্রেমী একজন তরুণ হিসেবে সবসময় আমার ইচ্ছা ছিল এমন কিছু উদ্ভাবন করা, যা মানুষের উপকারে আসবে এবং দেশের স্বাস্থ্যসেবায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সক্ষম হবে। সেই স্বপ্ন থেকেই আমি তৈরি করেছি “LungsAI” নামের একটি ডিপ লার্নিং ভিত্তিক নিউমোনিয়া শনাক্তকরণ প্রযুক্তি।

বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশে নিউমোনিয়া এখনো একটি প্রাণঘাতী রোগ। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের জন্য এটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। আমাদের দেশের অনেক প্রত্যন্ত অঞ্চলে এখনো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাব রয়েছে। অনেক সময় এক্স রে রিপোর্ট বিশ্লেষণে দেরি হওয়ার কারণে রোগ শনাক্ত করতেও সময় লাগে। ফলে দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা সম্ভব হয় না। এই বাস্তব সমস্যাগুলো আমাকে গভীরভাবে ভাবিয়েছে। সেখান থেকেই “LungsAI” উদ্ভাবনের যাত্রা শুরু।

LungsAI” মূলত একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নিউমোনিয়া ক্লাসিফায়ার, যা এক্স রে ইমেজ বিশ্লেষণ করে দ্রুত এবং নির্ভুলভাবে নিউমোনিয়া শনাক্ত করতে পারে। আমি এই প্রজেক্টে এমন একটি সিস্টেম তৈরি করেছি, যা শুধু রোগ আছে কি না তা শনাক্ত করে না, বরং ফুসফুসের কোন অংশে সংক্রমণ ছড়িয়েছে সেটিও হিটম্যাপ প্রযুক্তির মাধ্যমে ভিজ্যুয়াল আকারে দেখাতে সক্ষম। এর ফলে চিকিৎসকদের জন্য রোগ নির্ণয় আরও সহজ এবং কার্যকর হয়ে ওঠে।

এই প্রজেক্টটি ডেভেলপ করতে আমি পাইথন প্রোগ্রামিং ভাষা ব্যবহার করেছি এবং চিকিৎসকদের জন্য সহজ ব্যবহার উপযোগী করার লক্ষ্যে এর ওয়েব ইন্টারফেস তৈরি করেছি স্ট্রিমলিট ফ্রেমওয়ার্কের মাধ্যমে। তবে এই সিস্টেমটির মূল শক্তি হিসেবে কাজ করছে ডিপ লার্নিংয়ের অত্যাধুনিক অ্যালগরিদম সিএনএন বা কনভোলিউশনাল নিউরাল নেটওয়ার্ক।

বর্তমানে চিকিৎসা বিজ্ঞান এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সমন্বয়ে সবচেয়ে সফল প্রযুক্তিগুলোর মধ্যে সিএনএন অন্যতম। উন্নত বিশ্বের হাসপাতালগুলোতে ক্যান্সার শনাক্তকরণ, চোখের রেটিনা বিশ্লেষণ, এমআরআই ও সিটি স্ক্যান অ্যানালাইসিসে এই প্রযুক্তি ইতোমধ্যেই বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। আমি আমার প্রজেক্টে সিএনএন ব্যবহার করেছি কারণ এটি মেডিকেল ইমেজ বিশ্লেষণে একজন দক্ষ রেডিওলজিস্টের মতো কাজ করতে পারে। এক্স রে ইমেজের ভেতরের সূক্ষ্ম প্যাটার্ন, দাগ কিংবা ফুসফুসের অস্বাভাবিকতা যা অনেক সময় সাধারণ চোখে ধরা কঠিন, সিএনএন অত্যন্ত নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ করতে সক্ষম। নিউমোনিয়ার কারণে ফুসফুসে যে ধরনের সংক্রমণ বা ফ্লুইড তৈরি হয়, সেই পিক্সেলভিত্তিক প্যাটার্নগুলো শিখে নিয়ে এটি দ্রুত সিদ্ধান্ত প্রদান করতে পারে।

এই প্রযুক্তিতে আমি রোগীর প্রোফাইল ব্যবস্থাপনাও যুক্ত করেছি। রোগীর নাম, বয়স, লিঙ্গ এবং রেফারেল আইডিসহ বিভিন্ন তথ্য সংরক্ষণ করা যায়। পাশাপাশি জ্বর, শ্বাসকষ্ট, বুকে ব্যথা কিংবা কফ জমার মতো গুরুত্বপূর্ণ উপসর্গ ইনপুট দেওয়ার সুবিধাও রয়েছে। এসব তথ্য এবং এক্স রে বিশ্লেষণের ভিত্তিতে “LungsAI” স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটি বিস্তারিত মেডিকেল রিপোর্ট তৈরি করতে পারে, যা দ্রুত চিকিৎসা সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করবে।

আমার কাছে সবচেয়ে আনন্দের বিষয় হলো, এই উদ্ভাবন ইতোমধ্যেই জাতীয় পর্যায়ে স্বীকৃতি অর্জন করেছে। ৪৭তম জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মেলা ২০২৬ এর সিনিয়র ক্যাটেগরিতে আমার “LungsAI” প্রজেক্ট সাতক্ষীরা সদর উপজেলা পর্যায়ে প্রথম স্থান অর্জন করেছে। পরবর্তীতে জেলা পর্যায়ে দ্বিতীয় স্থান লাভ করে এবং খুলনা বিভাগীয় পর্যায়ে অনুষ্ঠিত ৪৭তম জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সপ্তাহ ও বিজ্ঞান মেলার জন্য নির্বাচিত হয়েছে। এই অর্জন আমাকে আরও বড় স্বপ্ন দেখার সাহস জুগিয়েছে।

আমি বিশ্বাস করি, সঠিক পৃষ্ঠপোষকতা এবং সরকারি সহযোগিতা পেলে “LungsAI” কে একটি জাতীয় স্বাস্থ্য প্রযুক্তিতে রূপান্তর করা সম্ভব। দেশের ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং সরকারি হাসপাতালগুলোতে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা গেলে দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ আরও সহজ হয়ে উঠবে। বিশেষ করে গ্রামীণ অঞ্চলের মানুষ এর মাধ্যমে উন্নত স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সুযোগ পাবে।

বাংলাদেশ এখন স্মার্ট বাংলাদেশের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। আর এই পথচলায় তরুণদের উদ্ভাবন এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। আমি মনে করি, আমাদের দেশের তরুণদের শুধু সঠিক সুযোগ এবং দিকনির্দেশনা প্রয়োজন। তাহলেই তারা বিশ্বমানের প্রযুক্তি উদ্ভাবনের মাধ্যমে দেশকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে সক্ষম হবে।

LungsAI” শুধু আমার একটি প্রজেক্ট নয়, এটি মানুষের জীবন বাঁচানোর একটি স্বপ্ন। আমি চাই ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তি আরও উন্নত হোক, বৃহৎ পরিসরে ব্যবহৃত হোক এবং বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করুক। তরুণদের মেধা, প্রযুক্তি এবং মানবসেবার সমন্বয়ে গড়ে উঠুক একটি উন্নত, আধুনিক ও মানবিক বাংলাদেশ।

শাহেদ রহমান, শিক্ষার্থী, কম্পিউটার সাইন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট।

Ads small one

আজ সুপার সাইক্লোন’ আম্পানের ৬ বছর: ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি উপকূলের কয়েক লাখ মানুষ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ২০ মে, ২০২৬, ৯:৪২ পূর্বাহ্ণ
আজ সুপার সাইক্লোন’ আম্পানের ৬ বছর: ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি উপকূলের কয়েক লাখ মানুষ

মো. আসাদুজ্জামান সরদার: আজ ২০ মে। এদিনে সাতক্ষীরা উপকূলসহ গোটা জেলায় আঘাত হেনেছিল সুপার সাইক্লোন আম্পান। ছয় বছর পেরিয়ে গেলেও সেই ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছে সাতক্ষীরার উপকূল। আর্থিক ক্ষতি কাটিয়ে আজো ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি উপকূলের কয়েক লাখ মানুষ। ২০২০ সালের ২০ মে সুপার সাইক্লোন আম্পানের তা-বের স্মৃতি আজও ভুলতে পারেনি তারা।

আবহাওয়া অফিসের তথ্যমতে, ২০২০ সালের ২০ মে সাতক্ষীরা উপকূলে ঝড়ের সর্বোচ্চ গতিবেগ একপর্যায়ে ঘণ্টায় ১৪৮ কিলোমিটারে পৌঁছায়। টানা ১৫ ঘণ্টা চলে ঝড়, সৃষ্টি হয় ১২ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাস। প্রাথমিক হিসাবে ক্ষক্ষতির পরিমাণ ছিল প্রায় ১১০০ কোটি টাকা।

জেলা প্রশাসনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সাতক্ষীরায় ঘূর্ণিঝড় আম্পানের আঘাতে ১২ হাজার ৬৯৮টি মৎস্য ঘেরে ১৭৬ কোটি ৫ লাখ টাকার ক্ষতি হয়। কৃষিতে ১৩৭ কোটি ৬১ লাখ ৩০ হাজার টাকার ক্ষতির মধ্যে রয়েছেÑ৬৫ কোটি ১৮ লাখ ৪০ হাজার টাকার আম, ৬২ কোটি ১৬ লাখ টাকার সবজি, ১০ কোটি ২২ লাখ ৪০ হাজার টাকার পান এবং ২ লাখ ৫০ হাজার টাকার তিল। পশু সম্পদ খাতে ক্ষতির পরিমাণ ছিল ৯৫ লাখ ৪৮ হাজার ৬১৬ টাকা।

 

আম্পানের তা-বে জেলার মোট ৮৩ হাজার ৪১৩টি ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছিল; এর মধ্যে সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয় ২২ হাজার ৫১৫টি এবং আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয় ৬০,৯১৬টি। এছাড়া জেলার ৮১ কিলোমিটার রাস্তা এবং ৫৬ দশমিক ৫০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

আম্পানের আঘাতে সাতক্ষীরা উপকূলের শ্যামনগরের বুড়িগোয়ালিনী, গাবুরা, পদ্মপুকুর, কাশিমাড়ি এবং আশাশুনি উপজেলার শ্রীউলা ও প্রতাপনগর ইউনিয়নের অধিকাংশ বেড়িবাঁধ ভেঙে এলাকা প্লাবিত হয়। মেরামত করতে না পারায় দীর্ঘ দুই বছরের বেশি সময় ধরে এই ইউনিয়নগুলোর হাজার হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে ছিল। বহু এলাকায় প্লাবিত লোকালয়ের মধ্যেই নিয়মিত জোয়ার-ভাটা চলেছে এবং দুর্গত পরিবারগুলোকে নদীর ঢেউয়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করতে হয়েছে।

প্রতাপনগরের বাসিন্দা সাইদুল ইসলাম জানান, সেই দিনের কথা আজও আমাদের মনে আছে। ঘূর্ণিঝড় আইলায় আমাদের এলাকায় খুব বেশি ক্ষতি হয়নি, কিন্তু ‘আম্পান’ ঘূর্ণিঝড়ের সময়ে বেড়িবাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছিল। দুই বছরের বেশি সময় ধরে লোকালয়ে জোয়ার-ভাটা চলেছিল। ফলে ঘরবাড়ি, কৃষিজমি ও মৎস্যঘের মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

তিনি আরো বলেন, ঘূর্ণিঝড়ের বছরগুলো পেরিয়ে গেলেও উপকূলীয় এলাকার মানুষ এখনো মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারেনি। এখনো জোয়ারের জলোচ্ছ্বাসের আতঙ্ক, ভয় এবং কাজকর্মের তীব্র অভাব রয়েছে। একই সঙ্গে যোগাযোগব্যবস্থাও এখনো বিভিন্ন সমস্যার তিমিরে নিমজ্জিত। এলাকার মূল দাবি-রিং বাঁধের বদলে বেড়িবাঁধের মজবুত ও স্থায়ী টেকসই নির্মাণ হওয়া চাই। কয়েকটি জায়গায় সংস্কার করা হলেও অধিকাংশ জায়গায় ধস রয়েছে।

 

যেকোনো সময়ে প্রবল জোয়ারের চাপে এই বাঁধগুলো ভেঙে বিস্তীর্ণ এলাকা আবারও প্লাবিত হতে পারে।”
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড-এর তথ্য অনুযায়ী, শ্যামনগর, আশাশুনি ও সাতক্ষীরার উপকূলীয় অঞ্চলের বেশ কিছু বেড়িবাঁধ এখনো ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এদিকে, মেগা প্রকল্পের আওতায় শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা ইউনিয়নে বেড়িবাঁধ উন্নয়ন কাজ চলমান রয়েছে।

গাবুরা ইউপি চেয়ারম্যান মাসুদুল আলম বলেন, আম্পানের সেই ভয়াবহ ক্ষত ও দীর্ঘদিনের অবর্ণনীয় কষ্ট কাটিয়ে গাবুরার মানুষ এখন আবার নতুন করে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে। সরকারের বিশেষ নজরদারি পানি উন্নয়ন বোর্ডের সমন্বিত প্রচেষ্টায় ভাঙন কবলিত প্রধান পয়েন্টগুলোতে টেকসই ও আধুনিক বেড়িবাঁধ নির্মাণের কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে। বর্তমানে এখানে বড় আকারের মেগা প্রকল্প চলমান রয়েছে, যার কাজ শেষ হলে এই এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের কষ্ট অনেক কমে যাবে। আমরা আশাবাদী, এই প্রকল্পগুলো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে গাবুরা তথা পুরো উপকূলীয় অঞ্চল সম্পূর্ণ নিরাপদ হবে এবং এই জনপদের মানুষ টেকসই সুরক্ষাসহ নতুন করে তাদের কর্মসংস্থান ও মাথা গোঁজার ঠাঁই ফিরে পাবে।

প্রতাপনগর ইউপি চেয়ারম্যান আবু দাউদ ঢালী জানান, ঘূর্ণিঝড় আম্পানের আঘাতে সাতক্ষীরার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল আমার প্রতাপনগর ইউনিয়ন। তবে সেই ভয়াবহ ক্ষত ও দীর্ঘদিনের অবর্ণনীয় কষ্ট কাটিয়ে প্রতাপনগর এখন আবার নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সাহায্য-সহযোগিতার মাধ্যমে এই ইউনিয়নকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আমরা দিনরাত কাজ করে যাচ্ছি। টেকসই বাঁধের কাজ সম্পন্ন হলে এবং এই চলমান পুনর্বাসন প্রক্রিয়া সফল হলে এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ চিরতরে দূর হবে বলে আমি বিশ্বাস করি।

খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আগুন

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ২০ মে, ২০২৬, ৯:২৭ পূর্বাহ্ণ
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আগুন

অনলাইন ডেস্ক: খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রধান ভবনের তৃতীয় তলায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। আজ বুধবার ভোর ৬টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। ফায়ার সার্ভিসের ১০ ইউনিটের প্রায় এক ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে।

জানা গেছে, ভোর ৬টার দিকে আগুন লাগার খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছায় ফায়ার সার্ভিসের তিনটি ইউনিট। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পরে আরো সাতটি ইউনিট যোগ দেয়। প্রায় এক ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হন ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা।

 

এ ব্যাপারে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু না জানালেও কয়েকজন কর্মচারীরা জানান, হাসপাতালের প্রধান ভবনের তৃতীয় তলায় অপারেশন থিয়েটারে এ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। কক্ষটি তালাবদ্ধ ছিল।

 

এদিকে আগুন লাগার খবরে পুরো হাসপাতালজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেক রোগী ও তাদের স্বজনরা শয্যা ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে আসেন। তবে এ ঘটনায় কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।

 

ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক সরকার মাসুদ জানান, ধারণা করা হচ্ছে বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকেই আগুনের সূত্রপাত। তবে কেউ হতাহত হননি। ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের কাজ চলছে।

চুকনগর গণহত্যা: ভদ্রা নদীর রক্তস্রোত আর এক ‘সুন্দরী’র বেঁচে থাকার ইতিহাস

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ২০ মে, ২০২৬, ১:০৪ পূর্বাহ্ণ
চুকনগর গণহত্যা: ভদ্রা নদীর রক্তস্রোত আর এক ‘সুন্দরী’র বেঁচে থাকার ইতিহাস

সরদার এম এ মজিদ
খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার চুকনগর বাজার। ১৯৭১ সালের ২০ মে এই জনপদেই সংঘটিত হয়েছিল ইতিহাসের অন্যতম নৃশংস ও বৃহত্তম গণহত্যা। ভারতে আশ্রয় নেওয়ার উদ্দেশ্যে আসা ১০ থেকে ১৫ হাজার শরণার্থী সেদিন ট্রানজিট হিসেবে চুকনগর বাজারে জড়ো হয়েছিলেন। বাগেরহাটের রামপাল, মোড়লগঞ্জ, কচুয়া, শরণখোলা, মংলা এবং খুলনার দাকোপ, বটিয়াঘাটাসহ বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ ঘরবাড়ি, জমিজমার মায়া ত্যাগ করে স্রেফ প্রাণ বাঁচাতে এখানে এসেছিলেন।
১৯ মে রাত থেকেই চুকনগরের পাতাখোলা বিল, কাঁচাবাজার, চাঁদনী ফুটবল মাঠ, কালীমন্দির ও ভদ্রা নদীর ঘাট সংলগ্ন এলাকায় তিল ধারণের জায়গা ছিল না। কেউ দূর-দূরান্ত থেকে হেঁটে, কেউ নৌকায় বা গাড়িতে এসে কেবল একটু জিরিয়ে নিচ্ছিলেন। কেউ খাচ্ছিলেন চিঁড়ে-মুড়ি, কেউবা দুপুরের রান্নার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। কিন্তু স্থানীয় কিছু দুষ্কৃতকারী এই বিপুল জমায়েতের খবর পৌঁছে দেয় সাতক্ষীরার পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ক্যাম্পে।
২০ মে সকাল নয়টার দিকে একটি ট্যাংক ও একটি সাজোঁয়া জিপ নিয়ে সাতক্ষীরা-চুকনগর মহাসড়ক ধরে মালতিয়া মোড়ের ঝাউতলায় এসে থামে পাকিস্তানি সেনারা। গাড়ির শব্দ থামায় পাশে পাটক্ষেতে কর্মরত মালতিয়া গ্রামের বৃদ্ধ চিকন আলী মোড়ল (৭০) উঁকি দিয়ে দেখার চেষ্টা করেন। মুক্তিযোদ্ধারা ওঁৎ পেতে আছে ভেবে পাকিস্তানি সেনারা তাৎক্ষণিক চিকন আলীকে গুলি করে হত্যা করে।
ওই গুলির শব্দে হাজার হাজার মানুষের মধ্যে হুড়োহুড়ি ও দিক-বিদিক ছোটাছুটি শুরু হয়ে যায়। আর তখনই নির্বিচারে ব্রাশফায়ার শুরু করে হানাদাররা। যুবক, বৃদ্ধ, নারী কিংবা শিশু—কারো প্রতি দয়া দেখায়নি তারা। প্রাণভয়ে শত শত মানুষ ভদ্রা নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়লে, নদীর বুকেও গুলি চালানো হয়। মুহূর্তের মধ্যে ভদ্রা নদীর পানি রক্তে লাল হয়ে যায়। দোকানপাটের অলিগলি বা কালভার্টের নিচে লুকিয়েও শেষ রক্ষা হয়নি অনেকের। মাত্র দুই থেকে তিন ঘণ্টার এই তা-বে চুকনগর পরিণত হয় এক বিশাল লাশের স্তূপে।
গণহত্যার পরদিন, অর্থাৎ শুক্রবার সকালে মালতিয়া গ্রামের এরশাদ আলী মোড়ল তাঁর নিহত বাবা চিকন আলীর লাশের সন্ধানে ওই বধ্যভূমিতে যান। প্রতিটি লাশের মুখ দেখার সময় হঠাৎ তাঁর চোখ আটকে যায় এক মর্মস্পর্শী দৃশ্যে। তিনি দেখেন, এক মৃত মায়ের লাশের ওপর পড়ে আছে আনুমানিক ৫-৬ মাসের এক কন্যাসন্তান, যে তখনও মায়ের স্তন চোষার চেষ্টা করছে।
চোখের জল মুছতে মুছতে এরশাদ আলী সেই পরিচয়হীন শিশুটিকে কোলে তুলে বাড়ি নিয়ে যান এবং আদর করে নাম রাখেন ‘সুন্দরী’।
লোকমুখে কুড়িয়ে পাওয়া এই শিশুর খবর ছড়িয়ে পড়লে কেশবপুর থানার মঙ্গলকোটের কালিয়া গ্রামের নিঃসন্তান মাদার দাস দম্পতি শিশুটিকে লালন-পালনের আগ্রহ প্রকাশ করেন। জাতি-ধর্মের ঊর্ধ্বে উঠে মানবিক কারণে এরশাদ আলী ও স্থানীয়রা শিশুটিকে মাদার দাসের হাতে তুলে দেন।
মাদার দাসের ঘরেই সুন্দরী আস্তে আস্তে বড় হয়ে ওঠেন। ১৫ বছর বয়সে তাঁর বিয়ে হয় চুকনগরের মালতিয়া গ্রামের দিনমজুর বাটুল দাসের সঙ্গে। অত্যন্ত দরিদ্র বাটুল দাসের ঘরে সুমনের মা ও ডেভিড দাসের মা হিসেবে সুন্দরীর চরম অর্থকষ্টের সংসারজীবন শুরু হয়।
পরবর্তীতে বিভিন্ন গণমাধ্যম, সাংবাদিক ও গবেষকদের লেখালিখির মাধ্যমে চুকনগর গণহত্যার এই জীবন্ত সাক্ষীর কথা দেশজুড়ে জানাজানি হয়। একপর্যায়ে বিষয়টি সরকারের দৃষ্টিগোচর হলে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের পক্ষ থেকে সুন্দরীর স্থায়ী বাসস্থানের জন্য চুকনগরের নন্দী বাড়ির পেছনে ১১ শতক জমি ও একটি বাড়ি উপহার দেওয়া হয়।
আজ স্বামী, সন্তান ও নাতি-নাতনিদের নিয়ে সেই সরকারি বাড়িতেই সুন্দরীর দিন কাটছে। তিনি আজ শুধু একজন সাধারণ নারী নন, বরং ১৯৭১ সালের ২০ মে চুকনগরের সেই ভয়াবহ নৃশংসতার এক জীবন্ত ও ঐতিহাসিক সাক্ষী। বিশ্বের ইতিহাসে এই মর্মন্তুদ দিনটি যেন চিরস্মরণীয় হয়ে থাকে এবং সুন্দরীর জীবনসংগ্রাম যেন ইতিহাসের পাতায় যথাযথভাবে লিপিবদ্ধ হয়Ñআজকের দিনে এটাই সকলের প্রত্যাশা।