সাতক্ষীরায় সাড়ে ৯ মাসে পানিতে ডুবে ২০ জনের মৃত্যু
এসএম শহীদুল ইসলাম: সাতক্ষীরায় পানিতে ডুবে প্রাণ হারানোর ঘটনা থামছেই না। গত জানুয়ারি মাস থেকে ১৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জেলার বিভিন্ন উপজেলায় পুকুর, নদী, খাল ও মাছের ঘেরে ডুবে অন্তত ২০ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এর মধ্যে ১৭ জনই অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশু। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্যদের অগোচরে খেলতে গিয়ে কিংবা গোসল ও ওযু করার সময় অসাবধানতাবশত এসব দুর্ঘটনা ঘটেছে।
গণমাধ্যম সূত্রে প্রকাশ, জানুয়ারি ১জন (অজ্ঞাত), ফেব্রুয়ারি ২ জন (১ জন বৃদ্ধ, ১ জন শিশু), মার্চ ৩ জন (৩ জন শিশু), এপ্রিল ১ (জন১ জন শিশু), মে ২ জন (২ জন শিশু), জুন ৩ জন (৩ জন শিশু), জুলাই ৪ জন (১ জন নারী, ৩ জন শিশু), আগস্ট ৩ জন (৩ জন শিশু), সেপ্টেম্বর ৫ জন (১ জন বৃদ্ধা, ৪ জনশিশু) সর্বমোট ২০ জন, ১৭ জন শিশু, ১ জন বৃদ্ধা, ১ জন বৃদ্ধ, ১ জন অজ্ঞাত পানিতে ডুবে মৃত্যুবরণ করেছেন।
মাসভিত্তিক অনুসন্ধানে দেখা যায়, মে থেকে সেপ্টেম্বরÑএই চার মাসে পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে সবচেয়ে বেশি। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে দেখা গেছেÑসাঁতার না জানা, পুকুর বা জলাশয়ের ধারে অভিভাবকহীন অবস্থায় খেলাধুলো করা এবং হঠাৎ চোখ সরিয়ে নেওয়াতেই একেকটি তাজা প্রাণ নিভে গেছে।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, চলতি সালের ২৫ জানুয়ারি কালিগঞ্জ উপজেলার নবীনগর এলাকার হাবড়া (গোয়াল ঘেসিয়া) নদী থেকে আনুমানিক কয়েক দিন আগের ভাসমান অবস্থায় এক অজ্ঞাত ব্যক্তির (বয়স ও পরিচয় অজানা) মরদেহ উদ্ধার করে কালিগঞ্জ থানা পুলিশ। ১৮ ফেব্রুয়ারি শ্যামনগর উপজেলার কাশিমাড়ি ইউনিয়নের শংকরকাটি গ্রামের মৃত ময়েজ উদ্দিন মিস্ত্রির ছেলে মানসিক ভারসাম্যহীন মো. আবু দাউদ মিস্ত্রি (৭০) বাড়ির পাশের মাছের ঘেরে পড়ে মারা যান। ২১ ফেব্রুয়ারি কালিগঞ্জ উপজেলার বিষ্ণুপুর ইউনিয়নের মুকুন্দ-মধুসূদনপুর গ্রামে বাড়ির পাশের পুকুরে পড়ে মারা যায় তৌহিদ হোসেন মোড়লের সাড়ে তিন বছরের শিশু তাহির মোড়ল। ১৫ মার্চ তালা উপজেলার মাগুরা ইউনিয়নের বালিয়াদহ গ্রামের তেতুলতলা পুকুরে পড়ে মৃত্যু হয় ৩ বছরের শিশু আলিফ-এর।
শিশুটি পাটকেলঘাটা থানার সরুলিয়া ইউনিয়নের শার্শা গ্রামের মাজেদ গাজীর ছেলে। ২৩ মার্চ কালিগঞ্জের নলতা ইউনিয়নের সন্ন্যাসীরচক গ্রামে নানাবাড়িতে বেড়াতে গিয়ে ঘেরের পানিতে ডুবে মারা যায় দুই খালাতো ভাই-বোনÑসন্ন্যাসীরচক গ্রামের মো. ফারুক গাজীর ছেলে মো. জাকারিয়া হোসেন (১৩) ও নলতা কাশিমপুর গ্রামের মো. আহসান আলী খা’র মেয়ে জান্নাতুল (১০)। ১৯ এপ্রিল কলারোয়া উপজেলার বামনখালী বাজার সংলগ্ন পুকুরে খেলাধুলার সময় পড়ে গিয়ে মারা যায় পাইকগাছার কাটিপাড়া গ্রামের দিনমজুর শফিকুল ইসলামের ৬ বছরের মেয়ে উর্মি খাতুন। ১৬ মে শ্যামনগর উপজেলার নূরনগর গ্রামের আমির হোসেন আদরের ২ বছর বয়সী শিশু সন্তান আব্দুর রহমান বাড়ির পাশের জলাশয়ে পড়ে মারা যায়। ২২ মে কালিগঞ্জ উপজেলার নলতা ইউনিয়নের মাগুরী গ্রামের অবসরপ্রাপ্ত বিজিবি সদস্য মো. সাদিকুল ইসলামের মেয়ে জান্নাতুল (১১) সহপাঠীদের সাথে আকবর আলীর পুকুরে গোসল করতে নেমে তলিয়ে গিয়ে মারা যায়। ১৩ জুন সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ঝাউডাঙ্গা ইউনিয়নের ওয়ারিয়া গ্রামে বাড়ির পাশে পুকুরধারে খেলার সময় পড়ে গিয়ে মারা যায় আব্দুর রহিমের ৫ বছরের ছেলে শান্ত। ১৩ জুন পৃথক ঘটনায় সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ঝাউডাঙ্গা এলাকায় ঘরের পাশে খেলতে গিয়ে নিখোঁজের পর পার্শ্ববর্তী বেতনা নদী থেকে এক শিশু এবং একটি মাছের ঘের থেকে অপর এক শিশুর মরদেহ পাওয়া যায়। ৩ জুলাই সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ধুলিহর ইউনিয়নের পূর্ব সুকদেবপুর গ্রামে রাত ৯টার দিকে খালের কিনারায় মৃগী (খিঁচুনি) রোগে আক্রান্ত হয়ে পানিতে পড়ে মারা যান ব্রহ্মরাজপুর গ্রামের অরুণ পালের স্ত্রী তমা সরকার (২৮)। ১০ জুলাই তালা উপজেলার পাটকেলঘাটা থানার নগরঘাটা ইউনিয়নের গাবতলা গ্রামে বাড়ির আঙিনায় খেলার সময় পাশে থাকা কাশেম সরদারের পুকুরে ডুবে মারা যায় ইসরাইল হোসেনের ৩ বছরের ছেলে মো. আরাফাত হোসেন।
১৪ জুলাই তালা উপজেলার ঢ্যামসাখোলা গ্রামে মায়ের সাথে মাঠে গিয়ে কালভার্টের নিচে পানিতে পড়ে মারা যায় শাহিনুর রহমান মোড়লের ৫ বছরের মেয়ে রুমানা খাতুন। ২৬ জুলাই দেবহাটা উপজেলার দক্ষিণ সখিপুর গ্রামে মাছের ঘেরে পড়ে মারা যায় মো. হযরত আলীর ২ বছরের কন্যাশিশু আসমা উল হোসনা। ১০ আগস্ট শ্যামনগর উপজেলার বাদঘাটা গ্রামে বাড়ির পাশে বিলের ড্রাম/পুকুরে পড়ে মারা যায় ২৬ মাস (৩ বছর) বয়সী শিশু মো. জাওয়াত (বা জাওয়াদ)। সে যশোর জেলার কেশবপুর গ্রামের বাসিন্দা ও শ্যামনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কর্মী মনিরুজ্জামান/মনিরুল ইসলামের পুত্র। ২৯ আগস্ট কলারোয়া উপজেলার যুগিখালি ইউনিয়নের তালুন্দিয়া গ্রামে বাড়ির পাশের পুকুরে পড়ে প্রাণ হারায় প্রকৌশলী শাহজাহান কবিরের ২ বছরের শিশুসন্তান আব্দুর রহমান। ৩০ আগস্ট তালা উপজেলার বারুইহাটি গ্রামে সকাল ৮টার দিকে পুকুরের পানিতে ডুবে প্রাণ হারায় শেখ রিয়াজুল ইসলামের ২ বছর বয়সী শিশু মারিয়া। ৮ সেপ্টেম্বর তালা উপজেলার মাছিয়াড়া বাদামতলা গ্রামে বাড়ির পাশের জলাশয়ে পড়ে মারা যায় মো. আছাদুল মোড়লের সাড়ে তিন বছরের ছেলে আরিয়ান মোড়ল। ১৪ সেপ্টেম্বর সাতক্ষীরা পৌর শহরের বাটকেখালি এলাকায় গফুর সরদারের পুকুরে স্কুলে যাওয়ার আগে গোসল করতে নেমে সাঁতার না জানায় ডুবে মারা যায় বাটকেখালি মিশন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্র লাবিব হোসেন (১০, পিতা: সাদ্দাম হোসেন) ও একই বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্রী হাবিবা খাতুন (৯, পিতা: হাবিবুর রহমান)। ১৮ সেপ্টেম্বর কালিগঞ্জ উপজেলার দক্ষিণ শ্রীপুর ইউনিয়নের সোনাতলা গ্রামে নানাবাড়ির পাশে আবু বক্কর শেখের পুকুরে ডুবে মারা যায় দুই শিশুÑদক্ষিণ শ্রীপুর ইউনিয়নের সোনাতলা গ্রামের আজগার আলীর ছেলে আব্দুল্লাহ (৮) এবং কৃষ্ণনগর ইউনিয়নের বালিয়াডাঙ্গা গ্রামের আমিনুর বিশ্বাসের ছেলে ইকবাল হোসেন (৭)। ১৯ সেপ্টেম্বর কালিগঞ্জ উপজেলার ধলবাড়িয়া ইউনিয়নের দাড়িয়ালা গ্রামে ফজরের নামাজের আগে পুকুর ঘাটে ওযু করতে গিয়ে পানিতে পড়ে মারা যান মৃত আনছার আলীর স্ত্রী বৃদ্ধা আমেনা খাতুন (৮০)।
স্থানীয় সচেতন মহল ও সংশ্লিষ্টদের মতে, বাড়ির আশেপাশে পুকুর ও জলাশয়ে সুরক্ষাবেষ্টনী না থাকা এবং ছোট শিশুদের একাকী জলাশয়ের কাছে যেতে দেওয়াই এসব অকাল মৃত্যুর প্রধান কারণ। পরিবারের অভিভাবকদের প্রতি শিশুদের সার্বক্ষণিক নজরদারিতে রাখার তাগিদ দেওয়া হয়েছে।












