প্রসঙ্গ: প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষায় বিপুল অনুপস্থিতি: কারণ কী?
সাতক্ষীরা জেলায় উৎসবমুখর পরিবেশে প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা শুরু হলেও একটি বড় দুশ্চিন্তার খবর সামনে এসেছে। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রথম দিনের পরীক্ষায় জেলার সাতটি উপজেলায় ৮ হাজার ৫০২ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৩ হাজার ৩০৪ জনই অনুপস্থিত ছিল। অর্থাৎ প্রায় ৩৯ শতাংশ শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেয়নি। কলারোয়া উপজেলায় এই পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক, যেখানে উপস্থিতির হার ছিল মাত্র ৪০ শতাংশের কাছাকাছি। একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় এত বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীর অনুপস্থিতি আমাদের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার তৃণমূল পর্যায়ের কোনো গভীর সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখা জরুরি।
বৃত্তি পরীক্ষার মূল উদ্দেশ্য হলো শিক্ষার্থীদের মেধার মূল্যায়ন এবং তাদের পড়াশোনায় উৎসাহিত করা। বর্তমান সরকার বৃত্তির সংখ্যা ও অর্থের পরিমাণ বৃদ্ধি করেছে, যা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। কিন্তু মাঠপর্যায়ের এই পরিসংখ্যান বলছে, সরকারি এই সুযোগ গ্রহণে এক বিশাল সংখ্যক শিক্ষার্থী অনাগ্রহী অথবা তারা কোনো প্রতিবন্ধকতার শিকার। সাধারণত প্রাথমিক স্তরে বৃত্তি পরীক্ষার জন্য নির্দিষ্ট সংখ্যক মেধাবী শিক্ষার্থীকে মনোনীত করা হয়। মনোনীত হওয়ার পরও কেন তারা কেন্দ্রে এল না, সেই প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
উপজেলাওয়ারী বিশ্লেষণে দেখা যায়, তালার মতো এলাকায় উপস্থিতির হার সন্তোষজনক (৭২.৩৭%) হলেও কলারোয়া বা আশাশুনির চিত্র ভিন্ন। এই বৈষম্যের কারণ কী? যাতায়াত ব্যবস্থার ত্রুটি, অভিভাবক মহলে সচেতনতার অভাব, নাকি দীর্ঘমেয়াদি দারিদ্র্যের কারণে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার হার বৃদ্ধিÑকোনটি দায়ী? অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, পরিবারের কাজের চাপে বা অন্য কোনো সামাজিক কারণে বিশেষ করে চরাঞ্চল ও সীমান্তবর্তী এলাকায় শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। কলারোয়ায় উপস্থিতির হার অর্ধেকেরও নিচে নেমে আসাটা কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়, বরং স্থানীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনার জন্য একটি সতর্কবার্তা।
শিক্ষা কর্মকর্তারা পরীক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ ও প্রশ্নপত্রের নিরাপত্তা নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন, যা প্রশংসনীয়। কিন্তু কেবল ‘শান্তিপূর্ণ পরীক্ষা’ আয়োজনই সফলতার মাপকাঠি হতে পারে না। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রতিটি যোগ্য শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। বৃত্তি পরীক্ষার মতো আয়োজনে যদি ৩৯ শতাংশ শিক্ষার্থী কক্ষের বাইরে থাকে, তবে সেই বৃত্তির লক্ষ্য পূর্ণাঙ্গভাবে অর্জিত হবে না।
আমরা মনে করি, কেবল অনুপস্থিতির কারণ খতিয়ে দেখার আশ্বাসে সীমাবদ্ধ না থেকে শিক্ষা বিভাগকে প্রতিটি উপজেলার ঝরে পড়া বা অনুপস্থিত শিক্ষার্থীদের প্রকৃত তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। শিক্ষক ও অভিভাবকদের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ স্থাপন করে শিক্ষার্থীদের স্কুলমুখী ও পরীক্ষামুখী করার কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। বৃত্তি পরীক্ষা যেন কেবল গুটিকয়েক শিক্ষার্থীর আনুষ্ঠানিকতা না হয়ে প্রকৃত অর্থেই মেধাবিকাশের চাবিকাঠি হয়, তা নিশ্চিত করাই হবে সময়ের দাবি।












