পলিথিন নিলে সুন্দরবন বাঁচাবে না, আপনিও নয়-ভাবছেন কি?
সচ্চিদানন্দ দে সদয়
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলজুড়ে বিস্তৃত পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন শুধু একটি বনভূমি নয়, এটি বাংলাদেশের পরিবেশ, অর্থনীতি ও মানুষের জীবনরক্ষার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। শত শত বছর ধরে এই বন উপকূলকে আগলে রেখেছে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের ভয়াল আঘাত থেকে। কিন্তু আজ সেই সুন্দরবনই নীরবে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষের অসচেতনতা, লোভ ও দায়িত্বহীনতার কারণে। আর এই ধ্বংসযজ্ঞের অন্যতম প্রধান অস্ত্র হয়ে উঠেছে পলিথিন ও একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক।একসময় বাজার করতে গেলে মানুষ হাতে কাপড়ের ব্যাগ বা পাটের থলে নিয়ে বের হতো। মুদি দোকানে কাগজের মোড়কে পণ্য দেওয়া হতো। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সহজলভ্য ও সস্তা হওয়ায় পলিথিন আমাদের জীবনের প্রতিটি স্তরে ঢুকে পড়েছে। এখন বাজার, হাসপাতাল, স্কুল, অফিস, বাসস্ট্যান্ডÑসবখানেই পলিথিনের দাপট। কয়েক মিনিটের সুবিধার জন্য ব্যবহৃত এই পলিথিন শত শত বছর ধরে পরিবেশে থেকে যায়। অথচ আমরা হয়তো বুঝতেই পারছি না, এই সামান্য অবহেলাই ধীরে ধীরে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে আমাদের ভবিষ্যৎকে।সুন্দরবনের সঙ্গে পলিথিন দূষণের সম্পর্ক অনেকেই সরাসরি উপলব্ধি করতে পারেন না। অনেকে ভাবেন, শহরের ডাস্টবিনে ফেলা একটি প্লাস্টিক ব্যাগ কীভাবে সুন্দরবনের ক্ষতি করতে পারে? বাস্তবতা হলো, নদীমাতৃক বাংলাদেশের প্রতিটি নদী, খাল ও জলাশয় একে অন্যের সঙ্গে সংযুক্ত। শহরের ড্রেন বা গ্রামের খাল থেকে ফেলা পলিথিন শেষ পর্যন্ত নদীতে গিয়ে পড়ে। নদীর স্রোত তা বয়ে নিয়ে যায় মোহনায়, আর সেখান থেকে পৌঁছে যায় সুন্দরবনের ভেতরে। জোয়ার-ভাটার পানির সঙ্গে এসব পলিথিন আটকে যায় শ্বাসমূলের মধ্যে, বন্ধ করে দেয় স্বাভাবিক পানি চলাচল।সুন্দরবনের গাছের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো তাদের শ্বাসমূল। এই শ্বাসমূলের মাধ্যমেই গাছ অক্সিজেন গ্রহণ করে। কিন্তু যখন পলিথিন ও প্লাস্টিক বর্জ্য শ্বাসমূলের চারপাশে জমে যায়, তখন গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়। ধীরে ধীরে গাছ দুর্বল হয়ে পড়ে। বনাঞ্চলের মাটি শক্ত হয়ে যায়, জীববৈচিত্র্েযর ভারসাম্য নষ্ট হতে শুরু করে। ফলে পুরো বাস্তুতন্ত্রই হুমকির মুখে পড়ে।প্লাস্টিক দূষণের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো এর দীর্ঘস্থায়িত্ব। একটি পলিথিন ব্যাগ সম্পূর্ণভাবে মাটির সঙ্গে মিশে যেতে শত শত বছর সময় লাগে। এ সময়ের মধ্যে সূর্যের তাপ, পানি ও বাতাসের প্রভাবে এটি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হয়, যাকে বলা হয় মাইক্রোপ্লাস্টিক। এই মাইক্রোপ্লাস্টিক নদী ও সাগরের মাছের শরীরে প্রবেশ করে। মাছ, কাঁকড়া, কচ্ছপ কিংবা পাখিরা খাবার ভেবে প্লাস্টিক গিলে ফেলে। এতে তাদের পরিপাকতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়, অনেক প্রাণী মারা যায়। আরও ভয়াবহ বিষয় হলো, খাদ্যচক্রের মাধ্যমে এই বিষাক্ত কণা মানুষের শরীরেও ফিরে আসে।আজ বিশ্বজুড়ে গবেষকেরা সতর্ক করছেন, মাইক্রোপ্লাস্টিক শুধু পরিবেশ নয়, মানবস্বাস্থ্যের জন্যও বড় হুমকি। পানীয় পানি, লবণ, মাছ এমনকি বাতাসেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া যাচ্ছে। এসব কণা শরীরে প্রবেশ করে ক্যানসার, হরমোনজনিত সমস্যা, শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। অর্থাৎ পলিথিনের ক্ষতি কেবল বন ধ্বংসে সীমাবদ্ধ নয়; এটি সরাসরি মানুষের অস্তিত্বের জন্যও বিপজ্জনক।বাংলাদেশে পলিথিন নিষিদ্ধের ইতিহাস নতুন নয়। প্রায় দুই দশক আগেই সরকার পাতলা পলিথিন উৎপাদন ও ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছিল। আন্তর্জাতিক পরিম-লেও বাংলাদেশ একসময় পরিবেশবান্ধব উদ্যোগের জন্য প্রশংসিত হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে সেই আইন কার্যকর হয়নি। এখনও দেশের বাজারগুলোতে অবাধে বিক্রি হচ্ছে নিষিদ্ধ পলিথিন। অনেক দোকানদার জানেন এটি ক্ষতিকর, তবুও সস্তা ও সহজলভ্য হওয়ায় ব্যবহার বন্ধ করছেন না। আবার ক্রেতারাও বিনা প্রতিবাদে পলিথিন গ্রহণ করছেন। ফলে আইন কাগজে থাকলেও বাস্তবে পরিবেশ দূষণ কমছে না।উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষ সুন্দরবনের গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি অনুভব করেন। সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাটসহ উপকূলের বিস্তীর্ণ এলাকার মানুষ জানেন, সুন্দরবন না থাকলে ঘূর্ণিঝড়ের আঘাত কতটা ভয়াবহ হতে পারত। সিডর, আইলা, আম্পান কিংবা ইয়াসের মতো দুর্যোগের সময় সুন্দরবন ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল। বিশাল গাছপালা ঝড়ের গতি কমিয়েছে, জলোচ্ছ্বাসের চাপ কমিয়েছে। কিন্তু যদি এই বন দুর্বল হয়ে পড়ে, তাহলে ভবিষ্যতের দুর্যোগ আরও ভয়াবহ হবে। উপকূলের মানুষের জীবন, কৃষি ও অর্থনীতি তখন বড় বিপদের মুখে পড়বে।পলিথিনের কারণে শুধু বন নয়, নগরজীবনও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। শহরের ড্রেন ও নালা পলিথিনে আটকে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। সামান্য বৃষ্টিতেই রাস্তাঘাট ডুবে যাচ্ছে। কৃষিজমিতে পলিথিন জমে মাটির উর্বরতা কমে যাচ্ছে। গবাদিপশু খাবারের সঙ্গে প্লাস্টিক খেয়ে অসুস্থ হচ্ছে। নদীর তলদেশে প্লাস্টিক জমে নাব্যতা কমে যাচ্ছে। অর্থাৎ পলিথিন এক নীরব ঘাতকের মতো সমাজের প্রতিটি স্তরে ক্ষতি করে চলেছে।দুঃখজনক বিষয় হলো, আমরা এখনও পরিবেশকে আলাদা কোনো বিষয় মনে করি। মনে করি, বন রক্ষা করা শুধু বন বিভাগের কাজ, নদী রক্ষা করা সরকারের দায়িত্ব। অথচ পরিবেশ ধ্বংসের জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী আমাদের প্রতিদিনের অভ্যাস। বাজার থেকে একটি পলিথিন নেওয়া, রাস্তায় বোতল ফেলে দেওয়া কিংবা নদীতে ময়লা ফেলাÑএসব ছোট ছোট কাজই মিলিত হয়ে বড় বিপর্যয় তৈরি করে।আজ প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতার বিপ্লব। মানুষকে বুঝতে হবে, পরিবেশ রক্ষা কোনো বিলাসিতা নয়; এটি বেঁচে থাকার শর্ত। স্কুল-কলেজে পরিবেশ শিক্ষা আরও কার্যকর করতে হবে। শিশুদের ছোটবেলা থেকেই শেখাতে হবে পলিথিনের ক্ষতি সম্পর্কে। পরিবার থেকে সচেতনতা শুরু করতে হবে। বাজারে গেলে কাপড়ের ব্যাগ নেওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। দোকানদারদেরও বিকল্প ব্যবহারে উৎসাহিত করতে হবে।বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা হতে পারে পাটশিল্প। একসময় “সোনালি আঁশ” নামে পরিচিত পাট ছিল দেশের অর্থনীতির প্রধান শক্তি। পরিবেশবান্ধব হওয়ায় বিশ্বজুড়ে আবার পাটজাত পণ্যের চাহিদা বাড়ছে। পাটের ব্যাগ, কাগজের মোড়ক কিংবা জৈব উপাদান দিয়ে তৈরি প্যাকেজিং ব্যবহারে গুরুত্ব দিলে পরিবেশ যেমন রক্ষা পাবে, তেমনি দেশের অর্থনীতিও শক্তিশালী হবে। এটি হতে পারে পরিবেশ ও অর্থনীতির যৌথ সমাধান।স্থানীয় সরকার, প্রশাসন ও সামাজিক সংগঠনগুলোকেও আরও সক্রিয় হতে হবে। শুধু অভিযান চালিয়ে জরিমানা করলেই হবে না; দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। বাজারে বিকল্প ব্যাগ সহজলভ্য করতে হবে। প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহার ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আধুনিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। নদী ও খাল পরিষ্কার রাখতে নিয়মিত কার্যক্রম চালাতে হবে। বিশেষ করে সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকায় প্লাস্টিক ব্যবহারে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ জরুরি।গণমাধ্যমের ভূমিকাও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংবাদপত্র, টেলিভিশন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিয়মিত পরিবেশ সচেতনতা বাড়াতে পারে। মানুষের কাছে বাস্তব উদাহরণ তুলে ধরতে হবেÑকীভাবে একটি পলিথিন ব্যাগ শেষ পর্যন্ত একটি প্রাণীর মৃত্যুর কারণ হয়, কীভাবে একটি বোতল নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করে। যখন মানুষ ক্ষতির বাস্তব চিত্র দেখবে, তখন সচেতনতা আরও বাড়বে।ধর্মীয় ও নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও পরিবেশ রক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। পৃথিবী মানুষের কাছে আমানতস্বরূপ। এই প্রকৃতি ধ্বংস করার অধিকার মানুষের নেই। নদী, বন ও প্রাণিকুল রক্ষা করা মানবিক দায়িত্ব। অথচ আমরা সাময়িক সুবিধার জন্য এমন এক উপাদান ব্যবহার করছি, যা শত বছরের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।আজকের শিশুদের জন্য আমরা কেমন পৃথিবী রেখে যেতে চাই? এমন এক পৃথিবী, যেখানে নদী প্লাস্টিকে ভরা, মাছ বিষাক্ত, বন উজাড় এবং বাতাস দূষিত? নাকি এমন এক পৃথিবী, যেখানে মানুষ ও প্রকৃতি সহাবস্থানে বেঁচে থাকবে? এই প্রশ্নের উত্তর আমাদেরই দিতে হবে।পলিথিনের বিরুদ্ধে লড়াই কোনো একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সম্ভব নয়। এটি সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করতে হবে। যেমন একসময় মানুষ ধূমপানের ক্ষতি সম্পর্কে সচেতন হয়েছিল, তেমনি পলিথিন ব্যবহারের বিরুদ্ধেও সামাজিক চাপ তৈরি করতে হবে। কেউ পলিথিন ব্যবহার করলে তাকে নিরুৎসাহিত করতে হবে। দোকানদারদের বিকল্প দিতে হবে। তরুণ প্রজন্মকে পরিবেশ আন্দোলনের নেতৃত্বে এগিয়ে আসতে হবে। বিশ্বের অনেক দেশ ইতোমধ্যে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। কোথাও প্লাস্টিক ব্যাগের ওপর কর আরোপ করা হয়েছে, কোথাও সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বাংলাদেশও চাইলে আরও কার্যকর উদ্যোগ নিতে পারে। প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সামাজিক অংশগ্রহণ।সবশেষে মনে রাখতে হবে, প্রকৃতি কখনও হঠাৎ ধ্বংস হয় না। ধীরে ধীরে জমে ওঠা অবহেলা একসময় ভয়াবহ বিপর্যয়ের রূপ নেয়। আজ সুন্দরবনের শ্বাসমূলের ফাঁকে আটকে থাকা একটি পলিথিন হয়তো আমাদের চোখে তুচ্ছ মনে হতে পারে। কিন্তু হাজার হাজার পলিথিন মিলে যখন বনকে অসুস্থ করে তোলে, তখন তার প্রভাব পড়ে মানুষের জীবনেও।সুন্দরবন বাঁচানো মানে শুধু একটি বন রক্ষা করা নয়; এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রক্ষা করা। কারণ সুন্দরবন দুর্বল হলে উপকূল দুর্বল হবে, কৃষি দুর্বল হবে, জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হবে, মানুষ আরও বেশি দুর্যোগের মুখে পড়বে। তাই পলিথিনের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া মানে নিজের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে অংশ নেওয়া।আজ থেকেই যদি আমরা সিদ্ধান্ত নিইÑবাজারে গেলে নিজের ব্যাগ ব্যবহার করব, অপ্রয়োজনীয় প্লাস্টিক এড়িয়ে চলব, নদী বা রাস্তায় ময়লা ফেলব না, অন্যদেরও সচেতন করবÑতাহলেই পরিবর্তনের শুরু হবে। বড় পরিবর্তন কখনও একদিনে আসে না; ছোট ছোট সচেতনতার সমষ্টিই সমাজকে বদলে দেয়।মনে রাখতে হবে, পলিথিন নিলে শুধু সুন্দরবন বাঁচবে নাÑশেষ পর্যন্ত বাঁচবে না মানুষও। কারণ প্রকৃতি ধ্বংস করে মানুষ কখনও নিরাপদ থাকতে পারে না। সুন্দরবনের শ্বাস যদি বন্ধ হয়ে যায়, একদিন থমকে যাবে আমাদের নিজেদের জীবনও। লেখক:সংবাদকর্মী











