বুধবার, ২০ মে ২০২৬, ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
বুধবার, ২০ মে ২০২৬, ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

শ্যামনগরে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে ঐতিহাসিক ‘নকিপুর জমিদার বাড়ি

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৯ মে, ২০২৬, ৪:৪৬ অপরাহ্ণ
শ্যামনগরে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে ঐতিহাসিক ‘নকিপুর জমিদার বাড়ি

দীপঙ্কর বিশ্বাস: সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার নকিপুর জমিদার বাড়িটি এখন কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বাংলার বারো ভুঁইয়াদের অন্যতম মহারাজ প্রতাপাদিত্যর স্মৃতি বিজড়িত পবিত্র ভূমি শ্যামনগর। শ্যামসুন্দর নামক একজন ভদ্রলোক প্রয়োজনীয় গৃহাদি নির্মাণের জন্য একখন্ড জমি ইংরেজ সরকারকে দান করেন। সেই থেকে স্থানটির নাম দাতার নামানুসারে ‘শ্যামনগর’ হয়েছে।

 

১৮৯৭ সালে ব্রিটিশ আমলে সৃষ্টি হওয়া শ্যামনগর উপজেলাটির মোট আয়তন ১৯০৩ বর্গ কিলোমিটার। যার মূল ভূখন্ড ৪৫৫ বর্গ কিলোমিটার এবং সুন্দরবনজুড়ে রয়েছে ১৪৪৮ বর্গ কিলোমিটার। প্রাচীন স্থাপত্যের নিদর্শন হিসেবে এখানে রয়েছে বংশীপুর ঐতিহাসিক শাহী মসজিদ, হাম্মামখানা/হাবসিখানা, যশোরেশ্বরী কালী মন্দির, জাহাজঘাটা নৌ দূর্গ, গোপালপুর গোবিন্দ দেবের মন্দির, জমিদার হরিচরণ রায় বাহাদুরের বাসভবন, নহবতখানা ও মন্দির, ঈশ্বরীপুরের জেযুইট গির্জা উল্লেখযোগ্য।

 

তৎকালীন সময়ে ঐতিহ্যের শ্যামনগরের নকিপুরে অবস্থিত জমিদার হরিচরণ রায় বাহাদুরের বাসভবনের সামনের রাস্তা দিয়ে কোন প্রজারা হেঁটে গেলে নাকি জমিদারের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের জন্য পা থেকে জুতা খুলে হাতে নিয়ে জমিদার বাড়ি অতিক্রম করে আবার জুতা পরতো। কিন্তু দূর্ভাগ্যজনক সত্য হলো শ্যামনগরের অন্যতম ঐতিহাসিক নিদর্শন হরিচরণ রায় বাহাদুরের বাসভবন ‘নকিপুর জমিদার বাড়ি‘টি রক্ষায় নামমাত্র কোন সাইনবোর্ডও এখোনো বসেনি।

 

বর্তমানে প্রাচীন স্থাপত্য শৈলীর নকিপুর জমিদার বাড়ির মূল ভবনটির প্রায় অর্ধেক অংশ ধংসপ্রাপ্ত হয়েছে। আর যে অংশটুকু এখনো টিকে আছে তা কোনরকম সংরক্ষণ বা ব্যবস্থাপনা না থাকায় ধংসের দারপ্রান্তে। সংস্কার আর রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বাড়িটি ভুতের বাড়িতে পরিণত হয়েছে। জানালা-দরজা না থাকায় বাড়িটি গবাক্ষে রূপ নিয়েছে। বাড়ির দেয়ালে জন্ম নিয়েছে শতশত বটবৃক্ষ। নোনা ধরে ইটের দেয়াল খসে খসে পড়ছে। ইতিহাসের জীবন্ত উপাদান এ বাড়িটি রক্ষায় নেয়া হচ্ছে না কোন উদ্যোগ।

 

স্থানীয়রা মনে করেন নকিপুর জমিদার বাড়িটি ইতিহাস ঐতিহ্যের সাক্ষী হয়ে আজও দাঁড়িয়ে আছে। শ্যামনগর থানা সদরের ২ কিলোমিটার পূর্বে জমিদার হরিচরণ রায়চৌধুরীর বাড়িটি ১৮৮৮ খ্রিষ্টাব্দে নির্মিত হয়। বিশাল আকারের তিনতলার ইমারতটি ভাঙাচোরা অবস্থায় এখন কোনরকমে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। রাজা প্রতাপাদিত্যের পরে হরিচরণ রায় ছিলেন শ্যামনগর অঞ্চলের প্রভাবশালী ও বিত্তশালী জমিদার। তার উদ্যোগে শ্যামনগরে তথা সমগ্র সাতক্ষীরায় অনেক জনহিতকর কাজ হয়েছিল। অনেক জমিদারের মতো হরিচরণ রায় শুধু সম্পদ ও বিলাসে মত্ত ছিলেন না। রাস্তাঘাট, খাল খনন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তৈরি করেছিলেন।

 

১৮৯৯ খ্রিষ্টাব্দে নির্মিত হয়েছিল নকিপুর মাইনর স্কুলটি। যেটি বর্তমানে নকিপুর সরকারি হরিচরণ পাইলট মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয় নামে খ্যাত। জমিদারবাড়ির সব জিনিসপত্র চলে গেছে চোর ও লুটেদারের দখলে। তবে পরিত্যক্ত জমিদারবাড়ি, এর পাশের দুর্গামন্ডপ, নহবতখানা, শিবমন্দির, জলাশয় ইত্যাদি দেখে সহজে অনুমান করা যায় এর অতীত জৌলুস। দক্ষিণবঙ্গের প্রতাপশালী শাসক রাজা প্রতাপাদিত্যের রাজধানী ছিল সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগরের ধুমঘাট এলাকায়। তাঁর রাজত্বের প্রায় ২৫০ বছর পরে জমিদার রায় বাহাদুর হরিচরণ চৌধুরী শ্যামনগরের নকিপুরে একছত্র অধিপতি ছিলেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় তাঁর অনিন্দ্য সুন্দর বসতবাড়িটি যা দর্শনীয় ঐতিহাসিক স্থাপত্য হিসেবে পর্যটকদের মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারতো তা আজ সংস্কার ও দূরদর্শীতার অভাবে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে।

 

শিক্ষক ও লেখক চারু চন্দ্র মন্ডলের লেখা একটি বই থেকে জানা যায়, জমিদার রায় বাহাদুর হরিচরণ চৌধুরীর বাড়িটি ছিল সাড়ে তিন বিঘা জমির উপর। যার বাউন্ডারীটি ছিল প্রায় দেড় হাত চওড়া প্রাচীর দ্বারা সীমাবদ্ধ। সদর পথে ছিল একটি বড় গেট বা সিংহদ্বার। সম্মুখে ছিল একটি শান বাঁধানো বড় পুকুর। শতাধিককাল পূর্বে খননকৃত এই পুকুরটিতে সারাবছরই জল থাকে এবং গ্রীষ্মের দিনে প্রচন্ড তাপদাহে তা শুকায় না। পুকুরঘাটের বাম পাশে ছত্রিশ ইঞ্চি সিঁড়ি বিশিষ্ট দ্বিতল নহবত খানা।

 

আটটি স্তম্ভ বিশিষ্ট এই নহবত খানার ধ্বংসাবশেষটি এখনও প্রায় অক্ষত অবস্থায় দন্ডায়মান থেকে কালের স্বাক্ষী বহন করছে। বাগান বাড়িসহ মোট বার বিঘা জমির উপর জমিদার বাড়িটি প্রতিষ্ঠিত ছিল। বাড়িটি ছিল দৈর্ঘ্য ২১০ ফুট, প্রস্থ ৩৭ ফুট, পুনঃ ৬৪ ফুটের মাথায় এল প্যাটার্নের বাড়ি। সদর দরজা দিয়ে ঢুকতেই সম্মুখে সিঁড়ির ঘর। নিচের তলায় অফিসাদি ও নানা দেবদেবীর পূজার ঘর, এছাড়া আরও দুইটি গমনাগমন সিঁড়ি পথ। মাঝের তলায় কুল দেবতা গোপাল দেবের মন্দির ও অতিথি শালা।

 

সিঁড়ির দু’পাশে কক্ষ ছিল এবং সিঁড়ি ছিল মধ্যবর্তী স্থানে। সদর অন্দরের দুই পাশেই বারান্দা ছিল। বারান্দাগুলি বেশ প্রশস্ত আট ফুট চওড়া। বিল্ডিং এর নীচে আন্ডারগ্রাউন্ড ছিল। নিচের তলায় ১৭টি এবং উপরের তলায় ৫টি কক্ষ ছিল বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। ছোট, বড়, মাঝারি সব রকমের কক্ষ ছিল। প্রথমবার ঢুকলে কোন দিকে বহির্গমন পথ তা বোঝা বেশ কষ্টদায়ক। চন্দন কাঠের খাট-পালঙ্ক, শাল, সেগুন, লৌহ কাষ্ঠের দরজা-জানালা ও বর্গাদি, লোহার কড়ি, ১০ ইঞ্চি পুরু চুন-সুরকির ছাঁদ, ভিতরে কক্ষে কক্ষে গদি তোষক, কার্পেট বিছানো মেঝে, এক কথায় জমিদার পরিবেশ, যেখানে যেমনটি হওয়া দরকার তার কোন ঘাটতি ছিল না।

 

বাড়িতে ঢুকতে ৪টি গেট ছিল। গেট ৪টি ছিল ২০ ফুট অন্তর। জমিদার বাড়ির দক্ষিণে একটি বড় পুকুর ছিল। ১৯৫৪ সালের জমিদার পরিবার এখান থেকে স্ব-পরিবারে ভারতে চলে যায়। বর্তমান সে পুকুরটি আর নেই। নেই পূর্বের মত সৌন্দর্য। তবে তার দক্ষিণে এখনও একটি পুকুর বিদ্যমান যার শান বাঁধানো ঘাটের ধ্বংসাবশেষটির দুই পাশে দুটি শিব মন্দির প্রতিষ্ঠিত রয়েছে। নকিপুর জমিদার বাড়িটি পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। বর্তমানে বাড়িটিকে পূর্বের নান্দনিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তরের ভূমিকা রাখা প্রয়োজন। তৎকালীন জমিদার বংশের গৌরবময় ঐতিহ্যের নানা নির্দশন পাওয়া যায় এ বাড়িতে। বাড়িটি সংরক্ষণে ইতোমধ্যে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে কিন্তু এর বাস্তবায়নের নিদর্শন এখনো পর্যন্ত চোখে পড়েনি।

 

Ads small one

আজ সুপার সাইক্লোন’ আম্পানের ৬ বছর: ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি উপকূলের কয়েক লাখ মানুষ

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ২০ মে, ২০২৬, ৯:৪২ পূর্বাহ্ণ
আজ সুপার সাইক্লোন’ আম্পানের ৬ বছর: ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি উপকূলের কয়েক লাখ মানুষ

মো. আসাদুজ্জামান সরদার: আজ ২০ মে। এদিনে সাতক্ষীরা উপকূলসহ গোটা জেলায় আঘাত হেনেছিল সুপার সাইক্লোন আম্পান। ছয় বছর পেরিয়ে গেলেও সেই ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছে সাতক্ষীরার উপকূল। আর্থিক ক্ষতি কাটিয়ে আজো ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি উপকূলের কয়েক লাখ মানুষ। ২০২০ সালের ২০ মে সুপার সাইক্লোন আম্পানের তা-বের স্মৃতি আজও ভুলতে পারেনি তারা।

আবহাওয়া অফিসের তথ্যমতে, ২০২০ সালের ২০ মে সাতক্ষীরা উপকূলে ঝড়ের সর্বোচ্চ গতিবেগ একপর্যায়ে ঘণ্টায় ১৪৮ কিলোমিটারে পৌঁছায়। টানা ১৫ ঘণ্টা চলে ঝড়, সৃষ্টি হয় ১২ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাস। প্রাথমিক হিসাবে ক্ষক্ষতির পরিমাণ ছিল প্রায় ১১০০ কোটি টাকা।

জেলা প্রশাসনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সাতক্ষীরায় ঘূর্ণিঝড় আম্পানের আঘাতে ১২ হাজার ৬৯৮টি মৎস্য ঘেরে ১৭৬ কোটি ৫ লাখ টাকার ক্ষতি হয়। কৃষিতে ১৩৭ কোটি ৬১ লাখ ৩০ হাজার টাকার ক্ষতির মধ্যে রয়েছেÑ৬৫ কোটি ১৮ লাখ ৪০ হাজার টাকার আম, ৬২ কোটি ১৬ লাখ টাকার সবজি, ১০ কোটি ২২ লাখ ৪০ হাজার টাকার পান এবং ২ লাখ ৫০ হাজার টাকার তিল। পশু সম্পদ খাতে ক্ষতির পরিমাণ ছিল ৯৫ লাখ ৪৮ হাজার ৬১৬ টাকা।

 

আম্পানের তা-বে জেলার মোট ৮৩ হাজার ৪১৩টি ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছিল; এর মধ্যে সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয় ২২ হাজার ৫১৫টি এবং আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয় ৬০,৯১৬টি। এছাড়া জেলার ৮১ কিলোমিটার রাস্তা এবং ৫৬ দশমিক ৫০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

আম্পানের আঘাতে সাতক্ষীরা উপকূলের শ্যামনগরের বুড়িগোয়ালিনী, গাবুরা, পদ্মপুকুর, কাশিমাড়ি এবং আশাশুনি উপজেলার শ্রীউলা ও প্রতাপনগর ইউনিয়নের অধিকাংশ বেড়িবাঁধ ভেঙে এলাকা প্লাবিত হয়। মেরামত করতে না পারায় দীর্ঘ দুই বছরের বেশি সময় ধরে এই ইউনিয়নগুলোর হাজার হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে ছিল। বহু এলাকায় প্লাবিত লোকালয়ের মধ্যেই নিয়মিত জোয়ার-ভাটা চলেছে এবং দুর্গত পরিবারগুলোকে নদীর ঢেউয়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করতে হয়েছে।

প্রতাপনগরের বাসিন্দা সাইদুল ইসলাম জানান, সেই দিনের কথা আজও আমাদের মনে আছে। ঘূর্ণিঝড় আইলায় আমাদের এলাকায় খুব বেশি ক্ষতি হয়নি, কিন্তু ‘আম্পান’ ঘূর্ণিঝড়ের সময়ে বেড়িবাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছিল। দুই বছরের বেশি সময় ধরে লোকালয়ে জোয়ার-ভাটা চলেছিল। ফলে ঘরবাড়ি, কৃষিজমি ও মৎস্যঘের মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

তিনি আরো বলেন, ঘূর্ণিঝড়ের বছরগুলো পেরিয়ে গেলেও উপকূলীয় এলাকার মানুষ এখনো মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারেনি। এখনো জোয়ারের জলোচ্ছ্বাসের আতঙ্ক, ভয় এবং কাজকর্মের তীব্র অভাব রয়েছে। একই সঙ্গে যোগাযোগব্যবস্থাও এখনো বিভিন্ন সমস্যার তিমিরে নিমজ্জিত। এলাকার মূল দাবি-রিং বাঁধের বদলে বেড়িবাঁধের মজবুত ও স্থায়ী টেকসই নির্মাণ হওয়া চাই। কয়েকটি জায়গায় সংস্কার করা হলেও অধিকাংশ জায়গায় ধস রয়েছে।

 

যেকোনো সময়ে প্রবল জোয়ারের চাপে এই বাঁধগুলো ভেঙে বিস্তীর্ণ এলাকা আবারও প্লাবিত হতে পারে।”
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড-এর তথ্য অনুযায়ী, শ্যামনগর, আশাশুনি ও সাতক্ষীরার উপকূলীয় অঞ্চলের বেশ কিছু বেড়িবাঁধ এখনো ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এদিকে, মেগা প্রকল্পের আওতায় শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা ইউনিয়নে বেড়িবাঁধ উন্নয়ন কাজ চলমান রয়েছে।

গাবুরা ইউপি চেয়ারম্যান মাসুদুল আলম বলেন, আম্পানের সেই ভয়াবহ ক্ষত ও দীর্ঘদিনের অবর্ণনীয় কষ্ট কাটিয়ে গাবুরার মানুষ এখন আবার নতুন করে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে। সরকারের বিশেষ নজরদারি পানি উন্নয়ন বোর্ডের সমন্বিত প্রচেষ্টায় ভাঙন কবলিত প্রধান পয়েন্টগুলোতে টেকসই ও আধুনিক বেড়িবাঁধ নির্মাণের কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে। বর্তমানে এখানে বড় আকারের মেগা প্রকল্প চলমান রয়েছে, যার কাজ শেষ হলে এই এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের কষ্ট অনেক কমে যাবে। আমরা আশাবাদী, এই প্রকল্পগুলো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে গাবুরা তথা পুরো উপকূলীয় অঞ্চল সম্পূর্ণ নিরাপদ হবে এবং এই জনপদের মানুষ টেকসই সুরক্ষাসহ নতুন করে তাদের কর্মসংস্থান ও মাথা গোঁজার ঠাঁই ফিরে পাবে।

প্রতাপনগর ইউপি চেয়ারম্যান আবু দাউদ ঢালী জানান, ঘূর্ণিঝড় আম্পানের আঘাতে সাতক্ষীরার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল আমার প্রতাপনগর ইউনিয়ন। তবে সেই ভয়াবহ ক্ষত ও দীর্ঘদিনের অবর্ণনীয় কষ্ট কাটিয়ে প্রতাপনগর এখন আবার নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সাহায্য-সহযোগিতার মাধ্যমে এই ইউনিয়নকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আমরা দিনরাত কাজ করে যাচ্ছি। টেকসই বাঁধের কাজ সম্পন্ন হলে এবং এই চলমান পুনর্বাসন প্রক্রিয়া সফল হলে এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ চিরতরে দূর হবে বলে আমি বিশ্বাস করি।

খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আগুন

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ২০ মে, ২০২৬, ৯:২৭ পূর্বাহ্ণ
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আগুন

অনলাইন ডেস্ক: খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রধান ভবনের তৃতীয় তলায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। আজ বুধবার ভোর ৬টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। ফায়ার সার্ভিসের ১০ ইউনিটের প্রায় এক ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে।

জানা গেছে, ভোর ৬টার দিকে আগুন লাগার খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছায় ফায়ার সার্ভিসের তিনটি ইউনিট। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পরে আরো সাতটি ইউনিট যোগ দেয়। প্রায় এক ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হন ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা।

 

এ ব্যাপারে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু না জানালেও কয়েকজন কর্মচারীরা জানান, হাসপাতালের প্রধান ভবনের তৃতীয় তলায় অপারেশন থিয়েটারে এ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। কক্ষটি তালাবদ্ধ ছিল।

 

এদিকে আগুন লাগার খবরে পুরো হাসপাতালজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেক রোগী ও তাদের স্বজনরা শয্যা ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে আসেন। তবে এ ঘটনায় কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।

 

ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক সরকার মাসুদ জানান, ধারণা করা হচ্ছে বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকেই আগুনের সূত্রপাত। তবে কেউ হতাহত হননি। ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের কাজ চলছে।

চুকনগর গণহত্যা: ভদ্রা নদীর রক্তস্রোত আর এক ‘সুন্দরী’র বেঁচে থাকার ইতিহাস

ডেস্ক নিউজ প্রকাশিত: বুধবার, ২০ মে, ২০২৬, ১:০৪ পূর্বাহ্ণ
চুকনগর গণহত্যা: ভদ্রা নদীর রক্তস্রোত আর এক ‘সুন্দরী’র বেঁচে থাকার ইতিহাস

সরদার এম এ মজিদ
খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার চুকনগর বাজার। ১৯৭১ সালের ২০ মে এই জনপদেই সংঘটিত হয়েছিল ইতিহাসের অন্যতম নৃশংস ও বৃহত্তম গণহত্যা। ভারতে আশ্রয় নেওয়ার উদ্দেশ্যে আসা ১০ থেকে ১৫ হাজার শরণার্থী সেদিন ট্রানজিট হিসেবে চুকনগর বাজারে জড়ো হয়েছিলেন। বাগেরহাটের রামপাল, মোড়লগঞ্জ, কচুয়া, শরণখোলা, মংলা এবং খুলনার দাকোপ, বটিয়াঘাটাসহ বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ ঘরবাড়ি, জমিজমার মায়া ত্যাগ করে স্রেফ প্রাণ বাঁচাতে এখানে এসেছিলেন।
১৯ মে রাত থেকেই চুকনগরের পাতাখোলা বিল, কাঁচাবাজার, চাঁদনী ফুটবল মাঠ, কালীমন্দির ও ভদ্রা নদীর ঘাট সংলগ্ন এলাকায় তিল ধারণের জায়গা ছিল না। কেউ দূর-দূরান্ত থেকে হেঁটে, কেউ নৌকায় বা গাড়িতে এসে কেবল একটু জিরিয়ে নিচ্ছিলেন। কেউ খাচ্ছিলেন চিঁড়ে-মুড়ি, কেউবা দুপুরের রান্নার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। কিন্তু স্থানীয় কিছু দুষ্কৃতকারী এই বিপুল জমায়েতের খবর পৌঁছে দেয় সাতক্ষীরার পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ক্যাম্পে।
২০ মে সকাল নয়টার দিকে একটি ট্যাংক ও একটি সাজোঁয়া জিপ নিয়ে সাতক্ষীরা-চুকনগর মহাসড়ক ধরে মালতিয়া মোড়ের ঝাউতলায় এসে থামে পাকিস্তানি সেনারা। গাড়ির শব্দ থামায় পাশে পাটক্ষেতে কর্মরত মালতিয়া গ্রামের বৃদ্ধ চিকন আলী মোড়ল (৭০) উঁকি দিয়ে দেখার চেষ্টা করেন। মুক্তিযোদ্ধারা ওঁৎ পেতে আছে ভেবে পাকিস্তানি সেনারা তাৎক্ষণিক চিকন আলীকে গুলি করে হত্যা করে।
ওই গুলির শব্দে হাজার হাজার মানুষের মধ্যে হুড়োহুড়ি ও দিক-বিদিক ছোটাছুটি শুরু হয়ে যায়। আর তখনই নির্বিচারে ব্রাশফায়ার শুরু করে হানাদাররা। যুবক, বৃদ্ধ, নারী কিংবা শিশু—কারো প্রতি দয়া দেখায়নি তারা। প্রাণভয়ে শত শত মানুষ ভদ্রা নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়লে, নদীর বুকেও গুলি চালানো হয়। মুহূর্তের মধ্যে ভদ্রা নদীর পানি রক্তে লাল হয়ে যায়। দোকানপাটের অলিগলি বা কালভার্টের নিচে লুকিয়েও শেষ রক্ষা হয়নি অনেকের। মাত্র দুই থেকে তিন ঘণ্টার এই তা-বে চুকনগর পরিণত হয় এক বিশাল লাশের স্তূপে।
গণহত্যার পরদিন, অর্থাৎ শুক্রবার সকালে মালতিয়া গ্রামের এরশাদ আলী মোড়ল তাঁর নিহত বাবা চিকন আলীর লাশের সন্ধানে ওই বধ্যভূমিতে যান। প্রতিটি লাশের মুখ দেখার সময় হঠাৎ তাঁর চোখ আটকে যায় এক মর্মস্পর্শী দৃশ্যে। তিনি দেখেন, এক মৃত মায়ের লাশের ওপর পড়ে আছে আনুমানিক ৫-৬ মাসের এক কন্যাসন্তান, যে তখনও মায়ের স্তন চোষার চেষ্টা করছে।
চোখের জল মুছতে মুছতে এরশাদ আলী সেই পরিচয়হীন শিশুটিকে কোলে তুলে বাড়ি নিয়ে যান এবং আদর করে নাম রাখেন ‘সুন্দরী’।
লোকমুখে কুড়িয়ে পাওয়া এই শিশুর খবর ছড়িয়ে পড়লে কেশবপুর থানার মঙ্গলকোটের কালিয়া গ্রামের নিঃসন্তান মাদার দাস দম্পতি শিশুটিকে লালন-পালনের আগ্রহ প্রকাশ করেন। জাতি-ধর্মের ঊর্ধ্বে উঠে মানবিক কারণে এরশাদ আলী ও স্থানীয়রা শিশুটিকে মাদার দাসের হাতে তুলে দেন।
মাদার দাসের ঘরেই সুন্দরী আস্তে আস্তে বড় হয়ে ওঠেন। ১৫ বছর বয়সে তাঁর বিয়ে হয় চুকনগরের মালতিয়া গ্রামের দিনমজুর বাটুল দাসের সঙ্গে। অত্যন্ত দরিদ্র বাটুল দাসের ঘরে সুমনের মা ও ডেভিড দাসের মা হিসেবে সুন্দরীর চরম অর্থকষ্টের সংসারজীবন শুরু হয়।
পরবর্তীতে বিভিন্ন গণমাধ্যম, সাংবাদিক ও গবেষকদের লেখালিখির মাধ্যমে চুকনগর গণহত্যার এই জীবন্ত সাক্ষীর কথা দেশজুড়ে জানাজানি হয়। একপর্যায়ে বিষয়টি সরকারের দৃষ্টিগোচর হলে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের পক্ষ থেকে সুন্দরীর স্থায়ী বাসস্থানের জন্য চুকনগরের নন্দী বাড়ির পেছনে ১১ শতক জমি ও একটি বাড়ি উপহার দেওয়া হয়।
আজ স্বামী, সন্তান ও নাতি-নাতনিদের নিয়ে সেই সরকারি বাড়িতেই সুন্দরীর দিন কাটছে। তিনি আজ শুধু একজন সাধারণ নারী নন, বরং ১৯৭১ সালের ২০ মে চুকনগরের সেই ভয়াবহ নৃশংসতার এক জীবন্ত ও ঐতিহাসিক সাক্ষী। বিশ্বের ইতিহাসে এই মর্মন্তুদ দিনটি যেন চিরস্মরণীয় হয়ে থাকে এবং সুন্দরীর জীবনসংগ্রাম যেন ইতিহাসের পাতায় যথাযথভাবে লিপিবদ্ধ হয়Ñআজকের দিনে এটাই সকলের প্রত্যাশা।