পরিবেশ সুরক্ষা ও স্বাস্থ্য সচেতনতা বাড়াতে ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার কমাতে হবে
প্রকাশ ঘোষ বিধান
পরিবেশ সুরক্ষা ও স্বাস্থ্য সচেতনতা বাড়াতে ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার কমানো এখন সময়ের দাবি। ক্রমাগত ব্যক্তিগত গাড়ি বৃদ্ধির ফলে তীব্র যানজটের পাশাপাশি বায়ুদূষণও চরম মাত্রায় পৌঁছাচ্ছে। পরিবেশের এই বিপর্যয় ও নাগরিকদের স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে ব্যক্তিগত গাড়ির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে টেকসই বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি।
সড়কে গাড়ির সংখ্যা কমলে কার্বন-ডাই-অক্সাইডসহ অন্যান্য ক্ষতিকর গ্রিনহাউস গ্যাসের নির্গমন উল্লেখযোগ্য হারে কমে। ঘন ঘন হর্ন ও গাড়ির কালো ধোঁয়া কমে যাওয়ায় শহরের বায়ুর মান উন্নত হয় এবং শব্দদূষণজনিত স্বাস্থ্য সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। জীবাশ্ম জ্বালানির অপচয় রোধ হয়, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি ও জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সাহায্য করে।
পরিবেশ রক্ষা ও স্বাস্থ্য সচেতনতা বাড়াতে ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার কমানো অত্যন্ত জরুরি। বাসযোগ্য ও সুস্থ নগরী গড়তে ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ন্ত্রণ ও গণপরিবহণ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ব্যক্তিগত গাড়ি কমালে ক্ষতিকর কার্বন নিঃসরণ কমে এবং বায়ু পরিষ্কার থাকে। গাড়ির হর্ন ও ইঞ্জিন থেকে সৃষ্ট শব্দ দূষণ কমে। অল্প দূরত্বে হাঁটাচলা বা সাইকেল চালালে শারীরিক কসরত হয় এবং স্বাস্থ্য ভালো থাকে। সড়কে ব্যক্তিগত বাহন কমলে তীব্র যানজট কমে এবং যাতায়াত সহজ হয়।
২২ সেপ্টেম্বর বিশ্ব ব্যক্তিগত গাড়িমুক্ত দিবস। যা প্রতিবছর বিশ্বজুড়ে নাগরিকদের ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার না করে বরং সাইকেল, হাঁটা বা গণপরিবহন ব্যবহারে উৎসাহিত করতে পালিত হয়। পরিবেশ দূষণ হ্রাস, যানজট নিয়ন্ত্রণ এবং জ্বালানি সাশ্রয়ের লক্ষ্যে বিশ্বব্যাপী এই সচেতনতা তৈরি করা হয়। ৭০-এর দশকে ইউরোপে প্রথম এই ধারণার সূচনা হলেও, প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ১৯৯৮ সালে ফ্রান্সে এটি জাতীয়ভাবে উদযাপিত হয়। পরবর্তীতে ২০০০ সালে ইউরোপীয় কমিশন এটিকে একটি স্বতন্ত্র দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয় এবং এটি আন্তর্জাতিক রূপ পায়। বাংলাদেশে প্রথম ২০০৬ সাল থেকে বেসরকারি উদ্যোগে এই দিবসটি পালন করা শুরু হয়। পরবর্তীতে ২০১৬ সাল থেকে সরকারিভাবেসহ বিভিন্ন অংশীজনদের সাথে নিয়ে দিবসটি নিয়মিত উদযাপন করা হচ্ছে। পরিবেশবান্ধব ও টেকসই পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য এই দিবসটি একটি বড় অনুস্মারক হিসেবে কাজ করে।
জীবাশ্ম জ্বালানি পুড়িয়ে ব্যক্তিগত গাড়ি চালানোর ফলে অতিরিক্ত মাত্রায় গ্রিনহাউস গ্যাস উৎপন্ন হয়, যা জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ। ব্যক্তিগত গাড়ি থেকে নির্গত কার্বন ডাই-অক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড এবং অন্যান্য ক্ষতিকর ধোঁয়া বায়ুর গুণমান মারাত্মকভাবে নষ্ট করে। গাড়ি কমলে বাতাসে এসব বিষাক্ত গ্যাসের পরিমাণ কমে যায়।
অতিরিক্ত ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারের ফলে শহরের বায়ু দূষণ ও তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়। এই দিনে নাগরিকদের ব্যক্তিগত গাড়ি বাদ দিয়ে পায়ে হেঁটে, সাইকেলে বা গণপরিবহনে যাতায়াতে উৎসাহিত করা হয়। পরিবেশবান্ধব গণপরিবহন এবং হাঁটা বা সাইকেল চালানোর সুবিধা ও প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা হয়।
ব্যক্তিগত গাড়ি রাস্তায় বেশি জায়গা দখল করে কিন্তু বহন করে কম যাত্রী। এর ফলে তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়। গণপরিবহন বা হাঁটার অভ্যাস বাড়ালে সড়কের ওপর চাপ কমে। ছোট দূরত্বের পথগুলোতে ব্যক্তিগত গাড়ি বর্জন করে হাঁটা বা সাইকেল চালানোর অভ্যাস তৈরি করলে হৃদরোগ, স্থূলতা এবং ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমে। যানজট এবং উচ্চ হর্নের কারণে সৃষ্ট মানসিক চাপ ও বিষণ্ণতা থেকে নাগরিকরা মুক্তি পান।
বিশ্বের বহু দেশেই এবং অধিকাংশ রাজধানীতে গাড়িমুক্ত হাঁটার সড়ক যেমন আছে, তেমনি থাকে ফুটপাত। স্বল্প দূরত্বে হাঁটার সুযোগ নগরে চলাচলে স্বস্তি যেমন বাড়ায়, তেমনি তা স্বাস্থ্যকরও। আমাদের দেশে সড়ক অনুপাতে ফুটপাতের পরিমাণ খুবই কম। আবার যেটুকু আছে, সেটুকুও অবৈধ স্থাপনা ও ব্যবসার উদ্দেশ্যে ব্যবহার করার কারণে দখল করে রাখে। সে জন্য ফুটপাত ব্যবহার করা সম্ভব হয় না।
শহরের ফুটপাতগুলোকে দখলমুক্ত ও ছায়াযুক্ত করা এবং সাইকেল চলাচলের জন্য আলাদা লেনের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। শহরগুলোকে গাড়ির আধিপত্য থেকে মুক্ত করে মানুষের উপযোগী ও বাসযোগ্য করে তোলার তাগিদ দেওয়া হয়। মানুষের ব্যক্তিগত গাড়ির প্রতি ঝোঁক কমানোর জন্য নিরাপদ, আরামদায়ক ও সময়সাশ্রয়ী গণপরিবহন নিশ্চিত করা।
একটি বাসযোগ্য ও পরিবেশবান্ধব নগরী গড়ে তুলতে আমাদের প্রতিদিনের যাতায়াতে সচেতন হতে হবে। ছোট দূরত্বে ব্যক্তিগত গাড়ির বিকল্প খোঁজার মানসিকতা তৈরি করতে হবে। পরিবেশবান্ধব ও টেকসই নগর গড়তে ব্যক্তিগত গাড়ির বিকল্প হিসেবে মানসম্মত গণপরিবহন ব্যবস্থা এবং হেঁটে বা সাইকেলে চলাচলে উৎসাহিত করা প্রয়োজন।
একটি পরিচ্ছন্ন, দূষণমুক্ত ও সুস্থ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আমাদের প্রত্যেকেরই উচিত ব্যক্তিগত গাড়ির ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে পরিবেশবান্ধব জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত হওয়া। নগর রক্ষা, নিজের স্বাস্থ্য উন্নত করা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ে তুলতে আমাদের এখনই ব্যক্তিগত গাড়ির বিলাসী ব্যবহার বর্জন করে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট












