সাতক্ষীরার চরাঞ্চলে শিক্ষা বঞ্চনার বহুমাত্রিক সংকট
মো. মামুন হাসান
একজন শিক্ষক হিসেবে যখন সাতক্ষীরার প্রত্যন্ত চরাঞ্চলের দিকে তাকাই, তখন প্রথমেই যে দৃশ্যটি চোখে ভাসে, তা হলো ভোরবেলা নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজন শিশু, যাদের হাতে বই-খাতা, অথচ চোখে অনিশ্চয়তা। নৌকা আসবে কি না, নদী শান্ত থাকবে কি না, বাঁধ ভেঙে যাওয়া পথ পার হওয়া যাবে কি না এই প্রশ্নগুলো তাদের কাছে প্রতিদিনের বাস্তবতা। একজন শিক্ষকের কাজ শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান দেওয়া নয়, বরং শিক্ষার্থীর সামগ্রিক পরিস্থিতি বোঝা এবং তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা। শ্যামনগর, গাবুরা, পদ্মপুকুর বা কৈখালীর মতো এলাকায় গেলে বোঝা যায়, শিক্ষা এখানে কেবল একটি অধিকার নয়, বরং প্রতিদিনের এক সংগ্রাম।
আমি যে প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করি, সেখানে কারিগরি শিক্ষা নিয়ে কাজ করার সুযোগ হয়। এই কাজের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, একজন শিক্ষক হিসেবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো শিক্ষার্থীকে ধরে রাখা। শহরাঞ্চলে যেখানে ঝরে পড়ার হার তুলনামূলক কম, চরাঞ্চলে তা ভয়াবহ রকম বেশি। একজন শিক্ষার্থী সপ্তাহের তিন দিন আসে, দুই দিন আসে না কারণ পরিবারের সঙ্গে ঘেরে কাজ করতে হয়, অথবা ছোট ভাইবোনকে দেখে রাখতে হয়, অথবা নদী পার হওয়ার নৌকা পাওয়া যায়নি। শিক্ষক হিসেবে এই অনুপস্থিতিকে শুধু হাজিরার খাতায় দাগ কেটে রাখা যায় না; বুঝতে হয় এর পেছনের জীবনসংগ্রাম।
শিক্ষকতার পেশায় থেকে আরেকটি বাস্তবতা প্রতিনিয়ত সামনে আসে শিক্ষকরা নিজেই এই এলাকায় থাকতে চান না। প্রত্যন্ত চরে নিয়োগ পাওয়া অনেক সহকর্মী প্রথম সুযোগেই বদলির চেষ্টা করেন। এর পেছনে যুক্তিও আছে। বিদ্যুৎ নেই, বিশুদ্ধ পানি নেই, চিকিৎসাসেবা নেই বললেই চলে, সন্তানের জন্য ভালো স্কুলও নেই। একজন শিক্ষক যখন নিজের পরিবারের নিরাপত্তা আর সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে দ্বিধায় থাকেন, তখন তার কাছ থেকে দীর্ঘমেয়াদী প্রতিশ্রুতি আশা করা কঠিন। ফলে একটি বিদ্যালয়ে বছরের পর বছর শিক্ষক পরিবর্তন হতেই থাকে, আর সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় শিক্ষার্থী, যাদের শেখার ধারাবাহিকতা বারবার ব্যাহত হয়।
তবে এই সংকটের মধ্যেও যে জিনিসটি আমাকে সবচেয়ে বেশি ভাবায়, তা হলো শিক্ষার সঙ্গে জীবিকার সংযোগহীনতা। একজন শিক্ষক পাঠ্যবই থেকে যা শেখান, তার সঙ্গে শিক্ষার্থীর বাস্তব জীবনের কোনো মিল থাকে না। একটি শিশু জানে কীভাবে চিংড়ির ঘের দেখাশোনা করতে হয়, কীভাবে সুন্দরবনে মধু সংগ্রহ করতে হয়, অথচ বিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে এসবের কোনো প্রতিফলন নেই। কারিগরি শিক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকার কারণে আমি বিশ্বাস করি, যদি স্থানীয় বাস্তবতা ও জীবিকার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ দক্ষতা প্রশিক্ষণ পাঠ্যক্রমে যুক্ত করা যায়, তাহলে শিক্ষার প্রতি আগ্রহ বাড়বে। সুন্দরবন-সংলগ্ন এই অঞ্চলে পর্যটন ও হসপিটালিটি বিষয়ক প্রাথমিক দক্ষতা প্রশিক্ষণ, নৌকা পরিচালনা, প্রাকৃতিক গাইডিং, স্থানীয় হস্তশিল্পের মতো বিষয়গুলো যদি শিক্ষার সঙ্গে সংযুক্ত করা যায়, তাহলে অভিভাবকরাও সন্তানকে বিদ্যালয়ে পাঠাতে আগ্রহী হবেন, কারণ তারা দেখবেন শিক্ষা সরাসরি জীবিকার সঙ্গে সম্পর্কিত।
একজন শিক্ষকের দৃষ্টিকোণ থেকে আরেকটি বিষয় লক্ষণীয় শ্রেণিকক্ষের বাইরে শিক্ষার্থীর মানসিক অবস্থা। ঘূর্ণিঝড়, নদী ভাঙন, লবণাক্ততার কারণে ফসল নষ্ট হওয়া এসব ঘটনা শিশুর মনে গভীর প্রভাব ফেলে। আয়লা বা আম্ফানের পর যে শিক্ষার্থীরা ঘরবাড়ি হারিয়েছে, তাদের কাছে পাঠ্যবইয়ের অক্ষরের চেয়ে বেঁচে থাকার লড়াই বড় হয়ে দাঁড়ায়। একজন শিক্ষক তখন কেবল শিক্ষক থাকেন না, হয়ে ওঠেন মানসিক সহায়তার একজন সঙ্গীও। কিন্তু এই বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ বা সহায়তা প্রায় নেই বললেই চলে।
তারপরও আশার জায়গা আছে। কিছু এলাকায় ভাসমান স্কুল বা নৌকাভিত্তিক শিক্ষা প্রকল্প শিক্ষার্থীদের কাছে শিক্ষা পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছে। এই উদ্যোগগুলো প্রমাণ করে, সদিচ্ছা থাকলে ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করা সম্ভব। একজন শিক্ষক হিসেবে আমি বিশ্বাস করি, শুধু অবকাঠামো তৈরি করাই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন শিক্ষকদের জন্য উপযুক্ত প্রণোদনা, প্রত্যন্ত এলাকায় কাজের জন্য বিশেষ সুযোগ-সুবিধা এবং দীর্ঘমেয়াদী পদায়নের নিশ্চয়তা। একজন শিক্ষক যদি নিরাপদ থাকার নিশ্চয়তা পান, তাহলে তিনিও দীর্ঘমেয়াদী অঙ্গীকার নিয়ে কাজ করতে পারবেন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শিক্ষাকে স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে সংযুক্ত করা। সাতক্ষীরার চরাঞ্চলের শিশুরা প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে বড় হয়। তাদের এই অভিজ্ঞতাকে শিক্ষার অংশ করে তোলা গেলে, শিক্ষা আর দূরের কোনো বিষয় থাকবে না, হয়ে উঠবে জীবনের অংশ। একজন শিক্ষক হিসেবে আমার বিশ্বাস, এই সংযোগ তৈরি করতে পারলেই চরাঞ্চলের শিশুদের কাছে শিক্ষার আলো সত্যিকার অর্থে পৌঁছাবে। তা না হলে প্রতিটি নতুন বর্ষা, প্রতিটি নতুন জলোচ্ছ্বাস এই শিশুদের স্বপ্নকেও একইসঙ্গে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে, এবং আমরা শিক্ষকরা কেবল দূর থেকে তা দেখে যাব।
লেখক: ইনস্ট্রাক্টর (টেক) ও বিভাগীয় প্রধান, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট












